📄 গুনাহ নেককাজের আগ্রহ শেষ করে দেয়
গুনাহের একটি ভয়ংকর ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষের ভালো ও কল্যাণ কাজের আগ্রহকে নিঃশেষ করে দেয় এবং অন্তরকে পাপকাজের প্রতি দুর্বল করে ফেলে। বান্দার মনোবাসনা তখন পাপকাজের প্রতি ঝুঁকে যায়। নেক কাজ করতে তার ইচ্ছা হয় না। নেক কাজের প্রতি তার কোনো আগ্রহ থাকে না। সে ভালো কাজের প্রতি কোনো উৎসাহ পায় না। এভাবে তার অন্তর থেকে নেক কাজের স্পৃহা লুপ্ত হয়ে যায়। সে তাওবা করারও ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে। তাওবাহীন অবস্থায়ই হয়তো সে মারা যায়। অথবা বাধ্য হয়ে তাওবা করলেও তা কেবল মুখের কিছু আওড়ানো বুলিই থাকে। অনাগ্রহের কারণে মন থেকে তাওবা করতে পারে না। মুখে তাওবা ও ইস্তিগফার করা অবস্থায়ও তার অন্তর পাপকাজের প্রতি ঝুঁকে থাকে। এমনকি মৃত্যু-যন্ত্রণায় তাওবার বাক্য উচ্চারণ করলেও তার মন থাকে গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট, আবার যদি সুযোগ পায়, তাহলে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে উঠবে।
গুনাহের এই বাস্তবধর্মী ক্ষতিটি বান্দার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।
📄 গুনাহ করতে ভালো লাগতে থাকে
পাপকাজের উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষতি হলো, মন থেকে খারাপ ও মন্দ কাজের ঘৃণা দূর হয়ে যায়। পাপকাজকে তখন আর তার কাছে পাপ কিংবা খারাপ কাজ বলে মনে হয় না। মন্দকাজ তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন 'লোকে কী বলবে' বা 'মানুষ আমাকে দেখছে'- এ ধরনের চিন্তা ছেড়ে আপন গতিতে খারাপ কাজ করে বেড়ায়। গুনাহপ্রীতি তাকে চক্ষুলজ্জা উপেক্ষা করে নির্বিকারভাবে গুনাহের কাজ চালিয়ে যেতে সাহস যোগায়। গুনাহের ব্যাপারে সে হয়ে যায় তখন লাজ-লজ্জাহীন। এমনকি নিজ গুনাহ নিয়ে প্রকাশ্যে গর্বও করে। যারা তার অপরাধকর্মের কথা জানে না তাদেরকেও সে বুক ফুলিয়ে নিজের মন্দ কাজের কথা জানাতে থাকে। উদ্ভ্রান্ত ব্যক্তির মতো নিজের গুনাহের কথা ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়। নির্লজ্জ ব্যক্তির মতো বলতে থাকে- 'শোনো তোমরা! আমি এই এই অপরাধ আজ করেছি!'
এই প্রকারের দুশ্চরিত্র লোকেরা ক্ষমা পাবে না। তাদের জন্য তাওবার দরজা সাধারণত বন্ধ করে দেয়া হয়। আল্লাহর নবী ﷺ ইরশাদ করেন-
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
'প্রকাশ্যে গুনাহগার ব্যক্তি ব্যতীত আমার উম্মতের সকলেই ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। প্রকাশ্য গুনাহ করার একটি অর্থ এই যে, বান্দা রাতের বেলায় গোপনে গুনাহ করে আর আল্লাহ তাআলা সেই গুনাহকে গোপনই রেখে দেন। কিন্তু গুনাহগার ব্যক্তি নিজেই সকালে প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়, "শোনো তোমরা! আমি তো রাতে এই এই কাজ করেছি।” সে নিজেই নিজের মন্দ কথার জানান দিয়ে বেড়ায় অথচ আল্লাহ তাআলা রাতের বেলায় তার সেই গুনাহের কথা গোপন রেখেছিলেন।''১৯
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬০৬৯
📄 গুনাহ অতীতে আযাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের কর্মের সিলসিলা
পৃথিবীতে যত ধরনের নাফরমানি রয়েছে এর সবই পূর্ববর্তী কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের করে যাওয়া বদ-আমল। যেমন—
* সমকামিতা লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কুকর্মের সিলসিলা।
* ওজন ও পরিমাপে কম-বেশি করা শুআইব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের রেখে যাওয়া অনৈতিকতা。
* সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ছিল ফিরআউনের অনুসারীদের কাজ。
* অহংকার-অহমিকার ব্যাধি ছিল হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের বদঅভ্যাস。
ফলত গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য শত্রুদের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ইমাম আহমাদ কিতাবুয যুহদে ইমাম মালিক ইবনু দিনার সূত্রে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। হাদীসটি হলো—আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের একজন নবীর কাছে এই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করলেন যে, 'আপনি জনপদের লোকদেরকে জানিয়ে দিন, তারা যেন আমার শত্রুদের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়, আমার শত্রুদের পোষাক যেন তারা পরিধান না করে, আমার শত্রুদের মতো যেন তাদের জীবনাচার না হয়, তাদের আহার-নিদ্রা যেন আমার শত্রুদের মতো না হয়। অন্যথায় তারাও আমার শত্রু হয়ে যাবে। আমার দুশমনের পরিণতি তাদেরও ভোগ করতে হবে।'
নবীজি ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তির জীবনধারা যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' [২৯]
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬০৬৯
[২] মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, হাদীস-ক্রম: ১৯৪০১
📄 গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহর কাছে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত
গুনাহের একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হলো, অবাধ্যতা ও নাফরমানির কারণে বান্দা আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত হয়ে যায়। মূল্যহীন ও হেয়-প্রতিপন্ন বান্দায় পরিণত হয়। হাসান বসরী বলেন, 'তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে লাঞ্ছিত ও ধিকৃত, তাই তারা আল্লাহর নাফরমানি করতে থাকে। আর যারা আল্লাহর নিকট সম্মানিত ও প্রিয় তাদেরকে আল্লাহ তাআলা গুনাহ ও পাপকাজ থেকে রক্ষা করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয় তাকে অন্য কেউ সম্মানিত করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ
'আর আল্লাহ তাআলা যাকে অপমানিত করেন, তাকে কেউই সম্মান করে না।
যদিও কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ জাগতিক প্রয়োজনের স্বার্থে বা ভয়ের কারণে তাকে সম্মান করে কিন্তু অন্তরে অন্তরে তার প্রতি ঠিকই ঘৃণা পোষণ করে এবং সে মানুষের অন্তর্দৃষ্টিতে হয় লাঞ্ছিত ও অপদস্থ।