📄 গুনাহের পরম্পরা দীর্ঘ হতে থাকে
গুনাহের অন্যতম একটি ক্ষতি হলো, একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহের পথ দেখায়। এভাবে বান্দার জন্য একের পর এক গুনাহের দ্বার খুলে যায়। গুনাহগার ব্যক্তিও একের পর এক গুনাহকে আলিঙ্গন করতে করতে একসময় সে গুনাহের অতল সাগরে নেমে যায়। পাপকাজ তার অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়া তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। একজন বুযুর্গ বলেছিলেন, 'অপকর্মের শাস্তি হলো পরবর্তী অপকর্মের সুযোগপ্রাপ্ত হওয়া। আর নেক কাজের পুরস্কার হলো পরবর্তী আরেকটি নেক কাজের সুযোগ পাওয়া। সুতরাং বান্দা যখন কোনো ভালো কাজ করে তখনই তাকে অদৃশ্য থেকে আরেকটি ভালো কাজ হাতছানি দিয়ে বলতে থাকে, “উত্তমকাজ সম্পাদনকারী, তুমি আমাকেও পৃথিবীর বুকে বাস্তবায়ন করো।” যখন সে এই ভালো কাজটিও করে ফেলে তখন তৃতীয় আরেকটি ভালো কাজ তাকে আহ্বান করতে থাকে। আর সেও তার আহ্বানে সাড়া দেয়। এভাবে সে একের পর এক ভালো কাজের আহ্বানে সাড়া দিতে থাকে। আর ভালো ও উত্তমকাজে তার মননশীলতা বাড়তে থাকে। গুনাহ ও মন্দ কাজের ব্যাপারটিও অনুরূপ। ফলে বান্দা তার কৃতকর্ম অনুযায়ী হয় ভালো অথবা খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাপ কিংবা পুণ্য তার জীবনের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভালো বা মন্দকাজ তার স্বভাবজাত যোগ্যতায় পরিণত হয়।'
এই অবস্থায় নেককার বান্দা যদি নেক ও উত্তম কাজ করতে না পারে, ভালো কাজ করতে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তার জন্য স্বাভাবিক থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। ভালো কাজ করতে সে অস্থির হয়ে ওঠে। সে পানিহীন মাছের মতোই ছটফট করতে থাকে উত্তম কাজের খোঁজে। আবার অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির জন্য যদি অপরাধের দরজা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে অস্থির হয়ে ওঠে। অপরাধ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য তার জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কেমন-যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। খারাপ ও বদ অভ্যাসে অভ্যস্ত অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, তারা এমনও কিছু অপরাধ ও খারাপ কাজ করে থাকে যা পার্থিব বিবেচনাতেও নিতান্তই অহেতুক ও অনর্থক। যে ব্যক্তি খারাপ কাজটি করে তারও বিন্দুমাত্র লাভ বা প্রাপ্তি থাকে না এখানে। এমন খারাপ কাজেও তারা নিজেদের অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে যেখানে তাদের ন্যূনতম মনোবাসনা বা আত্মতৃপ্তির কোনো স্বার্থ কাজ করে না। তাদের এসব অপরাধের পেছনে তেমন কোনো হেতু বা কারণও থাকে না। শুধুমাত্র অপরাধ করতে হবে, অপরাধ করা ছাড়া সে স্বাভাবিক থাকতে পারে না—এই অবস্থার কারণেই সে অর্থহীন এমন নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। শাইখ হাসান ইবনু হানি' আবৃত্তি করেছেন—
وَكَأْسِ شَرِبْتُ عَلَى لَذَّةٍ ... وَأُخْرَى تَدَاوَيْتُ مِنْهَا بِهَا
'এক পেয়ালা শরাব পান করেছি আত্মতৃপ্তির নেশায়। পরের পেয়ালা পান করেছি আগের পেয়ালার নেশা দূর করার আশায়।'
আরেক কবি বলেন—
فَكَانَتْ دَوَائِي وَهْيَ دَائِي بِعَيْنِهِ ... كَمَا يَتَدَاوَى شَارِبُ الْخَمْرِ بِالْخَمْرِ
'আমার ওষুধই তো আমার রোগ, যেমন মদ্যপ ব্যক্তির দ্বিতীয় ঢোক মদ প্রথম ঢোকের নেশার ওষুধ।'
কোনো বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে মনযোগী হয়ে ওঠে, রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য আন্তরিক হয় এবং আল্লাহর ভালোবাসাকে জাগতিক সব ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর প্রাধান্য দেয় তখন আল্লাহ তাআলা তার নিকট বিশেষ রহমত দিয়ে ফিরিশতা পাঠান। রহমতের সেই ফিরিশতা সব জায়গায় তাকে সাহায্য করতে থাকে। আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তাকে সুযোগ করে দেয়। রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাকে উৎসাহ যোগায়। জাগতিক বিভিন্ন বৈষয়িক আলাপ-আলাপনের অনর্থক মজলিস, আরাম-আয়েশ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যস্ত রাখে। এভাবে সে একজন পরিপূর্ণ আল্লাহভীরু, আনুগত্যশীল ও ন্যায়পরায়ণ বান্দা হয়ে যায়।
আর বান্দা যখন গুনাহের প্রতি আন্তরিক হয়, পাপকাজকে ঘিরে তার মনোযোগ আবর্তিত হয়, অন্যায়কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে বাস্তবজীবনে তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য শয়তানের দ্বার খুলে দেন। শয়তান সর্বত্র তাকে খারাপ কাজের প্রতি প্ররোচনা দেয়। মন্দ কাজকেই তার জন্য সহজ করে দেয়। ফলে বান্দা তখন খুব সহজেই খারাপ কাজকে গ্রহণ করে নেয়। আর একসময় সে শয়তানের সাহায্যে শক্তিধর পাপাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
📄 গুনাহ নেককাজের আগ্রহ শেষ করে দেয়
গুনাহের একটি ভয়ংকর ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষের ভালো ও কল্যাণ কাজের আগ্রহকে নিঃশেষ করে দেয় এবং অন্তরকে পাপকাজের প্রতি দুর্বল করে ফেলে। বান্দার মনোবাসনা তখন পাপকাজের প্রতি ঝুঁকে যায়। নেক কাজ করতে তার ইচ্ছা হয় না। নেক কাজের প্রতি তার কোনো আগ্রহ থাকে না। সে ভালো কাজের প্রতি কোনো উৎসাহ পায় না। এভাবে তার অন্তর থেকে নেক কাজের স্পৃহা লুপ্ত হয়ে যায়। সে তাওবা করারও ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে। তাওবাহীন অবস্থায়ই হয়তো সে মারা যায়। অথবা বাধ্য হয়ে তাওবা করলেও তা কেবল মুখের কিছু আওড়ানো বুলিই থাকে। অনাগ্রহের কারণে মন থেকে তাওবা করতে পারে না। মুখে তাওবা ও ইস্তিগফার করা অবস্থায়ও তার অন্তর পাপকাজের প্রতি ঝুঁকে থাকে। এমনকি মৃত্যু-যন্ত্রণায় তাওবার বাক্য উচ্চারণ করলেও তার মন থাকে গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট, আবার যদি সুযোগ পায়, তাহলে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে উঠবে।
গুনাহের এই বাস্তবধর্মী ক্ষতিটি বান্দার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।
📄 গুনাহ করতে ভালো লাগতে থাকে
পাপকাজের উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষতি হলো, মন থেকে খারাপ ও মন্দ কাজের ঘৃণা দূর হয়ে যায়। পাপকাজকে তখন আর তার কাছে পাপ কিংবা খারাপ কাজ বলে মনে হয় না। মন্দকাজ তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন 'লোকে কী বলবে' বা 'মানুষ আমাকে দেখছে'- এ ধরনের চিন্তা ছেড়ে আপন গতিতে খারাপ কাজ করে বেড়ায়। গুনাহপ্রীতি তাকে চক্ষুলজ্জা উপেক্ষা করে নির্বিকারভাবে গুনাহের কাজ চালিয়ে যেতে সাহস যোগায়। গুনাহের ব্যাপারে সে হয়ে যায় তখন লাজ-লজ্জাহীন। এমনকি নিজ গুনাহ নিয়ে প্রকাশ্যে গর্বও করে। যারা তার অপরাধকর্মের কথা জানে না তাদেরকেও সে বুক ফুলিয়ে নিজের মন্দ কাজের কথা জানাতে থাকে। উদ্ভ্রান্ত ব্যক্তির মতো নিজের গুনাহের কথা ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়। নির্লজ্জ ব্যক্তির মতো বলতে থাকে- 'শোনো তোমরা! আমি এই এই অপরাধ আজ করেছি!'
এই প্রকারের দুশ্চরিত্র লোকেরা ক্ষমা পাবে না। তাদের জন্য তাওবার দরজা সাধারণত বন্ধ করে দেয়া হয়। আল্লাহর নবী ﷺ ইরশাদ করেন-
كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولُ يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ
'প্রকাশ্যে গুনাহগার ব্যক্তি ব্যতীত আমার উম্মতের সকলেই ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। প্রকাশ্য গুনাহ করার একটি অর্থ এই যে, বান্দা রাতের বেলায় গোপনে গুনাহ করে আর আল্লাহ তাআলা সেই গুনাহকে গোপনই রেখে দেন। কিন্তু গুনাহগার ব্যক্তি নিজেই সকালে প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়, "শোনো তোমরা! আমি তো রাতে এই এই কাজ করেছি।” সে নিজেই নিজের মন্দ কথার জানান দিয়ে বেড়ায় অথচ আল্লাহ তাআলা রাতের বেলায় তার সেই গুনাহের কথা গোপন রেখেছিলেন।''১৯
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬০৬৯
📄 গুনাহ অতীতে আযাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের কর্মের সিলসিলা
পৃথিবীতে যত ধরনের নাফরমানি রয়েছে এর সবই পূর্ববর্তী কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের করে যাওয়া বদ-আমল। যেমন—
* সমকামিতা লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের কুকর্মের সিলসিলা।
* ওজন ও পরিমাপে কম-বেশি করা শুআইব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের রেখে যাওয়া অনৈতিকতা。
* সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ছিল ফিরআউনের অনুসারীদের কাজ。
* অহংকার-অহমিকার ব্যাধি ছিল হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের বদঅভ্যাস。
ফলত গুনাহগার ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রকাশ্য শত্রুদের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ইমাম আহমাদ কিতাবুয যুহদে ইমাম মালিক ইবনু দিনার সূত্রে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। হাদীসটি হলো—আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের একজন নবীর কাছে এই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করলেন যে, 'আপনি জনপদের লোকদেরকে জানিয়ে দিন, তারা যেন আমার শত্রুদের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়, আমার শত্রুদের পোষাক যেন তারা পরিধান না করে, আমার শত্রুদের মতো যেন তাদের জীবনাচার না হয়, তাদের আহার-নিদ্রা যেন আমার শত্রুদের মতো না হয়। অন্যথায় তারাও আমার শত্রু হয়ে যাবে। আমার দুশমনের পরিণতি তাদেরও ভোগ করতে হবে।'
নবীজি ইরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তির জীবনধারা যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।' [২৯]
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬০৬৯
[২] মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, হাদীস-ক্রম: ১৯৪০১