📄 কোনো গুনাহকেই হালকা বা তুচ্ছ মনে করতে নেই
আনাস ইবনু মালিক রা. বলেন, 'তোমরা তো এখন এমন অনেক অনুত্তম কাজ করো, যা তোমাদের চোখে খুবই নগণ্য। অথচ আমরা এসব কাজকেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় আমাদের জন্য ধংসাত্মক মনে করতাম।' [৩]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, আল্লাহর নবী ইরশাদ করেছেন, 'একটি বিড়ালকে আটকে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার কারণে এক মহিলাকে জাহান্নামের শাস্তি দেয়া হয়েছে।'[১]
ইমাম আওযায়ী বলেন, আমি বিলাল ইবনু সাদকে নসীহত করতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'তোমরা কোনো অপরাধের ক্ষুদ্রতার প্রতি লক্ষ কোরো না। তোমরা অপরাধকে আল্লাহর নাফরমানি হিসেবে গণনা করো।'
ফুযাইল ইবনু ইয়ায বলেন, 'কোনো গুনাহ তোমার কাছে যত ছোট মনে হবে আল্লাহ তাআলার নিকট সেই গুনাহ পরিমাণে তত বড় অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে।'
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ ذَنْبًا كَانَتْ نُكْتَةً سَوْدَاءَ فِي قَلْبِهِ ، فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ صُقِلَ مِنْهَا قَلْبُهُ ، وَإِنْ زَادَ زَادَتْ حَتَّى يُغْلَقَ بِهَا قَلْبُهُ فَذَلِكَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي كِتَابِهِ : كَلَا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'কোনো মুমিন বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। এরপর যদি সে গুনাহ ছেড়ে দিয়ে তাওবা ও ইস্তিগফার করে, তাহলে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। আর যদি সে গুনাহ করতেই থাকে, তাহলে কালো দাগটিও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এভাবে একসময় পুরো অন্তর গুনাহের প্রভাবে কালো হয়ে যায়। অন্তরের এই অবস্থাকেই আল্লাহ তাআলা (এই আয়াতে) হৃদয়ের মরিচা বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন-"কখনোই নয়। তাদের কৃতকর্মের ফলেই তাদের অন্তরে মরিচা পড়েছে."[২]
হুযাইফাহ বলেন, 'বান্দা গুনাহ করলে অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। বিরামহীন গুনাহের কারণে এক পর্যায়ে তার অন্তর কালো ছাগলের রঙ ধারণ করে।'
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু'র নিকট চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে উল্লেখ ছিল-'কোনো ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে তখন প্রশংসাকারীও ঐ ব্যক্তির নিন্দা করতে থাকে।'
আবু দারদা বলেন, 'শাসকগণ যেন মুমিন বান্দাদের অন্তরের অভিশাপ থেকে সতর্ক থাকে। হয়তো সে বুঝতেও পারবে না যে, মুমিন ব্যক্তিদের অন্তর তাকে অভিসম্পাত করছে।' এরপর আবু দারদা বলেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে তখন ঐ ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ তাআলার ক্রোধ মুমিন বান্দাদের অন্তরে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, কেউ বুঝতেও পারে না।
টিকাঃ
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৪৯২
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ২৩৬৫; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৫৯৮৯
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৩৪
📄 গুনাহের তাৎক্ষণিক ও দূরবর্তী প্রভাব
গুনাহের ব্যাপারে অনেক মানুষ একটি ভুল চিন্তা লালন করে থাকে। তারা গুনাহের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পায় না। কখনো কখনো গুনাহের প্রতিক্রিয়া দূর ভবিষ্যতের কোনো সময়ে প্রকাশ পায়। গুনাহগার ব্যক্তির তখন পুরনো গুনাহের কথা মনে থাকে না। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখলেই তারা মনে করে ভবিষ্যতে এর কোনো প্রভাব নেই।
তাদের চিন্তা ও মানসিকতা নিতান্তই অবান্তর। অনেক মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় এমন নির্ভীক দুঃসাহসী চিন্তায়। মূর্খ ব্যক্তি তো বটেই, ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন অনেক আলিমও এ ক্ষেত্রে ধোঁকায় পড়ে যান। অথচ মানবদেহে বিষ কিংবা দৈহিক আঘাতের প্রতিক্রিয়ার চেয়েও অধিক প্রভাব বিস্তারকারী হলো মানুষের পাপকর্ম। তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব চোখে না পড়লেও ভবিষ্যতের কোনো না কোনো সময়ে অবধারিতভাবে বান্দা গুনাহের কুফল ভোগ করবে।
কিতাবুয যুহদে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ ইবনু সীরীন যখন বেশকিছু আর্থিক ঋণের কারণে চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন, তখন বলেছিলেন, 'আমি খুব ভালোভাবেই জানি, আমার এই দুশ্চিন্তা আজ থেকে ৪০ বছরের পুরনো গুনাহের ফসল।'
আবু দারদা বলেন, 'তোমরা এমনভাবে ইবাদাত করো, যেন আল্লাহকে দেখছ। আর নিজেদেরকে মৃত ব্যক্তিদের মাঝে ভাবতে থাক। জেনে রেখো, উপকারী অল্প জিনিস ক্ষতিকর প্রাচুর্যতা থেকে উত্তম। তোমরা মনে রেখো, পুণ্যময় কাজ কখনো পুরনো বা মলিন হয় না, আবার গুনাহ বা অপরাধ কখনো ভুলে যাওয়া হয় না।'
কথিত আছে, একজন বুযুর্গ একদিন সুন্দর চেহারার এক বালককে দেখে মুগ্ধ হওয়ায় অন্তরে এক ধরনের ঘোর জন্ম নেয়। রাতের বেলা স্বপ্নে সেই ছেলে এসে তাকে বলল, 'তোমার অন্তরের এই গুনাহের ফল তুমি ৪০ বছর পর ভোগ করবে।'
এ তো হলো গুনাহের দূরবর্তী প্রভাব। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও মানুষ ভোগ করে থাকে। সুলাইমান আত-তাইমী বলেন, 'এমনও হয় যে, মানুষ গোপনে গুনাহ করে, পরে সকাল হলেই সেই গুনাহের লাঞ্ছনা সে বয়ে বেড়ায়।' ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায আর-রাযী বলেন, 'আমি বড় আশ্চর্যবোধ করি ঐ বুদ্ধিমান ব্যক্তির আচরণে, যে আল্লাহর কাছে দুআ করে বলে, “আল্লাহ! আপনি আমাকে শত্রুদের মনোতুষ্টির কারণ বানাবেন না।”' এরপর দুআকারী ব্যক্তি নিজেই তার শত্রুদের আনন্দের কাজ করতে থাকে।' তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'দুআকারী কীভাবে নিজের শত্রুদের আনন্দের কারণ হয়?' ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বললেন, 'সে তো আল্লাহর নাফরমানি করে। আর এর পরিণতিতে সে কিয়ামতের দিন তার সকল শত্রুর সামনে অপদস্থ হয়ে তাদের মনোতুষ্টির কারণ হবে।' আল্লামা জুন্নুন বলেন, 'যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয় মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্যে তার গোপন অবস্থাকে উন্মোচন করে দেন।'
📄 গুনাহের পরিণতি
গুনাহের অনেক নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয় প্রভাব রয়েছে। গুনাহের কারণে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে অগণিত শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
ঐশী জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। গুনাহের একটি ক্ষতি হলো মানুষ ইলম থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। ইলম হলো একটি ঐশী নূর, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে থাকেন। আর গুনাহ সেই নূর নিভিয়ে দেয়।
ইমাম শাফিয়ী ছিলেন ইমাম মালিক -এর গুণধর শিষ্য। ইমাম শাফিয়ী ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী। ছাত্রজীবনেই তাঁর এই প্রতিভা ইমাম মালিককে বিমুগ্ধ করেছিল। তাই ইমাম মালিক ওই সময়েই তাঁকে নসীহত করে বললেন, 'আমি মনে করি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে প্রখর মেধার অধিকারী বানিয়েছেন, আপনার অন্তরে ইলমের এক বিশেষ নূর দান করেছেন। আপনি এই নূরকে আল্লাহর অবাধ্যতার অন্ধকারের মাধ্যমে মুছে ফেলবেন না।'
ইমাম শাফিয়ী বলেন, 'আমি আমার উস্তাদ ইমাম ওয়াকী -এর নিকট আমার দুর্বল স্মরণশক্তির জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করলাম। তিনি আমাকে জীবন থেকে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতাকে ঝেড়ে ফেলার কথা বললেন। এবং নসীহত করে বললেন, "শুনে রাখো বৎস! ইলম হলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ এক অনুগ্রহ। আর এই বিশেষ অনুগ্রহমূলক পুরস্কার কোনো অবাধ্য ব্যক্তিকে দেয়া হয় না."'
রিযিক থেকে বঞ্চিত হতে হয়। গুনাহের কারণে মানুষ রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। মুসনাদু আহমাদে বর্ণিত আছে, 'মানুষ তার কৃত অপরাধের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। তাকওয়া যেমন মানুষের রিযিক বাড়িয়ে দেয়, তাকওয়ার অনুপস্থিতি তেমন রিযিকের মধ্যে সংকীর্ণতা সৃষ্টি করে।'[১]
আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অমূলক ভয়ভীতি, আতঙ্ক ও শূন্যতা জন্ম নেয়। গুনাহের প্রভাবে গুনাহগার ব্যক্তি তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি এক ধরনের দূরত্ব অনুভব করে। এ দূরত্ব ও শূন্যতাবোধ থেকে আল্লাহ তাআলার কুদরতের ব্যাপারে অহেতুক ও অমূলক ভয়ভীতি জন্মায় তার অন্তরে। ভালো-মন্দ অনুধাবনে সক্ষম ব্যক্তিই বিষয়টি বুঝতে ও অনুভব করতে পারবে।
একজন বুযুর্গের নিকট এক ব্যক্তি এ ধরনের ভয়ভীতির ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি বলে দিলেন, 'যখন গুনাহের প্রভাবে তোমার অন্তরে শূন্যতা ও ভয়ভীতি তৈরি হবে, তখন সেই শূন্যতা ও ভীতি দূর করতে চাইলে তুমি গুনাহ করা ছেড়ে দাও। এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা অর্জনের কাজ করো।'
গুনাহগার ব্যক্তির অন্তরে মানুষের প্রতিও অমূলক ভয়ভীতি, আতঙ্ক ও শূন্যতা জন্ম নেয়। বিশেষত নেককার ও বুযুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি তার এক ধরনের ভীতি ও দূরত্ব কাজ করে। আর এই গুনাহের কারণে অন্তরে শূন্যতা যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে ততই বুযুর্গ ও মুত্তাকী ব্যক্তিদের প্রতি তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। তারা আল্লাহওয়ালাদের আলোচনার মজলিসগুলো এড়িয়ে চলে। ফলে আল্লাহওয়ালাদের উত্তম সাহচর্য ও বারাকাহ থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এভাবে তারা উত্তম ও দ্বীনি মজলিস থেকে দূরে সরতে থাকে এবং দুনিয়াবি ও গুনাহের আসরের দিকে তাদের যাতায়াত বাড়তে থাকে। এই ভীতি ও শূন্যতা একপর্যায়ে একাকিত্বের পথে ঠেলে দেয়। গুনাহগার ব্যক্তি একটা সময়ে তার পরিবার থেকেও একাকিত্ব খুঁজে বেড়ায়। পাপ কাজের মোহ তাকে তার বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-পরিজন, ছেলে-মেয়ে-সবার থেকে দূরে নিয়ে যায়। এভাবে সে জগত-সংসারেও এক নিঃসঙ্গ জীবনে দিনাতিপাত করতে থাকে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিসম্পন্ন এক বুযুর্গ বলেন, 'আমি যদি কখনো আল্লাহর অবাধ্য হই, এর প্রভাব আমি আমার স্ত্রী-পরিজন-এমনকি নিজের পালিত পশুর মাঝেও অনুভব করতে পারি।
গুনাহের কারণে জাগতিক বিষয়াদিতে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। সে যেকোনো কাজই করতে যায়, বিভিন্ন রকমের অসুবিধার সম্মুখীন হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং উত্তম ও কল্যাণের পথে চলে তার জন্য পার্থিব বিষয়াদি সহজসাধ্য হয়ে যায়। আর আল্লাহর নাফরমানিতে যে ব্যক্তি লিপ্ত থাকে সে জগত-সংসারের প্রতিটি পদে পদে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়।
গুনাহগার ব্যক্তি অন্তরে একধরনের বিষাদ ও অবসন্নতার অন্ধকার অনুভব করে। বাহ্যিক অন্ধকারের মতোই সে তার মনে এক ধরনের অন্ধকার অনুভব করে। হৃদয়ের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অনুভূতি হলো গুনাহের আঁধার। আল্লাহর আনুগত্য যেমন আল্লাহ-প্রদত্ত আলো, তেমনি আল্লাহর নাফরমানিও একপ্রকারের অন্ধকার। সে এই অন্ধকারের কারণে মানসিকভাবে এক ধরনের হতাশা ও অস্থিরতার মধ্যে থাকে। তার গুনাহের পরিমাণ যত বাড়ে অন্তরের অন্ধত্বও তত বৃদ্ধি পায়। একইসাথে বেড়ে যায় তার অস্থিরতা। হৃদয়ের এই অন্ধকার থেকেই সে বিভিন্ন রকমের ভ্রান্ত চিন্তা, বিদআত এবং বিধ্বংসী সব কার্যকলাপে জড়িয়ে যায়। তার জীবনের গতিপথ হয়ে যায় তখন অন্ধ ব্যক্তির একাকী পথচলার মতোই। আলোকহীন হৃদয়ের এই প্রভাব ধীরে ধীরে বান্দার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে। চেহারার হাস্যোজ্জ্বল নির্মলতা, ঈমানের নূর, উত্তম চরিত্রের মাধুর্যতা-সব নির্বাপিত হয়ে যায়। অন্যান্য মানুষও তখন তার চেহারায় মলিনতাই দেখতে পায়, স্পষ্টভাবে।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, 'নেক ও উত্তম কাজের একটি আলোকিত প্রভাব মানুষের চেহারায় প্রস্ফুটিত হয়। অন্তরে নূর অনুভূত হয়। বান্দার রিযিক বৃদ্ধি পায়। শারীরিক শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা উৎকর্ষিত হয়। অন্যান্য মানুষের অন্তরেও তার প্রতি এক প্রকারের ভালোবাসা ও প্রীতি জায়গা করে নেয়। আর গুনাহ ও পাপকাজের কারণে মানুষের চেহারায় এক ধরনের মলিনতা ভেসে ওঠে। হৃদয়ে অন্ধকারের হাহাকারবোধ জাগ্রত হয়। শারীরিকভাবে সে দুর্বল ও রোগা হয়ে যায়। রিযিক হ্রাস পায় এবং মানুষের অন্তরেও তার প্রতি এক ধরনের ঘৃণা ও চাপা ক্ষোভ জন্ম নেয়।
গুনাহগার ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বলতার শিকার হয়। অন্তরের দুর্বলতার কথা তো স্পষ্ট। গুনাহের কারণে অন্তরের দুর্বলতা ও হৃদয়ের যন্ত্রণা থেকে মানুষ মুক্তির আশায় কখনো কখনো আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। একজন নেককার ও মুমিন ব্যক্তির অন্তর নেক ও উত্তম কাজের প্রভাবে ঝরঝরে তাজা ও শক্তিশালী থাকে। অন্তরের এই শক্তি তার শরীরেও প্রভাব ফেলে। মানসিক শক্তির কারণে তার শরীর প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। আর যে ব্যক্তি পাপকাজে লিপ্ত তার হৃদয়ের দুর্বলতার কারণে দৈহিকভাবে সুঠাম ও শক্তিশালী হলেও প্রয়োজনের মুহূর্তে সে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। তার শক্তিমত্তা তার বিপদের সময় কাজে আসে না। বরং সে ভগ্ন হৃদয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার শোচনীয় অবস্থা দেখতে থাকে। ইসলামের বিশ্বজয়ের সময়ে সাহাবীরা পার্থিব প্রাচুর্যতার অভাবে শারীরিকভাবে তেমন শক্তিশালী না হলেও রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য ধ্বসিয়ে দিয়েছেন গুটিকয়েক মুসলিম সৈন্যবাহিনী। অথচ শারীরিক শক্তি ও শৌর্যের প্রবাদতুল্য সামরিকশক্তি ও আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল তৎকালীন বিশ্বের এই দুই পরাশক্তি। তবুও তাদের এই শৌর্য, শক্তিমত্তা ও শ্রেষ্ঠত্ব ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে ঈমানদারদের ঈমানী শক্তির সামনে।
পাপকাজ মানুষকে রবের আনুগত্য ও ইবাদাত থেকে বঞ্চিত কর দেয়। গুনাহের অন্যতম একটি প্রভাব এই যে, সাময়িক গুনাহও মানুষকে তার রবের আনুগত্য ও ইবাদাত করা থেকে বঞ্চিত করে দেয়। পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, পাপকাজ মানুষকে আল্লাহর ইবাদাত থেকে বাধা দেয়। ইবাদাতের প্রতিবন্ধক এই পাপকাজ। গুনাহগার ব্যক্তি আজ একটি নেক কাজ ছাড়ল, আগামীকাল আরেকটি, পরশু আরেকটি—এভাবে লাগাতার নেক কাজ ছেড়ে দিয়ে নেক-পরিত্যাগের তালিকা দীর্ঘ করতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সে আল্লাহর আনুগত্যহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট এক বান্দায় পরিণত হয়। এক গুনাহের কারণে সে অসংখ্য উত্তম ও নেক কাজ থেকে বঞ্চিত হয়। যেসব নেককাজের একটিই হয়তো পার্থিব জগতের সবকিছুর চেয়ে দামি। এই ব্যক্তির উদাহরণ হলো এমন ব্যক্তির মতো, যে কোনো একটি খাবার খেয়ে এমনভাবে দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যে, জগতের অন্যান্য সকল সুস্বাদু খাবার তার জন্য নিষেধ হয়ে যায়।
গুনাহের কারণে আয়ু কমে যায়। গুনাহের প্রভাবে মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। গুনাহগার ব্যক্তির জীবনের বারাকাহ নষ্ট হয়ে যায়। আর নেককার ব্যক্তি জীবনে বরকত পাবার কারণে স্বল্প সময়ে অনেক কাজ করতে পারে। জ্ঞানীরা এই কথাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।
একদল উলামায়ে কেরাম মনে করেন, গুনাহগার ব্যক্তির জীবন সংকীর্ণ হওয়ার অর্থ তার জীবনে কোনো কাজে বরকত থাকে না। জীবন থেকে প্রাচুর্য নিঃশেষ হয়ে যায়।
আবার কেউ আয়ু হ্রাস পাওয়ার ব্যাখ্যা করে থাকেন সত্যিকারার্থেই। অর্থাৎ গুনাহের কারণে সে দীর্ঘায়ু লাভ করে না বরং তার আয়ু কমে যায়। নেককাজের দ্বারা যেমন মানুষের রিযিক বাস্তবেই বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহের কারণে মানুষের রিযিক সংকীর্ণ হয়, তেমনই পাপকাজের দ্বারা মানুষের আয়ু কমে যায় এবং নেক ও কল্যাণের কারণে মানুষের হায়াত দীর্ঘস্থায়ী হয়।
কেউ কেউ বলেন, গুনাহের প্রভাব মানবজীবনে প্রতিফলিত হওয়ার অর্থ হলো, মানুষের আত্মা মরে যায়। আল্লাহ তাআলা কাফিরদের সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
أَمْوَاتُ غَيْرُ أَحْيَاءٍ
| 'তারা তো জীবিত নয়, তারা হলো মৃতপ্রাণ।[১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার দেখানো পথে চলার মাধ্যমেই মানবাত্মা জীবিত থাকে। আর জীবিত আত্মাকেই ধারণ করে রাখে মানুষের সমগ্র জীবন। মহাপ্রতিপালকের আনুগত্যহীন ব্যক্তি রক্ত মাংসের দৈহিক কাঠামো কেবল। এ যেন প্রাণহীন চলমান এক মানবদেহ। তাই বান্দা যখন তার রবের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, এবং নাফরমানিতে লিপ্ত হয় তখন সে তার প্রকৃত জীবনকালকে নষ্ট করতে থাকে। এর করুণ পরিণতি যেদিন সে ভোগ করবে সেদিন বলে উঠবে-
يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي
'হায়, যদি আমি আমার জীবনের জন্য অগ্রীম কিছু প্রেরণ করতাম![২]
মূল বিষয় হলো, মানুষের জীবনকাল হলো তার বেঁচে থাকার সময়টুকু। আর বাঁচার মতো বেঁচে থাকা তখনই হবে যখন তার জীবন হবে আল্লাহমুখী। যখন মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন, রবের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসাই হবে তার জীবনকর্ম, তখনই বেঁচে থাকাকে সার্থক বলা যায়। অন্যথায় কেমন-যেন আলোহীন, অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাণহীন দেহে ভর করেই তার বেঁচে থাকার আয়ুষ্কাল নিঃশেষ হবে একদিন।
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৪০২২
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ২১
[২] সূরা ফজর, আয়াত-ক্রম: ২৪
📄 গুনাহের পরম্পরা দীর্ঘ হতে থাকে
গুনাহের অন্যতম একটি ক্ষতি হলো, একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহের পথ দেখায়। এভাবে বান্দার জন্য একের পর এক গুনাহের দ্বার খুলে যায়। গুনাহগার ব্যক্তিও একের পর এক গুনাহকে আলিঙ্গন করতে করতে একসময় সে গুনাহের অতল সাগরে নেমে যায়। পাপকাজ তার অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়া তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। একজন বুযুর্গ বলেছিলেন, 'অপকর্মের শাস্তি হলো পরবর্তী অপকর্মের সুযোগপ্রাপ্ত হওয়া। আর নেক কাজের পুরস্কার হলো পরবর্তী আরেকটি নেক কাজের সুযোগ পাওয়া। সুতরাং বান্দা যখন কোনো ভালো কাজ করে তখনই তাকে অদৃশ্য থেকে আরেকটি ভালো কাজ হাতছানি দিয়ে বলতে থাকে, “উত্তমকাজ সম্পাদনকারী, তুমি আমাকেও পৃথিবীর বুকে বাস্তবায়ন করো।” যখন সে এই ভালো কাজটিও করে ফেলে তখন তৃতীয় আরেকটি ভালো কাজ তাকে আহ্বান করতে থাকে। আর সেও তার আহ্বানে সাড়া দেয়। এভাবে সে একের পর এক ভালো কাজের আহ্বানে সাড়া দিতে থাকে। আর ভালো ও উত্তমকাজে তার মননশীলতা বাড়তে থাকে। গুনাহ ও মন্দ কাজের ব্যাপারটিও অনুরূপ। ফলে বান্দা তার কৃতকর্ম অনুযায়ী হয় ভালো অথবা খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাপ কিংবা পুণ্য তার জীবনের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভালো বা মন্দকাজ তার স্বভাবজাত যোগ্যতায় পরিণত হয়।'
এই অবস্থায় নেককার বান্দা যদি নেক ও উত্তম কাজ করতে না পারে, ভালো কাজ করতে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তার জন্য স্বাভাবিক থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। ভালো কাজ করতে সে অস্থির হয়ে ওঠে। সে পানিহীন মাছের মতোই ছটফট করতে থাকে উত্তম কাজের খোঁজে। আবার অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির জন্য যদি অপরাধের দরজা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে অস্থির হয়ে ওঠে। অপরাধ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য তার জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কেমন-যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। খারাপ ও বদ অভ্যাসে অভ্যস্ত অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, তারা এমনও কিছু অপরাধ ও খারাপ কাজ করে থাকে যা পার্থিব বিবেচনাতেও নিতান্তই অহেতুক ও অনর্থক। যে ব্যক্তি খারাপ কাজটি করে তারও বিন্দুমাত্র লাভ বা প্রাপ্তি থাকে না এখানে। এমন খারাপ কাজেও তারা নিজেদের অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে যেখানে তাদের ন্যূনতম মনোবাসনা বা আত্মতৃপ্তির কোনো স্বার্থ কাজ করে না। তাদের এসব অপরাধের পেছনে তেমন কোনো হেতু বা কারণও থাকে না। শুধুমাত্র অপরাধ করতে হবে, অপরাধ করা ছাড়া সে স্বাভাবিক থাকতে পারে না—এই অবস্থার কারণেই সে অর্থহীন এমন নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। শাইখ হাসান ইবনু হানি' আবৃত্তি করেছেন—
وَكَأْسِ شَرِبْتُ عَلَى لَذَّةٍ ... وَأُخْرَى تَدَاوَيْتُ مِنْهَا بِهَا
'এক পেয়ালা শরাব পান করেছি আত্মতৃপ্তির নেশায়। পরের পেয়ালা পান করেছি আগের পেয়ালার নেশা দূর করার আশায়।'
আরেক কবি বলেন—
فَكَانَتْ دَوَائِي وَهْيَ دَائِي بِعَيْنِهِ ... كَمَا يَتَدَاوَى شَارِبُ الْخَمْرِ بِالْخَمْرِ
'আমার ওষুধই তো আমার রোগ, যেমন মদ্যপ ব্যক্তির দ্বিতীয় ঢোক মদ প্রথম ঢোকের নেশার ওষুধ।'
কোনো বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে মনযোগী হয়ে ওঠে, রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য আন্তরিক হয় এবং আল্লাহর ভালোবাসাকে জাগতিক সব ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার উপর প্রাধান্য দেয় তখন আল্লাহ তাআলা তার নিকট বিশেষ রহমত দিয়ে ফিরিশতা পাঠান। রহমতের সেই ফিরিশতা সব জায়গায় তাকে সাহায্য করতে থাকে। আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তাকে সুযোগ করে দেয়। রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাকে উৎসাহ যোগায়। জাগতিক বিভিন্ন বৈষয়িক আলাপ-আলাপনের অনর্থক মজলিস, আরাম-আয়েশ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যস্ত রাখে। এভাবে সে একজন পরিপূর্ণ আল্লাহভীরু, আনুগত্যশীল ও ন্যায়পরায়ণ বান্দা হয়ে যায়।
আর বান্দা যখন গুনাহের প্রতি আন্তরিক হয়, পাপকাজকে ঘিরে তার মনোযোগ আবর্তিত হয়, অন্যায়কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে বাস্তবজীবনে তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য শয়তানের দ্বার খুলে দেন। শয়তান সর্বত্র তাকে খারাপ কাজের প্রতি প্ররোচনা দেয়। মন্দ কাজকেই তার জন্য সহজ করে দেয়। ফলে বান্দা তখন খুব সহজেই খারাপ কাজকে গ্রহণ করে নেয়। আর একসময় সে শয়তানের সাহায্যে শক্তিধর পাপাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।