📄 নবীজি ও সাহাবীদের সতর্কবাণী
ইমাম আহমাদ বলেন, জুবাইর ইবনু নুফাইর বর্ণনা করেন, 'মুসলমানদের হাতে যখন সাইপ্রাস বিজয় হলো, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা পরাজয়ের গ্লানি আর পেরেশানিতে কান্না করতে করতে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছিল। তখন আমি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম, তিনি একা বসে বসে কাঁদছেন। আমি অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি এমন এক দিনে কেন এভাবে বসে কান্না করছেন, যেদিন আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে গৌরবান্বিত করেছেন!" তখন তিনি আমাকে বললেন, "আহ জুবাইর, আল্লাহ তোমার সহায় হোন! তুমি কি দেখছ না, এই সাইপ্রাসবাসীরা প্রতাপশালী ও শৌর্যশালী হওয়া সত্ত্বেও আজ তারা আল্লাহ তাআলার মুকাবিলায় কত তুচ্ছ! কত হীন! আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হওয়ায় দেখো আজ তাদের কী করুণ পরিণতি!"'
নবীজি বলেন, 'যতক্ষণ বান্দা তার কৃতকর্মের কারণে আত্মকৈফিয়তে লজ্জিত হবে, ততক্ষণ সে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসের মুখে পড়বে না।' [২]
অন্যত্র নবীজি ইরশাদ করেন, 'যখন আমার উম্মতের মধ্যে ব্যাপকভাবে পাপকাজ ছড়িয়ে পড়বে, তখন আল্লাহ তাআলার আযাবও তাদের সকলকে গ্রাস করে নেবে।' সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! তখন কি উম্মতের মধ্যে নেককার লোকও থাকবে না? নবীজি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই থাকবে।' সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আযাবের সময় তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে?' নবীজি জবাব দিলেন, 'গুনাহের কারণে যখন আল্লাহর আযাব এই উম্মতকে পাকড়াও করবে, তখন নেককার লোকেরাও সকলের মতোই আযাবগ্রস্ত হবে। আল্লাহর প্রেরিত দুর্যোগ তাদেরকেও আচ্ছাদিত করে নেবে। তবে পরবর্তীতে তারা তাদের নেক ও সৎ কাজের বিনিময়ে দয়ালু রবের ক্ষমা ও সন্তুষ্টির ছায়াতলে জায়গা করে নেবে।' [১]
মুসনাদু আহমাদের হাদীস, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'মানুষ তার গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়।'
অন্যত্র বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'আমার আশঙ্কা হয় তোমাদের ব্যাপারে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হয়তো তোমাদের উপর বিধর্মীরা এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে, যেভাবে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাবারের প্লেটের সামনে হামলে পড়ে।' সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, 'আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমাদের সংখ্যা কম হবে?' নবীজি জবাবে বললেন, 'না! তখন তোমরা সংখ্যায় বেশিই থাকবে। কিন্তু এই সংখ্যাধিক্য হবে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খরকুটোর মতো। শত্রুদের অন্তরে তোমাদের জন্য কোনো ভয় থাকবে না, আর তোমাদের অন্তরে সাহসের পরিবর্তে থাকবে দুর্বলতা।' সাহাবীরা জানতে চাইলেন, 'কেমন দুর্বলতা?' নবীজি বললেন, 'পার্থিব মোহ আর মৃত্যুর প্রতি অনীহা।'।খ
শেষ যামানায় যখন গুনাহের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে সেই সময়ের জন্য আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ভবিষ্যদ্বাণী-মানুষের জন্য এক দুঃসহ সময় অপেক্ষা করছে। তখন ইসলামের কেবল নামই বাকি থাকবে এই পৃথিবীতে। কুরআন শুধুই একটি ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী-সংকলন হিসেবে ব্যবহৃত হবে। হিদায়াত ও হকের আওয়াজ উচ্চারিত হওয়ার বদলে মসজিদগুলো হয়ে যাবে দর্শনীয় স্থান। সেই সময়ে ধর্মীয় আলিমগণ পৃথিবীর বুকে নিকৃষ্ট মুসলিম হিসেবে বিচরণ করবেন। তাঁদের কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে আবার তাঁদের মাধ্যমেই এসবের সমাধান হবে।'
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ছেলে তাঁর পিতার সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেন, 'যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার প্রকাশ পায় তখন আল্লাহ তাআলা সেই জনপদের ধ্বংস ঘোষণা করেন।' [১]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমিসহ মুহাজিরদের ১০ জনের একটি দল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে লক্ষ করে বললেন, "মুহাজিরের দল! পাঁচটি স্বভাব থেকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।
অশ্লীলতার স্বভাব। যখন কোনো জনপদে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহ তখন তাদের মাঝে এমনভাবে প্লেগ ও অন্যান্য নতুন নতুন মহামারি-রোগ ছড়িয়ে দেন, যা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবদ্দশায় ছিল না।
মাপে কম দেয়ার প্রবণতা। কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন মাপে কম দেয়া শুরু করবে তখন তাদেরকে দুর্ভিক্ষ ও মূল্যবৃদ্ধির দুর্যোগে ফেলে দেয়া হবে। একইসাথে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে অত্যাচারী শাসক।
যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি। যখন লোকেরা তাদের সম্পত্তির যাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকবে তখন তাদেরকেও রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে দেয়া হবে, অনাবৃষ্টির দুর্যোগ নেমে আসবে তাদের উপর। যদি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি অন্যান্য প্রাণী, গবাদি পশু না থাকত তাহলে তাদের উপর পুরোপুরিভাবেই বৃষ্টিবর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হতো।
চুক্তি ভঙ্গের মানসিকতা। কোনো সম্প্রদায় যখন কথার বিপরীত কাজ করবে, চুক্তিভঙ্গ করবে তখন তারা এমন শত্রুবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হবে যারা তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নেবে।
শাসকগোষ্ঠীর কুরআন-হাদীস-বহির্ভূত শাসনব্যবস্থা। যখন কোনো জনপদের শাসকগণ কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত কোনো শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করবে তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ বাঁধিয়ে দেবেন." [২]
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সাথে একজন লোক আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র দরবারে উপস্থিত হলেন। আগত লোকটি বললেন, 'উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাদেরকে ভূমিকম্পের ব্যাপারে হাদীস শোনান।' আম্মাজান বললেন, 'যখন কওমের লোকেরা যিনা, ব্যাভিচারকে বৈধ মনে করা শুরু করে, নির্দ্বিধায় মদ পান করে এবং গান-বাজনায় মত্ত হয়ে যায় তখন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার আত্মসম্মানবোধ গর্জন করে উঠে তাদের এই অবাধ্যচারিতায়। তখন জমিনকে আদেশ করা হয়, 'তুমি কেঁপে উঠে তাদেরকে সতর্ক করে দাও।' যদি তারা তখন তাওবা করে এবং দ্রুত গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে পৃথিবী স্বাভাবিক স্থিরতায় ফিরে আসে। আর তারা যদি নির্বিকারই থেকে যায় তাহলে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
ইবনু আবিদ দুনিয়া অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ করেন, 'আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় একবার ভূমিকম্প হয়। নবীজি তখন মাটিতে হাত রেখে বললেন, "থেমে যাও। এর বেশি কেঁপে ওঠার জন্য তো তুমি আদেশপ্রাপ্ত হওনি।” এরপর তিনি সাহাবীদের লক্ষ করে বললেন, "তোমাদের রব তোমাদের থেকে তাওবা-প্রার্থনা আশা করছেন, তোমরা তাঁর নিকট তাওবা করো.” পরবর্তীতে খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র শাসনামলে আবারও ভূমিকম্প হয়। উমর তখন সবাইকে সতর্ক করে বলেন, "লোক সকল! এই ভূ-কম্পন তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। তোমাদেরকে সতর্ক করা হলো। যদি তোমরা সতর্ক না হও তাহলে এই কম্পন যদি আবারও শুরু হয় তাহলে আমি (অর্থাৎ আমরা কেউই) আর একসাথে বসবাস করতে পারব না." [১]
মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যতম খলীফা উমর ইবনু আবদিল আযীযের শাসনামলে ভূকম্পন হলে তিনি বিভিন্ন নগরে ও জনপদে দিকনির্দেশনা দিয়ে চিঠি লিখে পাঠান। চিঠিতে আল্লাহ তাআলার প্রেরিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, 'এই ভূ-কম্পন দিয়ে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বাসিন্দাদের সতর্ক করছেন। শহরের অধিবাসীদের প্রতি আমি এই নির্দেশনা প্রদান করছি যে, তারা মাসের নির্দিষ্ট দিনে একটি ময়দানে সমবেত হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এবং ময়দানের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রত্যেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সাদাকাহ করে নেবে। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى، وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى
"যে ব্যক্তি (দান-সাদাকাহ'র মাধ্যমে) অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তার রবের নাম নেবে, অতঃপর নামায আদায় করবে, অবশ্যই সে সফলকাম."[১]
'তাওবা করার সময় প্রত্যেকেই যেন আদম আলাইহিস সালামের ভাষায় বলে-
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"হে আমাদের প্রতিপালক! (আপনার নাফরমানির দ্বারা) আমরা তো আমাদের উপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন আমরা তো ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব."[২]
'এবং নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় এই বলে ক্ষমা চায়-
وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"আয় আল্লাহ! আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, রহম না করেন আমি তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব.”'[৩]
'ইউনুস আলাইহিস সালামের মতো দুআ করে যেন বলে-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া তো আর কোনো উপাস্য নেই। অন্তর থেকে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আল্লাহ! আমি তো অপরাধ করে ফেলেছি, | জালিমদের কাতারে শামিল হয়ে গেছি। (আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।)”.১
আম্মার ইবনু ইয়াসির ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেন, 'মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা যখন বান্দাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চান তখন তাদের শিশুসন্তানদের মৃত্যুহার বেড়ে যায় এবং মহিলারা বন্ধ্যা হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তাআলার প্রলয়ংকারী প্রতিশোধ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়। কারো প্রতিই তখন আর বিন্দুমাত্র দয়া দেখানো হয় না।' ২
কিতাবুয যুহদে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল উল্লেখ করেছেন- মূসা একবার আল্লাহ তাআলাকে বললেন, 'আল্লাহ! আপনি তো ঊর্ধ্বাকাশে! আর আমরা থাকি পৃথিবীর বুকে। আমরা কীভাবে আপনার ক্রোধ টের পাব? আপনার অসন্তুষ্টির আলামত কী? আমাদের জন্য আপনার সন্তুষ্টির নিদর্শন কী?' তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, 'যখন আমি সন্তুষ্টি থাকি তখন তোমাদের জন্য উত্তম লোকবলকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দিই আর যখন আমি ক্রোধান্বিত থাকি তখন তোমাদের জন্য নিকৃষ্ট চরিত্রের লোকদেরকে শাসনক্ষমতা দান করি।' [৩]
ফুযাইল ইবনু ইয়ায সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের কোনো এক নবীর কাছে ওহী মারফত আল্লাহর এক চিরায়ত বিধান জানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যখন আমার পরিচয়, বিধানাবলি সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি আমার অবাধ্য হয় তখন আমি তার উপর এমন ব্যক্তিকে ন্যস্ত করে, যে আমাকে চেনে না, আমার বিধানাবলিও জানে না।'
টিকাঃ
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৩৪৭
[১] হাকিম-৪/৫২৩
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪২৯৭
[১] মাজমাউয যাওয়াইদ-৪/১১৮
[২] হাকিম-৪/৫৪০
[১] মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবাহ-১/২২১
[১] সূরা আ'লা, আয়াত-ক্রম: ১৪, ১৫
[২] সূরা আ'রাফ, আয়াত-ক্রম: ২৩
[৩] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৪৭
[১] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[২] হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, এই হাদীসের কোনো সূত্র নেই। -ফাইযুল কাদীর লিল মুনাউয়ি-২/২০০-সম্পাদক
[৩] কিতাবুয যুহদ, পৃষ্ঠা-ক্রম: ৩৩৭
📄 অসৎ কাজে বাধা প্রদান
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেন, 'তোমাদের পূর্বের লোকদের মধ্যে যখন কেউ কোনো খারাপ কাজ করত তখন তাকে অপরজন নিষেধ করত, খারাপ কাজের ব্যাপারে সতর্ক করত। তবে পরেরদিনই আবার তার সাথে এমনভাবে ওঠাবসা ও খাওয়া-দাওয়া করত যে, গতকাল যেন সে তাকে কোনো খারাপ কাজ করতেই দেখেনি। আল্লাহ তাআলা যখন তাদের এই অবস্থা দেখলেন তখন ভালো-মন্দ সকলের অন্তরকে মিলিয়ে দিলেন। এরপর নাফরমানি আর সীমালঙ্ঘনের কারণে তাদের নবীদের যবানে তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। ফলে তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন তাদের নবী দাউদ ও ঈসা ইবনু মারইয়াম। সুতরাং হে উম্মতে মুহাম্মদ! আমি তোমাদেরকে সেই সত্তার কসম দিয়ে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে। গুনাহগার, অজ্ঞ লোকদেরকে তোমরা সঠিক পথ দেখাবে। নাহয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরসমূহকেও একত্রিত করে দেবেন, তোমাদেরকেও অভিসম্পাত করবেন।'
ইবরাহীম ইবনু আমর সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা ইউশা ইবনু নূন আলাইহিস সালামকে ওহী মারফত জানিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্প্রদায়ের ৪০ হাজার নেককার ও উত্তম বান্দাকে এবং ৬০ হাজার পাপাচারী ব্যক্তিকে ধ্বংস করবেন। এই প্রত্যাদেশ পেয়ে ইউশা ফরিয়াদ করে উঠলেন, 'আল্লাহ! আপনি খারাপ লোকদের তো তাদের বদ আমলের কারণে ধ্বংস করবেন কিন্তু যারা নেককার, তারাও কেন এই আযাবে নিপতিত হবে?' আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, 'ওরা আমার রাগ দেখেও রাগ করেনি (অর্থাৎ পাপের কারণে আমার রাগ নেককারদেরকে রাগিয়ে তোলেনি)। বরং যারা আমাকে রাগিয়েছে তাদের সাথে ওরা স্বাভাবিকভাবেই ওঠাবসা করেছে, পানাহার করেছে।'
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ সূত্রে হুমায়দী'র বর্ণনা, তিনি বলেন, 'সুফিয়ান ইবনু সাদ মিসআর আমাদেরকে ইবনু কিদাম সূত্রে একটি ঘটনা শোনান, যে, একবার কোনো এক জনপদ ধ্বসিয়ে দেয়ার জন্য এক ফিরিশতাকে আদেশ করা হলো। ফিরিশতা আল্লাহ তাআলাকে বললেন, "আল্লাহ! এই জনপদে তো আপনার একজন নেক বান্দা আছেন, যিনি আপনার ইবাদাতে মশগুল।" আল্লাহ তখন ফিরিশতাকে জানিয়ে দিলেন, "তাকে দিয়েই আমার আযাব শুরু করে দাও। আমার অবাধ্যতায়, নাফরমানিতে তাকে কখনোই বিরক্ত হতে দেখা যায়নি."
সিদ্দীকে আকবর আবু বকর বলেন, 'তোমরা কুরআনের একটি আয়াতকে ভুল জায়গায় প্রয়োগ করে সান্ত্বনা নিচ্ছ। আয়াতটি হলো-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে চিন্তা করো। তোমরা যদি সঠিক পথে থাক তাহলে যারা পথভ্রষ্ট হবে তাদের জন্য তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই." [১]
'অথচ আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই লোকেরা যখন চোখের সামনেই কাউকে যখন জুলুম করতে দেখার পরেও তাকে হাত ধরে বাধা দিবে না অথবা তাকে জুলুম থেকে ফেরাবে না তখন আল্লাহ তাআলা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সকলকে তাঁর আযাবের দ্বারা পাকড়াও করবেন।' [২]
টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১০৫
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৬; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৩৩৮; তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২১৬৮, ৩০৫৭
📄 গুনাহের সামাজিক প্রভাব
আবু হুরায়রা বলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'যখন গুনাহের কাজ গোপনে হবে তখন কেবল গুনাহগার ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর গুনাহ যখন সমাজে প্রকাশ পেয়ে ছড়িয়ে যাবে তখন সর্বসাধারণ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' [৩]
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, 'একবার রাসূলুল্লাহ উত্তেজিত অবস্থায় আমার ঘরে আসলেন। তাঁর চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম, কিছু একটা ঘটেছে। আল্লাহর রাসূল কোনো কথা না বলে ওযু করে বের হয়ে গেলেন। মসজিদে প্রবেশ করে মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা পাঠ করতে শুরু করলেন। আমি তাঁর কথা শোনার জন্য ঘরের দেয়ালে কান পেতে দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা শেষ করে বললেন-"লোকসকল! শুনে রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে বলছেন, 'তোমরা ভালো ও কল্যাণের আদেশ করবে। মন্দ ও খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অন্যথায় এমন এক সময় আসবে, যখন তোমরা দুআ করবে আর আমি তোমাদের সেই দুআ কবুল করব না। তোমরা আমার কাছে সাহায্য চাইবে, আমি সাহায্য করব না। তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি মঞ্জুর করব না।'[২] יי[
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস সূত্রে সাঈদ ইবনু জুবাইর বর্ণনা করেন, নবীজি ইরশাদ করেছেন, 'যখন কোনো সম্প্রদায় ওজনে কম দেয়া শুরু করবে তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অনাবৃষ্টির দুর্যোগ দেন। আর কোনো জনপদে যখন অশ্লীলতা-ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে তখন তাদের মাঝে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়ে যায়। আর যখন কোনো জাতির মাঝে সুদের প্রচলন শুরু হয় আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে মানসিক রোগ বাড়িয়ে দেন। যখন সমাজে খুন, হত্যা, গুমের মতো গর্হিত কাজ শুরু হয়ে যায় আল্লাহ তাআলা তাদের উপর তাদের শত্রুদের চাপিয়ে দেন। যেই জনপদে লূত সম্প্রদায়ের মতো সমকামিতা ছড়িয়ে পড়ে তাদের অঞ্চলে ভূমিধ্বসের প্রবণতা শুরু হয়ে যায়। আর যখন কোনো সমাজ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকে ছেড়ে দেবে তখন তাদের ভালো কাজগুলোকে সমাজ থেকে সরিয়ে নেয়া হবে এবং তাদের দুআ আর কবুল করা হবে না।'
আবদুল্লাহ ইবনু উমর সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেন। সেই হাদীসে আল্লাহর নবী এই উম্মতের শেষ যামানার একটি ভয়ানক চিত্র তুলে ধরেছেন। নবীজি বলেন- 'শপথ করে বলছি সেই রবের, যাঁর হাতে আমার প্রাণ। কিয়ামতের পূর্বে অবশ্যই আল্লাহ তাআলা একদল শাসক প্রেরণ করবেন। যারা হবে মিথ্যুক। এই শাসকদের সাথে থাকবে একদল পাপিষ্ঠ মন্ত্রিপরিষদ। তাদের আমলারা হবে দুর্নীতিবাজ। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দায়িত্বশীলগণ হবে জালিম, অত্যাচারী। তাদের আলিম ও কারী সাহেবরা হবে নিকৃষ্ট স্বভাবের; যাদের বেশভূষা থাকবে দুনিয়াবিমুখ দরবেশের, কিন্তু অন্তর হবে ময়লা-আবর্জনা থেকেও কলুষিত। বিভিন্ন ধরনের মনোবাসনা থাকবে তাদের জীবনে। আল্লাহ তাআলা তাদের মাধ্যমে নতুন ও আশ্চর্য রকমের অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভিন্ন ফিতনা ছড়িয়ে দেবেন সমাজে। লোকেরা এই ঘন অমানিশা বেষ্টিত ফিতনায় নিমজ্জিত হয়ে একজন আরেকজনের উপর হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে।
'কসম করে বলছি সেই সত্তার, যাঁর হাতে মুহাম্মদের জীবন! বিভিন্ন ধাপে ধাপে ইসলামকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। একপর্যায়ে আল্লাহ নাম নেয়ার মতো কেউ থাকবে না। হে লোকসকল! তোমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে সৎ কাজের আদেশ করো এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা দাও। অন্যথায় মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তোমাদের জন্য জঘন্যতম লোকদেরকে শাসক বানিয়ে দেবেন; যারা নিকৃষ্টভাবে তোমাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করবে। এমতাবস্থায় তোমাদের ভালো ও নেককাররা আল্লাহর কাছে মুক্তির আশায় দুআ করবে কিন্তু তাদের দুআ কবুল হবে না।
'হে লোকসকল! তোমরা অবধারিতভাবে ভালো কাজের আদেশ করো, মন্দ কাজে বাধা দাও, নয়তো আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর এমন শাসক চাপিয়ে দেবেন, যে জুলুম-নির্যাতন করবার সময় না তোমাদের ছোটদের প্রতি দয়া দেখাবে আর না বড়দেরকে কোনো প্রকার সম্মান করবে।' [১]
জারীর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজি (সঃ) ইরশাদ করেন, 'কোনো জনপদে কেউ যখন কোনো গুনাহের কাজ করে আর অন্যান্য লোকেরা তার থেকে প্রভাবশালী ও সংখ্যায় অধিক হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাধা না দেয়, তখন আল্লাহ তাআলার শাস্তি তাদের সকলের জন্যই প্রযোজ্য হয়।' [২]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'নবীজি (সঃ) কুরাইশ সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা যতদিন আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত থাকবে ততদিন এই শাসন-ক্ষমতা তোমাদের কাছেই থাকবে। আর যখন আল্লাহর নাফরমানি শুরু করবে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এমন লোক নিযুক্ত করবেন, যে তোমাদেরকে বাঁশ চাঁছার মতো করে অত্যাচার করবে।” এই বলে নবীজি তাঁর হাতে-থাকা বাঁশের বাকল টেনে দেখালেন।
টিকাঃ
[৩] হাদীসটি ভিত্তিহীন। ইমাম হাইছামি বলেছেন, এই হাদীসের রাবী মারওয়ান ইবনু সালিম গিফারি মাতরুক বা পরিত্যায্য রাবী। -ফাইযুল কাদির-১/৩৩৬
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২৫২৫৫
[১] এই হাদীসের সূত্র পরম্পরায় কাউসার ইবনু হাকীম নাম্নী একজন রাবী আছেন, যিনি অনির্ভরযোগ্য। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেছেন, তাঁর বর্ণনাকৃত সমস্ত হাদীস মিথ্যা ও বানোয়াট। -লিসানুল মীযান ৬/৪২৫-৪২৬
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৩৩৯
📄 সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বাধা-প্রদান
বাকল ফেলে দেওয়ায় বাশটির সাদা অংশ বের হয়ে গেল।।’[১]
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বাধা-প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
অন্যকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদানের সাথে সাথে নিজের জীবনেও আল্লাহর আদেশ মানা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট থাকা একান্ত জরুরি। যে ব্যক্তি অন্যকে সৎ কাজের আদেশ করে অথচ নিজে সেই আদেশকে ব্যক্তি-জীবনে প্রতিপালন করে না কিংবা অসৎ কাজ থেকে অন্যকে বাধা দিলেও নিজে বিরত থাকে না, সে ব্যক্তির ভয়াবহ পরিণতির কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। উসামা ইবনু যায়েদ রা. বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন একজন ব্যক্তিকে এনে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। আগুনের তাপে তার নাড়িভুঁড়ি গলে যাবে। চাকতি নিয়ে গাধার চক্রাকারে ঘোরার মতো সে আগুনের উত্তাল শিখার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকবে। তখন জাহান্নামীরা তার চারপাশে ভিড় করে বলবে, "হায়! আপনার এ অবস্থা কেন! আপনিই তো পৃথিবীতে আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতেন আর অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতেন!" তখন সে বলবে, "আমি তোমাদেরকে ঠিকই আদেশ করতাম, কিন্তু নিজে সৎ পথে চলতাম না। তোমাদেরকে আমি মন্দ কাজ করতে নিষেধ করলেও আমি নিজেই সেই কাজে জড়িয়ে যেতাম।”’[২]
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ৪৩৮০
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩২৬৭; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৯৮৯