📄 একজন মুমিনের শরীয়ত-প্রতিপালনে অবহেলার কারণ
কোনো ব্যক্তি যদি জানতে পারে, আগামীকাল তাকে বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে, কোনো কৃতকর্মের জন্য তাকে রাজ দরবারে ভর্ৎসনা করা হবে কিংবা শাস্তি দেওয়া হবে অথবা তাকে বাদশাহ সম্মানিত করবেন বা পুরস্কৃত করবেন তাহলে তো এই ব্যক্তি সারাদিন সারারাত এই চিন্তায়ই বিভোর থাকবে। তাকে কখনো উদাসীন, বেখেয়ালি অথবা রাজদরবারে যাওয়ার প্রস্তুতি ব্যতীত ভিন্ন কোনো ব্যস্ততায় পাওয়া যাওয়ার কথা না! অথচ পরকালকে বিশ্বাস করে, মনে-প্রাণে সে আখিরাতের ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী, মহান রবের সামনে জীবনের হিসাব দেওয়ার ব্যাপারে তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই—এমন বহু লোককে দেখা যায়, সে আখিরাত ভুলে দুনিয়ার মোহে বিভোর হয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার ওঠাবসা, চাল-চলনে পরকাল-বিস্মৃত উদাসীন ব্যক্তির মতোই মনে হয়। একদিকে তার অন্তর আখিরাতে পূর্ণ বিশ্বাসী, অন্যদিকে তার জীবনাচারে রয়েছে শরীয়ত-প্রতিপালনে যথেষ্ট দুর্বলতা। এ ধরনের মানুষের এই দ্বিমুখী আচরণের কারণ-
জ্ঞানের স্বল্পতা।
দুর্বল বিশ্বাস।
জাগতিক অতিব্যস্ততা।
দুনিয়ার মোহ।
প্রবৃত্তির চাহিদা।
স্বভাবজাত ইচ্ছা ও কল্পনা।
কামোদ্দীপক লোভ-লালসা।
শয়তানের ধোঁকা।
নিজের অবস্থানকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।
এসব কারণে একজন বিশ্বাসী ব্যক্তিও কখনো কখনো অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে পরকালকে অবিশ্বাসকারী ব্যক্তির মতো জীবনযাপন করতে পারে। এসব ধোঁকার মায়াজাল ছিন্ন করতে গিয়ে মানুষের মাঝে ঈমানের দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থক্য জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলার প্রতি সকল মুসলিম একই ঈমান রাখলেও তাদের ঈমানী শক্তির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়ে যায় উল্লিখিত কারণসমূহের প্রভাবে।
বিশ্বাসী মানুষের অন্তরে বিদ্যমান উল্লিখিত সকল কারণের প্রতিকার হলো, ধৈর্যশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টিজ্ঞান। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীল ও অন্তর্দৃষ্টিজ্ঞান-সম্পন্ন দৃঢ় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের প্রশংসায় আয়াত অবতীর্ণ করে ইরশাদ করেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
'তারা যেহেতু সবর করত তাই আমি তাদের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় লোকদের মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশে পথপ্রদর্শন করত। আর তারা আমার আয়াতসমূহে ছিল দৃঢ় বিশ্বাসী।'
টিকাঃ
[১] সূরা সিজদা, আয়াত-ক্রম: ২৪
📄 গুনাহের ক্ষতি
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এবার আমরা আমাদের গ্রন্থের মূল আলোচনা শুরু করতে পারি। অর্থাৎ, কারো অন্তরে যদি গুনাহ-আসক্তি বিদ্যমান থাকে তাহলে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতই নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন ব্যক্তির জেনে রাখা আবশ্যক যে, গুনাহ বান্দার অন্তরে বিষের মতো প্রভাব ফেলে।
গুনাহের কাজ নিশ্চিতভাবেই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। বিষ যেভাবে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর তেমনই গুনাহ ও পাপাচার মানুষের অন্তরের জন্য বিষতুল্য। মহান আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে দিয়ে অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণেই বস্তুত পার্থিব জগতের সকল অনিষ্ট, দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ, ধ্বংস, পতন এবং বরবাদির ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে।
📄 ইতিহাসের সাক্ষ্য
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ইবলিসকে ফিরিশতাদের রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত ও ধিকৃত করেছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ অভিশাপপ্রাপ্ত প্রাণীতে পরিণত করেছে। জগতের সবচেয়ে ঘৃণিত, বিকৃত, কুৎসিত, কদাকার, কুশ্রী আর বদকার সৃষ্টির নাম এই ইবলিস। গুনাহ আর নাফরমানির কারণে সে আরশের নৈকট্যের পরিবর্তে সীমাহীন দূরত্বের জিন্দেগিতে পতিত হয়েছে। মহান আল্লাহর রহমতের বদলে তার জীবন এখন অভিশাপে পরিপূর্ণ। চারিত্রিক গুণাবলি ছেড়ে কদর্য চরিত্রের আধারে পরিণত হয়েছে সে। জান্নাতের নিয়ামত ত্যাগ করে প্রজ্জ্বলিত আগ্নেয়গিরির জাহান্নামকে বাসস্থান হিসেবে গ্রহণ করেছে। নাফরমানিতে মোহগ্রস্ত হয়ে ঈমানের নূরকে কুফরির অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। অবাধ্যতার কারণে সবচেয়ে উত্তম ও দয়ালু অভিভাবকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করেছে। এই গুনাহের কারণেই পৃথিবীর বুকে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি অপদস্থ আর লাঞ্চিত হয়েছে।
মহাপরাক্রমশালীর ক্রোধের অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে সে জাগতের সমগ্র কাফির, ফাসেক, বদকার আর নিকৃষ্ট লোকদের সরদারে পরিণত হয়েছে। অথচ সে ছিল সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবিদ, যাহিদ আল্লাহমুখী ইবাদাতকারী। গুনাহের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একপর্যায়ে বিশ্ববাসীর সকল পাপকর্মের দায়-দায়িত্ব ও নেতৃত্ব গ্রহণ করার ব্রতে নিজেকে অর্পণ করে দিয়েছে।
হে আল্লাহ! আপনারই দরবারে আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করি আপনার আদেশের অবাধ্য হওয়া থেকে, আপনার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করা থেকে, আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন।
ইবলিসের কুমন্ত্রণায় আল্লাহ তাআলার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করায় আদি পিতা আদম ও আদি মাতা হাওয়া আলাইহিমাস সালাম জান্নাতের নিয়ামতরাজি থেকে পৃথিবীর বুকে প্রেরিত হয়েছেন। সুখ, শান্তি, আরাম আর বিলাসের জীবনাচার থেকে তাদেরকে প্রেরণ করে দেয়া হয়েছে দুঃখ দুর্দশাগ্রস্ত কষ্ট, ক্লেশে জর্জরিত এই পৃথিবীতে।
আল্লাহর নাফরমানি মানবজাতির জন্য এমন এক ভায়ানক দূরবস্থা, যার ফলে নাফরমানদের পুরো সম্প্রদায়কে নূহ আলাইহিস সালামের সময়কালে নিমজ্জিত করে দেয়া হয়েছিল ধ্বংসাত্মক এক মহাপ্লাবনে। এমনকি প্লাবনের জলরাশি পাহাড়কে পর্যন্ত ডুবিয়ে ফেলেছিল।
এই গুনাহের কারণেই আদ সম্প্রদায়ের উপর প্রবাহিত হয়েছে প্রলয়ঙ্করী ঝঞ্চা বায়ু। মানুষগুলো সব উদম বাগানের কাঁটা খেজুরগাছের মতো মুখ থুবড়ে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের ঘরবাড়ি, সাজানো সংসার চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে স্মৃতিলীন হয়ে আছে।
আল্লাহর অবাধ্যতার কারণেই সামূদ সম্প্রদায়কে হৃৎপিণ্ডে চিড়ধরানো তীব্র আওয়াজের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণেই লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়কে ফিরিশতাগণ আল্লাহর হুকুমে জমিন থেকে আকাশের দিকে উঠিয়ে আছাড় মেরে ফেলে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন, পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন। মাটিসমেত উলটে ফেলার কারণে সেই স্থানে প্রবাহিত হয়েছে জমাটবদ্ধ লবণাক্ত সাগর।
আল্লাহর নাফরমানিতে ডুবে থাকা শুআইব আলাইহিস সালামের জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে আসমানের বারিবহ মেঘমালা দিয়ে। ঘন কালো মেঘ তাদের অঞ্চলকে আঁধার-কালো করে তাদের উপর বর্ষণ করেছে অগ্নিবৃষ্টি। অবাধ্য সম্প্রদায় তাদের নাফরমানির কারণে আল্লাহর আযাবে ভস্মীভূত হয়েছে।
গুনাহের কারণেই তো ফিরআউন আর তার দলবলকে সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। ফিরআউনের দেহকে সমুদ্রে ডুবিয়ে সংরক্ষিত করা হয়েছে বিশ্ববাসীর শিক্ষার্জনের জন্য আর পাপাচার আত্মাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে জাহান্নামের লেলিহান অগ্নি-গহ্বরে।
ধনাঢ্য কারুনকে তার আলিশান বাসস্থান, ধন-সম্পদসহ ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে এই গুনাহের কারণেই।
ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত জাতি বনী ইসরাঈলের জীবনাচার বারবার চরমভাবে সামগ্রিক বিপর্যয়ে পর্যদুস্ত হয়েছে আল্লাহ তাআলার লাগাতার নাফরমানি ও অবাধ্যতার ফলে। প্রচণ্ড ক্ষমতাধর অত্যাচারী বাদশাহকে তাদের জন্য ন্যস্ত করা হয়েছে। বাদশাহর সৈন্যবাহিনী তাদের বাড়িঘরে লুণ্ঠন করে তাদেরকে হত্যা করেছে। নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছে। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত করেছে শহরের পর শহর। তবুও তারা সতর্ক হয়নি। রবের নাফরমানিতেই নিমজ্জিত হয়েছে পুনরায়। ফলে আবারও তাদের উপর জালিম শাসক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যে তাদের পুরো সাম্রাজ্যের উপর ধ্বংস আর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছে। এভাবে আল্লাহর নাফরমানি, অবাধ্যচারণ, গুনাহ আর পাপ-পঙ্কিলতায় যতবারই বনী ইসরাঈলের লোকেরা সম্মিলিতভাবে লিপ্ত হয়েছে, ততবারই তাদেরকে বিভিন্ন রকমের শাস্তি আর দুর্যোগ দিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয়া হয়েছে। কখনো হত্যা ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে, কখনো অত্যাচারী শাসকদের দ্বারা, কখনো বানর কিংবা শুকরে রূপান্তরিত করে, আবার কখনো দুর্ভিক্ষ ও অভাব-অনটনের মাধ্যমে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিয়ে তাদের পাপের পার্থিব প্রতিদান দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও কৃতকর্মের ফলাফল স্বরূপ তাদের ভাগ্যে এই দুর্ভোগ, দুর্দশাকে স্থায়ী করে দিয়েছেন। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে-
لَيَبْعَثَنَّ عَلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ يَسُومُهُمْ سُوءَ الْعَذَابِ
'অবশ্যই আপনার রব কিয়ামত অবধি তাদের বিরুদ্ধে এমন লোকদের প্রেরণ করবেন, যারা তাদেরকে আস্বাদন করাবে অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের শাস্তি ও নির্যাতন।'[১]
টিকাঃ
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৬৭
📄 নবীজি ও সাহাবীদের সতর্কবাণী
ইমাম আহমাদ বলেন, জুবাইর ইবনু নুফাইর বর্ণনা করেন, 'মুসলমানদের হাতে যখন সাইপ্রাস বিজয় হলো, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা পরাজয়ের গ্লানি আর পেরেশানিতে কান্না করতে করতে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছিল। তখন আমি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলাম, তিনি একা বসে বসে কাঁদছেন। আমি অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি এমন এক দিনে কেন এভাবে বসে কান্না করছেন, যেদিন আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে গৌরবান্বিত করেছেন!" তখন তিনি আমাকে বললেন, "আহ জুবাইর, আল্লাহ তোমার সহায় হোন! তুমি কি দেখছ না, এই সাইপ্রাসবাসীরা প্রতাপশালী ও শৌর্যশালী হওয়া সত্ত্বেও আজ তারা আল্লাহ তাআলার মুকাবিলায় কত তুচ্ছ! কত হীন! আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হওয়ায় দেখো আজ তাদের কী করুণ পরিণতি!"'
নবীজি বলেন, 'যতক্ষণ বান্দা তার কৃতকর্মের কারণে আত্মকৈফিয়তে লজ্জিত হবে, ততক্ষণ সে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসের মুখে পড়বে না।' [২]
অন্যত্র নবীজি ইরশাদ করেন, 'যখন আমার উম্মতের মধ্যে ব্যাপকভাবে পাপকাজ ছড়িয়ে পড়বে, তখন আল্লাহ তাআলার আযাবও তাদের সকলকে গ্রাস করে নেবে।' সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! তখন কি উম্মতের মধ্যে নেককার লোকও থাকবে না? নবীজি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই থাকবে।' সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আযাবের সময় তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে?' নবীজি জবাব দিলেন, 'গুনাহের কারণে যখন আল্লাহর আযাব এই উম্মতকে পাকড়াও করবে, তখন নেককার লোকেরাও সকলের মতোই আযাবগ্রস্ত হবে। আল্লাহর প্রেরিত দুর্যোগ তাদেরকেও আচ্ছাদিত করে নেবে। তবে পরবর্তীতে তারা তাদের নেক ও সৎ কাজের বিনিময়ে দয়ালু রবের ক্ষমা ও সন্তুষ্টির ছায়াতলে জায়গা করে নেবে।' [১]
মুসনাদু আহমাদের হাদীস, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'মানুষ তার গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়।'
অন্যত্র বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসূল বলেন, 'আমার আশঙ্কা হয় তোমাদের ব্যাপারে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হয়তো তোমাদের উপর বিধর্মীরা এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে, যেভাবে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাবারের প্লেটের সামনে হামলে পড়ে।' সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, 'আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমাদের সংখ্যা কম হবে?' নবীজি জবাবে বললেন, 'না! তখন তোমরা সংখ্যায় বেশিই থাকবে। কিন্তু এই সংখ্যাধিক্য হবে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া খরকুটোর মতো। শত্রুদের অন্তরে তোমাদের জন্য কোনো ভয় থাকবে না, আর তোমাদের অন্তরে সাহসের পরিবর্তে থাকবে দুর্বলতা।' সাহাবীরা জানতে চাইলেন, 'কেমন দুর্বলতা?' নবীজি বললেন, 'পার্থিব মোহ আর মৃত্যুর প্রতি অনীহা।'।খ
শেষ যামানায় যখন গুনাহের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে সেই সময়ের জন্য আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ভবিষ্যদ্বাণী-মানুষের জন্য এক দুঃসহ সময় অপেক্ষা করছে। তখন ইসলামের কেবল নামই বাকি থাকবে এই পৃথিবীতে। কুরআন শুধুই একটি ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী-সংকলন হিসেবে ব্যবহৃত হবে। হিদায়াত ও হকের আওয়াজ উচ্চারিত হওয়ার বদলে মসজিদগুলো হয়ে যাবে দর্শনীয় স্থান। সেই সময়ে ধর্মীয় আলিমগণ পৃথিবীর বুকে নিকৃষ্ট মুসলিম হিসেবে বিচরণ করবেন। তাঁদের কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে আবার তাঁদের মাধ্যমেই এসবের সমাধান হবে।'
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ছেলে তাঁর পিতার সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেন, 'যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার প্রকাশ পায় তখন আল্লাহ তাআলা সেই জনপদের ধ্বংস ঘোষণা করেন।' [১]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমিসহ মুহাজিরদের ১০ জনের একটি দল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে লক্ষ করে বললেন, "মুহাজিরের দল! পাঁচটি স্বভাব থেকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।
অশ্লীলতার স্বভাব। যখন কোনো জনপদে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহ তখন তাদের মাঝে এমনভাবে প্লেগ ও অন্যান্য নতুন নতুন মহামারি-রোগ ছড়িয়ে দেন, যা তাদের পূর্বপুরুষদের জীবদ্দশায় ছিল না।
মাপে কম দেয়ার প্রবণতা। কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন মাপে কম দেয়া শুরু করবে তখন তাদেরকে দুর্ভিক্ষ ও মূল্যবৃদ্ধির দুর্যোগে ফেলে দেয়া হবে। একইসাথে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে অত্যাচারী শাসক।
যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি। যখন লোকেরা তাদের সম্পত্তির যাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকবে তখন তাদেরকেও রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে দেয়া হবে, অনাবৃষ্টির দুর্যোগ নেমে আসবে তাদের উপর। যদি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি অন্যান্য প্রাণী, গবাদি পশু না থাকত তাহলে তাদের উপর পুরোপুরিভাবেই বৃষ্টিবর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হতো।
চুক্তি ভঙ্গের মানসিকতা। কোনো সম্প্রদায় যখন কথার বিপরীত কাজ করবে, চুক্তিভঙ্গ করবে তখন তারা এমন শত্রুবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হবে যারা তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নেবে।
শাসকগোষ্ঠীর কুরআন-হাদীস-বহির্ভূত শাসনব্যবস্থা। যখন কোনো জনপদের শাসকগণ কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত কোনো শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করবে তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ বাঁধিয়ে দেবেন." [২]
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সাথে একজন লোক আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র দরবারে উপস্থিত হলেন। আগত লোকটি বললেন, 'উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাদেরকে ভূমিকম্পের ব্যাপারে হাদীস শোনান।' আম্মাজান বললেন, 'যখন কওমের লোকেরা যিনা, ব্যাভিচারকে বৈধ মনে করা শুরু করে, নির্দ্বিধায় মদ পান করে এবং গান-বাজনায় মত্ত হয়ে যায় তখন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার আত্মসম্মানবোধ গর্জন করে উঠে তাদের এই অবাধ্যচারিতায়। তখন জমিনকে আদেশ করা হয়, 'তুমি কেঁপে উঠে তাদেরকে সতর্ক করে দাও।' যদি তারা তখন তাওবা করে এবং দ্রুত গুনাহ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে পৃথিবী স্বাভাবিক স্থিরতায় ফিরে আসে। আর তারা যদি নির্বিকারই থেকে যায় তাহলে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
ইবনু আবিদ দুনিয়া অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ করেন, 'আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় একবার ভূমিকম্প হয়। নবীজি তখন মাটিতে হাত রেখে বললেন, "থেমে যাও। এর বেশি কেঁপে ওঠার জন্য তো তুমি আদেশপ্রাপ্ত হওনি।” এরপর তিনি সাহাবীদের লক্ষ করে বললেন, "তোমাদের রব তোমাদের থেকে তাওবা-প্রার্থনা আশা করছেন, তোমরা তাঁর নিকট তাওবা করো.” পরবর্তীতে খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র শাসনামলে আবারও ভূমিকম্প হয়। উমর তখন সবাইকে সতর্ক করে বলেন, "লোক সকল! এই ভূ-কম্পন তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। তোমাদেরকে সতর্ক করা হলো। যদি তোমরা সতর্ক না হও তাহলে এই কম্পন যদি আবারও শুরু হয় তাহলে আমি (অর্থাৎ আমরা কেউই) আর একসাথে বসবাস করতে পারব না." [১]
মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যতম খলীফা উমর ইবনু আবদিল আযীযের শাসনামলে ভূকম্পন হলে তিনি বিভিন্ন নগরে ও জনপদে দিকনির্দেশনা দিয়ে চিঠি লিখে পাঠান। চিঠিতে আল্লাহ তাআলার প্রেরিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, 'এই ভূ-কম্পন দিয়ে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বাসিন্দাদের সতর্ক করছেন। শহরের অধিবাসীদের প্রতি আমি এই নির্দেশনা প্রদান করছি যে, তারা মাসের নির্দিষ্ট দিনে একটি ময়দানে সমবেত হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এবং ময়দানের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রত্যেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সাদাকাহ করে নেবে। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى، وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى
"যে ব্যক্তি (দান-সাদাকাহ'র মাধ্যমে) অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তার রবের নাম নেবে, অতঃপর নামায আদায় করবে, অবশ্যই সে সফলকাম."[১]
'তাওবা করার সময় প্রত্যেকেই যেন আদম আলাইহিস সালামের ভাষায় বলে-
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"হে আমাদের প্রতিপালক! (আপনার নাফরমানির দ্বারা) আমরা তো আমাদের উপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন আমরা তো ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব."[২]
'এবং নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় এই বলে ক্ষমা চায়-
وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"আয় আল্লাহ! আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, রহম না করেন আমি তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব.”'[৩]
'ইউনুস আলাইহিস সালামের মতো দুআ করে যেন বলে-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া তো আর কোনো উপাস্য নেই। অন্তর থেকে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আল্লাহ! আমি তো অপরাধ করে ফেলেছি, | জালিমদের কাতারে শামিল হয়ে গেছি। (আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।)”.১
আম্মার ইবনু ইয়াসির ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেন, 'মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা যখন বান্দাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চান তখন তাদের শিশুসন্তানদের মৃত্যুহার বেড়ে যায় এবং মহিলারা বন্ধ্যা হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তাআলার প্রলয়ংকারী প্রতিশোধ তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়। কারো প্রতিই তখন আর বিন্দুমাত্র দয়া দেখানো হয় না।' ২
কিতাবুয যুহদে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল উল্লেখ করেছেন- মূসা একবার আল্লাহ তাআলাকে বললেন, 'আল্লাহ! আপনি তো ঊর্ধ্বাকাশে! আর আমরা থাকি পৃথিবীর বুকে। আমরা কীভাবে আপনার ক্রোধ টের পাব? আপনার অসন্তুষ্টির আলামত কী? আমাদের জন্য আপনার সন্তুষ্টির নিদর্শন কী?' তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, 'যখন আমি সন্তুষ্টি থাকি তখন তোমাদের জন্য উত্তম লোকবলকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দিই আর যখন আমি ক্রোধান্বিত থাকি তখন তোমাদের জন্য নিকৃষ্ট চরিত্রের লোকদেরকে শাসনক্ষমতা দান করি।' [৩]
ফুযাইল ইবনু ইয়ায সূত্রে ইবনু আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলের কোনো এক নবীর কাছে ওহী মারফত আল্লাহর এক চিরায়ত বিধান জানিয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যখন আমার পরিচয়, বিধানাবলি সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তি আমার অবাধ্য হয় তখন আমি তার উপর এমন ব্যক্তিকে ন্যস্ত করে, যে আমাকে চেনে না, আমার বিধানাবলিও জানে না।'
টিকাঃ
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৩৪৭
[১] হাকিম-৪/৫২৩
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪২৯৭
[১] মাজমাউয যাওয়াইদ-৪/১১৮
[২] হাকিম-৪/৫৪০
[১] মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবাহ-১/২২১
[১] সূরা আ'লা, আয়াত-ক্রম: ১৪, ১৫
[২] সূরা আ'রাফ, আয়াত-ক্রম: ২৩
[৩] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৪৭
[১] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[২] হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, এই হাদীসের কোনো সূত্র নেই। -ফাইযুল কাদীর লিল মুনাউয়ি-২/২০০-সম্পাদক
[৩] কিতাবুয যুহদ, পৃষ্ঠা-ক্রম: ৩৩৭