📄 নগদ-বাকির হিসাব
এই শ্রেণির মানুষ এতটাই দুনিয়াগ্রস্ত যে সর্বদা নগদ-বাকির হিসাবে মত্ত। অথচ বিলম্বিত পরকালীন জীবনের তুলনায় হাতের কাছের এই দুনিয়ার জিন্দেগি কত তুচ্ছ, কত নীচু, তার খবর কি তারা রাখে! জীবনের জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস অবধি মানুষের যত শ্বাস-প্রশ্বাস আছে তা কি পরকালের একটি শ্বাসের সমান হতে পারে? একজন মুমিনের অন্তরে কি করে আসতে পারে এমনতর অবান্তর অহেতুক চিন্তা!
এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ আহমাদ তাঁর কালজয়ী হাদীসগ্রন্থ মুসনাদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস উল্লেখ করেছেন-
وَاللَّهُ مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ ؟
'আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তো সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো। হাতের সাথে কতটুকু পানি উঠে আসে দুনিয়াপ্রেমীরা তা যেন লক্ষ করে।' (অর্থাৎ, কেউ যদি তার হাত সাগরের পানিতে ডুবায় তাহলে হাতে-লেগে-থাকা পানি হলো দুনিয়া, আর দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের সীমাহীন জলরাশি হলো আখিরাতের জীবন।) [১]
এই যখন দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা তখন পার্থিব জীবনকে নগদ সম্ভোগের বস্তু বলে ধোঁকা আর মিথ্যে প্রলোভনে আত্মতৃপ্ত হওয়া সবচেয়ে বড় বোকামি ও নিম্নস্তরের মূর্খতা। গোটা দুনিয়ার আয়ুষ্কালের অবস্থা যদি আখিরাতের তুলনায় সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো হয় তাহলে ব্যক্তিবিশেষ একেকজন মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালের সময়টুকু তো আরো তুচ্ছ, আরো গৌণ। জাগতিক জীবনের এই মূল্যায়ন একজন সুস্থ বিবেচকের সামনে থাকলে সে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষণকালের নগণ্য এই জীবনকে নগদ মনে করে এমনভাবে কখনোই প্রাধান্য দেবে না, যাতে সীমাহীন বিশালতায় ভরপুর আখিরাতের নিয়ামত থেকে সে বঞ্চিত হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৮০০৯
📄 আরেকটি অথর্ব চিন্তা
দুনিয়াকে নিশ্চিত আর পরকালকে অনিশ্চিত ভাবাটাও একটি অথর্ব চিন্তা। তাওহীদে বিশ্বাসী একজন মুমিন বান্দা যখন মহান আল্লাহ তাআলার ওয়াদা, নেক কাজের বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি এবং পাপ কাজের শাস্তির চূড়ান্ত সতর্কতাকে সন্দেহাতীত সত্য মনে করবে তখন তার পক্ষে তুচ্ছ ও নশ্বর দুনিয়াকে অবিনশ্বর পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়া সম্ভব হবে না। দুনিয়া সামনে উপস্থিত হওয়ায় এই জীবনাচারকে সুনিশ্চিত মনে করা আর পরকালের জীবনাচার সামান্য বিলম্বিত দেখে তাকে অনিশ্চিত মনে করার কোনো কারণই নেই। তাওহীদের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাসই বান্দাকে দুনিয়ার তুলনায় পরকালকে আরো বেশি অকাট্য ও সুনিশ্চিত ভাবতে শিক্ষা দেয়। নশ্বর দুনিয়ায় কত অসংখ্য প্রাণ দুনিয়ার এক লোকমা খাবার মুখে নেয়ার আগেই ঝরে যায় অথবা কথিত এই নিশ্চিত দুনিয়ার কতটুকু ভোগ-বিলাস বান্দার ভাগ্যে রয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অজানাই থেকে যায়, কিন্তু এই জীবনাবসানের পর যেই অনন্ত আর অসীমের পথে বান্দার যাত্রা শুরু হয় সেই যাত্রা তো সকলের জন্য অকাট্যভাবেই নিশ্চিত ও অবধারিত।
📄 আল্লাহর ওয়াদা ও ভয়ভীতির প্রতি সন্দেহ-পোষণ
পরকাল বিষয়ে সন্দেহের জন্ম দেয়
আল্লাহর কিছু দুর্ভাগা বান্দা নামে মুসলিম হলেও কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন ওয়াদা, জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন বর্ণনা শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে অবিশ্বাস করে থাকে অথবা সন্দিহান হয়ে দোদুল্যমান এক জীবনে মগ্ন থাকে। তাদের অবিশ্বাস বা দোদুল্যমানতা থেকেই তারা চিন্তা করে—আমার সামনে এই মুহূর্তে উপস্থিত দুনিয়াই তো নিশ্চিত, হাতের মুঠোয় আছে। আর পরকাল সে তো সামনের কোনো এক সময়ের সন্দেহময় জীবন। যেই জীবন অনিশ্চিত। যেই জীবনে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম অথবা সুখ কিংবা দুঃখের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেই অনিশ্চিত সময়ের জন্য আমি কেন এই নিশ্চিত সুখময় সময়কে উপভোগ করব না!
এসকল সন্দিহান মুসলিম বান্দার জন্য রয়েছে শাশ্বত মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারীম। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে—
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
‘কুরআনে নাযিলকৃত আয়াতের মধ্যে আমি মুমিনদের জন্য রহমত ও শিফা অবতীর্ণ করেছি।’১
দোদুল্যমান এই মুমিনরা আল্লাহ তাআলার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করলে তাদের এই সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। যখন তারা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, কুদরত, তাঁর সীমাহীন রাজত্ব, ইচ্ছাশক্তি, একত্ববাদ, বিভিন্ন যুগে প্রেরিত রাসূলগণের ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে তখন তার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে নবীদের সত্যবাদিতা। নবীগণ যে জান্নাত-জাহান্নাম-পরকালের সংবাদ দিয়েছেন তা তার নিকট সন্দেহাতীতভাবে সত্য হিসেবে প্রমাণিত হবে।
এমনকি মানুষ যখন তার নিজ অস্তিত্বের বিন্দু থেকে জীবনের সিন্ধু পর্যন্ত একবার গভীর নজরে তাকাবে, তখন আল্লাহ তাআলার কোনো ওয়াদা ও সতর্কতাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে পারবে না। সামান্য বীর্যফোঁটা থেকে বিস্ময়কর জীবনের এতগুলো স্তর যে স্রষ্টা সুনিপুণভাবে আঞ্জাম দিয়ে আসছেন, যিনি শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর বার্ধক্যের দিকে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাঁর কোনো কথাই অনর্থক হতে পারে না। তাঁর প্রতিটি কথা, ওয়াদা, ভীতিপ্রদর্শন শতভাগ সত্য, সন্দেহ-সংশয়ের বহু ঊর্ধ্বে। এভাবে বান্দা যখন সত্যিকারার্থেই নিজেকে নিয়ে চিন্তামগ্ন হবে, সে মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমানের আলোয় তাঁর প্রতিটি কথার সত্যতা পাবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
'তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে বহু নিদর্শন। তোমরা কি এসব দেখতে পাও না?'[১]
টিকাঃ
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৮২
[১] সূরা যারিয়াত, আয়াত-ক্রম: ২১
📄 একজন মুমিনের শরীয়ত-প্রতিপালনে অবহেলার কারণ
কোনো ব্যক্তি যদি জানতে পারে, আগামীকাল তাকে বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে, কোনো কৃতকর্মের জন্য তাকে রাজ দরবারে ভর্ৎসনা করা হবে কিংবা শাস্তি দেওয়া হবে অথবা তাকে বাদশাহ সম্মানিত করবেন বা পুরস্কৃত করবেন তাহলে তো এই ব্যক্তি সারাদিন সারারাত এই চিন্তায়ই বিভোর থাকবে। তাকে কখনো উদাসীন, বেখেয়ালি অথবা রাজদরবারে যাওয়ার প্রস্তুতি ব্যতীত ভিন্ন কোনো ব্যস্ততায় পাওয়া যাওয়ার কথা না! অথচ পরকালকে বিশ্বাস করে, মনে-প্রাণে সে আখিরাতের ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী, মহান রবের সামনে জীবনের হিসাব দেওয়ার ব্যাপারে তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই—এমন বহু লোককে দেখা যায়, সে আখিরাত ভুলে দুনিয়ার মোহে বিভোর হয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার ওঠাবসা, চাল-চলনে পরকাল-বিস্মৃত উদাসীন ব্যক্তির মতোই মনে হয়। একদিকে তার অন্তর আখিরাতে পূর্ণ বিশ্বাসী, অন্যদিকে তার জীবনাচারে রয়েছে শরীয়ত-প্রতিপালনে যথেষ্ট দুর্বলতা। এ ধরনের মানুষের এই দ্বিমুখী আচরণের কারণ-
জ্ঞানের স্বল্পতা।
দুর্বল বিশ্বাস।
জাগতিক অতিব্যস্ততা।
দুনিয়ার মোহ।
প্রবৃত্তির চাহিদা।
স্বভাবজাত ইচ্ছা ও কল্পনা।
কামোদ্দীপক লোভ-লালসা।
শয়তানের ধোঁকা।
নিজের অবস্থানকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।
এসব কারণে একজন বিশ্বাসী ব্যক্তিও কখনো কখনো অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে পরকালকে অবিশ্বাসকারী ব্যক্তির মতো জীবনযাপন করতে পারে। এসব ধোঁকার মায়াজাল ছিন্ন করতে গিয়ে মানুষের মাঝে ঈমানের দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থক্য জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলার প্রতি সকল মুসলিম একই ঈমান রাখলেও তাদের ঈমানী শক্তির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়ে যায় উল্লিখিত কারণসমূহের প্রভাবে।
বিশ্বাসী মানুষের অন্তরে বিদ্যমান উল্লিখিত সকল কারণের প্রতিকার হলো, ধৈর্যশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টিজ্ঞান। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীল ও অন্তর্দৃষ্টিজ্ঞান-সম্পন্ন দৃঢ় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের প্রশংসায় আয়াত অবতীর্ণ করে ইরশাদ করেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
'তারা যেহেতু সবর করত তাই আমি তাদের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় লোকদের মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশে পথপ্রদর্শন করত। আর তারা আমার আয়াতসমূহে ছিল দৃঢ় বিশ্বাসী।'
টিকাঃ
[১] সূরা সিজদা, আয়াত-ক্রম: ২৪