📄 দুনিয়ার ধোঁকা
সৃষ্টিজগতে সবচেয়ে মারাত্মক ধোঁকার বস্তু হলো দুনিয়া। এই ধোঁকা দ্রুততম সময়ে বান্দার পরকালের চিন্তাকে বিঘ্নিত করে তাকে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। বান্দা তখন মোহাবিষ্ট হয়ে পরকালকে ভুলে দুনিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। একপর্যায়ে সে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলতে থাকে—আরে! জাগতিক এই ভোগ- বিলাস তো এখনই উপস্থিত, নগদ! পরকালের জিন্দেগি, সে তো বিলম্বিত। বাকির খাতায় তোলা অনর্থক! আর যা কিছু তৎক্ষণাৎ ও নগদে পাওয়া যায় তা বাকি ও বিলম্বিত কিছুর চেয়ে উত্তমই হবে।
দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে কেউ এটাও বলে—নগদ ভোগবিলাস সামান্য পরিমাণও চলবে আমার। ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুত হিরে-মোতি-পান্নার দরকার নেই। এদের অনেকেই আবার বলে, চাকচিক্যময় দুনিয়ার প্রমোদবিলাস তো চোখের সামনেই সুনিশ্চিত! আর পরকালের আরাম-আয়েশ সন্দেহময়। তাহলে আমি নিশ্চিত প্রমোদবিলাসকে কীভাবে ছেড়ে দিই অনিশ্চিত সন্দিহান এক জীবনের আশায়!
দুনিয়ার আমোদ-ফুর্তিতে মত্ত এসব লোকের এমন মানসিকতা শয়তানের অন্যতম কুমন্ত্রণা বা মিথ্যে সান্ত্বনা। এদের দূরবস্থা তো অবলা পশুর চেয়েও শোচনীয়। অবলা প্রাণীরা যখন সামনে ক্ষতিকর কোনো কিছুর আভাষ পায় তখন তাদেরকে পেটানো হলেও তারা সামনে এগুতে ভয় পায়। আর এই লোকেরা তো ঈমানের নূরে আলোকিত হওয়ার পরেও এসব ভ্রান্ত চিন্তার কারণে বিনাশের পথে এগিয়ে যায়। যারা এইধরনের অবান্তর চিন্তা ধারণ করে আবার আল্লাহ রাসূল ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে তারা মূলত এই জগতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা। কেননা তারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েও অদৃশ্য এক আঁধারে নিমজ্জিত।
📄 নগদ-বাকির হিসাব
এই শ্রেণির মানুষ এতটাই দুনিয়াগ্রস্ত যে সর্বদা নগদ-বাকির হিসাবে মত্ত। অথচ বিলম্বিত পরকালীন জীবনের তুলনায় হাতের কাছের এই দুনিয়ার জিন্দেগি কত তুচ্ছ, কত নীচু, তার খবর কি তারা রাখে! জীবনের জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস অবধি মানুষের যত শ্বাস-প্রশ্বাস আছে তা কি পরকালের একটি শ্বাসের সমান হতে পারে? একজন মুমিনের অন্তরে কি করে আসতে পারে এমনতর অবান্তর অহেতুক চিন্তা!
এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ আহমাদ তাঁর কালজয়ী হাদীসগ্রন্থ মুসনাদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস উল্লেখ করেছেন-
وَاللَّهُ مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ ؟
'আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তো সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো। হাতের সাথে কতটুকু পানি উঠে আসে দুনিয়াপ্রেমীরা তা যেন লক্ষ করে।' (অর্থাৎ, কেউ যদি তার হাত সাগরের পানিতে ডুবায় তাহলে হাতে-লেগে-থাকা পানি হলো দুনিয়া, আর দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের সীমাহীন জলরাশি হলো আখিরাতের জীবন।) [১]
এই যখন দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা তখন পার্থিব জীবনকে নগদ সম্ভোগের বস্তু বলে ধোঁকা আর মিথ্যে প্রলোভনে আত্মতৃপ্ত হওয়া সবচেয়ে বড় বোকামি ও নিম্নস্তরের মূর্খতা। গোটা দুনিয়ার আয়ুষ্কালের অবস্থা যদি আখিরাতের তুলনায় সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো হয় তাহলে ব্যক্তিবিশেষ একেকজন মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালের সময়টুকু তো আরো তুচ্ছ, আরো গৌণ। জাগতিক জীবনের এই মূল্যায়ন একজন সুস্থ বিবেচকের সামনে থাকলে সে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষণকালের নগণ্য এই জীবনকে নগদ মনে করে এমনভাবে কখনোই প্রাধান্য দেবে না, যাতে সীমাহীন বিশালতায় ভরপুর আখিরাতের নিয়ামত থেকে সে বঞ্চিত হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৮০০৯
📄 আরেকটি অথর্ব চিন্তা
দুনিয়াকে নিশ্চিত আর পরকালকে অনিশ্চিত ভাবাটাও একটি অথর্ব চিন্তা। তাওহীদে বিশ্বাসী একজন মুমিন বান্দা যখন মহান আল্লাহ তাআলার ওয়াদা, নেক কাজের বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি এবং পাপ কাজের শাস্তির চূড়ান্ত সতর্কতাকে সন্দেহাতীত সত্য মনে করবে তখন তার পক্ষে তুচ্ছ ও নশ্বর দুনিয়াকে অবিনশ্বর পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়া সম্ভব হবে না। দুনিয়া সামনে উপস্থিত হওয়ায় এই জীবনাচারকে সুনিশ্চিত মনে করা আর পরকালের জীবনাচার সামান্য বিলম্বিত দেখে তাকে অনিশ্চিত মনে করার কোনো কারণই নেই। তাওহীদের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাসই বান্দাকে দুনিয়ার তুলনায় পরকালকে আরো বেশি অকাট্য ও সুনিশ্চিত ভাবতে শিক্ষা দেয়। নশ্বর দুনিয়ায় কত অসংখ্য প্রাণ দুনিয়ার এক লোকমা খাবার মুখে নেয়ার আগেই ঝরে যায় অথবা কথিত এই নিশ্চিত দুনিয়ার কতটুকু ভোগ-বিলাস বান্দার ভাগ্যে রয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অজানাই থেকে যায়, কিন্তু এই জীবনাবসানের পর যেই অনন্ত আর অসীমের পথে বান্দার যাত্রা শুরু হয় সেই যাত্রা তো সকলের জন্য অকাট্যভাবেই নিশ্চিত ও অবধারিত।
📄 আল্লাহর ওয়াদা ও ভয়ভীতির প্রতি সন্দেহ-পোষণ
পরকাল বিষয়ে সন্দেহের জন্ম দেয়
আল্লাহর কিছু দুর্ভাগা বান্দা নামে মুসলিম হলেও কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন ওয়াদা, জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন বর্ণনা শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে অবিশ্বাস করে থাকে অথবা সন্দিহান হয়ে দোদুল্যমান এক জীবনে মগ্ন থাকে। তাদের অবিশ্বাস বা দোদুল্যমানতা থেকেই তারা চিন্তা করে—আমার সামনে এই মুহূর্তে উপস্থিত দুনিয়াই তো নিশ্চিত, হাতের মুঠোয় আছে। আর পরকাল সে তো সামনের কোনো এক সময়ের সন্দেহময় জীবন। যেই জীবন অনিশ্চিত। যেই জীবনে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম অথবা সুখ কিংবা দুঃখের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেই অনিশ্চিত সময়ের জন্য আমি কেন এই নিশ্চিত সুখময় সময়কে উপভোগ করব না!
এসকল সন্দিহান মুসলিম বান্দার জন্য রয়েছে শাশ্বত মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারীম। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে—
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
‘কুরআনে নাযিলকৃত আয়াতের মধ্যে আমি মুমিনদের জন্য রহমত ও শিফা অবতীর্ণ করেছি।’১
দোদুল্যমান এই মুমিনরা আল্লাহ তাআলার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করলে তাদের এই সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। যখন তারা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, কুদরত, তাঁর সীমাহীন রাজত্ব, ইচ্ছাশক্তি, একত্ববাদ, বিভিন্ন যুগে প্রেরিত রাসূলগণের ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে তখন তার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে নবীদের সত্যবাদিতা। নবীগণ যে জান্নাত-জাহান্নাম-পরকালের সংবাদ দিয়েছেন তা তার নিকট সন্দেহাতীতভাবে সত্য হিসেবে প্রমাণিত হবে।
এমনকি মানুষ যখন তার নিজ অস্তিত্বের বিন্দু থেকে জীবনের সিন্ধু পর্যন্ত একবার গভীর নজরে তাকাবে, তখন আল্লাহ তাআলার কোনো ওয়াদা ও সতর্কতাকেই সন্দেহের চোখে দেখতে পারবে না। সামান্য বীর্যফোঁটা থেকে বিস্ময়কর জীবনের এতগুলো স্তর যে স্রষ্টা সুনিপুণভাবে আঞ্জাম দিয়ে আসছেন, যিনি শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর বার্ধক্যের দিকে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাঁর কোনো কথাই অনর্থক হতে পারে না। তাঁর প্রতিটি কথা, ওয়াদা, ভীতিপ্রদর্শন শতভাগ সত্য, সন্দেহ-সংশয়ের বহু ঊর্ধ্বে। এভাবে বান্দা যখন সত্যিকারার্থেই নিজেকে নিয়ে চিন্তামগ্ন হবে, সে মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমানের আলোয় তাঁর প্রতিটি কথার সত্যতা পাবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
'তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে বহু নিদর্শন। তোমরা কি এসব দেখতে পাও না?'[১]
টিকাঃ
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৮২
[১] সূরা যারিয়াত, আয়াত-ক্রম: ২১