📘 রূহের খোরাক > 📄 সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি

📄 সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি


أُولَئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ
'নিশ্চয় যারা তাদের প্রতিপালকের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে, যারা তাদের রবের কথাকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করে এবং যারা তাদের প্রাপ্ত সম্পদ থেকে শঙ্কিত ও কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান-সাদাকাহ করে যে, তারা তো অবধারিতভাবে তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে। এরাই কল্যাণের পথে দ্রুত ছুটে যায় এবং থাকে অগ্রগামী। [১]
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে সুনানুত তিরমিযী'র বর্ণনা, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল-এর কাছে আমি এই আয়াত সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এই ব্যক্তিরা কি মদপান, ব্যভিচার এবং চৌর্যবিত্ততে অভ্যস্ত?” আল্লাহর রাসূল তখন উত্তরে বলেন, "সিদ্দীকের কন্যা! বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা নিয়মিত নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-সাদাকাহ করে। তবে তারা এই আশঙ্কাও বোধ করে, হয়তো তাদের এই নেক আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এজন্য এরাই হলো প্রকৃতপক্ষে কল্যাণের পথে দ্রুতগামী.""
অন্য এক বর্ণনায় আবু হুরায়রা সূত্রেও উপরোক্ত হাদীসটি বিবৃত হয়েছে। [২] আল্লাহ তাআলাও সৌভাগ্যবান বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন ভয় ও শঙ্কা-মিশ্রিত নেক কাজ করার কথা বলে। আর দুর্ভাগা লোকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছেন গর্হিত কাজের কথা।
সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি
সাহাবায়ে কেরামের আল্লাহভীতি ও তাকওয়াপূর্ণ জীবনের দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি তাঁরা নেক আমলের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেও আল্লাহভীতির চূড়ান্ত স্তরে উপনীত ছিলেন। অথচ আমাদের আমলের এত দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা আল্লাহভীতি ও তাকওয়ার ন্যূনতম স্তরেও অবিচল থাকতে অক্ষম হয়ে যাই প্রায়শই।
আবু বকর -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের প্রথম খলীফা সায়্যিদুনা আবু বকর প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, 'হায়, আমি আবু বকর যদি কোনো মুমিন বান্দার শরীরের সামান্য একটা পশম হতাম!'
বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর জিহ্বাকে হাত দিয়ে ধরে টেনে বের করে বলতেন, 'এই এক অঙ্গ আমাকে ধ্বংসের নানা ঘাটে উপনীত করে।'
আবু বকর অধিক পরিমাণে কাঁদতেন। তিনি বলতেন, 'তোমরা বেশি বেশি কান্না করো। যদি তোমাদের কান্না না আসে তাহলে অন্তত কান্নার ভান করো।' তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন, আল্লাহর ভয়ের তীব্রতায় তাঁকে নিথর একখণ্ড কাঠের টুকরোর মতো মনে হতো।
একবার তাঁর কাছে একটি পাখি নিয়ে আসা হলে তিনি পাখিটিকে ধরে উপর-নিচ করে দেখলেন। এরপর বললেন, 'কোনো প্রাণীকে ততক্ষণ পর্যন্ত শিকার করা হয় না কিংবা কোনো গাছ ততক্ষণ পর্যন্ত কাটা হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই প্রাণী বা উদ্ভিদ আল্লাহর যিকির বন্ধ করে না দেয়।'
আবু বকর-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকাকে তিনি বললেন, 'বেটি! মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির মধ্য থেকে এই জামা আর দুধ-দোহানোর এই পাত্র এবং এই গোলামটি আমার কাছে আছে। এগুলো তুমি দ্রুত উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে পৌঁছে দাও।' এরপর বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমার ইচ্ছে হয়—আমি যদি কোনো বৃক্ষলতা হতাম! যদি আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলা হতো!'
কাতাদাহ বলেন, 'আমি শুনেছি, আবু বকর বলতেন, "হায়! আমি যদি কোনো বৃক্ষ হতাম! আমাকে যদি কোনো গবাদি পশু খেয়ে ফেলত!"'
উমর -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা সায়্যিদুনা উমর সূরা তুর তিলাওয়াত করতে করতে যখন নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন তখন আল্লাহর আযাবের ভয়ে এত অধিক পরিমাণে কান্না করলেন যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আয়াতটি ছিলো—
إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعُ
'নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের (প্রতিশ্রুত) শাস্তি ও আযাব অবধারিতভাবে বাস্তবায়িত হবে।।১]'
তিনি মৃত্যুশয্যায় যখন শায়িত ছিলেন, তখন নিজ সন্তানকে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে মাটিতে শোয়াও। আমার চেহারাও মাটিতে নামিয়ে দাও। হয়তো আমার রব আমার প্রতি রহম করবেন। হায়, তিনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, তাহলে তো আমি ধ্বংস হয়ে যাব।' এই কথা তিনবার বলতে না বলতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
রাতের বেলায় নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের নিজস্ব একটি রুটিন ছিল তাঁর। তিলাওয়াতের সময় যখন ভয়ের কোনো আয়াত সামনে আসত, তিনি এত বেশি পরিমাণে কান্না করতেন যে অসুস্থ হয়ে কয়েকদিন বাড়িতে থাকতেন। তখন লোকেরা রোগী দেখার নিয়তে তাঁর সাক্ষাতে আসত।
অধিক পরিমাণে অশ্রু প্রবাহের কারণে তাঁর চেহারায় কালো দুইটি দাগ পড়ে গিয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস একবার তাঁকে বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বারা মুসলিম সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছেন, গৌরবান্বিত করেছেন। আপনার হাতে অনেক নগরী গড়ে উঠেছে। ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে অনেক বিজয় অর্জিত হয়েছে।' উমর জবাব দিলেন, '(এই গুরু- দায়িত্ব থেকে) আমি এমনভাবে দায়মুক্ত হতে চাই যে, আমার কোনো প্রতিদানও থাকবে না, কোনো অপরাধও থাকবে না।'
উসমান-এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের তৃতীয় খলীফা সায়্যিদুনা উসমান ইবনু আফফান যখন কোনো কবরের সামনে দাঁড়াতেন, তখন কাঁদতে কাঁদতে মুখের দাড়ি পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলতেন। তিনি বলতেন, 'যদি জান্নাত-জাহান্নামের মাঝে আমার চূড়ান্ত আবাসস্থল কোথায় হবে তা জানার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে সেই মুহূর্তে আমার পরিণতি জানার আগেই আমি বালুকণায় মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেব।'
হযরত আলী -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের চতুর্থ খলীফা সায়্যিদুনা আলী আল্লাহ তাআলার ভয়ে অধিক পরিমাণে কান্না করতেন। দুই কারণে তাঁর ভয়ের মাত্রা বেড়ে যেত—দীর্ঘ আশা এবং প্রবৃত্তির আনুগত্য। তিনি বলতেন, 'বড় বড় আশা মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। আর নফসের আনুগত্য হক ও সত্য অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শুনে রাখো! দুনিয়া পিঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যাবে আর আখিরাত যতই দিন যাবে ততই তোমার সামনে আসবে। তোমরা দুনিয়ার পেছনে ছুটো না, সে অধরাই থেকে যাবে। তোমরা আখিরাতের কর্মী হও, তাঁর জন্য যাত্রা করো। আজ কাজের দিন, হিসাবের দিন নয়। আগামীকাল হিসাবের দিন, কাজের দিন নয়।'
আবু দারদা বলতেন, 'আমি নিজের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা বোধ করি, কিয়ামতের দিন যখন আমাকে বলা হবে, "আবু দারদা! দুনিয়ায় থাকতে তো তুমি আমল করেছ। আচ্ছা এখন তবে তোমার আমলের হিসাব দাও—কী কী আমল কীভাবে কীভাবে করেছ!""
তিনি বলতেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে তা যদি জানতে তাহলে তৃপ্তিভরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে। ছায়াদার শীতল ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যেতে। আর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কান্না করতে। হায়, আমার অন্তর তো চায় আমি বৃক্ষলতা হয়ে যাই আর আমাকে কোনো পশু-পাখি এসে খেয়ে ফেলুক!'
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ব্যাপারে বর্ণিত আছে, আল্লাহর ভয়ে তাঁর দুই চোখ থেকে এত অধিক পরিমাণ অশ্রু প্রবাহিত হতো যে, চোখের নিচে ফিতার মতো ধূসর বর্ণের লম্বা সরু দাগ বসে গিয়েছিল।
আবু যার গিফারী আক্ষেপ করে বলতেন, 'হায়! আমি যদি কোনো গাছ হতাম আর লোকে আমাকে কেটে ফেলত! আমার মন বলে, হায়! আমাকে যদি সৃষ্টিই না করা হতো!'
বর্ণিত আছে, প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁকে কিছু টাকা-পয়সা দেওয়া হলে তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে তো বকরি আছে, বকরির দুধ দোহন করে খেয়ে নেব। যাতায়াতের জন্য গৃহপালিত গাধা আছে। কিছু স্বাধীন লোক আছে, যারা কাজ করে দেয়। গায়ে দেয়ার মতো কম্বলও আছে। আর কিয়ামতের দিন এইসব জিনিসের যথাযথ হিসাব নিয়েই তো আমি শঙ্কিত। নতুন করে টাকা-পয়সা নিয়ে আর কী করব!'
তামীম আদ-দারী এক রাতে সূরা জাসিয়া তিলাওয়াত করছিলেন। তিলাওয়াত করতে করতে নিম্নোক্ত আয়াতে এলে বারবার আয়াতটি তিলাওয়াত করতে লাগলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। ফজর পর্যন্ত তাঁর এই অবস্থায়ই কাটল। আয়াতটি হলো-
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
'দুষ্কৃতিকারীগণ কি একথা ভেবে বসে আছে যে, আমি তাদেরকে ঐ ব্যক্তিদের মতো বানিয়ে দেব, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে! আর তাদের জন্ম ও মৃত্যু কি সমান হতে পারে? তাদের এসব দাবি কতই না নিকৃষ্ট!!১।
আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ বলতেন, 'আফসোস! আমি যদি একটি দুম্বা হতাম! আমাকে লোকজন জবাই করত! রান্না করে গোশত খেয়ে ফেলত! (তাহলে কিয়ামতের দিন আমাকে আর হিসাব দেয়া লাগত না!)'
দীর্ঘ এক কলেবর তৈরী হয়ে যাবে সাহাবাদের আল্লাহভীতির এই সমস্ত ঘটনা বলতে থাকলে। ইমাম বুখারী তাঁর বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ সহীহ বুখারীতে বলেন, 'মুমিন এই শঙ্কায় থাকে যে, হয়তো তার আমল বিফলে যাবে অথচ সে বুঝতেও পারবে না। ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, "আমি আমার কথার সাথে কাজের মিল খুঁজতে গেলেই নিজেকে মিথ্যুক মনে হওয়ার আশঙ্কা বোধ করি।”
ইবনু আবি মুলাইকাহ বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ৩০ জন সাহাবীকে দেখেছি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যপারে নিফাকীর ভয় করতেন। তাঁদের কাউকেই আমি এমন দাবি করতে শুনিনি যে, তিনি বলছেন, তাঁর ঈমান জিবরীল কিংবা মীকাঈল আলাইহিমাস সালামের মতো." [১]
থেকে বর্ণিত আছে, ভয় শুধুমাত্র মুমিন বান্দারাই করে। আর হাসান বসরী নিশ্চিন্ত মনে থাকে মুনাফিক।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আল্লাহর রাসূল আপনার কাছে মুনাফিকদের তালিকা বলার সময় আমার নামটি বলেছিলেন?' তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, আপনার নাম বলেননি। তবে আপনার পরে আমি এ ব্যাপারে আর কাউকেই কিছু বলব না।' ২

টিকাঃ
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াতক্রম: ৫৭-৬০
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩১৭৫
[১] সূরা তৃর, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] সূরা জাসিয়াহ, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] আল-মুখতাসার-১/১৯১
[২] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অনেক গোপন বিষয় জানিয়েছিলেন। এইজন্য তাঁর উপাধী হলো, سر الرسول -সিররুর রাসূল; রাসূলের একান্ত গোপন-জান্তা সাহাবী। তাঁর নিকট নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের নাম বলে দিয়েছিলেন। আল্লাহভীতি ও নিজের ঈমানের ব্যাপারে অত্যধিক সতর্ক থাকায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির পরে তাঁকে সেই মুনাফিকদের তালিকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছিলেন—তাঁর নাম সেই তালিকাভুক্ত কিনা!

📘 রূহের খোরাক > 📄 দুনিয়ার ধোঁকা

📄 দুনিয়ার ধোঁকা


সৃষ্টিজগতে সবচেয়ে মারাত্মক ধোঁকার বস্তু হলো দুনিয়া। এই ধোঁকা দ্রুততম সময়ে বান্দার পরকালের চিন্তাকে বিঘ্নিত করে তাকে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। বান্দা তখন মোহাবিষ্ট হয়ে পরকালকে ভুলে দুনিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। একপর্যায়ে সে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলতে থাকে—আরে! জাগতিক এই ভোগ- বিলাস তো এখনই উপস্থিত, নগদ! পরকালের জিন্দেগি, সে তো বিলম্বিত। বাকির খাতায় তোলা অনর্থক! আর যা কিছু তৎক্ষণাৎ ও নগদে পাওয়া যায় তা বাকি ও বিলম্বিত কিছুর চেয়ে উত্তমই হবে।
দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে কেউ এটাও বলে—নগদ ভোগবিলাস সামান্য পরিমাণও চলবে আমার। ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুত হিরে-মোতি-পান্নার দরকার নেই। এদের অনেকেই আবার বলে, চাকচিক্যময় দুনিয়ার প্রমোদবিলাস তো চোখের সামনেই সুনিশ্চিত! আর পরকালের আরাম-আয়েশ সন্দেহময়। তাহলে আমি নিশ্চিত প্রমোদবিলাসকে কীভাবে ছেড়ে দিই অনিশ্চিত সন্দিহান এক জীবনের আশায়!
দুনিয়ার আমোদ-ফুর্তিতে মত্ত এসব লোকের এমন মানসিকতা শয়তানের অন্যতম কুমন্ত্রণা বা মিথ্যে সান্ত্বনা। এদের দূরবস্থা তো অবলা পশুর চেয়েও শোচনীয়। অবলা প্রাণীরা যখন সামনে ক্ষতিকর কোনো কিছুর আভাষ পায় তখন তাদেরকে পেটানো হলেও তারা সামনে এগুতে ভয় পায়। আর এই লোকেরা তো ঈমানের নূরে আলোকিত হওয়ার পরেও এসব ভ্রান্ত চিন্তার কারণে বিনাশের পথে এগিয়ে যায়। যারা এইধরনের অবান্তর চিন্তা ধারণ করে আবার আল্লাহ রাসূল ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে তারা মূলত এই জগতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা। কেননা তারা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েও অদৃশ্য এক আঁধারে নিমজ্জিত।

📘 রূহের খোরাক > 📄 নগদ-বাকির হিসাব

📄 নগদ-বাকির হিসাব


এই শ্রেণির মানুষ এতটাই দুনিয়াগ্রস্ত যে সর্বদা নগদ-বাকির হিসাবে মত্ত। অথচ বিলম্বিত পরকালীন জীবনের তুলনায় হাতের কাছের এই দুনিয়ার জিন্দেগি কত তুচ্ছ, কত নীচু, তার খবর কি তারা রাখে! জীবনের জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যুর শেষ নিঃশ্বাস অবধি মানুষের যত শ্বাস-প্রশ্বাস আছে তা কি পরকালের একটি শ্বাসের সমান হতে পারে? একজন মুমিনের অন্তরে কি করে আসতে পারে এমনতর অবান্তর অহেতুক চিন্তা!
এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ আহমাদ তাঁর কালজয়ী হাদীসগ্রন্থ মুসনাদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস উল্লেখ করেছেন-
وَاللَّهُ مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ هَذِهِ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ ؟
'আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তো সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো। হাতের সাথে কতটুকু পানি উঠে আসে দুনিয়াপ্রেমীরা তা যেন লক্ষ করে।' (অর্থাৎ, কেউ যদি তার হাত সাগরের পানিতে ডুবায় তাহলে হাতে-লেগে-থাকা পানি হলো দুনিয়া, আর দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের সীমাহীন জলরাশি হলো আখিরাতের জীবন।) [১]
এই যখন দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা তখন পার্থিব জীবনকে নগদ সম্ভোগের বস্তু বলে ধোঁকা আর মিথ্যে প্রলোভনে আত্মতৃপ্ত হওয়া সবচেয়ে বড় বোকামি ও নিম্নস্তরের মূর্খতা। গোটা দুনিয়ার আয়ুষ্কালের অবস্থা যদি আখিরাতের তুলনায় সমুদ্রে-ভেজা-আঙুলে লেগে থাকা পানির মতো হয় তাহলে ব্যক্তিবিশেষ একেকজন মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালের সময়টুকু তো আরো তুচ্ছ, আরো গৌণ। জাগতিক জীবনের এই মূল্যায়ন একজন সুস্থ বিবেচকের সামনে থাকলে সে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষণকালের নগণ্য এই জীবনকে নগদ মনে করে এমনভাবে কখনোই প্রাধান্য দেবে না, যাতে সীমাহীন বিশালতায় ভরপুর আখিরাতের নিয়ামত থেকে সে বঞ্চিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৮০০৯

📘 রূহের খোরাক > 📄 আরেকটি অথর্ব চিন্তা

📄 আরেকটি অথর্ব চিন্তা


দুনিয়াকে নিশ্চিত আর পরকালকে অনিশ্চিত ভাবাটাও একটি অথর্ব চিন্তা। তাওহীদে বিশ্বাসী একজন মুমিন বান্দা যখন মহান আল্লাহ তাআলার ওয়াদা, নেক কাজের বিনিময়ের প্রতিশ্রুতি এবং পাপ কাজের শাস্তির চূড়ান্ত সতর্কতাকে সন্দেহাতীত সত্য মনে করবে তখন তার পক্ষে তুচ্ছ ও নশ্বর দুনিয়াকে অবিনশ্বর পরকালের উপর প্রাধান্য দেয়া সম্ভব হবে না। দুনিয়া সামনে উপস্থিত হওয়ায় এই জীবনাচারকে সুনিশ্চিত মনে করা আর পরকালের জীবনাচার সামান্য বিলম্বিত দেখে তাকে অনিশ্চিত মনে করার কোনো কারণই নেই। তাওহীদের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাসই বান্দাকে দুনিয়ার তুলনায় পরকালকে আরো বেশি অকাট্য ও সুনিশ্চিত ভাবতে শিক্ষা দেয়। নশ্বর দুনিয়ায় কত অসংখ্য প্রাণ দুনিয়ার এক লোকমা খাবার মুখে নেয়ার আগেই ঝরে যায় অথবা কথিত এই নিশ্চিত দুনিয়ার কতটুকু ভোগ-বিলাস বান্দার ভাগ্যে রয়েছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অজানাই থেকে যায়, কিন্তু এই জীবনাবসানের পর যেই অনন্ত আর অসীমের পথে বান্দার যাত্রা শুরু হয় সেই যাত্রা তো সকলের জন্য অকাট্যভাবেই নিশ্চিত ও অবধারিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00