📘 রূহের খোরাক > 📄 ক্ষমাপ্রাপ্তির ভরসায় আল্লাহ’র আদেশ-নিষেধকে অমান্য করা

📄 ক্ষমাপ্রাপ্তির ভরসায় আল্লাহ’র আদেশ-নিষেধকে অমান্য করা


কিছু মূর্খ লোক আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির আশায় নির্ভার থাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। ভাবনাহীন জীবনে তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ, হালাল ও হারামের সীমা অতিক্রম করতে থাকে ক্ষমা ও মার্জনার আশায়। নাফরমানি করতে গিয়ে তারা ভুলে যায় আল্লাহ তাআলা দয়ালু ক্ষমাশীল হওয়ার পাশাপাশি মহাপরাক্রমশালী ও যন্ত্রণাদায়ক আযাবদাতা। অপরাধীদেরকে পাকড়াও করতে তিনি কুণ্ঠিত হন না। আর তাঁর প্রেরিত শান্তি ও আযাবকে কেউ প্রতিহতও করতে পারে না।
মারূফ কারখী বলেন, 'তুমি যে-রবের আনুগত্য করতে পার না, তাঁর রহমতের আশা করা তোমার জন্য নিতান্তই লাঞ্চনা ও গ্লানিকর।'
কোনো এক আলিম মন্তব্য করেন- 'যেই মহান সত্তা দুনিয়াতে সামান্য কিছু দিরহাম চুরির শাস্তিস্বরূপ একটি অঙ্গ কেটে নেন, তুমি তার অবাধ্য হয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যেয়ো না। আবার এরকমও ভেবো না তোমার নাফরমানির জন্য দুনিয়ার অঙ্গহানির মতোই তিনি সহনীয় কোনো শাস্তি দেবেন। বরং প্রত্যেক অপরাধীর জন্যই কল্পনাতীত শাস্তি রয়েছে।'
একবার হাসান বসরী -কে বলা হলো, 'আপনি তো অনেক পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব, আপনাকে দীর্ঘ সময় ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখা যায়!' তিনি এর উত্তরে বলেন, 'আমার আশঙ্কা হয়, আমার এই আমলনামা কি না আবার ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়!'
তিনি প্রায়শই বলতেন, 'কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহর মাগফিরাতের আশায় উদাসীন অবস্থায় জীবন পার করে দেয়। এভাবে এক সময় তারা দুনিয়া থেকে তাওবা ছাড়াই বিদায় নেয়। তাদের কেউ কেউ তখন বলে, “আরে! আমি তো আমার রবের প্রতি সুধারণা রাখি। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।” অথচ সে তখনও মিথ্যা বলছে। সে যদি সত্যিই আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালো ধারণা রাখত তাহলে পুণ্যের কাজও করত।'

📘 রূহের খোরাক > 📄 সুধারণা নাকি ধোঁকা?

📄 সুধারণা নাকি ধোঁকা?


উল্লিখিত আলোচনায় মহান আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা আর ক্ষমাপ্রাপ্তির আশায় ধোঁকার মধ্যে থাকার বিষয়টি তো স্পষ্ট হলো। দৈনন্দিন কার্যাবলির মধ্যেও সচেতন থাকা আবশ্যক, আত্মপ্রবঞ্চনাকে যেন সুধারণা মনে করা না হয়। এখানে জেনে রাখা দরকার, নেক ও উত্তম কাজেই কেবল সুধারণা করা যায়। খারাপ ও গর্হিত কাজ করে আল্লাহর প্রতি সুধারণা করা এক প্রকারের ধোঁকা। মহান আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের সুধারণা বান্দাকে নেক কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে, কল্যাণ ও মঙ্গলের পথে উদ্বুদ্ধ করে। আর যেই পোষাকি সুধারণা বান্দাকে গুনাহের দিকে, আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয় তা আসলে আল্লাহর প্রতি কোনো সুধারণাই নয়। এই ধারণা এক প্রকারের ধোঁকা। বান্দা এই ধোঁকায় মিথ্যা প্রলোভনে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকে আর নিজের দুনিয়া-আখিরাতকে বিনাশ করতে থাকে।
বস্তুত আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখার অর্থ উত্তম প্রতিদানের আশা। অর্থাৎ সুধারণা হলো এক প্রকারের আশা-আকাঙ্ক্ষা। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা বান্দাকে মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করে। আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবাধ্য হওয়া থেকে বান্দাকে প্রবলভাবে বাধা দেয়। বান্দা সর্বদা নেক আমল, উত্তম ও কল্যাণের প্রতি আশাবাদী হয়ে থাকবে—এমন আশা ও আকাঙ্ক্ষাই হলো সুধারণা।
আর যদি বান্দার আশা ও আকাঙ্ক্ষা হয় গুনাহ ও অপরাধমূলক কাজকে ঘিরে তাহলে সেই আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে সুধারণা বলে ব্যক্ত করা যায় না। বরং এই আশা ও আকাঙ্ক্ষা হলো শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা।
একটি উদাহরণ
একজন ক্ষেতের মালিক তার ক্ষেতকে কেন্দ্র করে অনেক রকমের আশা করতে পারে। সে যখন ক্ষেতে ফসল রোপণ করে, চাষাবাদ শুরু করে তখন এই ক্ষেতের ফসলের আশায় সে হয়তো স্বপ্নের প্রাসাদও নির্মাণ করে ফেলে আকাঙ্ক্ষার ডানায় ভর করে। কিন্তু কোনো লোক যদি শুধুমাত্র ক্ষেতের জমির মালিক হওয়ার সুবাদেই জমিন থেকে ভরপুর ফসলের আশা করে, কিন্তু কোনো প্রকারের চাষাবাদ ও বীজ না বুনে, তাহলে মানুষের কাছে সে কি সবচেয়ে নিম্নস্তরের নির্বোধ ও বোকা বলে বিবেচিত হবে না?
একইভাবে বিয়ে ও স্ত্রী-সহবাস ব্যতীত একজন মানুষ সন্তান লাভের জন্য যতই তীব্র ও প্রবল আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করুক না কেন তার আশা ও আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে চিরকাল।
একই কথা ওই বান্দার জন্যও প্রযোজ্য, যে পরকালের সফলতা, আল্লাহর নৈকট্যের বুকভরা আশা নিয়ে বসে আছে কোনো প্রকারের নেক কাজ করা ব্যতীতই। মহান আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ মান্য করা ব্যতীত বান্দার আশা-আকাঙ্ক্ষা যতই শক্তিশালী ও দৃঢ় হোক না কেন তা শয়তানের ধোঁকা হয়ে মানব-জীবনে প্রবেশ করে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। কেননা, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার কারণেই মানুষের অন্তরে সত্যিকারের আখিরাতমুখী আশা ও আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ
'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত ও জিহাদ করেছে তারাই সত্যিকারার্থে আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করে।'
এই হলো কুরআনে বিবৃত আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রকৃত আশাবাদী বান্দাদের পরিচয়। অথচ যারা পার্থিব লোভ-লালসায় মোহগ্রস্থ হয়ে আছে তারা কিনা দাবি করে-আল্লাহর বিধানাবলি নষ্টকারী, অবাধ্য ও হারাম জীবনে লিপ্তরাই আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও রহমতের প্রকৃত আশাবাদী!

📘 রূহের খোরাক > 📄 মুমিনের আশা

📄 মুমিনের আশা


মুমিন বান্দার আশা ও আকাঙ্ক্ষায় তিনটি বিষয়ের মিশ্র অনুভূতি থাকবে।
কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা ও হৃদ্যতা থাকবে।
কাঙ্ক্ষিত বিষয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটি গোপন আশঙ্কা কাজ করবে তার অন্তরে।
কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জনের জন্য সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সে তার চেষ্টা-মেহনত অবিরাম চালিয়ে যাবে।
মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষায় যদি উল্লিখিত তিনটি অনুভূতির কোনো একটি অনুপস্থিত থাকে তাহলে সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা নিরেট কল্পবিলাসে পরিণত হয়। আশাবাদী প্রত্যেক ব্যক্তিই শঙ্কিত থাকে। আর মানুষের পথচলা যখন শঙ্কাময় হয় তখন সে সতর্কতা অবলম্বন করে কাঙ্ক্ষিত বস্তু হারিয়ে যাওয়ার উৎকণ্ঠায় দ্রুত গতিতে পথ চলতে থাকে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে তিরমিযী'র বর্ণনা, আল্লাহর রাসূল বলেন-
'যে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকে, সে দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই রাতের প্রথম প্রহরে যাত্রা শুরু করে দেয়। আর যে এভাবে রাতের আঁধারেই যাত্রা শুরু করে সে তার গন্তব্যে পৌঁছুতে সক্ষম হয়। শুনে রাখো! আল্লাহ তাআলার দেয়া পাথেয় খুবই মূল্যবান। শুনে রাখো! আল্লাহ তাআলার দেয়া (সবচেয়ে দামি) পণ্য হলো জান্নাত।' [১]
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ هُمْ مِنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُشْفِقُونَ (٥٧) وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ (٥٨) وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُونَ (٥٩) وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ (٦٠)

টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৪৫০

📘 রূহের খোরাক > 📄 সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি

📄 সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি


أُولَئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ
'নিশ্চয় যারা তাদের প্রতিপালকের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে, যারা তাদের রবের কথাকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করে এবং যারা তাদের প্রাপ্ত সম্পদ থেকে শঙ্কিত ও কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান-সাদাকাহ করে যে, তারা তো অবধারিতভাবে তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে। এরাই কল্যাণের পথে দ্রুত ছুটে যায় এবং থাকে অগ্রগামী। [১]
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে সুনানুত তিরমিযী'র বর্ণনা, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসূল-এর কাছে আমি এই আয়াত সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এই ব্যক্তিরা কি মদপান, ব্যভিচার এবং চৌর্যবিত্ততে অভ্যস্ত?” আল্লাহর রাসূল তখন উত্তরে বলেন, "সিদ্দীকের কন্যা! বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা নিয়মিত নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দান-সাদাকাহ করে। তবে তারা এই আশঙ্কাও বোধ করে, হয়তো তাদের এই নেক আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এজন্য এরাই হলো প্রকৃতপক্ষে কল্যাণের পথে দ্রুতগামী.""
অন্য এক বর্ণনায় আবু হুরায়রা সূত্রেও উপরোক্ত হাদীসটি বিবৃত হয়েছে। [২] আল্লাহ তাআলাও সৌভাগ্যবান বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন ভয় ও শঙ্কা-মিশ্রিত নেক কাজ করার কথা বলে। আর দুর্ভাগা লোকদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছেন গর্হিত কাজের কথা।
সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহভীতি
সাহাবায়ে কেরামের আল্লাহভীতি ও তাকওয়াপূর্ণ জীবনের দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি তাঁরা নেক আমলের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেও আল্লাহভীতির চূড়ান্ত স্তরে উপনীত ছিলেন। অথচ আমাদের আমলের এত দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা আল্লাহভীতি ও তাকওয়ার ন্যূনতম স্তরেও অবিচল থাকতে অক্ষম হয়ে যাই প্রায়শই।
আবু বকর -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের প্রথম খলীফা সায়্যিদুনা আবু বকর প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, 'হায়, আমি আবু বকর যদি কোনো মুমিন বান্দার শরীরের সামান্য একটা পশম হতাম!'
বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর জিহ্বাকে হাত দিয়ে ধরে টেনে বের করে বলতেন, 'এই এক অঙ্গ আমাকে ধ্বংসের নানা ঘাটে উপনীত করে।'
আবু বকর অধিক পরিমাণে কাঁদতেন। তিনি বলতেন, 'তোমরা বেশি বেশি কান্না করো। যদি তোমাদের কান্না না আসে তাহলে অন্তত কান্নার ভান করো।' তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন, আল্লাহর ভয়ের তীব্রতায় তাঁকে নিথর একখণ্ড কাঠের টুকরোর মতো মনে হতো।
একবার তাঁর কাছে একটি পাখি নিয়ে আসা হলে তিনি পাখিটিকে ধরে উপর-নিচ করে দেখলেন। এরপর বললেন, 'কোনো প্রাণীকে ততক্ষণ পর্যন্ত শিকার করা হয় না কিংবা কোনো গাছ ততক্ষণ পর্যন্ত কাটা হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই প্রাণী বা উদ্ভিদ আল্লাহর যিকির বন্ধ করে না দেয়।'
আবু বকর-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকাকে তিনি বললেন, 'বেটি! মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির মধ্য থেকে এই জামা আর দুধ-দোহানোর এই পাত্র এবং এই গোলামটি আমার কাছে আছে। এগুলো তুমি দ্রুত উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে পৌঁছে দাও।' এরপর বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমার ইচ্ছে হয়—আমি যদি কোনো বৃক্ষলতা হতাম! যদি আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলা হতো!'
কাতাদাহ বলেন, 'আমি শুনেছি, আবু বকর বলতেন, "হায়! আমি যদি কোনো বৃক্ষ হতাম! আমাকে যদি কোনো গবাদি পশু খেয়ে ফেলত!"'
উমর -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা সায়্যিদুনা উমর সূরা তুর তিলাওয়াত করতে করতে যখন নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন তখন আল্লাহর আযাবের ভয়ে এত অধিক পরিমাণে কান্না করলেন যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আয়াতটি ছিলো—
إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعُ
'নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের (প্রতিশ্রুত) শাস্তি ও আযাব অবধারিতভাবে বাস্তবায়িত হবে।।১]'
তিনি মৃত্যুশয্যায় যখন শায়িত ছিলেন, তখন নিজ সন্তানকে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে মাটিতে শোয়াও। আমার চেহারাও মাটিতে নামিয়ে দাও। হয়তো আমার রব আমার প্রতি রহম করবেন। হায়, তিনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, তাহলে তো আমি ধ্বংস হয়ে যাব।' এই কথা তিনবার বলতে না বলতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
রাতের বেলায় নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের নিজস্ব একটি রুটিন ছিল তাঁর। তিলাওয়াতের সময় যখন ভয়ের কোনো আয়াত সামনে আসত, তিনি এত বেশি পরিমাণে কান্না করতেন যে অসুস্থ হয়ে কয়েকদিন বাড়িতে থাকতেন। তখন লোকেরা রোগী দেখার নিয়তে তাঁর সাক্ষাতে আসত।
অধিক পরিমাণে অশ্রু প্রবাহের কারণে তাঁর চেহারায় কালো দুইটি দাগ পড়ে গিয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস একবার তাঁকে বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বারা মুসলিম সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছেন, গৌরবান্বিত করেছেন। আপনার হাতে অনেক নগরী গড়ে উঠেছে। ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে অনেক বিজয় অর্জিত হয়েছে।' উমর জবাব দিলেন, '(এই গুরু- দায়িত্ব থেকে) আমি এমনভাবে দায়মুক্ত হতে চাই যে, আমার কোনো প্রতিদানও থাকবে না, কোনো অপরাধও থাকবে না।'
উসমান-এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের তৃতীয় খলীফা সায়্যিদুনা উসমান ইবনু আফফান যখন কোনো কবরের সামনে দাঁড়াতেন, তখন কাঁদতে কাঁদতে মুখের দাড়ি পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলতেন। তিনি বলতেন, 'যদি জান্নাত-জাহান্নামের মাঝে আমার চূড়ান্ত আবাসস্থল কোথায় হবে তা জানার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে সেই মুহূর্তে আমার পরিণতি জানার আগেই আমি বালুকণায় মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেব।'
হযরত আলী -এর আল্লাহভীতি
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী, ইসলামের চতুর্থ খলীফা সায়্যিদুনা আলী আল্লাহ তাআলার ভয়ে অধিক পরিমাণে কান্না করতেন। দুই কারণে তাঁর ভয়ের মাত্রা বেড়ে যেত—দীর্ঘ আশা এবং প্রবৃত্তির আনুগত্য। তিনি বলতেন, 'বড় বড় আশা মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। আর নফসের আনুগত্য হক ও সত্য অনুধাবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শুনে রাখো! দুনিয়া পিঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যাবে আর আখিরাত যতই দিন যাবে ততই তোমার সামনে আসবে। তোমরা দুনিয়ার পেছনে ছুটো না, সে অধরাই থেকে যাবে। তোমরা আখিরাতের কর্মী হও, তাঁর জন্য যাত্রা করো। আজ কাজের দিন, হিসাবের দিন নয়। আগামীকাল হিসাবের দিন, কাজের দিন নয়।'
আবু দারদা বলতেন, 'আমি নিজের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা বোধ করি, কিয়ামতের দিন যখন আমাকে বলা হবে, "আবু দারদা! দুনিয়ায় থাকতে তো তুমি আমল করেছ। আচ্ছা এখন তবে তোমার আমলের হিসাব দাও—কী কী আমল কীভাবে কীভাবে করেছ!""
তিনি বলতেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে তা যদি জানতে তাহলে তৃপ্তিভরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে। ছায়াদার শীতল ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চলে যেতে। আর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কান্না করতে। হায়, আমার অন্তর তো চায় আমি বৃক্ষলতা হয়ে যাই আর আমাকে কোনো পশু-পাখি এসে খেয়ে ফেলুক!'
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ব্যাপারে বর্ণিত আছে, আল্লাহর ভয়ে তাঁর দুই চোখ থেকে এত অধিক পরিমাণ অশ্রু প্রবাহিত হতো যে, চোখের নিচে ফিতার মতো ধূসর বর্ণের লম্বা সরু দাগ বসে গিয়েছিল।
আবু যার গিফারী আক্ষেপ করে বলতেন, 'হায়! আমি যদি কোনো গাছ হতাম আর লোকে আমাকে কেটে ফেলত! আমার মন বলে, হায়! আমাকে যদি সৃষ্টিই না করা হতো!'
বর্ণিত আছে, প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁকে কিছু টাকা-পয়সা দেওয়া হলে তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে তো বকরি আছে, বকরির দুধ দোহন করে খেয়ে নেব। যাতায়াতের জন্য গৃহপালিত গাধা আছে। কিছু স্বাধীন লোক আছে, যারা কাজ করে দেয়। গায়ে দেয়ার মতো কম্বলও আছে। আর কিয়ামতের দিন এইসব জিনিসের যথাযথ হিসাব নিয়েই তো আমি শঙ্কিত। নতুন করে টাকা-পয়সা নিয়ে আর কী করব!'
তামীম আদ-দারী এক রাতে সূরা জাসিয়া তিলাওয়াত করছিলেন। তিলাওয়াত করতে করতে নিম্নোক্ত আয়াতে এলে বারবার আয়াতটি তিলাওয়াত করতে লাগলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। ফজর পর্যন্ত তাঁর এই অবস্থায়ই কাটল। আয়াতটি হলো-
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
'দুষ্কৃতিকারীগণ কি একথা ভেবে বসে আছে যে, আমি তাদেরকে ঐ ব্যক্তিদের মতো বানিয়ে দেব, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে! আর তাদের জন্ম ও মৃত্যু কি সমান হতে পারে? তাদের এসব দাবি কতই না নিকৃষ্ট!!১।
আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ বলতেন, 'আফসোস! আমি যদি একটি দুম্বা হতাম! আমাকে লোকজন জবাই করত! রান্না করে গোশত খেয়ে ফেলত! (তাহলে কিয়ামতের দিন আমাকে আর হিসাব দেয়া লাগত না!)'
দীর্ঘ এক কলেবর তৈরী হয়ে যাবে সাহাবাদের আল্লাহভীতির এই সমস্ত ঘটনা বলতে থাকলে। ইমাম বুখারী তাঁর বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ সহীহ বুখারীতে বলেন, 'মুমিন এই শঙ্কায় থাকে যে, হয়তো তার আমল বিফলে যাবে অথচ সে বুঝতেও পারবে না। ইবরাহীম আত-তাইমী বলেন, "আমি আমার কথার সাথে কাজের মিল খুঁজতে গেলেই নিজেকে মিথ্যুক মনে হওয়ার আশঙ্কা বোধ করি।”
ইবনু আবি মুলাইকাহ বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ৩০ জন সাহাবীকে দেখেছি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যপারে নিফাকীর ভয় করতেন। তাঁদের কাউকেই আমি এমন দাবি করতে শুনিনি যে, তিনি বলছেন, তাঁর ঈমান জিবরীল কিংবা মীকাঈল আলাইহিমাস সালামের মতো." [১]
থেকে বর্ণিত আছে, ভয় শুধুমাত্র মুমিন বান্দারাই করে। আর হাসান বসরী নিশ্চিন্ত মনে থাকে মুনাফিক।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আল্লাহর রাসূল আপনার কাছে মুনাফিকদের তালিকা বলার সময় আমার নামটি বলেছিলেন?' তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, আপনার নাম বলেননি। তবে আপনার পরে আমি এ ব্যাপারে আর কাউকেই কিছু বলব না।' ২

টিকাঃ
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াতক্রম: ৫৭-৬০
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩১৭৫
[১] সূরা তৃর, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] সূরা জাসিয়াহ, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] আল-মুখতাসার-১/১৯১
[২] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অনেক গোপন বিষয় জানিয়েছিলেন। এইজন্য তাঁর উপাধী হলো, سر الرسول -সিররুর রাসূল; রাসূলের একান্ত গোপন-জান্তা সাহাবী। তাঁর নিকট নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের নাম বলে দিয়েছিলেন। আল্লাহভীতি ও নিজের ঈমানের ব্যাপারে অত্যধিক সতর্ক থাকায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির পরে তাঁকে সেই মুনাফিকদের তালিকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছিলেন—তাঁর নাম সেই তালিকাভুক্ত কিনা!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00