📘 রূহের খোরাক > 📄 সুধারণা ও এক ধরনের নেক আমল

📄 সুধারণা ও এক ধরনের নেক আমল


একটু খেয়াল করলেই আমরা বুঝতে পারি আল্লাহর প্রতি সুধারণাও এক প্রকারের নেক আমল। আল্লাহর প্রতি বান্দার উত্তম ধারণাই বান্দাকে নেক ও সৎ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বান্দা যখন তার রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করবে, সে চিন্তা করবে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতিটি সৎ ও নেক কাজ কবুল করবেন, বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দেবেন। এই নির্মল চিন্তা তাকে যত বেশি আচ্ছাদিত করবে সে ততই ভালো ও কল্যাণের পথে ছুটতে থাকবে। অন্তরে আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ রেখে কখনোই নফসের গোলামী বা প্রবৃত্তির মনোবাসনা পূরণ করা সম্ভব নয়।
শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেন-
الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنِ اتَّبَعَ نَفْسَهُ وَهَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
'প্রকৃত বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তিকে চিনতে পেরেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী-জীবনের জন্য কাজ করে যায়। অক্ষম, অকর্মণ্য ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে নফসের কথামতো চলে আর আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আকাশ-কুসুম কল্পনা করে (যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন)।' [১]
মোটকথা, আল্লাহর প্রতি বান্দার সুধারণা নেক ও সৎ কাজের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। আর নিজের ধ্বংস ও বরবাদির উপকরণ; গুনাহের জিন্দেগিতে থেকে আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা সম্ভব নয়।

টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৪৫৯

📘 রূহের খোরাক > 📄 সত্যিকারের সুধারণা বনাম নফসের ধোঁকা

📄 সত্যিকারের সুধারণা বনাম নফসের ধোঁকা


কেউ হয়তো চিন্তা করতে পারে, খারাপ কাজে লিপ্ত ব্যক্তির অন্তরেও তো আল্লাহর প্রতি নেক ধারণা থাকতে পারে। কেউ নিজে হয়তো গুনাহের কাজ করে কিন্তু সে আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত রহমত, মাগফিরাত ও মহানুভবতার গুণাবলির দিকে তাকিয়ে আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে। আল্লাহ তাআলা তো হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেছেন, 'আমার অনুকম্পা ও দয়া আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে।'[১]
বান্দার কৃতকর্মের কারণে শাস্তি দিলে তো আল্লাহর কোনো লাভ নেই, ক্ষমা করে দিলেও কোনো ক্ষতি নেই—এই ধরনের অবান্তর চিন্তায় হয়তো অনেকেই প্রভাবিত থাকতে পারে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।
বস্তুত তাদের চিন্তাটি সঠিক নয়। কেননা এ ধরনের বিকৃত সুধারণা মানুষ কেবল চিন্তার ভ্রষ্টতা ও নফসের ধোঁকায় পড়লেই করতে পারে। একথা তো অবশ্যই সত্য যে, আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। এমনকি বান্দার চিন্তারও বাইরে বিস্তৃত আল্লাহ তাআলার এ সকল গুণাবলি।
তবে আল্লাহর এসব মার্জনামূলক গুণাবলির নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা হলেন সর্বোত্তম ন্যায়পরায়ণ ও প্রজ্ঞাবান। একইসাথে তিনি সর্বোচ্চ কঠোর, রূঢ় ও আক্রোশাত্মক গুণধরও। আল্লাহ তাআলার এই রূঢ় গুণাবলির প্রত্যেকটিরই ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন।
মুত্তাকী, নেককার ও ভালোমানুষদের সাথে আল্লাহ তাআলার দয়া ও মার্জনার আচরণ এবং বদকার, ফাসিক ও গুনাহগারদের সাথে রূঢ় ও রুক্ষ আচরণই তাঁর ন্যায়পরায়ণতার স্বাক্ষর।
সুতরাং যারা সুধারণার ধোঁকায় পড়ে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করে করে জীবনযাপন করছে তাদের এই জীর্ণ চিন্তার দাবি হলো, আল্লাহ তাআলার দরবারে মুমিন, আনুগত্যশীল, তাওবাকারী এবং কাফির, ফাসেক, অননুতপ্ত—সকলেই ক্ষমাপ্রাপ্ত।
অথচ আল্লাহ তাআলার সকল গুণাবলির ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের কারণে প্রত্যেক বান্দাই তাদের কর্মের ফল ভোগ করবে এবং মহান সত্তার এমন রূপ ও আচরণই তারা প্রত্যক্ষ করবে যা তাদের কর্মজীবনের জন্য উপযোগী। বস্তুত অন্যায় ও অপরাধপ্রবণতাকে বৈধতা দেয়ার জন্যই মানুষ নফসের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারণা রাখার বুলি আওড়াতে থাকে। আর জ্ঞানী ও বিচক্ষণ বান্দারা আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারণা ও ক্ষমা-মার্জনার সুবিশাল আশার প্রদীপকে জীবনের যথাস্থানে স্থাপন করে আরো অধিক পরিমাণে নেক কাজ করতে থাকে। পক্ষান্তরে জাহিল-অজ্ঞ লোকেরা সেই সুধারণাকে নফসের ধোঁকায় পড়ে যথাস্থানে স্থাপন করতে না পেরে মিথ্যা সান্ত্বনায় জীবন পার করে দেয়।

টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৭১১৪

📘 রূহের খোরাক > 📄 ক্ষমাপ্রাপ্তির ভরসায় আল্লাহ’র আদেশ-নিষেধকে অমান্য করা

📄 ক্ষমাপ্রাপ্তির ভরসায় আল্লাহ’র আদেশ-নিষেধকে অমান্য করা


কিছু মূর্খ লোক আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্তির আশায় নির্ভার থাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। ভাবনাহীন জীবনে তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ, হালাল ও হারামের সীমা অতিক্রম করতে থাকে ক্ষমা ও মার্জনার আশায়। নাফরমানি করতে গিয়ে তারা ভুলে যায় আল্লাহ তাআলা দয়ালু ক্ষমাশীল হওয়ার পাশাপাশি মহাপরাক্রমশালী ও যন্ত্রণাদায়ক আযাবদাতা। অপরাধীদেরকে পাকড়াও করতে তিনি কুণ্ঠিত হন না। আর তাঁর প্রেরিত শান্তি ও আযাবকে কেউ প্রতিহতও করতে পারে না।
মারূফ কারখী বলেন, 'তুমি যে-রবের আনুগত্য করতে পার না, তাঁর রহমতের আশা করা তোমার জন্য নিতান্তই লাঞ্চনা ও গ্লানিকর।'
কোনো এক আলিম মন্তব্য করেন- 'যেই মহান সত্তা দুনিয়াতে সামান্য কিছু দিরহাম চুরির শাস্তিস্বরূপ একটি অঙ্গ কেটে নেন, তুমি তার অবাধ্য হয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যেয়ো না। আবার এরকমও ভেবো না তোমার নাফরমানির জন্য দুনিয়ার অঙ্গহানির মতোই তিনি সহনীয় কোনো শাস্তি দেবেন। বরং প্রত্যেক অপরাধীর জন্যই কল্পনাতীত শাস্তি রয়েছে।'
একবার হাসান বসরী -কে বলা হলো, 'আপনি তো অনেক পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব, আপনাকে দীর্ঘ সময় ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখা যায়!' তিনি এর উত্তরে বলেন, 'আমার আশঙ্কা হয়, আমার এই আমলনামা কি না আবার ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়!'
তিনি প্রায়শই বলতেন, 'কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহর মাগফিরাতের আশায় উদাসীন অবস্থায় জীবন পার করে দেয়। এভাবে এক সময় তারা দুনিয়া থেকে তাওবা ছাড়াই বিদায় নেয়। তাদের কেউ কেউ তখন বলে, “আরে! আমি তো আমার রবের প্রতি সুধারণা রাখি। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।” অথচ সে তখনও মিথ্যা বলছে। সে যদি সত্যিই আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালো ধারণা রাখত তাহলে পুণ্যের কাজও করত।'

📘 রূহের খোরাক > 📄 সুধারণা নাকি ধোঁকা?

📄 সুধারণা নাকি ধোঁকা?


উল্লিখিত আলোচনায় মহান আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা আর ক্ষমাপ্রাপ্তির আশায় ধোঁকার মধ্যে থাকার বিষয়টি তো স্পষ্ট হলো। দৈনন্দিন কার্যাবলির মধ্যেও সচেতন থাকা আবশ্যক, আত্মপ্রবঞ্চনাকে যেন সুধারণা মনে করা না হয়। এখানে জেনে রাখা দরকার, নেক ও উত্তম কাজেই কেবল সুধারণা করা যায়। খারাপ ও গর্হিত কাজ করে আল্লাহর প্রতি সুধারণা করা এক প্রকারের ধোঁকা। মহান আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের সুধারণা বান্দাকে নেক কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে, কল্যাণ ও মঙ্গলের পথে উদ্বুদ্ধ করে। আর যেই পোষাকি সুধারণা বান্দাকে গুনাহের দিকে, আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয় তা আসলে আল্লাহর প্রতি কোনো সুধারণাই নয়। এই ধারণা এক প্রকারের ধোঁকা। বান্দা এই ধোঁকায় মিথ্যা প্রলোভনে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকে আর নিজের দুনিয়া-আখিরাতকে বিনাশ করতে থাকে।
বস্তুত আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখার অর্থ উত্তম প্রতিদানের আশা। অর্থাৎ সুধারণা হলো এক প্রকারের আশা-আকাঙ্ক্ষা। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা বান্দাকে মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ আনুগত্যের দিকে পরিচালিত করে। আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবাধ্য হওয়া থেকে বান্দাকে প্রবলভাবে বাধা দেয়। বান্দা সর্বদা নেক আমল, উত্তম ও কল্যাণের প্রতি আশাবাদী হয়ে থাকবে—এমন আশা ও আকাঙ্ক্ষাই হলো সুধারণা।
আর যদি বান্দার আশা ও আকাঙ্ক্ষা হয় গুনাহ ও অপরাধমূলক কাজকে ঘিরে তাহলে সেই আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে সুধারণা বলে ব্যক্ত করা যায় না। বরং এই আশা ও আকাঙ্ক্ষা হলো শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা।
একটি উদাহরণ
একজন ক্ষেতের মালিক তার ক্ষেতকে কেন্দ্র করে অনেক রকমের আশা করতে পারে। সে যখন ক্ষেতে ফসল রোপণ করে, চাষাবাদ শুরু করে তখন এই ক্ষেতের ফসলের আশায় সে হয়তো স্বপ্নের প্রাসাদও নির্মাণ করে ফেলে আকাঙ্ক্ষার ডানায় ভর করে। কিন্তু কোনো লোক যদি শুধুমাত্র ক্ষেতের জমির মালিক হওয়ার সুবাদেই জমিন থেকে ভরপুর ফসলের আশা করে, কিন্তু কোনো প্রকারের চাষাবাদ ও বীজ না বুনে, তাহলে মানুষের কাছে সে কি সবচেয়ে নিম্নস্তরের নির্বোধ ও বোকা বলে বিবেচিত হবে না?
একইভাবে বিয়ে ও স্ত্রী-সহবাস ব্যতীত একজন মানুষ সন্তান লাভের জন্য যতই তীব্র ও প্রবল আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করুক না কেন তার আশা ও আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে চিরকাল।
একই কথা ওই বান্দার জন্যও প্রযোজ্য, যে পরকালের সফলতা, আল্লাহর নৈকট্যের বুকভরা আশা নিয়ে বসে আছে কোনো প্রকারের নেক কাজ করা ব্যতীতই। মহান আল্লাহর আদেশ পালন ও নিষেধ মান্য করা ব্যতীত বান্দার আশা-আকাঙ্ক্ষা যতই শক্তিশালী ও দৃঢ় হোক না কেন তা শয়তানের ধোঁকা হয়ে মানব-জীবনে প্রবেশ করে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। কেননা, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার কারণেই মানুষের অন্তরে সত্যিকারের আখিরাতমুখী আশা ও আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ يَرْجُونَ رَحْمَةَ اللَّهِ
'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত ও জিহাদ করেছে তারাই সত্যিকারার্থে আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করে।'
এই হলো কুরআনে বিবৃত আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রকৃত আশাবাদী বান্দাদের পরিচয়। অথচ যারা পার্থিব লোভ-লালসায় মোহগ্রস্থ হয়ে আছে তারা কিনা দাবি করে-আল্লাহর বিধানাবলি নষ্টকারী, অবাধ্য ও হারাম জীবনে লিপ্তরাই আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও রহমতের প্রকৃত আশাবাদী!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00