📘 রূহের খোরাক > 📄 ক্ষমাপ্রার্থনার আশায় মানুষ প্রবঞ্চনার শিকার হয়

📄 ক্ষমাপ্রার্থনার আশায় মানুষ প্রবঞ্চনার শিকার হয়


জগতে অনেক মানুষই চিন্তা করে থাকে, আমি সময়-সুযোগ-মতো আল্লাহর নিকট 'ইস্তিগফার' পাঠ করে আমার যথেচ্ছ কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করে নেব। ইস্তিগফারের কারণে আমি গুনাহমুক্ত জীবন ফিরে পাব। কোনো সন্দেহ নেই, তারা এক স্পষ্ট ভ্রান্তির গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন—আমাকে নামধারী একজন ফকীহ বললেন, 'আমি তো যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াই। তারপর আমি ১০০ বার সুবহানাল্লাহু ও ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করি, এতে আমার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আর নবীজি থেকেও এমনই বর্ণিত হয়েছে— "যেদিন কেউ ১০০ বার সুবহানাল্লাহ ও ১০০ আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে, তার সেদিনের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে; এমনকি তার গুনাহের পরিমাণ সাগরের ফেনার মতো অগণিত হলেও।" [১]
মক্কার কোনো এক লোক আমাকে একবার বলেছিল, 'আমাদের কেউ যখন মন-চাহিদা কাজ করতে গিয়ে গুনাহ করে বসে এরপর সে গোসল করে সাত বার কাবা শরীফ তাওয়াফ করে নেয় তখন তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।' এই প্রকৃতির আরেকজন আমাকে একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীসও শুনিয়েছিল যে, 'বান্দা যত গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহ তো মাফ করে দেবেনই। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— "আল্লাহর কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর নিকট এই বলে ফরিয়াদ করে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো একটি ভুল করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করুন!' তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে কিছুদিন পর আবার কোনো গুনাহ করে সে আবারও আল্লাহর নিকট একইভাবে বলে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন!' বান্দার এই আচরণে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার এই বান্দা জানে তার একজন প্রতিপালক আছেন। যে কখনো গুনাহকে ক্ষমা করে দেন আবার কখনো গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। আমি আমার এই বান্দার গুনাহকে মাফ করে দিলাম।'"'
লোকটি আমাকে হাদীসটি শুনিয়ে বলল, 'যেই আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন তাঁর ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় না যে, তিনি আবার সেই গুনাহের শাস্তিও দেবেন।' [১]
এই শ্রেণির লোকেরা মূলত কুরআন ও হাদীসের আশাব্যঞ্জক বাণীসমূহকে নিজেদের জীবনধারণের সাথে শক্তভাবে জড়িয়ে রেখেছে। নির্ভার হয়ে তারা দুই হাত প্রসারিত করে শুধুমাত্র ক্ষমা ও মহানুভবতার ঘোষণাকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে গ্রহণ করে নিয়েছে। মহাপরাক্রমশালীর শাস্তি ও পাপাচারের ভয়-ভীতিকে তারা উপেক্ষা করে দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহকে জীবনের মানসপটে বসিয়ে রেখে যথেচ্ছ জীবনধারাকে বেছে নিয়েছে। কখনো যদি তাদেরকে ভুল কিংবা অপরাধের জন্য ভর্ৎসনা করা হয় তাহলে তারা অনুশোচনার বদলে আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত রহমত ও দয়ার মহত্ব, ক্ষমার উদারতা ও আশার বাণীর এক পসরা মেলে ধরে। এই বিভ্রান্ত চিন্তাজগতে এধরনের নির্বোধ লোকদের অনেক অদ্ভূত ও বিস্ময়কর কারনামা প্রকাশ পেয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ তো কবিতাও রচনা করে বসেছে-
'যখন তুমি মহানুভব সত্তার রাজদরবারে উপস্থিত হচ্ছো, তাহলে এই সুযোগে যত ইচ্ছা হয় ভুল করে নাও। (কারণ তোমাকে তো তিনি ক্ষমা করে দেবেনই)।'
আবার আরেক দল বলে বেড়ায়, আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত ক্ষমার মহত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ গুনাহ থেকে দূরে থাকে।
কেউ কেউ বলে, গুনাহ না করা আল্লাহর ক্ষমাগুণের বিপরীতে একধরনের দুঃসাহস প্রদর্শন।
মুহাম্মদ ইবনু হাযাম বলেন, 'আমি এই নির্বোধদেরকে এমনও দুআ করতে শুনেছি যে, তারা দুআ করছে-“আল্লাহ! আমি আপনার নিকট গুনাহমুক্ত জীবন থেকে পানাহ চাই।”

টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৬৮
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৫৮

📘 রূহের খোরাক > 📄 নেক ও সৎকর্মের প্রতি অন্তর্ভুক্ত

📄 নেক ও সৎকর্মের প্রতি অন্তর্ভুক্ত


মতিভ্রম এই লোকদের কেউ আবার পীর, মাশায়েখ, দরবেশ কিংবা প্রসিদ্ধ কোনো বিজ্ঞ আলিমের প্রতি অন্ধভক্তির কারণে এক অলৌকিক শক্তিবলে গুনাহ-মাফের নিশ্চয়তা নিয়ে দিনাতিপাত করে। প্রয়াত পীর মাশায়েখ বা বুযুর্গদের কবরে এরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে থাকে। দুআর মধ্যে তাঁদের কথা স্মরণ করে, তাঁদের নামের উসীলা গ্রহণ ও সুপারিশের আশাকে পুঁজি করে তারা তাদের পাপ-পঙ্কিল জীবনেও ভাবনাহীন থাকে।
কেউ আবার তাঁদের পূর্বপুরুষ, নিজ পিতা বা পিতামহের তাকওয়া, খোদাভীতি দুনিয়াবিমুখতার কথা স্মরণ করে নিজের জীবন সম্পর্কে ধোঁকার মধ্যে থাকে। তারা মনে করে তাদের পূর্বপুরুষদের কারণে আল্লাহ তাআলার নিকট তাদেরও বিশেষ মর্যাদা আছে। তাই তারা নিজেদের মুক্তির জন্য, গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করার প্রয়োজন মনে করে না। যেমনটা জাগতিক রাজা-বাদশাহদের দরবারে দেখা যায়। ক্ষমতাবান রাজা-বাদশাহদের নিকটস্থ ব্যক্তিদের সন্তানরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তখন তারা তাদের বাপ-দাদা বা পরিচিত লোকদের কারণে, তাদের পদমর্যাদায়, সুপারিশে রাজদরবারে নিরপরাধীর মতোই আসা-যাওয়া করতে পারে। তাদের অপরাধকে ক্ষমার চোখে দেখা যায়।

📘 রূহের খোরাক > 📄 আল্লাহ তাআলার ব্যাপারেও তারা ধোঁকার মধ্যে থাকে

📄 আল্লাহ তাআলার ব্যাপারেও তারা ধোঁকার মধ্যে থাকে


এই নির্বোধ লোকদের কেউ আবার আল্লাহ তাআলার ব্যাপারেও ধোঁকার মধ্যে থাকে। তারা এক অবান্তর চিন্তায় পথভ্রষ্ট হয়। তারা মনে করে, আল্লাহ তাআলা তো বান্দাদেরকে শাস্তি দেওয়ার মুখাপেক্ষী নন। বান্দাদেরকে শাস্তি প্রদান করলে তাঁর রাজত্বের কোনো লাভ নেই। আবার বান্দার প্রতি রহম করলেও তাঁর রাজত্বের কোনো কমতি নেই।
এই শ্রেণির মানুষের ধারণা-আমি তো তাঁর রহমতের ভিখারি! আর তিনি হলেন সকল ধনীদের ধনী! এখন যদি কোনো পিপাসার্ত অসহায় ব্যক্তি প্রবাহিত ঝর্ণার কোনো মালিকের নিকট এসে পানি চায় তাহলে তো সে ব্যক্তির পানি না দেওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার আল্লাহ তো তাদের থেকেও মহান, দানশীল ও দয়ালু! বান্দার প্রতি তাঁর মাগফিরাত ও ক্ষমার ঘোষণায় তাঁর ক্ষতি নেই, আবার শাস্তি প্রয়োগেও তাঁর কোনো লাভ নেই।

📘 রূহের খোরাক > 📄 কুরআন-সুন্নাহর মর্মার্থ অনুধাবনে ভ্রান্তির শিকার হওয়া

📄 কুরআন-সুন্নাহর মর্মার্থ অনুধাবনে ভ্রান্তির শিকার হওয়া


বিভ্রান্ত এই দলের কেউ কেউ আবার কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহর বিভিন্ন ঐশী বাণীর মর্মার্থ অনুধাবনে ভুলের শিকার হয়। কিছু আয়াত ও হাদীসকে তারা সামনে রেখে জীবনের ভুলভ্রান্তি থেকে নির্ভার হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহর শাশ্বত বাণী-
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
'আর শীঘ্রই আপনার প্রভু আপনাকে এমন ভরপুর দান করবেন যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।১]
এই আয়াত থেকে তারা বলতে চায়, আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নবীকে সন্তুষ্ট করবেন। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো উম্মত জাহান্নামে প্রবেশ করলে নবীজিও তার জন্য ব্যথিত হবেন, কষ্ট পাবেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা নবীজিকে সন্তুষ্ট করবেন এর অর্থ হলো তাঁর উম্মাতের কেউই জাহান্নামে যাবে না।
কুরআনের আয়াত থেকে এ ধরনের স্খলিত চিন্তা নিকৃষ্ট পর্যায়ের অজ্ঞতা ও মূর্খতা। এবং আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে সুস্পষ্ট মিথ্যাচারের নামান্তর। কেননা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিতেই সন্তুষ্ট হবেন। আর জালিম, ফাসিক, আমানাতের খিয়ানতকারী ও কবীরা গুনাহে জীবন পার করে দেওয়া পাপাচারীদেরকে শাস্তি প্রদানেই আল্লাহর সন্তষ্টি রয়েছে। আল্লাহর নবীর ব্যাপারে তো কল্পনাও করা যায় না, তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি যেই সিদ্ধান্তে নিহিত, তাতে অসন্তুষ্ট হবেন।
এদের কেউ কেউ আবার কুরআনুল কারীমের অন্য আয়াতের দিকে তাকিয়ে ভাবনাহীন জীবনযাপন করতে থাকে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
| 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।'|
এই আয়াতকে সান্ত্বনার বাণী মনে করা এক ধরনের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। স্থূলভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, উল্লিখিত আয়াতের মধ্যে শিরকের মতো জঘন্য গুনাহ মাফেরও ঘোষণা চলে আসে। অথচ আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলে দিয়েছেন-তিনি শিরকের গুনাহ কোনোভাবেই মাফ করবেন না। শিরকের অপরাধকে অন্য আয়াতে অমার্জনীয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। একইসাথে তাদের উল্লিখিত এই আয়াতটি তাওবাকারীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। গুনাহগার ব্যক্তি যখন তাওবা করবেন আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। যদি উল্লিখিত আয়াতে তাওবাকারী এবং তাওবার সৌভাগ্য নসীব হয়নি-এমন সকল ব্যক্তিরই গুনাহ মাফের ঘোষণার জন্য বলা হয়ে থাকে তাহলে তো কুরআনে বর্ণিত আযাব ও শাস্তির ওয়াদামূলক অসংখ্য আয়াত বাস্তবতা বিবর্জিত হয়ে যায়।
এভাবে তারা বিভিন্ন আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে গুনাহ করাকে কোনো অপরাধ বা গর্হিত কাজ মনে করে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।
একইভাবে হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন আমলসমূহের প্রতিদানস্বরূপ গুনাহ মাফের যেই ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে সেক্ষেত্রেও তারা বিচ্যুতির শিকার হয়েছে। তারা ধোঁকায় পড়ে যায়—যখন দেখে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আশুরার সাওম, আরাফার দিনের সাওম সারা বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়, তারা মনে করে সারা বছর গুনাহ করলে কোনো সমস্যা নেই। আশুরা কিংবা আরাফার দিনের সাওম যাবতীয় পাপ মোচন করে দেবে।
নফসের ধোঁকায় পর্যদুস্ত এই নির্বোধ ব্যক্তিরা জানে না, রামাদানের সাওম, পাঁচ ওয়াক্ত নামায-এসব নফলের চাইতেও অধিক শক্তিশালী আমল। আর হাদীসে বর্ণিত সারা বছরের গুনাহ মাফের যেই ঘোষণা এসেছে তা কার্যকর হবে সগীরা গুনাহের ক্ষেত্রে, যখন বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। কবীরা গুনাহ মাফের জন্য এসব আমলের ফযিলত কার্যকরী নয়। কবীরা গুনাহ মাফের জন্য অন্তর থেকে দৃঢ় সংকল্পের তাওবা জরুরি। গুনাহে লিপ্ত থেকে, কবীরা গুনাহের মাঝে ডুবে থেকে বছরের এক-দুইদিনের রোযার দ্বারা বা বিশেষ কোনো আমলের কারণে সারা বছরের গুনাহ মাফের আশা করাটা বিলাসী কল্পনার নামান্তর। বান্দা যখন গুনাহে লিপ্ত না থেকে, কবীরা গুনাহ ছেড়ে দেবে, গুনাহমুক্ত জীবন যাপন করবে তখন আল্লাহ তাআলা বান্দার এসব নফল আমলের দ্বারা তার ছোট ছোট গুনাহকে মাফ করে দেবেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ
'তোমদেরকে যেসব বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা তার বৃহৎ ও মূল অংশ (কবীরা গুনাহ) থেকে বেঁচে থাক তাহলে আল্লাহ তোমাদের ছোট ছোট ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেবেন।' [১]
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কোনো একটি আমলকে গুনাহ মাফের কারণ বা উপকরণ নির্ধারণ করা হলে, পাশাপাশি গুনাহ মাফের অন্যান্য কারণও (শিরক ও কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা) বিদ্যমান থাকা দরকার। আর গুনাহ মাফের একাধিক কারণ একসাথে মিলিত হলে বান্দার পাপমোচন আরও কার্যকরী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
[১] সূরা দোহা, আয়াত-ক্রম: ৫
[১] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৫৩
[১] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00