📄 মানুষের কর্মফল-ভোগের ব্যাপারে ইতিহাসের সাক্ষ্য
জীবনের ভালো-মন্দের বোধ ও পার্থিব জগতের কল্যাণ-অকল্যাণের জ্ঞান মানুষের অর্জিত হয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং যুগযুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে।
মানবজীবনের জন্য কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ-এই প্রশ্নের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উত্তর হলো, শাশ্বতগ্রন্থ আল-কুরআন। কুরআনুল কারীমে গভীর দৃষ্টি দিয়ে আমরা স্পষ্টভাবে জানতে পারি মানবজাতির ভালো ও মন্দের দিকগুলো। আমাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও অসঙ্গতিপূর্ণ কর্মধারাকে কুরআন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছে। এরপরেই জীবনের গাইডলাইন হিসেবে স্থান পাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া অমূল্য রত্নভাণ্ডার সুন্নাহ বা হাদীস। সুন্নাহ যেন কুরআনেরই একটি শাখা। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্টভাবে ভালো ও মন্দ এবং তার উপায়-উপকরণকে দেখিয়ে দেয়। কেউ যদি শুধুমাত্র এই দুটি গাইডলাইন অনুসরণ করার প্রতি মনযোগী হয়ে ওঠে তাহলে সে নির্ভারভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
কুরআন ও সুন্নাহকে সামনে রেখে যখন আমরা পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস ঘাঁটব, দেখতে পাব আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী জাতিদের উত্থান-উন্নতি এবং অবাধ্য, নাফরমান সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি; যারা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধচারণ করে উদ্ধত আচরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের ভালো ও মন্দের যেই উপকরণ, পার্থিব উত্থান ও পতনের জন্য যেই কারণসমূহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন তাঁর প্রতিটি কথাই ধ্রুব সত্য ও বাস্তব। ইতিহাসের পর্যালোচনা প্রমাণ করে দেয় আল্লাহর নবীর বর্ণিত গাইডলাইন আস-সুন্নাহ, মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তাআলার ওয়াদা, হুঁশিয়ারি অবধারিতভাবে সত্য ও প্রমাণিত। ইতিহাস আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বর্ণিত কল্যাণ-অকল্যাণ এবং এর ভালো-মন্দ উপায়-উপকরণের সত্যতার উপর অকাট্য সাক্ষ্য দিয়ে থাকে।
টিকাঃ
[১] আল্লাহর বিধানাবলির অন্তর্নিহিত কারণ বা গূঢ় রহস্যকে হেকমত বলা হয়।
📄 নফসের ধোঁকা
মানুষ যখন জানতে পারে, বিভিন্ন উপায়-উপকরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তখন সে সতর্ক থাকার চেষ্টা করতে গিয়েও অনেক সময় ধোঁকায় পড়ে যায়। এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মানুষ জানে, আল্লাহর নাফরমানি ও দ্বীন-ধর্মের প্রতি উদাসীনতা ইহ ও পরকালের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, তবুও সে নিজের প্রবৃত্তির কাছ থেকে অবান্তর এক সান্ত্বনার বাণীতে ধোঁকায় পড়ে যায়।
আল্লাহ তাআলার মহানুভবতা ও ক্ষমার গুণাবলির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার নফস তাকে নিশ্চিন্ত ও উদাসীন করে রাখে। আবার কখনো মানুষ তাওবা-ইস্তিগফারের সুযোগের কথা স্মরণ করে উদাসীন হয়ে যায়। কখনো ভবিষ্যতের কল্যাণমূলক কোনো কাজের নিয়ত করে বা ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বর্তমান সময়ের পাপ-বোধকে হালকা করে দেখতে থাকে। আবার কখনো সে জাগতিক মোহগ্রস্ত হয়ে দুনিয়ার বিত্তশালী আল্লাহভোলা লোকদের কথা চিন্তা করে নিজেকেও আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখতে থাকে।
📄 ক্ষমাপ্রার্থনার আশায় মানুষ প্রবঞ্চনার শিকার হয়
জগতে অনেক মানুষই চিন্তা করে থাকে, আমি সময়-সুযোগ-মতো আল্লাহর নিকট 'ইস্তিগফার' পাঠ করে আমার যথেচ্ছ কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করে নেব। ইস্তিগফারের কারণে আমি গুনাহমুক্ত জীবন ফিরে পাব। কোনো সন্দেহ নেই, তারা এক স্পষ্ট ভ্রান্তির গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন—আমাকে নামধারী একজন ফকীহ বললেন, 'আমি তো যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াই। তারপর আমি ১০০ বার সুবহানাল্লাহু ও ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করি, এতে আমার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আর নবীজি থেকেও এমনই বর্ণিত হয়েছে— "যেদিন কেউ ১০০ বার সুবহানাল্লাহ ও ১০০ আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে, তার সেদিনের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে; এমনকি তার গুনাহের পরিমাণ সাগরের ফেনার মতো অগণিত হলেও।" [১]
মক্কার কোনো এক লোক আমাকে একবার বলেছিল, 'আমাদের কেউ যখন মন-চাহিদা কাজ করতে গিয়ে গুনাহ করে বসে এরপর সে গোসল করে সাত বার কাবা শরীফ তাওয়াফ করে নেয় তখন তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।' এই প্রকৃতির আরেকজন আমাকে একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীসও শুনিয়েছিল যে, 'বান্দা যত গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহ তো মাফ করে দেবেনই। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— "আল্লাহর কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর নিকট এই বলে ফরিয়াদ করে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো একটি ভুল করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করুন!' তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে কিছুদিন পর আবার কোনো গুনাহ করে সে আবারও আল্লাহর নিকট একইভাবে বলে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন!' বান্দার এই আচরণে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার এই বান্দা জানে তার একজন প্রতিপালক আছেন। যে কখনো গুনাহকে ক্ষমা করে দেন আবার কখনো গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। আমি আমার এই বান্দার গুনাহকে মাফ করে দিলাম।'"'
লোকটি আমাকে হাদীসটি শুনিয়ে বলল, 'যেই আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন তাঁর ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় না যে, তিনি আবার সেই গুনাহের শাস্তিও দেবেন।' [১]
এই শ্রেণির লোকেরা মূলত কুরআন ও হাদীসের আশাব্যঞ্জক বাণীসমূহকে নিজেদের জীবনধারণের সাথে শক্তভাবে জড়িয়ে রেখেছে। নির্ভার হয়ে তারা দুই হাত প্রসারিত করে শুধুমাত্র ক্ষমা ও মহানুভবতার ঘোষণাকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে গ্রহণ করে নিয়েছে। মহাপরাক্রমশালীর শাস্তি ও পাপাচারের ভয়-ভীতিকে তারা উপেক্ষা করে দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহকে জীবনের মানসপটে বসিয়ে রেখে যথেচ্ছ জীবনধারাকে বেছে নিয়েছে। কখনো যদি তাদেরকে ভুল কিংবা অপরাধের জন্য ভর্ৎসনা করা হয় তাহলে তারা অনুশোচনার বদলে আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত রহমত ও দয়ার মহত্ব, ক্ষমার উদারতা ও আশার বাণীর এক পসরা মেলে ধরে। এই বিভ্রান্ত চিন্তাজগতে এধরনের নির্বোধ লোকদের অনেক অদ্ভূত ও বিস্ময়কর কারনামা প্রকাশ পেয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ তো কবিতাও রচনা করে বসেছে-
'যখন তুমি মহানুভব সত্তার রাজদরবারে উপস্থিত হচ্ছো, তাহলে এই সুযোগে যত ইচ্ছা হয় ভুল করে নাও। (কারণ তোমাকে তো তিনি ক্ষমা করে দেবেনই)।'
আবার আরেক দল বলে বেড়ায়, আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত ক্ষমার মহত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ গুনাহ থেকে দূরে থাকে।
কেউ কেউ বলে, গুনাহ না করা আল্লাহর ক্ষমাগুণের বিপরীতে একধরনের দুঃসাহস প্রদর্শন।
মুহাম্মদ ইবনু হাযাম বলেন, 'আমি এই নির্বোধদেরকে এমনও দুআ করতে শুনেছি যে, তারা দুআ করছে-“আল্লাহ! আমি আপনার নিকট গুনাহমুক্ত জীবন থেকে পানাহ চাই।”
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৬৮
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৫৮
📄 নেক ও সৎকর্মের প্রতি অন্তর্ভুক্ত
মতিভ্রম এই লোকদের কেউ আবার পীর, মাশায়েখ, দরবেশ কিংবা প্রসিদ্ধ কোনো বিজ্ঞ আলিমের প্রতি অন্ধভক্তির কারণে এক অলৌকিক শক্তিবলে গুনাহ-মাফের নিশ্চয়তা নিয়ে দিনাতিপাত করে। প্রয়াত পীর মাশায়েখ বা বুযুর্গদের কবরে এরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে থাকে। দুআর মধ্যে তাঁদের কথা স্মরণ করে, তাঁদের নামের উসীলা গ্রহণ ও সুপারিশের আশাকে পুঁজি করে তারা তাদের পাপ-পঙ্কিল জীবনেও ভাবনাহীন থাকে।
কেউ আবার তাঁদের পূর্বপুরুষ, নিজ পিতা বা পিতামহের তাকওয়া, খোদাভীতি দুনিয়াবিমুখতার কথা স্মরণ করে নিজের জীবন সম্পর্কে ধোঁকার মধ্যে থাকে। তারা মনে করে তাদের পূর্বপুরুষদের কারণে আল্লাহ তাআলার নিকট তাদেরও বিশেষ মর্যাদা আছে। তাই তারা নিজেদের মুক্তির জন্য, গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করার প্রয়োজন মনে করে না। যেমনটা জাগতিক রাজা-বাদশাহদের দরবারে দেখা যায়। ক্ষমতাবান রাজা-বাদশাহদের নিকটস্থ ব্যক্তিদের সন্তানরা যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তখন তারা তাদের বাপ-দাদা বা পরিচিত লোকদের কারণে, তাদের পদমর্যাদায়, সুপারিশে রাজদরবারে নিরপরাধীর মতোই আসা-যাওয়া করতে পারে। তাদের অপরাধকে ক্ষমার চোখে দেখা যায়।