📄 যেমন কর্ম তেমন ফল
আল্লাহ তাআলা ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের ভিত্তি রেখেছেন বান্দাদের আমলের মধ্যে। কুরআনুল কারীমের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
যেমন-বনী ইসরাঈল যখন অনবরত আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করতে লাগল আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বানর ও শুকরের জাতিতে পরিণত করে দিলেন। এ সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ
'যখন তারা আমার নিষেধাজ্ঞাকে পূর্ণ ধৃষ্টতা সমেত অমান্য করতে লাগল আমি তাদের প্রতি আমার (কুদরতী আদেশ অবতীর্ণ করে বললাম), তোমরা নিকৃষ্ট বানরে পরিণত হয়ে যাও।'
অন্য একটি আয়াতের দিকে লক্ষ করলেও আমরা দেখতে পাই-আল্লাহ তাআলা পার্থিব জগতের কৃতকর্মের ফল দুনিয়াতেই প্রয়োগ করছেন বিধান নাযিল করার দ্বারা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا
পুরুষ কিংবা নারী—যেই চুরি করে থাকুক না কেন, তোমরা তার উভয় হাত কেটে দাও তার কৃতকর্মের শাস্তি হিসেবে। [১]
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফের জন্য খোদাভীতিকে শর্ত করে ইরশাদ করেন—
إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
‘হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তাহলে তিনি তোমাদের জন্য হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণায়ক বিধান দান করবেন। তোমাদের পাপ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।’[২]
অন্যত্র ইরশাদ করেন—
وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ
‘তাদেরকে যেই উপদেশ দেয়া হয়েছে তারা যদি সে-মতে আমল করত তাহলে তা তাদের জন্য বড়ই কল্যাণকর হতো।’[৩]
মোটকথা, কুরআনুল কারীমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে—মানুষের কল্যাণ, অকল্যাণ এবং জাগতিক নানান প্রেক্ষাপট মানুষের কর্মফল ও উপায়-উপকরণ গ্রহণের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এভাবেও বলা যায়, ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় বিধি-বিধান ও ভালো-মন্দ অবস্থাসমূহ মানুষের নানান কাজ ও উপকরণ গ্রহণের উপর নির্ভর করে।
যে ব্যক্তি আমাদের এই আলোচ্য অধ্যায়টি গভীরভাবে চিন্তা করে ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হবে সে জীবনের অমূল্য রত্ন লাভ করবে। মূর্খের মতো কিংবা অপারগ বা বেকার হয়ে হাত-পা গুটিয়ে ভাগ্যের উপর ভরসা করে সে বসে থাকবে না। এসব ক্ষেত্রে তার তাওয়াক্কুল অবলম্বন হবে এক ধরনের অপারগতা।
বুদ্ধিমান তো সেই হবে, যে ভাগ্যকে ভাগ্য দিয়ে বদলে ফেলতে পারে। তাকদীরকে প্রতিহত করবে আরেক তাকদীরের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যের সামনে নিজের অসহায় আত্মসমর্পণের আগেই সে আরেক সৌভাগ্যকে ঢাল বানিয়ে ফেলবে। এই চরম সত্য লড়াই করেই তো মানুষ টিকে থাকে যুগ যুগ ধরে। ক্ষুধা, পিপাসা, ঠান্ডা, নানা রকমের ভয়, ঝঞ্ঝা, হুমকি-ধমকি-সব কিছুই মানুষের ভাগ্যলিপিতে নির্ধারিত থাকলেও মানবজাতি দুর্বার শক্তিতে এই ভাগ্যকে প্রতিরোধ করে আরেক ভাগ্যকে বরণ করে নেয়।
একইভাবে আল্লাহ তাআলা যাঁকে তৌফিক দেন এবং কল্যাণের পথ দেখান সে ব্যক্তি নিজের পরকালীন শাস্তি ও আযাবের ভাগ্যকে তাওবা, অনুশোচনা, ঈমান ও নেক আমলের ভাগ্য দ্বারা পরিবর্তন করে নেন।
তাকদীরই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিপদ-আপদ ও কষ্ট-ক্লেশ প্রতিরোধকারী। উভয় জগতের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাঁর হিকমাতও একক।
টিকাঃ
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৬৬
[১] সূরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ২৯
[৩] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৬৬
📄 মানুষের কর্মফল-ভোগের ব্যাপারে ইতিহাসের সাক্ষ্য
জীবনের ভালো-মন্দের বোধ ও পার্থিব জগতের কল্যাণ-অকল্যাণের জ্ঞান মানুষের অর্জিত হয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং যুগযুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের উত্থান-পতনের ইতিহাস থেকে।
মানবজীবনের জন্য কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ-এই প্রশ্নের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উত্তর হলো, শাশ্বতগ্রন্থ আল-কুরআন। কুরআনুল কারীমে গভীর দৃষ্টি দিয়ে আমরা স্পষ্টভাবে জানতে পারি মানবজাতির ভালো ও মন্দের দিকগুলো। আমাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও অসঙ্গতিপূর্ণ কর্মধারাকে কুরআন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছে। এরপরেই জীবনের গাইডলাইন হিসেবে স্থান পাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া অমূল্য রত্নভাণ্ডার সুন্নাহ বা হাদীস। সুন্নাহ যেন কুরআনেরই একটি শাখা। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্টভাবে ভালো ও মন্দ এবং তার উপায়-উপকরণকে দেখিয়ে দেয়। কেউ যদি শুধুমাত্র এই দুটি গাইডলাইন অনুসরণ করার প্রতি মনযোগী হয়ে ওঠে তাহলে সে নির্ভারভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
কুরআন ও সুন্নাহকে সামনে রেখে যখন আমরা পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস ঘাঁটব, দেখতে পাব আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী জাতিদের উত্থান-উন্নতি এবং অবাধ্য, নাফরমান সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি; যারা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধচারণ করে উদ্ধত আচরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের ভালো ও মন্দের যেই উপকরণ, পার্থিব উত্থান ও পতনের জন্য যেই কারণসমূহ কুরআনে বর্ণনা করেছেন তাঁর প্রতিটি কথাই ধ্রুব সত্য ও বাস্তব। ইতিহাসের পর্যালোচনা প্রমাণ করে দেয় আল্লাহর নবীর বর্ণিত গাইডলাইন আস-সুন্নাহ, মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তাআলার ওয়াদা, হুঁশিয়ারি অবধারিতভাবে সত্য ও প্রমাণিত। ইতিহাস আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বর্ণিত কল্যাণ-অকল্যাণ এবং এর ভালো-মন্দ উপায়-উপকরণের সত্যতার উপর অকাট্য সাক্ষ্য দিয়ে থাকে।
টিকাঃ
[১] আল্লাহর বিধানাবলির অন্তর্নিহিত কারণ বা গূঢ় রহস্যকে হেকমত বলা হয়।
📄 নফসের ধোঁকা
মানুষ যখন জানতে পারে, বিভিন্ন উপায়-উপকরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তখন সে সতর্ক থাকার চেষ্টা করতে গিয়েও অনেক সময় ধোঁকায় পড়ে যায়। এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মানুষ জানে, আল্লাহর নাফরমানি ও দ্বীন-ধর্মের প্রতি উদাসীনতা ইহ ও পরকালের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, তবুও সে নিজের প্রবৃত্তির কাছ থেকে অবান্তর এক সান্ত্বনার বাণীতে ধোঁকায় পড়ে যায়।
আল্লাহ তাআলার মহানুভবতা ও ক্ষমার গুণাবলির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার নফস তাকে নিশ্চিন্ত ও উদাসীন করে রাখে। আবার কখনো মানুষ তাওবা-ইস্তিগফারের সুযোগের কথা স্মরণ করে উদাসীন হয়ে যায়। কখনো ভবিষ্যতের কল্যাণমূলক কোনো কাজের নিয়ত করে বা ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বর্তমান সময়ের পাপ-বোধকে হালকা করে দেখতে থাকে। আবার কখনো সে জাগতিক মোহগ্রস্ত হয়ে দুনিয়ার বিত্তশালী আল্লাহভোলা লোকদের কথা চিন্তা করে নিজেকেও আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখতে থাকে।
📄 ক্ষমাপ্রার্থনার আশায় মানুষ প্রবঞ্চনার শিকার হয়
জগতে অনেক মানুষই চিন্তা করে থাকে, আমি সময়-সুযোগ-মতো আল্লাহর নিকট 'ইস্তিগফার' পাঠ করে আমার যথেচ্ছ কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করে নেব। ইস্তিগফারের কারণে আমি গুনাহমুক্ত জীবন ফিরে পাব। কোনো সন্দেহ নেই, তারা এক স্পষ্ট ভ্রান্তির গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন—আমাকে নামধারী একজন ফকীহ বললেন, 'আমি তো যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াই। তারপর আমি ১০০ বার সুবহানাল্লাহু ও ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করি, এতে আমার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আর নবীজি থেকেও এমনই বর্ণিত হয়েছে— "যেদিন কেউ ১০০ বার সুবহানাল্লাহ ও ১০০ আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করবে, তার সেদিনের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে; এমনকি তার গুনাহের পরিমাণ সাগরের ফেনার মতো অগণিত হলেও।" [১]
মক্কার কোনো এক লোক আমাকে একবার বলেছিল, 'আমাদের কেউ যখন মন-চাহিদা কাজ করতে গিয়ে গুনাহ করে বসে এরপর সে গোসল করে সাত বার কাবা শরীফ তাওয়াফ করে নেয় তখন তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।' এই প্রকৃতির আরেকজন আমাকে একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীসও শুনিয়েছিল যে, 'বান্দা যত গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহ তো মাফ করে দেবেনই। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— "আল্লাহর কোনো কোনো বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর নিকট এই বলে ফরিয়াদ করে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো একটি ভুল করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করুন!' তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে কিছুদিন পর আবার কোনো গুনাহ করে সে আবারও আল্লাহর নিকট একইভাবে বলে, 'আমার প্রতিপালক! আমি তো গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন!' বান্দার এই আচরণে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার এই বান্দা জানে তার একজন প্রতিপালক আছেন। যে কখনো গুনাহকে ক্ষমা করে দেন আবার কখনো গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। আমি আমার এই বান্দার গুনাহকে মাফ করে দিলাম।'"'
লোকটি আমাকে হাদীসটি শুনিয়ে বলল, 'যেই আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন তাঁর ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয় না যে, তিনি আবার সেই গুনাহের শাস্তিও দেবেন।' [১]
এই শ্রেণির লোকেরা মূলত কুরআন ও হাদীসের আশাব্যঞ্জক বাণীসমূহকে নিজেদের জীবনধারণের সাথে শক্তভাবে জড়িয়ে রেখেছে। নির্ভার হয়ে তারা দুই হাত প্রসারিত করে শুধুমাত্র ক্ষমা ও মহানুভবতার ঘোষণাকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে গ্রহণ করে নিয়েছে। মহাপরাক্রমশালীর শাস্তি ও পাপাচারের ভয়-ভীতিকে তারা উপেক্ষা করে দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহকে জীবনের মানসপটে বসিয়ে রেখে যথেচ্ছ জীবনধারাকে বেছে নিয়েছে। কখনো যদি তাদেরকে ভুল কিংবা অপরাধের জন্য ভর্ৎসনা করা হয় তাহলে তারা অনুশোচনার বদলে আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত রহমত ও দয়ার মহত্ব, ক্ষমার উদারতা ও আশার বাণীর এক পসরা মেলে ধরে। এই বিভ্রান্ত চিন্তাজগতে এধরনের নির্বোধ লোকদের অনেক অদ্ভূত ও বিস্ময়কর কারনামা প্রকাশ পেয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ তো কবিতাও রচনা করে বসেছে-
'যখন তুমি মহানুভব সত্তার রাজদরবারে উপস্থিত হচ্ছো, তাহলে এই সুযোগে যত ইচ্ছা হয় ভুল করে নাও। (কারণ তোমাকে তো তিনি ক্ষমা করে দেবেনই)।'
আবার আরেক দল বলে বেড়ায়, আল্লাহ তাআলার বিস্তৃত ক্ষমার মহত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ গুনাহ থেকে দূরে থাকে।
কেউ কেউ বলে, গুনাহ না করা আল্লাহর ক্ষমাগুণের বিপরীতে একধরনের দুঃসাহস প্রদর্শন।
মুহাম্মদ ইবনু হাযাম বলেন, 'আমি এই নির্বোধদেরকে এমনও দুআ করতে শুনেছি যে, তারা দুআ করছে-“আল্লাহ! আমি আপনার নিকট গুনাহমুক্ত জীবন থেকে পানাহ চাই।”
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৬৮
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৫৮