📄 দুআ ও ভাগ্যলিপি
মনে হতে পারে যে, দুআকৃত বিষয়টি যদি ভাগ্যে পূর্ব-নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো দুআর কোনো প্রয়োজন নেই। বিষয়টি আবশ্যকভাবেই অস্তিত্বে চলে আসবে। আর যদি ভাগ্যে বিষয়টি না-ই থাকে তাহলে তো শত দুআ করেও কোনো লাভ নেই! তাহলে আমরা কেন দুআ করি? দুআর কার্যকারিতা আসলে কোথায়?
অন্তরের এই সাদামাটা প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে একদল লোক বাস্তবেও দুআ করা ছেড়ে দেয়। তাদের ধারণা, যা হবার তা তো হবেই। দুআ মুনাজাত করে আর কী হবে! অথচ তাদের এই ভ্রান্ত চিন্তাকে মেনে নিলে পার্থিব জগতের যাবতীয় আসবাব বা উপকরণ সবকিছুই ছেড়ে দিয়ে কল্পনাতীত মানবেতর এক বৈরাগী জীবনকে আলিঙ্গন করে নিতে হয়।
উদাহরণত, মানবদেহের ক্ষুধামুক্তি ও তৃপ্ত পাকস্থলি যদি ভাগ্যেই সুনির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো যেভাবেই হোক ভাগ্যের প্রতিফলন ঘটবেই। সুতরাং আলাদাভাবে খাওয়া-দাওয়ার আর কী প্রয়োজন! আর ভাগ্যে যদি ক্ষুধা-যন্ত্রণা, পানির তৃষ্ণা নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো শত খাবার খেয়েও কোনো লাভ নেই!
আবার ভাগ্যে যদি সন্তানাদি থাকে তাহলে তো অবধারিতভাবে জন্ম নেবেই। স্ত্রী সহবাসের কোনো প্রয়োজন নেই। তদ্রূপ ভাগ্যলিপিতে যদি কোনো সন্তানের কথা না থাকে তাহলে হাজারো বিয়ে কোন উপকারে আসবে না।
এভাবে জাগতিক সকল বিষয়কেই ভাগ্যলিপির দোহাই দিয়ে অবান্তর প্রমাণ করা দেয়া যায়।
এই ধরনের চিন্তার লোকদের কি মানুষ বলা যায়! জাগতিক ভারসাম্যহীন অবলা পশুর স্তরে বসবাস এদের। অথবা বলা যায়, বন্য প্রাণীরাও অনেক ক্ষেত্রে এদের তুলনায় সভ্য ও মার্জিত।
দুআ ও ভাগ্যের এই বাহ্যিক দ্বন্দ্ব এড়াতে আবার একদল লোক ভাবে-দুআ নিছকই একটি ইবাদাত; ভাগ্য-পরিবর্তনকারী নয়, ভাগ্যে যা আছে তা হবেই। আর দুআর জন্য বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান ও সওয়াব পাবে। তাদের মতে, দুআর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাদের ধারণা-মৌখিক দুআ, অন্তর থেকে দুআ করা-এসবের কোনো প্রভাবই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কার্যকর না।
আরেকদল মনে করে, দুআ হলো আলামত। দুআ করার সুযোগ হলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। দুআ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের নিদর্শন। বান্দাকে যখন দুআ করার তৌফিক দেয়া হবে তখন বুঝে নিতে হবে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় দান করবেন। তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন।
দুআর ব্যাপারে তাদের এই চিন্তাকে ব্যাখ্যা করতে তারা আকাশের মেঘের উদাহরণ দিয়ে থাকে। বর্ষার মৌসুমে আকাশের মেঘ যেমন বৃষ্টির আলামত হিসেবে দেখা দেয় তেমনই দুআ হলো বান্দার প্রয়োজন পূরণ হওয়ার আলামত। তাদের নিকট আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সওয়াব এবং আল্লাহর অবাধ্যতা ও কুফরীর সাথে শাস্তির সম্পর্কও একই রকম। অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারাটা কেবল নেক প্রতিদান ও সওয়াব অর্জনের আলামত। আবার আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা শুধুমাত্র জাহান্নামের শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার জাগতিক নিদর্শন বলে বিবেচিত হবে। কেননা আনুগত্য ও অবাধ্যতার কারণেই মানুষ উত্তম ও ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। জাগতিক বিষয়াদিতেও এদের দর্শন হলো, কোনো জিনিস ভেঙে ফেলার কারণে খণ্ডিত হয়ে পড়া, আগুনে ফেলে দেয়ার কারণে পুড়ে যাওয়া, হত্যার কারণে কারো মারা যাওয়া ইত্যাদি কোনো কাজই এসব পরিণতির কারণ হতে পারে না। উল্লিখিত কাজগুলো এসব পরিণামের সাথে এমন বিশেষ কোনো সম্পর্ক রাখে না, যার ফলে এই কাজগুলোর ফলে কোনো জিনিস ভেঙে যাবে, মারা যাবে বা পুড়ে যাবে। বরং উল্লিখিত কাজগুলো প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়মানুসারে বিভিন্ন পরিণতির সাথে যুক্ত হয়। কোনো পরিণামের কারণ হিসেবে কোনো কাজকে নির্ধারণ করা যায় না।
তাদের এই অবান্তর চিন্তা ও অসার যুক্তি স্বাভাবিকভাবেই জাগতিক নিয়ম, ভারসাম্যপূর্ণ হিতাহিত জ্ঞান, শরয়ী ভাবধারা বা মানব-স্বভাব-বহির্ভূত। এসব চিন্তা ও যুক্তি জ্ঞানী সমাজে শুধুই হাসির খোরাক হতে পারে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এই দ্বন্দ নিরসনে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো, জগতের কিছু বিষয় যেমন বিভিন্ন ধরনের উপায়-উপকরণের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে, ভাগ্যের কিছু ব্যাপারও ঠিক তেমন। এই উপায়-উপকরণের অন্যতম একটি হলো দুআ। উপায় ও উপকরণহীন নিরেট ভাগ্যের দোলায় এসব দুলতে থাকে না। বরং কোনো একটি কারণ বা উপকরণের পিঠে ভর করে বাস্তব জগতে ভাগ্যলিপি প্রকাশ পায়। সুতরাং বান্দা যখন সেই উপায়-উপকরণকে পুঁজি করে পথ চলে তখন সেই উপায়-উপকরণের সাথে যুক্ত বিষয়টিই তার জন্য নির্ধারিত হয়, তার সামনে প্রকাশ পায়। আর বান্দা যখন এসব উপকরণের ধার ধারে না, তখন এই উপকরণের সাথে যুক্ত নির্ধারিত বিষয়টিও আর অস্তিত্ব আসে না।
যেমনিভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করাটা খাদ্য ও পানি গ্রহণের উপায়-উপকরণের সাথে যুক্ত থাকে। যে ব্যক্তি খাদ্য গ্রহণ করল, পানি পান করল, সে তৃপ্তি লাভের উপকরণকেই গ্রহণ করল। অনুরূপভাবে সন্তান লাভের বিষয়টিও সহবাসের সাথে যুক্ত। একইভাবে চাষাবাদের সাথে ফসল উৎপন্ন হওয়া, জবাইয়ের কারণে পশু মারা যাওয়া, সৎকর্মের জন্য জান্নাত আর অসৎ কর্মের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করা ইত্যাদি সবই হলো মানুষের পরিণতি ও পরিণামের একেকটি উপকরণ। সে নিজের জন্য যেই উপকরণকে গ্রহণ করবে তার পরিণাম সে ভোগ করবে। আমার এই চিঠির প্রশ্নকারীও এই দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করতে না পারায় সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই ব্যাখ্যাটিই বাস্তবসম্মত ও সঠিক ব্যাখ্যা। আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম জ্ঞানী।
📄 দুআ সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম
ভাগ্যের নানাবিধ পরিণতির সবচেয়ে কার্যকরী ও শক্তিশালী উপকরণ হলো দুআ। তাই দুআর কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে দুআর উপকরণের সাথে নির্ধারণ করে দেয়া হয়ে থাকে, তখন এরকমের চিন্তাভাবনা সঠিক নয় যে, 'দুআ করে লাভ নেই, যা হওয়ার এমনিতেই হবে!'
যেমনভাবে খাওয়া-দাওয়া ও যাবতীয় মানবিক কর্মকাণ্ড ও ওঠাবসাকে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না, দুআর ব্যাপারটিও ঠিক তেমন। বরং কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনে দুআর চেয়ে অধিক কার্যকর ও উপকারী কোনো উপকরণই নেই।
📄 দুআর মাধ্যমে উমর ইবনুল খাত্তাবের সাহায্য-প্রার্থনা
উমর ইবনুল খাত্তাব শত্রু বাহিনীর মুকাবিলায় আল্লাহর নিকট দুআর মাধ্যমে সাহায্য চাইতেন। তাঁর সেনাবাহিনীর বহর ছিল বেশ বড়। তবুও তিনি তাঁর সঙ্গীদেরকে বলতেন, 'তোমরা সংখ্যাধিক্যের কারণে সাহায্যপ্রাপ্ত বা বিজয় লাভ করো না। তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হও আসমান থেকে। (সুতরাং আসমানের অধিকর্তার নিকট দুআ করতে থাকো)।'
তিনি বলতেন, 'আমি দুআ কবুলের জন্য চিন্তা করি না। আমার চিন্তা থাকে দুআকে ঘিরেই, আমি খেয়াল করি, আমার দুআ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না। তোমরা যদি দুআ নিয়ে চিন্তিত হতে পার তাহলে দুআ এমনিতেই কবুল হয়ে যাবে। দুআ কবুল হওয়া নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।'
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র এই কথার মর্ম ধারণ করে কবি বলেছেন—
لَوْ لَمْ تُرِدْ نَيْلَ مَا أَرْجُو وَأَطْلُبُهُ ... مِنْ جُودِ كَفَّيْكَ مَا عَلَّمْتَنِي الطَّلَبَا
'আপনি যদি আপনার বদান্য হাতে আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ নাই করেন, তাহলে তো আপনি আমাকে দুআর জন্য আদেশ করতেন না।
'যাকে দুআর জন্য অদৃশ্য থেকে অনুপ্রাণিত করা হয়, মনে করতে হবে তার দুআ কবুল করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
| 'তোমরা আমার নিকট দুআ করো। আমি তোমাদের দুআ কবুল করব।'
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
'আর যখন আমার বান্দারা আপনার নিকট আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তখন আমি তাদের সন্নিকটেই থাকি। আমার নিকট যখন কোনো দুআকারী দুআ করে তখন আমি তার দুআ কবুল করে নিই।'
ইমাম ইবনু মাজাহ তাঁর বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ আস-সুনানে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে একটি হাদীস উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত হন।' [১]
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, দুআ ও আনুগত্যের মধ্যেই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি নিহিত। বান্দার প্রতি আল্লাহ যখন সন্তুষ্ট হয়ে যান, সেই সন্তুষ্টির দ্বারাই যাবতীয় কল্যাণ নির্ধারিত হয়ে যায়। একইভাবে আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত আছে সব ধরনের বিপদ-আপদ।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব আয-যুহদে হাদীসে কুদসী [২] থেকে বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَنَا اللهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا، إِذَا رَضِيتُ بَارَكْتُ، وَلَيْسَ لِبَرَكَتِي مُنْتَهى وَإِذَا غَضِبْتُ لَعَنْتُ، وَلَعْنَتِي تَبْلُغُ السَّابِعَ مِنَ الْوَلَدِ
'আমিই আল্লাহ! আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আমি যখন সন্তুষ্ট হয়ে যাই তখন বরকত দান করি। আমার বরকতের কোনো সীমা নেই। আর যখন রাগান্বিত হই তখন লানত বর্ষণ করি। আমার লানত বংশের সপ্তম প্রজন্ম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।। ১০
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, হাদীস শরীফের বিভিন্ন বাণী ও উপদেশাবলি, যুগে যুগে মানবজাতির বিভিন্ন উত্থান-পতনের ঘটনা পর্যালোচনা করলে এবং ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে দেখা যায়, বিশ্ব জগতের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার নৈকট্য, তাঁর সন্তুষ্টি অন্বেষণ, সৃষ্টিজগতের প্রতি অনুগ্রহ- ইত্যাদি সকল উত্তম কার্যাবলীই যাবতীয় কল্যাণ ও মঙ্গল বয়ে আনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। আর এসকল সৎ ও উত্তম কাজের বিপরীতে মানুষ যখন অসৎ পথ অবলম্বন করেছে তখন তাদের এই বিপথগামিতাই জগতের সামগ্রিক অকল্যাণ ও সমষ্টিগত ধ্বংসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্যত যুগে যুগে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও নিয়ামতরাজির অবিরাম বর্ষণ এবং আল্লাহর ক্রোধ ও আযাব প্রতিরোধন—তাঁর আনুগত্য, নৈকট্য ও পরোপকারের অনুপাতে প্রতিফলিত হয়ে থাকে।
টিকাঃ
[১] সূরা মুমিন, হাদীস-ক্রম: ৬০
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৮৬
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ-৩৮২৭
[২] হাদীসে কুদসী বলা হয়, যে সকল হাদীসের মূল কথা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিজস্ব বক্তব্য দ্বারা সরাসরি ব্যক্ত হয়েছে-সে সকল হাদীসকে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার যেই বাণী কুরআনের মধ্যে আয়াত হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে, পরবর্তীতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাতকে তা কুরআনের আয়াত হিসেবে নয় বরং হাদীস হিসেবে জানিয়ে দিয়েছেন। -অনুবাদক
[৩] বর্ণিত হাদীসটি সম্পর্কে তিনটি কথা। প্রথমত, হাদীসের কোনো কিতাবে হাদীসটি পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ইসলামের বিধান হলো, কারও পাপের দায় অন্যের উপর বর্তায় না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'কোনো পাপী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না'-সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৭। উল্লিখিত হাদীসটি উপরোক্ত আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। তৃতীয়ত, এই হাদীসের রাবী ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ, ওয়াহাব ইসরাঈলী বর্ণনার জন্য প্রসিদ্ধ। তাই সার্বিক বিচারে উপরোক্ত হাদীসটি অর্থগতভাবে শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক না হলেও শেষাংশের অর্থ মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। -সম্পাদক
📄 যেমন কর্ম তেমন ফল
আল্লাহ তাআলা ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের ভিত্তি রেখেছেন বান্দাদের আমলের মধ্যে। কুরআনুল কারীমের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
যেমন-বনী ইসরাঈল যখন অনবরত আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করতে লাগল আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বানর ও শুকরের জাতিতে পরিণত করে দিলেন। এ সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَا نُهُوا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ
'যখন তারা আমার নিষেধাজ্ঞাকে পূর্ণ ধৃষ্টতা সমেত অমান্য করতে লাগল আমি তাদের প্রতি আমার (কুদরতী আদেশ অবতীর্ণ করে বললাম), তোমরা নিকৃষ্ট বানরে পরিণত হয়ে যাও।'
অন্য একটি আয়াতের দিকে লক্ষ করলেও আমরা দেখতে পাই-আল্লাহ তাআলা পার্থিব জগতের কৃতকর্মের ফল দুনিয়াতেই প্রয়োগ করছেন বিধান নাযিল করার দ্বারা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا
পুরুষ কিংবা নারী—যেই চুরি করে থাকুক না কেন, তোমরা তার উভয় হাত কেটে দাও তার কৃতকর্মের শাস্তি হিসেবে। [১]
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফের জন্য খোদাভীতিকে শর্ত করে ইরশাদ করেন—
إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
‘হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তাহলে তিনি তোমাদের জন্য হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণায়ক বিধান দান করবেন। তোমাদের পাপ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।’[২]
অন্যত্র ইরশাদ করেন—
وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ
‘তাদেরকে যেই উপদেশ দেয়া হয়েছে তারা যদি সে-মতে আমল করত তাহলে তা তাদের জন্য বড়ই কল্যাণকর হতো।’[৩]
মোটকথা, কুরআনুল কারীমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে—মানুষের কল্যাণ, অকল্যাণ এবং জাগতিক নানান প্রেক্ষাপট মানুষের কর্মফল ও উপায়-উপকরণ গ্রহণের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এভাবেও বলা যায়, ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় বিধি-বিধান ও ভালো-মন্দ অবস্থাসমূহ মানুষের নানান কাজ ও উপকরণ গ্রহণের উপর নির্ভর করে।
যে ব্যক্তি আমাদের এই আলোচ্য অধ্যায়টি গভীরভাবে চিন্তা করে ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হবে সে জীবনের অমূল্য রত্ন লাভ করবে। মূর্খের মতো কিংবা অপারগ বা বেকার হয়ে হাত-পা গুটিয়ে ভাগ্যের উপর ভরসা করে সে বসে থাকবে না। এসব ক্ষেত্রে তার তাওয়াক্কুল অবলম্বন হবে এক ধরনের অপারগতা।
বুদ্ধিমান তো সেই হবে, যে ভাগ্যকে ভাগ্য দিয়ে বদলে ফেলতে পারে। তাকদীরকে প্রতিহত করবে আরেক তাকদীরের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যের সামনে নিজের অসহায় আত্মসমর্পণের আগেই সে আরেক সৌভাগ্যকে ঢাল বানিয়ে ফেলবে। এই চরম সত্য লড়াই করেই তো মানুষ টিকে থাকে যুগ যুগ ধরে। ক্ষুধা, পিপাসা, ঠান্ডা, নানা রকমের ভয়, ঝঞ্ঝা, হুমকি-ধমকি-সব কিছুই মানুষের ভাগ্যলিপিতে নির্ধারিত থাকলেও মানবজাতি দুর্বার শক্তিতে এই ভাগ্যকে প্রতিরোধ করে আরেক ভাগ্যকে বরণ করে নেয়।
একইভাবে আল্লাহ তাআলা যাঁকে তৌফিক দেন এবং কল্যাণের পথ দেখান সে ব্যক্তি নিজের পরকালীন শাস্তি ও আযাবের ভাগ্যকে তাওবা, অনুশোচনা, ঈমান ও নেক আমলের ভাগ্য দ্বারা পরিবর্তন করে নেন।
তাকদীরই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিপদ-আপদ ও কষ্ট-ক্লেশ প্রতিরোধকারী। উভয় জগতের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাঁর হিকমাতও একক।
টিকাঃ
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৬৬
[১] সূরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ২৯
[৩] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৬৬