📄 দুআ কবুলের ক্ষেত্রসমূহ
ব্যক্তিবিশেষ মাঝেমধ্যে আমরা দেখতে পাই, কেউ কেউ দুআ করলে সাথে সাথে কবুল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হয়তো দুআকারী ব্যক্তির প্রয়োজনের তীব্রতা অনুসারে, আল্লাহমুখিতার এক বিশেষ অবস্থা দুআ কবুলে প্রভাব বিস্তার করে। অথবা দুআর মধ্যে সে এমন চমৎকার পন্থায় আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বসে, আল্লাহ তাআলা তার এই চমৎকার দুআর বদৌলতে দুআকে কবুল করে নেন।
কিংবা দুআ কবুলের বিশেষ সময়ে তার দুআটি আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হয়।
এ ছাড়াও অন্যান্য অনেক কারণে তার দুআর ফলাফল দ্রুত প্রকাশ পায়। তখন অনেকেই ধারণা করে, দুআর মধ্যে উচ্চারিত কোনো কালিমা বা শব্দের কারণে হয়তো অমুকের দুআ কবুল করা হয়েছে। ফলে সেও দুআ কবুলের পারিপার্শ্বিক আবশ্যক বিষয়াবলির প্রতি লক্ষ না রেখে শুধুমাত্র ঐ শব্দ বা কালিমাসমূহ দিয়ে দুআ করতে থাকে আর অপেক্ষা করতে থাকে যে, আমার দুআও এখন কবুল হয়ে যাবে।
এর একটি উদাহরণ হলো—একজন অসুস্থ ব্যক্তি সঠিক পদ্ধতিতে যথাসময়ে সঠিক ওষুধ ব্যবহার করায় সুস্থ হয়ে উঠল। তখন অপরজন চিন্তা করল, শুধুমাত্র এই ওষুধটির ব্যবহারই হয়তো রোগমুক্তির জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। সময়ানুবর্তিতা কিংবা প্রয়োগপদ্ধতির কথা না ভেবে কেবল ওষুধকেই রোগমুক্তির একমাত্র কারণ ভাবাটা তার সুস্পষ্ট ভুল। একইভাবে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দুআকেই দুআ কবুলের ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় ভাবাটাও এধরনের ভুল। অনেক মানুষই এসব ভুলের শিকার হন।
আমাদের সমাজে দেখা যায়, বিপদগ্রস্ত কেউ হয়তো বিপদে পেরেশান হয়ে কোনো কবরের সামনে আল্লাহ তাআলার নিকট মনের গভীর থেকে একাগ্রচিত্তে কাকুতি-মিনতি করে দুআ করতে থাকে। আর বিপদগ্রস্ত লোকটির মনের এই ব্যথা-বেদনার কারণে আল্লাহ তাআলা তার দুআকে কবুল করে নেন। তখন অনেকের মাঝেই এই ভুল বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, হয়তো এই কবরবাসীর কারণেই এই লোকটির দুআ কবুল হয়েছে। এইভেবে বহু আবেগপ্রবণ মানুষ কবরের সামনে এসে দুআ করতে থাকে। অথচ এক্ষেত্রে দুআ কবুলের জন্য অন্তরের বিশেষ অবস্থা, শতভাগ আল্লাহমুখিতা—এসবের প্রতি কোনো মনোযোগ দেয়া ব্যতীতই নিরেট কবরবাসীর কারণে দুআ কবুলের আশায় বসে থাকে তারা। আবেগী অজ্ঞ লোকেরা বুঝতে পারে না, দুআ কবুলের সেই গোপন রহস্য হলো, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির সত্যিকারের আল্লাহমুখী হওয়ার তীব্র প্রচেষ্টা।
বস্তুত কবরের সামনে না বসে আল্লাহর ঘর মসজিদে যদি অন্তরের এই বিশেষ অবস্থায় দুআ করা হয় তাহলে তো সেই দুআ আরো উত্তম ও আল্লাহর নিকট আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
📄 দুআ কবুলের শর্ত
আল্লাহর নিকট দুআ করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা মুমিন বান্দার জন্য একপ্রকারের অস্ত্র। অস্ত্রের গুণগত মান শুধুমাত্র তার ধার কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নতির উপর নির্ভর করে না বরং ব্যবহারকারীর দক্ষতাও এখানে বড় একটি ব্যাপার। সুতরাং একটি অস্ত্র যখন—
* নিখুঁত, ধারালো ও মানসম্পন্ন হবে
* ব্যবহারকারীর হাতও হবে দক্ষ
* এবং অস্ত্র প্রয়োগে কোনো প্রতিবন্ধকও থাকবে না
তখন সেই অস্ত্র শত্রুকে পরিপূর্ণ ঘায়েল করতে সক্ষম হবে। আর যদি উল্লিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যের কোনো একটিও পাওয়া না যায় তাহলে অস্ত্রের প্রভাবও দুর্বলভাবে প্রকাশ পাবে।
মুমিন বান্দার দুআ যদিও বাহ্যত কোনো অস্ত্র নয়, তবুও দুআকারী যদি তার মুখের উচ্চারিত প্রার্থনার সাথে অন্তরের ব্যাথাকে একত্রিত করতে অক্ষম হয় অথবা দুআ কবুলের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা যদি অন্তরায় হয়ে থাকে তাহলে এক্ষেত্রেও দুআর পূর্ণ প্রভাব অপ্রকাশিত থেকে যায়।
📄 দুআ ও ভাগ্যলিপি
মনে হতে পারে যে, দুআকৃত বিষয়টি যদি ভাগ্যে পূর্ব-নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো দুআর কোনো প্রয়োজন নেই। বিষয়টি আবশ্যকভাবেই অস্তিত্বে চলে আসবে। আর যদি ভাগ্যে বিষয়টি না-ই থাকে তাহলে তো শত দুআ করেও কোনো লাভ নেই! তাহলে আমরা কেন দুআ করি? দুআর কার্যকারিতা আসলে কোথায়?
অন্তরের এই সাদামাটা প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে একদল লোক বাস্তবেও দুআ করা ছেড়ে দেয়। তাদের ধারণা, যা হবার তা তো হবেই। দুআ মুনাজাত করে আর কী হবে! অথচ তাদের এই ভ্রান্ত চিন্তাকে মেনে নিলে পার্থিব জগতের যাবতীয় আসবাব বা উপকরণ সবকিছুই ছেড়ে দিয়ে কল্পনাতীত মানবেতর এক বৈরাগী জীবনকে আলিঙ্গন করে নিতে হয়।
উদাহরণত, মানবদেহের ক্ষুধামুক্তি ও তৃপ্ত পাকস্থলি যদি ভাগ্যেই সুনির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো যেভাবেই হোক ভাগ্যের প্রতিফলন ঘটবেই। সুতরাং আলাদাভাবে খাওয়া-দাওয়ার আর কী প্রয়োজন! আর ভাগ্যে যদি ক্ষুধা-যন্ত্রণা, পানির তৃষ্ণা নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো শত খাবার খেয়েও কোনো লাভ নেই!
আবার ভাগ্যে যদি সন্তানাদি থাকে তাহলে তো অবধারিতভাবে জন্ম নেবেই। স্ত্রী সহবাসের কোনো প্রয়োজন নেই। তদ্রূপ ভাগ্যলিপিতে যদি কোনো সন্তানের কথা না থাকে তাহলে হাজারো বিয়ে কোন উপকারে আসবে না।
এভাবে জাগতিক সকল বিষয়কেই ভাগ্যলিপির দোহাই দিয়ে অবান্তর প্রমাণ করা দেয়া যায়।
এই ধরনের চিন্তার লোকদের কি মানুষ বলা যায়! জাগতিক ভারসাম্যহীন অবলা পশুর স্তরে বসবাস এদের। অথবা বলা যায়, বন্য প্রাণীরাও অনেক ক্ষেত্রে এদের তুলনায় সভ্য ও মার্জিত।
দুআ ও ভাগ্যের এই বাহ্যিক দ্বন্দ্ব এড়াতে আবার একদল লোক ভাবে-দুআ নিছকই একটি ইবাদাত; ভাগ্য-পরিবর্তনকারী নয়, ভাগ্যে যা আছে তা হবেই। আর দুআর জন্য বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান ও সওয়াব পাবে। তাদের মতে, দুআর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাদের ধারণা-মৌখিক দুআ, অন্তর থেকে দুআ করা-এসবের কোনো প্রভাবই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কার্যকর না।
আরেকদল মনে করে, দুআ হলো আলামত। দুআ করার সুযোগ হলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। দুআ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের নিদর্শন। বান্দাকে যখন দুআ করার তৌফিক দেয়া হবে তখন বুঝে নিতে হবে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় দান করবেন। তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন।
দুআর ব্যাপারে তাদের এই চিন্তাকে ব্যাখ্যা করতে তারা আকাশের মেঘের উদাহরণ দিয়ে থাকে। বর্ষার মৌসুমে আকাশের মেঘ যেমন বৃষ্টির আলামত হিসেবে দেখা দেয় তেমনই দুআ হলো বান্দার প্রয়োজন পূরণ হওয়ার আলামত। তাদের নিকট আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সওয়াব এবং আল্লাহর অবাধ্যতা ও কুফরীর সাথে শাস্তির সম্পর্কও একই রকম। অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্য করতে পারাটা কেবল নেক প্রতিদান ও সওয়াব অর্জনের আলামত। আবার আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা শুধুমাত্র জাহান্নামের শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার জাগতিক নিদর্শন বলে বিবেচিত হবে। কেননা আনুগত্য ও অবাধ্যতার কারণেই মানুষ উত্তম ও ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। জাগতিক বিষয়াদিতেও এদের দর্শন হলো, কোনো জিনিস ভেঙে ফেলার কারণে খণ্ডিত হয়ে পড়া, আগুনে ফেলে দেয়ার কারণে পুড়ে যাওয়া, হত্যার কারণে কারো মারা যাওয়া ইত্যাদি কোনো কাজই এসব পরিণতির কারণ হতে পারে না। উল্লিখিত কাজগুলো এসব পরিণামের সাথে এমন বিশেষ কোনো সম্পর্ক রাখে না, যার ফলে এই কাজগুলোর ফলে কোনো জিনিস ভেঙে যাবে, মারা যাবে বা পুড়ে যাবে। বরং উল্লিখিত কাজগুলো প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়মানুসারে বিভিন্ন পরিণতির সাথে যুক্ত হয়। কোনো পরিণামের কারণ হিসেবে কোনো কাজকে নির্ধারণ করা যায় না।
তাদের এই অবান্তর চিন্তা ও অসার যুক্তি স্বাভাবিকভাবেই জাগতিক নিয়ম, ভারসাম্যপূর্ণ হিতাহিত জ্ঞান, শরয়ী ভাবধারা বা মানব-স্বভাব-বহির্ভূত। এসব চিন্তা ও যুক্তি জ্ঞানী সমাজে শুধুই হাসির খোরাক হতে পারে।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, এই দ্বন্দ নিরসনে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো, জগতের কিছু বিষয় যেমন বিভিন্ন ধরনের উপায়-উপকরণের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে, ভাগ্যের কিছু ব্যাপারও ঠিক তেমন। এই উপায়-উপকরণের অন্যতম একটি হলো দুআ। উপায় ও উপকরণহীন নিরেট ভাগ্যের দোলায় এসব দুলতে থাকে না। বরং কোনো একটি কারণ বা উপকরণের পিঠে ভর করে বাস্তব জগতে ভাগ্যলিপি প্রকাশ পায়। সুতরাং বান্দা যখন সেই উপায়-উপকরণকে পুঁজি করে পথ চলে তখন সেই উপায়-উপকরণের সাথে যুক্ত বিষয়টিই তার জন্য নির্ধারিত হয়, তার সামনে প্রকাশ পায়। আর বান্দা যখন এসব উপকরণের ধার ধারে না, তখন এই উপকরণের সাথে যুক্ত নির্ধারিত বিষয়টিও আর অস্তিত্ব আসে না।
যেমনিভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করাটা খাদ্য ও পানি গ্রহণের উপায়-উপকরণের সাথে যুক্ত থাকে। যে ব্যক্তি খাদ্য গ্রহণ করল, পানি পান করল, সে তৃপ্তি লাভের উপকরণকেই গ্রহণ করল। অনুরূপভাবে সন্তান লাভের বিষয়টিও সহবাসের সাথে যুক্ত। একইভাবে চাষাবাদের সাথে ফসল উৎপন্ন হওয়া, জবাইয়ের কারণে পশু মারা যাওয়া, সৎকর্মের জন্য জান্নাত আর অসৎ কর্মের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করা ইত্যাদি সবই হলো মানুষের পরিণতি ও পরিণামের একেকটি উপকরণ। সে নিজের জন্য যেই উপকরণকে গ্রহণ করবে তার পরিণাম সে ভোগ করবে। আমার এই চিঠির প্রশ্নকারীও এই দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করতে না পারায় সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই ব্যাখ্যাটিই বাস্তবসম্মত ও সঠিক ব্যাখ্যা। আল্লাহ তাআলাই সর্বোত্তম জ্ঞানী।
📄 দুআ সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম
ভাগ্যের নানাবিধ পরিণতির সবচেয়ে কার্যকরী ও শক্তিশালী উপকরণ হলো দুআ। তাই দুআর কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে দুআর উপকরণের সাথে নির্ধারণ করে দেয়া হয়ে থাকে, তখন এরকমের চিন্তাভাবনা সঠিক নয় যে, 'দুআ করে লাভ নেই, যা হওয়ার এমনিতেই হবে!'
যেমনভাবে খাওয়া-দাওয়া ও যাবতীয় মানবিক কর্মকাণ্ড ও ওঠাবসাকে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না, দুআর ব্যাপারটিও ঠিক তেমন। বরং কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনে দুআর চেয়ে অধিক কার্যকর ও উপকারী কোনো উপকরণই নেই।