📄 দুআর মধ্যে কাকুতি-মিনতি করা
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত থাকেন।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا تَعْجِزُوا فِي الدُّعَاءِ فَإِنَّهُ لَا يَهْلِكُ مَعَ الدُّعَاءِ أَحَدُ
'তোমরা (অন্তত) দুআ করতে অক্ষম হয়ো না। কেননা দুআ যার সঙ্গী, সে কখনো ধ্বংস হয় না।
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُلِحِينَ فِي الدُّعَاءِ
| 'আল্লাহ তাআলা কাকুতি-মিনতি করে দুআকারীদের ভালোবাসেন।'
কিতাবুয যুহদে ইমাম মুওয়াররিকের একটি উক্তি এভাবে আছে যে, তিনি বলেন, 'আমি একজন মুমিনের দৃষ্টান্ত হিসেবে ওই ব্যক্তিকেই পেশ করতে পারি, যে একটি কাঠের টুকরোয় সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আর ইয়া রব! ইয়া রব! বলে আর্তনাদ করছে, (এই মনোবাসনায় যে) আল্লাহ তাআলা এই ফরিয়াদের দরুণ হয়তো-বা তাকে উদ্ধার করবেন।'
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮২৭
[২] মুসনাদু ইবনি হিব্বান, হাদীস-ক্রম: ২৩৯৮
[৩] হাদীসটির সনদগত কোনো ভিত্তি নেই। তবে কোনো কোনো হাদীসে এর অর্থগত কিছুটা সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতেন তিনবার করে দুআ করতেন, আর যখন আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইতেন, তিনবার করে চাইতেন। -মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৭১৪
📄 দুআর প্রতিবন্ধকতা
দুআর প্রভাব প্রতিফলনে বেশকিছু বিষয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-
• যদি দুআকারী ব্যক্তি দুআর ফল পেতে তাড়াহুড়ো করতে থাকে।
• দুআর ফল প্রকাশে বিলম্ব দেখে যদি সে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়।
এই ধরনের অস্থিরচিত্তের ব্যক্তির অবস্থা হয় ওই লোকের মতো, যে বীজ বা গাছের চারা রোপণ করে জমিনে পানি সিঞ্চন করে এবং গাছের পরিচর্যা করতে থাকে। কিন্তু যখন ফসল হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে তখন সে বিলম্ব দেখে হতাশ হয়ে গাছের যত্ন নেয়া ছেড়ে দেয়।
আবু হুরায়রা ﵎ সূত্রে বিবৃত সহীহ বুখারীর বর্ণনা, নবীজি ﷺ বলেছেন-
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
'যতক্ষণ তোমরা তাড়াহুড়ো না করো, তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয়। অথচ তোমাদের কেউ কেউ (অধৈর্য হয়ে) বলে ফেলে, দুআ তো করলাম, কবুল তো হলো না।'
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজি ﷺ বলেন-
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمِ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الِاسْتِعْجَالُ؟ قَالَ يَقُولُ: قَدْ دَعَوْتُ، وَقَدْ دَعَوْتُ، فَلَمْ أَرَ يُسْتَجَابُ لِي، فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدَعُ الدُّعَاءَ
'বান্দা যদি কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের জন্য দুআ না করে এবং দুআ কবুলে তাড়াহুড়ো থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার সকল দুআই আল্লাহর দরবারে কবুল হতে থাকে।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়োর অর্থ কী?' নবীজি বললেন, 'বান্দা যখন দুআ করে বলতে থাকে- "দুআ তো করলাম, কিন্তু তা কবুল হওয়ার কোনো আলামতই দেখলাম না!"-এভাবে সে আক্ষেপ করতে করতে একসময় দুআ করা ছেড়ে দেয়।
অন্য হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرٍ مَّا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ يَسْتَعْجِلُ؟ قَالَ: يَقُولُ قَدْ دَعَوْتُ رَبِّي فَلَمْ يَسْتَجِبْ لِي
'মানুষ সর্বদা ভালো ও কল্যাণের মাঝেই থাকে যতক্ষণ না তাড়াহুড়ো করে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! কীভাবে তাড়াহুড়ো করা হয়?' নবীজি বললেন, 'তাড়াহুড়োর অর্থ হলো, মানুষ দুআ করে বলে-"আমি আল্লাহর নিকট দুআ করলাম অথচ আমার দুআ কবুল করা হলো না!"
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক-১/২১৩; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৮৪
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৩৫
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩১৯৮; শুয়াইব আয়নাউত হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহি বলেছেন।
📄 দুআ কবুলের সময়
বান্দা যখন কাঙ্ক্ষিত জিনিস অর্জনের জন্য বুকভরা আশা নিয়ে অন্তরের পূর্ণ একাগ্রতার সাথে ছয়টি সময়ের যেকোনো একটি সময়ে দুআ করবে আল্লাহ তাআলার দরবারে তার দুআ অবশ্যই কবুল হবে। দুআ কবুলের ছয়টি সময় হলো-
১. রাতের শেষ তৃতীয়াংশ
২. আযান চলাকালে।
৩. আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়
৪. ফরজ নামাযের পর
৫. জুমার নামাযের খুতবার জন্য খতীব সাহেবের মিম্বারে আরোহণের সময়।
৬. (জুমার দিন) আসরের নামাযের পর সর্বশেষ সময়ে, মাগরিবের ওয়াক্তের আগ মুহূর্তে। [১]
সেই সাথে অন্তরের নিমগ্নতা ও হৃদয়ের আর্তিকে মুখের আবেদনমূলক ভাষায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে নিজেকে তুচ্ছ করে মিনতির সাথে নিজের প্রয়োজনকে তুলে ধরলে দুআ অবশ্যই কবুল হবে।
আল্লাহমুখী অন্তরের পাশাপাশি দুআকারী ব্যক্তি নিজেকে কিবলামুখী করে, দৈহিকভাবে পবিত্র হয়ে আল্লাহর নিকট নিজের উভয় হাত পেতে দেবে। দুআর শুরুতেই ভক্তি ও আবেগ নিয়ে আল্লাহর প্রসংশা পাঠ করে, প্রিয় নবীজির প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাবে। এরপর মহান আল্লাহর সামনে নিজেকে পূর্ণ সমর্পণ করে জীবনের গুনাহসমূহের ব্যাপারে তাওবা করতে থাকবে এবং গুনাহ মাফের ফরিয়াদ জানিয়ে নিজের সত্তাকে আল্লাহ তাআলার সামনে মোমের মতো বিগলিত করতে থাকবে। [২] তাওবা ও ইস্তিগফার শেষে আল্লাহ তাআলার দরবারে নিজেকে উপস্থিত ভেবে নিজের জরুরত ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরবে। ভিখ মাঙার মতোই কাকুতি-মিনতি করে করে নিজের কাঙ্ক্ষিত বিষয় বারবার চাইতে থাকবে। দুআ কবুলের আশা আর আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি প্রত্যাখ্যানের শঙ্কায় এক দোদুল্যমান হয়ে সে তার উদ্দেশ্যকে আল্লাহর সামনে তুলে ধরবে। দুআয় আল্লাহ তাআলার নাম, সিফাত ও একত্ববাদের উসীলা গ্রহণ করে নিজের প্রয়োজন পেশ করতে থাকবে।
দুআর পাশাপাশি দুআকারী ব্যক্তি নিজের কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জনের আশায় সাদাকাহ করবে। এই অবস্থার দুআ মহান আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে কখনোই প্রত্যাখ্যাত হতে পারে না।
বিশেষত নবীজি থেকে বর্ণিত দুআ ও মুনাজাত অথবা যেসব ইসমে আযম সম্বলিত বাক্যাবলির মাধ্যমে দুআ করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি সেই সকল দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না।
টিকাঃ
[১] এ ছাড়াও অন্যান্য কিছু সময়ের কথা আলাদাভাবে হাদীসে এসেছে। যেমন-ইফতারির মুহূর্তে রোযাদার ব্যক্তির দু'আ। তবে এই সময়টি যেহেতু শুধুমাত্র রোযাদার ব্যক্তির জন্যই নির্দিষ্ট তাই ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ তা উল্লেখ করেননি। -অনুবাদক
[২] পার্থিব জগতের মোহ-মায়া ত্যাগ করে, জাগতিক সকল কোলাহল ভুলে গিয়ে শুধুই আল্লাহর অস্তিত্বকে সামনে রেখে জীবনের পাপের কথা স্মরণ করে অনুশোচনার আগুনে নিজেকে ভস্ম করতে করতে মহান আল্লাহর দরবারে আরো বেশি আর্তনাদ করে উঠবে। ভেঙে পড়া বালুর ঢিবির মতোই সে অনুভব করবে নিজেকে, আস্তে আস্তে তার রিপু-সত্ত্বা বিলীন হয়ে যাচ্ছে পাপের অনুশোচনায় জাগ্রত উথাল-পাতাল ঢেউয়ের মাঝে। তাওবা করতে করতে একটা সময় বান্দা নিজেকে সামান্য বালুকণার মতো মনে করবে। সে অনুভব করবে এই বিশ্বজগতে কেউ নেই, কোথাও কিছুই নেই। অনন্ত অসীম মহান আল্লাহর সামনে সামান্য একটি বালুকণা হয়ে সে পড়ে আছে নিথর নির্জীবের মতো। বিড়বিড় কণ্ঠে তখন সে মহান আল্লাহর কাছে তার কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন তুলে ধরবে। ধীরে ধীরে গুনাহ মাফের এক অপার্থিব অনুভূতিতে তার সত্ত্বা জেগে উঠবে কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন নিয়ে। এবার শুরু হবে নিজের জরুরত ও প্রয়োজন পূরণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শিশুসুলভ ফরিয়াদ। অন্তর থেকে মিনতি জ্ঞাপন করে আল্লাহর কাছে ভিখ মাঙার মতো করে চাইতে থাকবে তার উদ্দিষ্ট বিষয়াদি। মহান আল্লাহর গুণবাচক নাম ও নামের মহত্ব বলে বলে দুআ করতে থাকবে। পাশাপাশি মুনাজাতের পূর্বে দান-সাদাকাহ করে নিজের দুআর শক্তিকে আরো কার্যকরী করে তুলবে। একইসাথে সুদৃঢ় বিশ্বাস, আশা ও ভয়ের পুঁজিতে ভর করে দুআকে আরো ক্রিয়াশীল করে তুলবে। তখনই এই মুনাজাত এমন এক অবস্থায় চলে যাবে যে, এই দুআ ফিরিয়ে দেয়ার মতো আর কিছুই থাকবে না। -অনুবাদক
📄 হাদীসে বর্ণিত দুআ
- আল্লাহর রাসূল একবার তাঁর এক সাহাবীকে এই বলে দুআ করতে শুনলেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
'আল্লাহ! আমি (মনেপ্রাণে) সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনিই আল্লাহ, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি একক, পরমুখাপেক্ষীতাহীন, আপনি কাউকে জন্ম দেননি, আপনাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। আপনার কোনো সমকক্ষ নেই। আমি আপনার এসব পরম-ক্ষমতাসম্পন্ন গুণের কথা স্মরণ করে আপনার নিকট প্রার্থনা করছি, আল্লাহ!'
এমন আবেগময় ভাষ্যের দুআ শুনে নবীজি বললেন, 'এই ব্যক্তি ইসমে আযমের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করছে। আল্লাহ তাআলার নিকট কোনো কিছুর জন্য এভাবে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা দান করেন। বস্তুত এভাবে আল্লাহকে ডাকা হলে আল্লাহ তাআলা সেই ডাকে সাড়া দেন।' [১]
আনাস � বলেন, 'আমি একদিন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের পাশে বসে ছিলাম। আমাদের পাশেই একজন লোক নামায পড়ে এই বলে মুনাজাত করতে লাগল—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ
“আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই জন্য। আপনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। আপনি মান্নান; পরম করুণাময়! আপনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকারী। হে মহাপরাক্রমশালী! সম্মানের আধার! হে অবিনশ্বর চিরঞ্জীব সত্তা! আমি তো আপনার কাছেই ফরিয়াদ করছি!”
'এই দুআ শুনে নবীজি ﷺ বললেন, “এই ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট ইসমে আযম অর্থাৎ তার মহান নাম ধরে ধরে দুআ করছে। আল্লাহর নিকট কোনো কিছুর জন্য এভাবে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআলা তা দান করেন। এভাবে আল্লাহকে ডাকা হলে আল্লাহ তাআলা সেই ডাকে সাড়া দেন।” [১]
আসমা বিনতু যায়েদ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেন, 'ইসমে আযম রয়েছে দুটি আয়াতের মধ্যে—
১. সূরা বাকারার ১৬৩ নম্বর আয়াতে—
وَإِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ
"আর তোমাদের ইলাহ তো কেবল একজনই। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তিনি রহমান, রহীম!”।
২. সূরা আলে ইমরানের শুরুতে—
الم - اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ
"আলিফ-লাম-মীম। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র ইলাহ। তিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর." [১]
আবু হুরায়রা, আনাস, রবীআহ ইবনু আমির প্রমুখ সাহাবী (রিদওয়ানুল্লাহি আনহুম আজমাঈন) থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন—
'তোমরা দুআর মধ্যে يَاذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ বলে রোনাজারি করতে থাকো।' [২]
অর্থাৎ দুআর সময় মহান আল্লাহর এই দুটি নামকে বেশি বেশি বলতে থাকো। আল্লাহকে এই দুটি নামে সম্বোধন করে তোমরা প্রার্থনা করতে থাকো।
অন্য এক হাদীসে আবু হুরায়রা বলেন, 'যখনই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোনো বিষয় বিচলিত করত, তিনি আসমানের দিকে (ওহীপ্রাপ্তির আশায়) মাথা উঁচু করে তাকাতেন। আর যখন দুআর মধ্যে কাকুতি-মিনতি বাড়িয়ে দিতেন, তখন বলতে থাকতেন- يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ'-হে চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর সত্তা!'
আনাস বলেন, নবীজি কোনো ব্যাপারে চিন্তিত হলে এই বলে দুআ করতেন- يَا حَيُّ يَا قَيُّوْمُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيْثُ -হে চিরঞ্জীব অবিনশ্বর সত্তা! আপনার রহমতের আশা নিয়ে সাহায্য চাচ্ছি। [৩]
নবীজি সূত্রে আবু উমামাহ বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলার ইসমে আযম কুরআনুল কারীমের তিনটি সূরার মধ্যে নিহিত আছে—
সূরা বাকারা।
সূরা আলে ইমরান।
সূরা তহা। [৪]
আল্লামা কাসিম বলেন, 'আমি এই তিনটি সূরায় তালাশ করে দেখি, ইসমে আযম হলো আল-হাইয়্যুল কাইয়্যুমের আয়াতটি।'
নবীজি সূত্রে সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন, যুন-নূন (নবী ইউনুস) আলাইহিস সালাম যখন মাছের পেটে আটকে ছিলেন, তখন মুক্তি লাভের আশায় আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করে বলেছিলেন—
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
'আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই! অন্তর থেকে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আল্লাহ! আমি তো (নিজের প্রতি) অন্যায় করে ফেলেছি।' নবীজি বলেন, 'বান্দা যখন কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহর নিকট এই দুআটি পড়ে সাহায্য চায়, আল্লাহ তাকে অবশ্যই সাহায্য করবেন।'[১]
সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণিত, নবীজি ইরশাদ করেন—
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشَيْءٍ إِذَا نَزَلَ بِرَجُلٍ مِنْكُمْ أَمْرُ مُهِمْ، فَدَعَا بِهِ يُفَرِّجُ اللَّهُ عَنْهُ؟ دُعَاءُ ذِي النُّونِ
'আমি তোমাদেরকে একটি বিশেষ দুআ জানিয়ে রাখি। যখন তোমাদের কেউ চিন্তাদায়ক কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে সেই দুআটি পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে চিন্তামুক্ত করে দেবেন। দুআটি হলো দুআয়ে ইউনুস।'[২]
অপর এক হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন, 'আমি কি তোমাদেরকে ইসমে আযমের সন্ধান দেব? তা হলো দুআয়ে ইউনুস।' জনৈক সাহাবী নিবেদন করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! এই দুআটি কি শুধুমাত্র ইউনুস আলাইহিস সালামের জন্যই?' আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তুমি কি কুরআনুল কারীমের এই আয়াতটি শোনোনি—
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
"আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছি, তাকে মুক্তি দিয়েছি। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে বিপদমুক্ত করে থাকি।""
এরপর নবীজি বলেন, 'কোনো মুসলমান অসুস্থাবস্থায় যখন এই দুআটি ৪০ বার পড়বে তখন সে যদি ঐ রোগাক্রান্ত অবস্থায় মারা যায় তাহলে তাকে শহীদী মৃত্যুর প্রতিদান দেয়া হবে। আর যদি সে আরোগ্য লাভ করে তাহলে সে (এই দুআর বরকতে) গুনাহমুক্ত অবস্থায় সুস্থ হবে।'[১]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বিবৃত ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র হাদীসে এসেছে, নবীজি যখন দুশ্চিন্তায় থাকতেন তখন আল্লাহর নিকট দুআ করে বলতেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ، وَرَبُّ الْأَرْضِ، وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
'পরম সহনশীল আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। মহান আরশের অধিপতি আল্লাহ তাআলাই একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য। আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি আসমানের রব, যমীনের রব। তিনি সুমহান আরশের রব।'২
আলী ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর নবী আমাকে বিপদের সময় পড়ার জন্য একটি দুআ শিখিয়ে দিয়েছেন। দুআটি হলো-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْحَلِيمُ الْكَرِيمُ، سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'মহা সম্মানিত পরম সহনশীল আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ তাআলার পবিত্রতার স্বতঃস্ফূর্ত ঘোষণা দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলা বড়ই বরকতময়। তিনি সুমহান আরশের অধিপতি। আর সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তাআলার জন্যই।'
মুসনাদু আহমাদে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন, 'যখনই কেউ বিপদগ্রস্থ হয়ে কিংবা দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে (নিম্নোক্ত) দুআটি পড়বে আল্লাহ তাআলা তাকে বিপদমুক্ত করে তার দুঃখ কষ্টকে আনন্দদায়ক পরিস্থিতিতে বদলে দেবেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ ابْنُ عَبْدِكَ ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حُكْمُكَ، عَدْلٌ فِي قَضَاؤُكَ، أَسْأَلُكَ اللَّهُمَّ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ الْعَظِيمَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجِلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي
'আল্লাহ! আমি তো আপনারই গোলাম! আপনারই কোনো গোলাম আর বাঁদির সন্তান। আপনার হাতের মুঠোয় আমার ভাগ্যরেখার পথচলা। আমার ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্তই কার্যকর। আপনার ফায়সালাই আমার জন্য সঠিক ও ন্যায়বিচার। আল্লাহ! আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি আপনার সকল নামকে উসীলা বানিয়ে। যেই নামসমূহ আপনি নিজেই নির্বাচন করেছেন নিজের জন্য। যেই নামের ব্যাপারে আপনি অবহিত করেছেন আপনার সৃষ্টজগতের কাউকে কাউকে। যেই নামের কথা আপনি অবতীর্ণ করেছেন আপনার পবিত্র কিতাবে। আপনার নিকট সংরক্ষিত অদৃশ্য জগতে যেই নামের মাধ্যমে আপনি নিজেকে একচ্ছত্র অধিপতি বানিয়েছেন। (এই সকল নামের গুণাবলির কার্যকারিতাকে পুঁজি করে আমি প্রার্থনা করছি, হে আল্লাহ!) আপনি পবিত্র কুরআনুল কারীমকে আমার হৃদয়ের বসন্ত বানিয়ে দিন। এই কুরআনকে আমার অন্তরের আলো বানিয়ে দিন। আমার দুঃখ কষ্টের মরীচিকা দূরকারী বানিয়ে দিন হে আল্লাহ! আপনার এই শাশ্বত গ্রন্থকে আমার সকল দুশ্চিন্তার উপশমকারী বানিয়ে দিন।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! দুআটি কি আমরা শিখে নিতে পারি?' নবীজি বললেন, 'যারা এই দুআটি শুনেছে, সকলেরই উচিত দুআটি শিখে রাখা।'১
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'নবীগণ বিপদগ্রস্ত হলে "সুবহানাল্লাহ” বলে (অর্থাৎ মহান আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ঘোষণা করে) সাহায্য প্রার্থনা করতেন।'
প্রখ্যাত আলিম ইবনু আবিদ দুনইয়া রচিত আদ-দুআ কিতাবে একটি ঘটনা বিবৃত আছে। ঘটনাটি হলো, আবু মুআল্লাক উপাধিতে পরিচিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন আনসার সাহাবী নিজের ও অন্যের পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি একজন পরহেযগার ও ইবাদাতগুজার ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গায় সফর করতেন। এমনই এক সফরে তিনি ডাকাতের কবলে পড়েন। খোলা তরবারি হাতে ডাকাত তাকে বলল, 'যা কিছু আছে দিয়ে দাও। তারপর তোমাকে মেরে ফেলব।'
আবু মুআল্লাক বললেন, 'তোমার তো আমার সম্পদের প্রয়োজন। আমি দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমাকে হত্যা করে কী লাভ তোমার?'
অস্ত্রধারী লোকটি বলল, 'তোমার সম্পদ যা আছে তা তো আমি নেবই, একইসাথে তোমাকেও আমি মেরে ফেলতে চাই। এটা আমার নিছকই এক মনোবাসনা।'
আবু মুআল্লাক বললেন, 'তাহলে আমাকে অন্তত চার রাকাত নামায পড়ার সুযোগ দাও।' অস্ত্রধারী তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, 'তোমার যা খুশি পড়ে নাও।' নবীজি'র এই সাহাবী ওযু করে চার রাকাত নামাযের শেষ সিজদায় আল্লাহর নিকট আকুলভাবে ফরিয়াদ জানিয়ে এই দুআ করতে লাগলেন-
يَا وَدُودُ يَا وَدُودُ، يَا ذَا الْعَرْشِ الْمَجِيدِ، يَا فَعَالًا لِمَا تُرِيدُ، أَسْأَلُكَ بِعِزِّكَ الَّذِي لَا يُرَامُ، وَبِمُلْكِكَ الَّذِي لَا يُضَامُ، وَبِنُورِكَ الَّذِي مَلَا أَرْكَانَ عَرْشِكَ أَنْ تَكْفِينِي شَرَّ هَذَا اللَّصِ، يَا مُغِيثُ أَغِثْنِي
'মুহাব্বাতকারী আল্লাহ! গৌরবময় আরশের অধিকর্তা, হে আল্লাহ! আপন ইচ্ছায় কার্য সম্পাদনকারী, হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি আপনার চির অমলিন সম্মানের উসীলায়। সাহায্য প্রার্থনা করছি আপনার একচ্ছত্র রাজত্বের কথা স্মরণ করে। আরশের চার স্তম্ভের ভরপুর নূরের উসীলা নিয়ে আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি, আল্লাহ! আপনি এই ডাকাতের মুকাবিলায় আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। হে সাহায্যকারী সত্তা! আপনি আমাকে সাহায্য করুন।'
দুআটি আবু মুআল্লাক তিনবার পড়তে না পড়তেই সেখানে সশস্ত্র এক অশ্বারোহীর আচানক আগমন ঘটে। ডাকাত লোকটি তাঁকে দেখতে পেয়ে মুকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে নিতে অশ্বারোহী হামলা করে বসেন তার ওপর এবং প্রথম হামলায়ই তাকে হত্যা করে ফেলেন। অতঃপর সিজদারত সাহাবীর দিকে ফিরে অশ্বারোহী বললেন, 'আপনি এবার উঠুন!'
সাহাবী বললেন, 'আমার বাবা-মা উৎসর্গিত হোন! আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে আজ আমাকে উদ্ধার করেছেন। আপনার পরিচয় জানতে চাই!'
'আমি চতুর্থ আসমানের ফিরিশতা! আপনি যখন প্রথমবার দুআ করলেন আমি আসমানের দরজায় "গড়গড়” আওয়াজ শুনতে পাই। আপনার দ্বিতীয়বারের দুআর কারণে ফিরিশতাদের মাঝে শোরগোলের আওয়াজ শোনা যায়। তৃতীয়বার যখন আপনি দুআ করলেন তখন ঘোষণা করা হলো, একজন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি দুআ করছে। তখন আমি আল্লাহ তাআলার নিকট আপনার হামলাকারীকে হত্যা করার জন্য অনুমতি চাই।'
হাসান বসরী বলেন, যে ব্যক্তি ওযু করে চার রাকাত নামায পড়ে (উপরে উল্লিখিত) এই দুআটি পড়বে তার ডাকে অবশ্যই সাড়া দেয়া হবে। চাই সে কোনো বিপদে আক্রান্ত হোক অথবা বিপদমুক্ত থাকুক।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২৯৬৫; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৯৩; তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৭৫; ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮৫৭
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৯৫
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৩
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৯৬; তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৭৮২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৮৩৫
[৩] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৫২৪
[৪] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮৫৬
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৫০৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৬২
[২] অর্থাৎ, ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে থাকাকালীন যে দুআটি পড়েছিলেন।
[৩] আল-জামিউস সাগীর, হাদীস-ক্রম: ২৮৪৬
[১] মুস্তাদরাকু হাকিম-১৮৬৫
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৩৪৬; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৩০
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ৩৭১২