📄 বিপদ-আপদ-প্রতিরোধে দুআর কয়েকটি স্তর
বান্দার উপর আরোপিত বিপদ প্রতিরোধে দুআর তিনটি স্তর রয়েছে-
১. কখনো দুআ গুণগতভাবে শক্তিশালী হয় ও পরিমাণে বেশি হয়। এমন দুআ বিপদের তুলনায় শক্তিশালী। এই স্তরের দুআ দ্বারা বিপদ দূর হয়।
২. কখনো বিপদের তুলনায় দুআর গুণগত মান দুর্বল হয়। এ অবস্থায় বান্দা বিপদগ্রস্ত হলে দুআর দুর্বলতা সত্ত্বেও বিপদ হ্রাস হয়।
৩. কখনো বান্দার দুআ করার পরিমাণ ও দুআর গুণগত অবস্থা আরোপিত বিপদের সমপর্যায়ে হয়। এ ক্ষেত্রে দুআর উপকারিতা ও আরোপিত বিপদ সমানতালে বান্দাকে ঘিরে রাখে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বলেন-
لَا يُغْنِي حَذَرُ مِنْ قَدَرٍ، وَالدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلُ، وَإِنَّ الْبَلَاءَ لَيَنْزِلُ فَيَلْقَاهُ الدُّعَاءُ فَيَعْتَلِجَانِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
'তাকদীরের ফায়সালায় সতর্ক থাকলেও লাভ হবে না। দুআ আগত-অনাগত সকল বালা-মুসীবতে বান্দাকে উপকৃত করে। দুআর অবস্থায় বান্দার উপর যখন বিপদ নেমে আসে তখন বান্দার দুআ ও উদ্ভূত বিপদ একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান করতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকে কিয়ামত পর্যন্ত।'
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
الدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ، فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللَّهِ بِالدُّعَاءِ
'বিপদ আসুক বা না আসুক-সর্বদা দুআ বান্দাকে উপকৃত করতে থাকে। সুতরাং তোমরা (আল্লাহর নিকট) দুআ করাকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নাও।
সাওবান (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا الْبِرُّ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
'দুআ ব্যতীত আর কিছুই তাকদীরের ফায়সালা ফিরিয়ে দিতে পারে না। মানুষের হায়াত কেবল নেক কাজের দ্বারাই বৃদ্ধি পায়। মানুষ তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদ আল-বাযযার-২৬৪; মুসতাদরাকু হাকিম-১/৪৯২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৫৪৮
[৩] জীবনের সময়ে বারাকাহ লাভ করে।
[৪] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২৪১৩, ২৮০; ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ১০, ৪০২২
📄 দুআর মধ্যে কাকুতি-মিনতি করা
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত থাকেন।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا تَعْجِزُوا فِي الدُّعَاءِ فَإِنَّهُ لَا يَهْلِكُ مَعَ الدُّعَاءِ أَحَدُ
'তোমরা (অন্তত) দুআ করতে অক্ষম হয়ো না। কেননা দুআ যার সঙ্গী, সে কখনো ধ্বংস হয় না।
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُلِحِينَ فِي الدُّعَاءِ
| 'আল্লাহ তাআলা কাকুতি-মিনতি করে দুআকারীদের ভালোবাসেন।'
কিতাবুয যুহদে ইমাম মুওয়াররিকের একটি উক্তি এভাবে আছে যে, তিনি বলেন, 'আমি একজন মুমিনের দৃষ্টান্ত হিসেবে ওই ব্যক্তিকেই পেশ করতে পারি, যে একটি কাঠের টুকরোয় সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আর ইয়া রব! ইয়া রব! বলে আর্তনাদ করছে, (এই মনোবাসনায় যে) আল্লাহ তাআলা এই ফরিয়াদের দরুণ হয়তো-বা তাকে উদ্ধার করবেন।'
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮২৭
[২] মুসনাদু ইবনি হিব্বান, হাদীস-ক্রম: ২৩৯৮
[৩] হাদীসটির সনদগত কোনো ভিত্তি নেই। তবে কোনো কোনো হাদীসে এর অর্থগত কিছুটা সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতেন তিনবার করে দুআ করতেন, আর যখন আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইতেন, তিনবার করে চাইতেন। -মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৭১৪
📄 দুআর প্রতিবন্ধকতা
দুআর প্রভাব প্রতিফলনে বেশকিছু বিষয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-
• যদি দুআকারী ব্যক্তি দুআর ফল পেতে তাড়াহুড়ো করতে থাকে।
• দুআর ফল প্রকাশে বিলম্ব দেখে যদি সে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়।
এই ধরনের অস্থিরচিত্তের ব্যক্তির অবস্থা হয় ওই লোকের মতো, যে বীজ বা গাছের চারা রোপণ করে জমিনে পানি সিঞ্চন করে এবং গাছের পরিচর্যা করতে থাকে। কিন্তু যখন ফসল হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে তখন সে বিলম্ব দেখে হতাশ হয়ে গাছের যত্ন নেয়া ছেড়ে দেয়।
আবু হুরায়রা ﵎ সূত্রে বিবৃত সহীহ বুখারীর বর্ণনা, নবীজি ﷺ বলেছেন-
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
'যতক্ষণ তোমরা তাড়াহুড়ো না করো, তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয়। অথচ তোমাদের কেউ কেউ (অধৈর্য হয়ে) বলে ফেলে, দুআ তো করলাম, কবুল তো হলো না।'
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজি ﷺ বলেন-
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمِ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الِاسْتِعْجَالُ؟ قَالَ يَقُولُ: قَدْ دَعَوْتُ، وَقَدْ دَعَوْتُ، فَلَمْ أَرَ يُسْتَجَابُ لِي، فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدَعُ الدُّعَاءَ
'বান্দা যদি কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের জন্য দুআ না করে এবং দুআ কবুলে তাড়াহুড়ো থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার সকল দুআই আল্লাহর দরবারে কবুল হতে থাকে।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়োর অর্থ কী?' নবীজি বললেন, 'বান্দা যখন দুআ করে বলতে থাকে- "দুআ তো করলাম, কিন্তু তা কবুল হওয়ার কোনো আলামতই দেখলাম না!"-এভাবে সে আক্ষেপ করতে করতে একসময় দুআ করা ছেড়ে দেয়।
অন্য হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرٍ مَّا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ يَسْتَعْجِلُ؟ قَالَ: يَقُولُ قَدْ دَعَوْتُ رَبِّي فَلَمْ يَسْتَجِبْ لِي
'মানুষ সর্বদা ভালো ও কল্যাণের মাঝেই থাকে যতক্ষণ না তাড়াহুড়ো করে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! কীভাবে তাড়াহুড়ো করা হয়?' নবীজি বললেন, 'তাড়াহুড়োর অর্থ হলো, মানুষ দুআ করে বলে-"আমি আল্লাহর নিকট দুআ করলাম অথচ আমার দুআ কবুল করা হলো না!"
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক-১/২১৩; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৮৪
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৩৫
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩১৯৮; শুয়াইব আয়নাউত হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহি বলেছেন।
📄 দুআ কবুলের সময়
বান্দা যখন কাঙ্ক্ষিত জিনিস অর্জনের জন্য বুকভরা আশা নিয়ে অন্তরের পূর্ণ একাগ্রতার সাথে ছয়টি সময়ের যেকোনো একটি সময়ে দুআ করবে আল্লাহ তাআলার দরবারে তার দুআ অবশ্যই কবুল হবে। দুআ কবুলের ছয়টি সময় হলো-
১. রাতের শেষ তৃতীয়াংশ
২. আযান চলাকালে।
৩. আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়
৪. ফরজ নামাযের পর
৫. জুমার নামাযের খুতবার জন্য খতীব সাহেবের মিম্বারে আরোহণের সময়।
৬. (জুমার দিন) আসরের নামাযের পর সর্বশেষ সময়ে, মাগরিবের ওয়াক্তের আগ মুহূর্তে। [১]
সেই সাথে অন্তরের নিমগ্নতা ও হৃদয়ের আর্তিকে মুখের আবেদনমূলক ভাষায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে নিজেকে তুচ্ছ করে মিনতির সাথে নিজের প্রয়োজনকে তুলে ধরলে দুআ অবশ্যই কবুল হবে।
আল্লাহমুখী অন্তরের পাশাপাশি দুআকারী ব্যক্তি নিজেকে কিবলামুখী করে, দৈহিকভাবে পবিত্র হয়ে আল্লাহর নিকট নিজের উভয় হাত পেতে দেবে। দুআর শুরুতেই ভক্তি ও আবেগ নিয়ে আল্লাহর প্রসংশা পাঠ করে, প্রিয় নবীজির প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাবে। এরপর মহান আল্লাহর সামনে নিজেকে পূর্ণ সমর্পণ করে জীবনের গুনাহসমূহের ব্যাপারে তাওবা করতে থাকবে এবং গুনাহ মাফের ফরিয়াদ জানিয়ে নিজের সত্তাকে আল্লাহ তাআলার সামনে মোমের মতো বিগলিত করতে থাকবে। [২] তাওবা ও ইস্তিগফার শেষে আল্লাহ তাআলার দরবারে নিজেকে উপস্থিত ভেবে নিজের জরুরত ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরবে। ভিখ মাঙার মতোই কাকুতি-মিনতি করে করে নিজের কাঙ্ক্ষিত বিষয় বারবার চাইতে থাকবে। দুআ কবুলের আশা আর আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি প্রত্যাখ্যানের শঙ্কায় এক দোদুল্যমান হয়ে সে তার উদ্দেশ্যকে আল্লাহর সামনে তুলে ধরবে। দুআয় আল্লাহ তাআলার নাম, সিফাত ও একত্ববাদের উসীলা গ্রহণ করে নিজের প্রয়োজন পেশ করতে থাকবে।
দুআর পাশাপাশি দুআকারী ব্যক্তি নিজের কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জনের আশায় সাদাকাহ করবে। এই অবস্থার দুআ মহান আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে কখনোই প্রত্যাখ্যাত হতে পারে না।
বিশেষত নবীজি থেকে বর্ণিত দুআ ও মুনাজাত অথবা যেসব ইসমে আযম সম্বলিত বাক্যাবলির মাধ্যমে দুআ করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি সেই সকল দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না।
টিকাঃ
[১] এ ছাড়াও অন্যান্য কিছু সময়ের কথা আলাদাভাবে হাদীসে এসেছে। যেমন-ইফতারির মুহূর্তে রোযাদার ব্যক্তির দু'আ। তবে এই সময়টি যেহেতু শুধুমাত্র রোযাদার ব্যক্তির জন্যই নির্দিষ্ট তাই ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ তা উল্লেখ করেননি। -অনুবাদক
[২] পার্থিব জগতের মোহ-মায়া ত্যাগ করে, জাগতিক সকল কোলাহল ভুলে গিয়ে শুধুই আল্লাহর অস্তিত্বকে সামনে রেখে জীবনের পাপের কথা স্মরণ করে অনুশোচনার আগুনে নিজেকে ভস্ম করতে করতে মহান আল্লাহর দরবারে আরো বেশি আর্তনাদ করে উঠবে। ভেঙে পড়া বালুর ঢিবির মতোই সে অনুভব করবে নিজেকে, আস্তে আস্তে তার রিপু-সত্ত্বা বিলীন হয়ে যাচ্ছে পাপের অনুশোচনায় জাগ্রত উথাল-পাতাল ঢেউয়ের মাঝে। তাওবা করতে করতে একটা সময় বান্দা নিজেকে সামান্য বালুকণার মতো মনে করবে। সে অনুভব করবে এই বিশ্বজগতে কেউ নেই, কোথাও কিছুই নেই। অনন্ত অসীম মহান আল্লাহর সামনে সামান্য একটি বালুকণা হয়ে সে পড়ে আছে নিথর নির্জীবের মতো। বিড়বিড় কণ্ঠে তখন সে মহান আল্লাহর কাছে তার কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন তুলে ধরবে। ধীরে ধীরে গুনাহ মাফের এক অপার্থিব অনুভূতিতে তার সত্ত্বা জেগে উঠবে কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন নিয়ে। এবার শুরু হবে নিজের জরুরত ও প্রয়োজন পূরণের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে শিশুসুলভ ফরিয়াদ। অন্তর থেকে মিনতি জ্ঞাপন করে আল্লাহর কাছে ভিখ মাঙার মতো করে চাইতে থাকবে তার উদ্দিষ্ট বিষয়াদি। মহান আল্লাহর গুণবাচক নাম ও নামের মহত্ব বলে বলে দুআ করতে থাকবে। পাশাপাশি মুনাজাতের পূর্বে দান-সাদাকাহ করে নিজের দুআর শক্তিকে আরো কার্যকরী করে তুলবে। একইসাথে সুদৃঢ় বিশ্বাস, আশা ও ভয়ের পুঁজিতে ভর করে দুআকে আরো ক্রিয়াশীল করে তুলবে। তখনই এই মুনাজাত এমন এক অবস্থায় চলে যাবে যে, এই দুআ ফিরিয়ে দেয়ার মতো আর কিছুই থাকবে না। -অনুবাদক