📄 দুআ সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ
দুআ বিপদ-আপদের দুশমন। বালা-মুসীবত প্রতিরোধে দুআ সবচেয়ে উপকারী হাতিয়ার। দুআ সকল মুশকিল আসান করে দেয়। প্রতিকূল অবস্থা প্রতিহত করে। দুআ হলো মুমিনের অস্ত্র। আলী ইবনু আবী তালিব সূত্রে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস-
الدُّعَاءُ سِلَاحُ الْمُؤْمِنِ، وَعِمَادُ الدِّينِ، وَنُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
'দুআ মুমিনের হাতিয়ার। দ্বীনের স্তম্ভ। আসমান ও যমীনের এক বিশেষ আলো।' [২]
টিকাঃ
[২] মুসতাদরাকু হাকিম-১/৪৯২
📄 বিপদ-আপদ-প্রতিরোধে দুআর কয়েকটি স্তর
বান্দার উপর আরোপিত বিপদ প্রতিরোধে দুআর তিনটি স্তর রয়েছে-
১. কখনো দুআ গুণগতভাবে শক্তিশালী হয় ও পরিমাণে বেশি হয়। এমন দুআ বিপদের তুলনায় শক্তিশালী। এই স্তরের দুআ দ্বারা বিপদ দূর হয়।
২. কখনো বিপদের তুলনায় দুআর গুণগত মান দুর্বল হয়। এ অবস্থায় বান্দা বিপদগ্রস্ত হলে দুআর দুর্বলতা সত্ত্বেও বিপদ হ্রাস হয়।
৩. কখনো বান্দার দুআ করার পরিমাণ ও দুআর গুণগত অবস্থা আরোপিত বিপদের সমপর্যায়ে হয়। এ ক্ষেত্রে দুআর উপকারিতা ও আরোপিত বিপদ সমানতালে বান্দাকে ঘিরে রাখে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বলেন-
لَا يُغْنِي حَذَرُ مِنْ قَدَرٍ، وَالدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلُ، وَإِنَّ الْبَلَاءَ لَيَنْزِلُ فَيَلْقَاهُ الدُّعَاءُ فَيَعْتَلِجَانِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
'তাকদীরের ফায়সালায় সতর্ক থাকলেও লাভ হবে না। দুআ আগত-অনাগত সকল বালা-মুসীবতে বান্দাকে উপকৃত করে। দুআর অবস্থায় বান্দার উপর যখন বিপদ নেমে আসে তখন বান্দার দুআ ও উদ্ভূত বিপদ একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান করতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকে কিয়ামত পর্যন্ত।'
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
الدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ، فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللَّهِ بِالدُّعَاءِ
'বিপদ আসুক বা না আসুক-সর্বদা দুআ বান্দাকে উপকৃত করতে থাকে। সুতরাং তোমরা (আল্লাহর নিকট) দুআ করাকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নাও।
সাওবান (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا الْبِرُّ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
'দুআ ব্যতীত আর কিছুই তাকদীরের ফায়সালা ফিরিয়ে দিতে পারে না। মানুষের হায়াত কেবল নেক কাজের দ্বারাই বৃদ্ধি পায়। মানুষ তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদ আল-বাযযার-২৬৪; মুসতাদরাকু হাকিম-১/৪৯২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৫৪৮
[৩] জীবনের সময়ে বারাকাহ লাভ করে।
[৪] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২৪১৩, ২৮০; ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ১০, ৪০২২
📄 দুআর মধ্যে কাকুতি-মিনতি করা
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত থাকেন।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا تَعْجِزُوا فِي الدُّعَاءِ فَإِنَّهُ لَا يَهْلِكُ مَعَ الدُّعَاءِ أَحَدُ
'তোমরা (অন্তত) দুআ করতে অক্ষম হয়ো না। কেননা দুআ যার সঙ্গী, সে কখনো ধ্বংস হয় না।
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُلِحِينَ فِي الدُّعَاءِ
| 'আল্লাহ তাআলা কাকুতি-মিনতি করে দুআকারীদের ভালোবাসেন।'
কিতাবুয যুহদে ইমাম মুওয়াররিকের একটি উক্তি এভাবে আছে যে, তিনি বলেন, 'আমি একজন মুমিনের দৃষ্টান্ত হিসেবে ওই ব্যক্তিকেই পেশ করতে পারি, যে একটি কাঠের টুকরোয় সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আর ইয়া রব! ইয়া রব! বলে আর্তনাদ করছে, (এই মনোবাসনায় যে) আল্লাহ তাআলা এই ফরিয়াদের দরুণ হয়তো-বা তাকে উদ্ধার করবেন।'
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮২৭
[২] মুসনাদু ইবনি হিব্বান, হাদীস-ক্রম: ২৩৯৮
[৩] হাদীসটির সনদগত কোনো ভিত্তি নেই। তবে কোনো কোনো হাদীসে এর অর্থগত কিছুটা সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতেন তিনবার করে দুআ করতেন, আর যখন আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইতেন, তিনবার করে চাইতেন। -মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৭১৪
📄 দুআর প্রতিবন্ধকতা
দুআর প্রভাব প্রতিফলনে বেশকিছু বিষয় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-
• যদি দুআকারী ব্যক্তি দুআর ফল পেতে তাড়াহুড়ো করতে থাকে।
• দুআর ফল প্রকাশে বিলম্ব দেখে যদি সে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়।
এই ধরনের অস্থিরচিত্তের ব্যক্তির অবস্থা হয় ওই লোকের মতো, যে বীজ বা গাছের চারা রোপণ করে জমিনে পানি সিঞ্চন করে এবং গাছের পরিচর্যা করতে থাকে। কিন্তু যখন ফসল হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে তখন সে বিলম্ব দেখে হতাশ হয়ে গাছের যত্ন নেয়া ছেড়ে দেয়।
আবু হুরায়রা ﵎ সূত্রে বিবৃত সহীহ বুখারীর বর্ণনা, নবীজি ﷺ বলেছেন-
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
'যতক্ষণ তোমরা তাড়াহুড়ো না করো, তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয়। অথচ তোমাদের কেউ কেউ (অধৈর্য হয়ে) বলে ফেলে, দুআ তো করলাম, কবুল তো হলো না।'
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজি ﷺ বলেন-
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمِ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الِاسْتِعْجَالُ؟ قَالَ يَقُولُ: قَدْ دَعَوْتُ، وَقَدْ دَعَوْتُ، فَلَمْ أَرَ يُسْتَجَابُ لِي، فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدَعُ الدُّعَاءَ
'বান্দা যদি কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের জন্য দুআ না করে এবং দুআ কবুলে তাড়াহুড়ো থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার সকল দুআই আল্লাহর দরবারে কবুল হতে থাকে।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়োর অর্থ কী?' নবীজি বললেন, 'বান্দা যখন দুআ করে বলতে থাকে- "দুআ তো করলাম, কিন্তু তা কবুল হওয়ার কোনো আলামতই দেখলাম না!"-এভাবে সে আক্ষেপ করতে করতে একসময় দুআ করা ছেড়ে দেয়।
অন্য হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرٍ مَّا لَمْ يَسْتَعْجِلْ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ يَسْتَعْجِلُ؟ قَالَ: يَقُولُ قَدْ دَعَوْتُ رَبِّي فَلَمْ يَسْتَجِبْ لِي
'মানুষ সর্বদা ভালো ও কল্যাণের মাঝেই থাকে যতক্ষণ না তাড়াহুড়ো করে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! কীভাবে তাড়াহুড়ো করা হয়?' নবীজি বললেন, 'তাড়াহুড়োর অর্থ হলো, মানুষ দুআ করে বলে-"আমি আল্লাহর নিকট দুআ করলাম অথচ আমার দুআ কবুল করা হলো না!"
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক-১/২১৩; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৪৮৪
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৭৩৫
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩১৯৮; শুয়াইব আয়নাউত হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহি বলেছেন।