📄 হারাম : দুআ কবুলের অন্তরায়
* হারাম খাদ্যগ্রহণও দুআর আধ্যাত্মিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন, 'লোকসকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে যা আদেশ করেছেন মুমিনদেরকেও তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
"হে আমার রাসূলগণ! আপনারা পবিত্র খাবার গ্রহণ করুন এবং সৎকাজ করতে থাকুন। নিশ্চয়ই আমি আপনাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারে সম্যক
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে-রিযিক দিয়েছি তা থেকে তোমরা হালাল খাদ্য গ্রহণ করো।"
এরপর নবীজি বলেন, 'কোনো কোনো লোক সফর করতে করতে উষ্কখুষ্ক চুলে ধূলিমলিন অবস্থায় আকাশ পানে দুই হাত উঠিয়ে দুআ করতে থাকে-“হে আমার রব! আমার প্রতিপালক!" অথচ তার পোষাক হারাম, খাবার-দাবার হারাম! হারাম খাদ্যেই তার শরীরের গঠিত হয়েছে! এই ব্যক্তির দুআ কীভাবে কবুল হবে!'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) রচিত কিতাবুয যুহদে তাঁর সন্তানের ভাষ্যে একটি ঘটনা বিবৃত আছে। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের উপর একবার বড় ধরনের দুর্যোগ নেমে আসে। ফলে দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে তারা শহরের বাইরে এসে সম্মিলিতভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে লাগল। আল্লাহ তাআলা তাদের নবীদের নিকট ওহী প্রেরণ করলেন- 'হে নবী! আপনি তাদেরকে আমার এই পয়গাম জানিয়ে দিন, হে লোক সকল! তোমরা নাপাক শরীরে শহরের বাইরের ময়দানে এসে আজ আমার সামনে একত্রিত হয়েছ! যেই হাত তোমরা অন্যায়ভাবে রক্তে রঞ্জিত করেছ সেই হাত আজ তোমরা আমার দরবারে পেতে দিয়েছ। এই হাত দিয়েই তো তোমরা তোমাদের ঘরকে হারাম উপার্জনে ভরপুর করেছ! আর আজ যখন আমার জাগতিক আযাব তোমাদের উপর আসন্ন হয়ে উঠেছে তখন তোমরা আমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছ! আজ তোমরা আমার দরবার থেকে শুধু বিতাড়িতই হবে।'
আবু যর গিফারী (রাঃ) বলেন, 'সততার সাথে (অল্প) দুআও মুক্তি লাভের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়, যেভাবে সামান্য পরিমাণের লবণ যথেষ্ট হয় পুরো খাবারের সুস্বাদের জন্য।' [১]
টিকাঃ
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্রম: ৫১
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৭২
[৩] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১০১৫
[৪] শুআবুল ঈমান, বাইহাকী-৩/৩৪৯
[১] কিতাবুয যুহদ, ইমান আহমাদ, পৃষ্ঠা-ক্রম: ১৪৬
📄 দুআ সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ
দুআ বিপদ-আপদের দুশমন। বালা-মুসীবত প্রতিরোধে দুআ সবচেয়ে উপকারী হাতিয়ার। দুআ সকল মুশকিল আসান করে দেয়। প্রতিকূল অবস্থা প্রতিহত করে। দুআ হলো মুমিনের অস্ত্র। আলী ইবনু আবী তালিব সূত্রে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস-
الدُّعَاءُ سِلَاحُ الْمُؤْمِنِ، وَعِمَادُ الدِّينِ، وَنُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
'দুআ মুমিনের হাতিয়ার। দ্বীনের স্তম্ভ। আসমান ও যমীনের এক বিশেষ আলো।' [২]
টিকাঃ
[২] মুসতাদরাকু হাকিম-১/৪৯২
📄 বিপদ-আপদ-প্রতিরোধে দুআর কয়েকটি স্তর
বান্দার উপর আরোপিত বিপদ প্রতিরোধে দুআর তিনটি স্তর রয়েছে-
১. কখনো দুআ গুণগতভাবে শক্তিশালী হয় ও পরিমাণে বেশি হয়। এমন দুআ বিপদের তুলনায় শক্তিশালী। এই স্তরের দুআ দ্বারা বিপদ দূর হয়।
২. কখনো বিপদের তুলনায় দুআর গুণগত মান দুর্বল হয়। এ অবস্থায় বান্দা বিপদগ্রস্ত হলে দুআর দুর্বলতা সত্ত্বেও বিপদ হ্রাস হয়।
৩. কখনো বান্দার দুআ করার পরিমাণ ও দুআর গুণগত অবস্থা আরোপিত বিপদের সমপর্যায়ে হয়। এ ক্ষেত্রে দুআর উপকারিতা ও আরোপিত বিপদ সমানতালে বান্দাকে ঘিরে রাখে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বলেন-
لَا يُغْنِي حَذَرُ مِنْ قَدَرٍ، وَالدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلُ، وَإِنَّ الْبَلَاءَ لَيَنْزِلُ فَيَلْقَاهُ الدُّعَاءُ فَيَعْتَلِجَانِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
'তাকদীরের ফায়সালায় সতর্ক থাকলেও লাভ হবে না। দুআ আগত-অনাগত সকল বালা-মুসীবতে বান্দাকে উপকৃত করে। দুআর অবস্থায় বান্দার উপর যখন বিপদ নেমে আসে তখন বান্দার দুআ ও উদ্ভূত বিপদ একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান করতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকে কিয়ামত পর্যন্ত।'
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
الدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ، فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللَّهِ بِالدُّعَاءِ
'বিপদ আসুক বা না আসুক-সর্বদা দুআ বান্দাকে উপকৃত করতে থাকে। সুতরাং তোমরা (আল্লাহর নিকট) দুআ করাকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নাও।
সাওবান (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) ইরশাদ করেন-
لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمُرِ إِلَّا الْبِرُّ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
'দুআ ব্যতীত আর কিছুই তাকদীরের ফায়সালা ফিরিয়ে দিতে পারে না। মানুষের হায়াত কেবল নেক কাজের দ্বারাই বৃদ্ধি পায়। মানুষ তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদ আল-বাযযার-২৬৪; মুসতাদরাকু হাকিম-১/৪৯২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৫৪৮
[৩] জীবনের সময়ে বারাকাহ লাভ করে।
[৪] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২৪১৩, ২৮০; ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ১০, ৪০২২
📄 দুআর মধ্যে কাকুতি-মিনতি করা
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে না আল্লাহ তাআলা তার উপর রাগান্বিত থাকেন।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا تَعْجِزُوا فِي الدُّعَاءِ فَإِنَّهُ لَا يَهْلِكُ مَعَ الدُّعَاءِ أَحَدُ
'তোমরা (অন্তত) দুআ করতে অক্ষম হয়ো না। কেননা দুআ যার সঙ্গী, সে কখনো ধ্বংস হয় না।
আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُلِحِينَ فِي الدُّعَاءِ
| 'আল্লাহ তাআলা কাকুতি-মিনতি করে দুআকারীদের ভালোবাসেন।'
কিতাবুয যুহদে ইমাম মুওয়াররিকের একটি উক্তি এভাবে আছে যে, তিনি বলেন, 'আমি একজন মুমিনের দৃষ্টান্ত হিসেবে ওই ব্যক্তিকেই পেশ করতে পারি, যে একটি কাঠের টুকরোয় সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আর ইয়া রব! ইয়া রব! বলে আর্তনাদ করছে, (এই মনোবাসনায় যে) আল্লাহ তাআলা এই ফরিয়াদের দরুণ হয়তো-বা তাকে উদ্ধার করবেন।'
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ৩৮২৭
[২] মুসনাদু ইবনি হিব্বান, হাদীস-ক্রম: ২৩৯৮
[৩] হাদীসটির সনদগত কোনো ভিত্তি নেই। তবে কোনো কোনো হাদীসে এর অর্থগত কিছুটা সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দুআ করতেন তিনবার করে দুআ করতেন, আর যখন আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইতেন, তিনবার করে চাইতেন। -মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৭১৪