📄 অজ্ঞতার প্রতিকার
নবী কারীম অজ্ঞতাকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে জ্ঞানী বা আলিম ব্যক্তিবর্গের শরণাপন্ন হতে হবে, তাঁদের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে অজ্ঞতাকে দূর করতে হবে।
সুনানু আবি দাউদে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু'র ভাষ্যে একটি ঘটনা বিবৃত হয়েছে। তিনি বলেন, 'শীতকালে আমরা একটি সফরে ছিলাম। পাথরের আঘাতে আমাদের এক সফরসঙ্গীর মাথা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ঘটনাক্রমে ওই রাতে তাঁর স্বপ্নদোষ হয়ে যায়। কিন্তু পবিত্রতা হাসিল করতে গোসল করাকে তিনি আঘাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলেন। সফরসঙ্গীদের নিকট পরামর্শ চাইলেন-এই অবস্থায় গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করা যাবে কি না। সঙ্গীরা তাৎক্ষণিক জানা-শোনা থেকে বললেন, "যেহেতু পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে, আর তুমিও পানি ব্যবহারে সক্ষম, তাই আমরা তোমার জন্য তায়াম্মুম করার কোনো অবকাশ দেখছি না।" এ কথা শুনে তিনি গোসল করে নিলেন। ফলে ক্ষতস্থান দিয়ে মাথার ভেতরে পানি ঢুকে যায় এবং তিনি মারা যান। এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর নবীজির কাছে পৌঁছুলে নবীজি ইরশাদ করেন-
قَتَلُوهُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَلَا سَأَلُوا إِذَا لَمْ يَعْلَمُوا فَإِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيَ السُّؤَالُ إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيهِ أَنْ يَتَيَمَّمَ وَيَعْصِرَ - أَوْ يَعْصِبَ - عَلَى جُرْحِهِ خِرْقَةٌ ثُمَّ يَمْسَحُ عَلَيْهَا، وَيَغْسِلُ سَائِرَ جَسَدِهِ
"তার সঙ্গীরা তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। তারা যেহেতু জানত না, তাহলে কেন তারা জিজ্ঞেস করল না! অজ্ঞতা নামক ব্যাধির চিকিৎসা হলো প্রশ্ন করা। এই ব্যক্তির জন্য তো তায়াম্মুমই যথেষ্ট ছিল। অথবা মাথায় একটি ব্যান্ডেজ বেঁধে গোসল করলেও পারত, এমতাবস্থায় ব্যান্ডেজের ওপর মাসেহ করে নিলেই হতো।"১
উল্লিখিত হাদীসে নবী কারীম খুব স্পষ্টভাবেই একটি বিষয় তুলে ধরেছেন যে, অজ্ঞতা হলো এক ধরনের মানবব্যাধি। প্রশ্ন করাই এই ব্যাধির চিকিৎসা। আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কালামুল্লাহকে বিশ্বাসীদের জন্য 'শিফা' বলে উল্লেখ করেছেন।
টিকাঃ
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৩৩৬
📄 কুরআনে শিক্ষা বা আরোগ্যের আলোচনা
আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ أَأَعْجَمِيٌّ وَعَرَبِيُّ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءُ
'যদি আমি এই কিতাবকে অনারব ভাষার কুরআন বানাতাম, তাহলে তারাই বলত যে, এর আয়াতসমূহকে কেন স্পষ্ট করা হলো না! কী আশ্চর্য! কুরআন অনারবী ভাষায় আর রাসূল হলেন আরবী ভাষার! হে নবী, আপনি তাদেরকে বলে দিন, এই কুরআন হলো ঈমানদারদের জন্য হিদায়াত ও শিফা।।২
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
'কুরআনে নাযিলকৃত আয়াতের মধ্যে আমি মুমিনদের জন্য রহমত ও শিফা অবতীর্ণ করেছি। ১৯
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের একটি মৌলিক গুণ তুলে ধরেছেন। কুরআনুল কারীমের একটি মৌলিক গুণ হলো, তা মানবজাতির জন্য রহমত ও শিফা হিসেবে কাজ করবে। কুরআনুল কারীম হলো সকল অজ্ঞতা, সন্দেহ, সংশয় ও দোদুল্যমানতার কার্যকরী ওষুধ। মানবিক ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনের চেয়ে অধিক ব্যাপ্ত, উপকারী, শক্তিশালী ও কার্যকরী কোনো ওষুধ অবতীর্ণ করেননি।
এ প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বিবৃত একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আবু সাঈদ খুদরী সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন সাহাবী একটি সফরে ছিলেন। পথিমধ্যে তাঁরা আরবের একটি গ্রামে যাত্রাবিরতি দিয়ে স্থানীয়দের কাছে আতিথেয়তার আবেদন জানান। কিন্তু স্থানীয়রা তা প্রত্যাখান করে। ঘটনাক্রমে সে সময়ে গ্রামের সরদারকে বিষধর সাপ দংশন করে বসে। গ্রামবাসী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সরদারকে সাপের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এক লোক তখন পরামর্শ দেয়-"আমাদের গ্রামে আগত মুসাফিরদের কারো কাছে হয়তো বিষক্রিয়া বন্ধের কোনো চিকিৎসা থাকতে পারে। আমাদের উচিত মুসাফির কাফেলার শরণ নেওয়া।" গ্রামবাসী সাহাবীদের কাছে এসে তাদের সরদারের বিষয়টা অবহিত করে বলে, "আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও বিষের ক্রিয়া থামাতে পারিনি। আপনাদের কারো কাছে বিষক্রিয়া বন্ধের কোনো ওষুধ বা উপায় জানা থাকলে অনুগ্রহপূর্বক আমাদের সরদারকে রক্ষা করুন!" তখন সাহাবীদের মধ্য থেকে একজন বললেন, "আল্লাহর শপথ! আমি বিষক্রিয়া বন্ধের রুকইয়া (ঝাড়ফুঁক) জানি। কিন্তু তোমরা যেহেতু আমাদেরকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করোনি, তাই আমিও এখন আর বিনা পারিশ্রমিকে তোমাদেরকে রুকইয়া করব না। রুকইয়ার বিনিময়ে আমাদেরকে একপাল মেষ দিতে হবে। গ্রামবাসী এই পারিশ্রমিকে রাজি হলে ওই সাহাবী সরদারের কাছে এসে সূরা ফাতিহা পড়ে পড়ে ফুঁ দিয়ে আল্লাহর কুদরতে বিষক্রিয়ার যন্ত্রণা থেকে তাকে রক্ষা করেন। সূরা ফাতিহার বরকতে আল্লাহ তাআলা তাকে এমনভাবে সুস্থ করে দেন, যেন তার কোনো যন্ত্রণাই ছিল না। সে যেন কোনো বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েছে—এমন উদ্যম নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সরদারের রোগমুক্তিতে গ্রামবাসীরা সাহাবীদেরকে ওয়াদাকৃত বকরির পাল দিয়ে দেয়। তখন কাফেলার কেউ কেউ বলতে লাগলেন, "বকরির পাল আমাদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হোক।" কিন্তু রুকইয়াকারী সাহাবী এতে অসম্মত হয়ে বললেন, "এই বকরির ব্যাপারে নবীজির সিদ্ধান্ত কী, জানতে হবে।" তাঁরা সফর শেষে নবীজির মজলিসে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করেন। নবীজি বললেন, "চমৎকার কাজ করেছ, সূরা ফাতিহার রুকইয়া তোমরা কীভাবে জানলে! বকরিগুলো সকলে ভাগ করে নিতে পারো, আমার জন্যও একভাগ রেখো।"
উল্লিখিত ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সূরা ফাতিহার আরোগ্যশক্তি এতটাই কার্যকর যে, রোগীকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, সে কিছুক্ষণ আগেও সাপের বিষে আক্রান্ত ছিল। অথচ সূরা ফাতিহা হলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল একটি সূরা। এ কথা বাস্তব যে, যদি কেউ সূরা ফাতিহাকে রুকইয়ার জন্য উত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সে অবশ্যই এর বিস্ময়কর প্রভাব দেখতে পাবে।
ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, আমি দীর্ঘকাল মক্কায় অবস্থান করেছি। এই সময়ে নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছি। মক্কায় চিকিৎসাব্যবস্থা সহজলভ্য না হওয়ায় এই সময়ে আমি নিজের অসুখের চিকিৎসা নিজেই করেছি সূরা ফাতিহার মাধ্যমে। আলহামদুলিল্লাহ! সূরা ফাতিহার বিস্ময়কর শক্তি আমি দেখেছি! রোগ নিরাময়ের এক অলৌকিক শক্তি পেয়েছি এ সূরায়। লোকজন আমার কাছে অসুস্থতার কথা বললে সূরা ফাতিহার আমল বলে দিতাম। আলহামদুলিল্লাহ, তারা এ আমলের ওসীলায় দ্রুততর সময়ে উপকৃত হতো।
একটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত: কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত এসব দুআ অবশ্যই রোগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তবে এক্ষেত্রে রোগের ধরন, রোগী, ফু-দানকারীর আভ্যন্তরীণ যোগ্যতা, দুআর উপর অগাধ বিশ্বাস-ইত্যাদি বেশকিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থা দুআ কবুলের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব রাখে। যা আমরা স্বাভাবিক ওষুধ-পথ্যেও দেখতে পাই। সঠিক ওষুধ প্রয়োগের পরও রোগের ধরন বা রোগীর শারীরিক অবস্থা-ইত্যাদির উপর রোগীর সুস্থতার গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। একইভাবে মানুষের দৈহিক ও আত্মিক ব্যাধি, ব্যক্তিজীবনের আনুষঙ্গিক নানা বিষয় কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন দুআর মাধ্যমে নিরাময় ও প্রভাবিত হয়। তাই তার অন্তরের অবস্থা, পঠিত দুআর প্রতি তার বিশ্বাস-ভক্তি, তাওয়াক্কুল, ফু-দানকারীর প্রতি তার তীব্র আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি নানা বিষয় এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টিকাঃ
[২] সূরা হা-মীম সিজদাহ, আয়াত-ক্রম: ৪৪
[১] সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-ক্রম: ৮২
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫৭৪৯; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৭২৭; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৩৯০০; তিরিমিযী, হাদীস-ক্রম: ২০৬৩
📄 দুআ অকল্যাণ বিদূরিত করে
অপছন্দনীয় বিষয়কে পাশ কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনে দুআ হলো অন্যতম একটি কার্যকরী অবলম্বন। দুআকে পুঁজি করে মানুষ সহজেই অর্জন করে নিতে পারে তার উদ্দেশ্য। তবে উদ্দেশ্য অর্জনে দুআর কার্যকারিতা একেকসময় একেকরকম হতে পারে।
হয়তো দুর্বলভাবে কোনো রকমে দায়সারাভাবে দুআ করা হয় কিংবা দুআর মাধ্যমে যেই জিনিসের প্রার্থনা করা হচ্ছে তা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়।
আবার কখনো প্রার্থনাকারীর অন্তরের দুর্বলতা, দুআর সময়ে অন্তরে পূর্ণ আল্লাহমুখিতা না থাকা কিংবা অন্তরের পূর্ণ মনোযোগকে আল্লাহর দরবারে আবদ্ধ রাখতে না পারাও দুআ কবুল না হওয়ার অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে দুআ হয়ে যায় ঢিলেঢালা একটি ধনুকের মতো। এই ধনুক থেকে ছোড়া তির ধীর গতির হয়।
আবার কখনো দুআ কবুলের জন্য এমন কোনো প্রতিবন্ধক অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, যা অনুভব করা যায় না কিন্তু দুআ কবুল হওয়ার শর্ত এতে নষ্ট হয়ে যায়। যেমন-হারাম খাদ্যগ্রহণ, অন্তর কোনো গুনাহে লিপ্ত আছে; কিংবা গাফলত, অপরাধপ্রবণতা যদি অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে থাকে তাহলেও আল্লাহর দরবারে দুআ কবুল হতে বাধাগ্রস্ত হয়।
📄 উদাসীন ব্যক্তির দুআ
আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত, নবীজি ইরশাদ করেন-
ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالْإِجَابَةِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لَا
'তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট এমনভাবে দুআ করো যেন তোমাদের অন্তরে দুআ কবুলের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। মনে রেখো, আল্লাহ তাআলা কোনো গাফেল-বেখেয়াল অন্তরের দুআ কবুল করেন না।
হাদীসে বর্ণিত পদ্ধতির দুআ হলো মানব-ব্যাধিকে দূর করার উপকারী পথ্য। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে অন্তরের উদাসীনতা এই দুআর কার্যকারিতাকে দুর্বল করে ফেলে।
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীসক্রম: ৩৪৭৯