📄 ইচ্ছাশক্তির বিবেচনায় মানুষের প্রকারভেদ
আমি বললাম, 'তাহলে, সব মানুষই ইচ্ছার অধিকারী হলেও এ-ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন প্রকারের হবে!'
শাইখ বললেন, 'ইচ্ছার ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকারের। এক প্রকারের লোক নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী ইরাদা করে ফেলে। এরা আসলে নফস ও শয়তানের গোলাম。
আরেক প্রকারের লোক মনে করে, তারা সম্পূর্ণভাবে ইচ্ছা-ইরাদা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে, আল্লাহর তাকদির ব্যতীত তাদের নিজস্ব কোনো উদ্দিষ্ট বস্তু নেই; এই প্রকারের লোকদের ধারণা, তাদের ধরে-নেওয়া এই স্তরটিই সবচেয়ে কামালিয়ত ও পূর্ণাঙ্গতার স্তর; যে এই স্তরটি লাভ করে সে-ই হাকিকতে পৌঁছুয়; আর, হাকিকত হলো, সৃষ্টি ও তাকদিরগত বাস্তবতা; এবং এমন লোকই আল্লাহর সর্বব্যাপী বিরাজিত ক্ষমতার দর্শন লাভ করেছে। তারা আরও ধারণা করে যে, ফানা হলো রবের তাওহিদের দর্শন ও অনুভব লাভ করা; এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য ও গন্তব্য। তারা এই পুরো বিষয়টির নাম দিয়েছে— জমা, ফানা ও ইসত্বিলাম; তথা, একত্রকরণ, বিলীন হওয়া, এবং মূল থেকে উপড়ে আনা。
'এরকম বহু উদ্ভট কথাবার্তা সুফিদের মাঝে প্রচলিত আছে; বহু শাইখ যেখানে পদস্খলনের শিকার হয়েছেন。
'এই বিষয়টিতে এসে শাইখ জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ ও তাঁর একদল সুফি-সাথির মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে তাঁরা সবাই রবের তাওহিদের দর্শন এবং আল্লাহ তাআলা যে সবকিছুর স্রষ্টা, রব ও অধিকর্তা—এর অনুভবের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন “শুহুদুল কদর” তথা তাকদিরের দর্শন ও অনুভব। আবার একে “মাকামুল জমা”-ও বলেছেন, অর্থাৎ, একত্রকরণ-স্তর; কারণ, এর মাধ্যমে বান্দা "প্রথম-বিচ্ছিন্নতা” থেকে বেরিয়ে যায়। “প্রথম বিচ্ছিন্নতা” হলো, "স্বভাবী বিচ্ছিন্নতা"; যার ফলে ব্যক্তি স্বাধীনভাবে কোনো একটা কিছুর ইরাদা করে; আবার অন্য আরেকটাকে অপছন্দ করে; কোনো কাজ করা-না-করার বেলায় নিজস্ব মত ব্যক্ত করে। আসলে মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত রবের তাওহিদের অনুভব ও দর্শন লাভ না-করে, ততক্ষণ সে মাখলুকের জন্য কোনো একটা কাজ করে ফেলা বৈধ মনে করে, যেটার ফলে তার মন মাখলুকের কর্ম অনুভবের ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে; পরিণামে, সে স্বভাব ও প্রবৃত্তির অনুসারীতে পরিণত হয়। এরপর, যখনই সে হক ও সত্যের ইরাদা করে, তখনই তার এই ইরাদার মাধ্যমে স্বভাব ও প্রবৃত্তির ইরাদা থেকে সে বেরিয়ে আসে। তখন সে অনুভব করতে পারে, যে, আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর স্রষ্টা; সবকিছুকে এইভাবে এক বিন্দুতে একত্র করার অনুভবের ফলে, সে আগের বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসে。
'এই বক্তব্যে যখন তাঁরা সবাই একমত হলেন, তখন জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহ তাঁদের কাছে “দ্বিতীয় বিচ্ছিন্নতা" তুলে ধরলেন; যা ওই "একত্রকরণ”-এর পরে হবে; আর, সেটা হলো "শরয়ি বিচ্ছিন্নতা”। তিনি বললেন, “দেখুন, শরিয়ত আমাদেরকে যেটার আদেশ করে, আমরা সেটারই ইরাদা করার (বৈধ) ক্ষমতা রাখি; যেটা থেকে আমাদেরকে নিষেধ করে, সেটার ইরাদা করার (বৈধ) স্বাধীনতা আমাদের নেই; এমনিভাবে আমরা অনুভব করি, আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত, অন্য কেউ নয়; আবার, তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যও হয় তাঁর রাসূলগণের অনুসরণের মাধ্যমে। তো, এভাবেই আল্লাহর আদেশকৃত ও নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও পার্থক্য তৈরি হয়, পার্থক্য হয় তাঁর দোস্ত-দুশমনদের মধ্যেও। এ-পর্যায়ে পৌঁছুলেই অনুভব করা যায় উনার তাওহিদ。
'এই বিচ্ছিন্নতার কথায় এসেই সাথিরা জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে দ্বিমত করে বসে।'
পাঠক! আত্মার ব্যাধি ও তার প্রতিকার বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া'র চমৎকার ও দীর্ঘ দীর্ঘ মজলিসগুলোর এখানেই সমাপ্তি। এই মজলিসগুলোতে শাইখের একেকটি শব্দ-বাক্য শ্রোতাদের হৃদয়-গহীনে এমনভাবে রেখাপাত করেছে, যে, এমন মধু-বাক্য শ্রবণের প্রতি তারা আরও বেশি তৃষাতুর হয়ে উঠেছে; একপর্যায়ে সুস্থ রুচির হৃদয়গুলো ওই অমৃত শরাব পান করেই পরিতৃপ্তি লাভ করেছে এবং অবগাহন করেছে সৌভাগ্যের ঝরনাধারায়। কিছু ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরও ঈমানি চিকিৎসার প্রভাবে সুস্থতায় সজীব হয়ে উঠেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আগের মতো অসুখী রয়ে গেছে দুর্ভাগা কিছু মন。