📄 হৃদয়ের ভাঙন : আল্লাহর জন্য তার খুলুস ও একনিষ্ঠতার প্রমাণ
'শাইখ জিলানি বলেন- “আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হয়ে তোমার নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়ার আলামত হলো, তুমি নিজ থেকে কখনো কোনো কিছুর ইরাদা করবে না; তোমার নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্যই রাখবে না; তোমার জানাশোনায় নিজের কোনো প্রয়োজন, বা লক্ষ্যের অস্তিত্বই থাকবে না; কারণ, তুমি তো আল্লাহর ইচ্ছা ও ইরাদার সামনে আলাদা কোনো ইচ্ছা রাখবে না। বরং তোমার সত্তায় জারি হবে আল্লাহর ফয়সালা; ফলে, তুমি খোদ পরিণত হবে আল্লাহর ইরাদা ও ফয়সালায়, তোমার অঙ্গ-প্রতঙ্গ হবে স্থির, হৃদয় হবে প্রশান্ত, বক্ষ হবে খোলা-উন্মোচিত, চেহারা হবে আলোকময়, ভেতর-জগত হবে সমৃদ্ধ, রহমানের অফুরান নিয়ামত পেয়ে মাখলুক থেকে অমুখাপেক্ষী, তোমার সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন হবে মহা ক্ষমতাধর রবের হাতে, এক অনাদি সত্তার অলৌকিক স্বর সর্বদা তোমাকে হেদায়েতের পথে ডাকবে, সমস্ত জগতের প্রতিপালক তোমাকে ইলম দান করবেন, তাঁর নিজের তরফ থেকে তোমাকে পরাবেন নূর ও ঐশী অলংকার, তোমাকে তিনি পূর্ববর্তী ইলমের শ্রেষ্ঠ ধারকদের পর্যায়ে পৌঁছে দেবেন, আর এর পরিণতিতে সর্বদাই তোমার মন থাকবে ভাঙা-ভাঙা, নরম-কোমল।”
'ফলে তোমার মধ্যে না কোনো প্রবৃত্তি কাজ করতে পারবে, না পারবে কোনো স্ব-ইচ্ছা তোমাকে প্রভাবিত করতে; বরং তুমি হয়ে যাবে সমান একটি কিনারাহীন পাত্রের মতো, যার মধ্যে তরল বা কর্দমাক্ত কোনো কিছুই জমতে পারে না। তখন তুমি মানবীয় দুর্বলতার ঊর্ধ্বে চলে যাবে, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অন্য কোনো কিছুতে তোমার অন্তর-জগত শান্তি পাবে না, তোমার দ্বারা আল্লাহ চাইলে বহু কুদরত ও অলৌকিক বিষয় প্রকাশ করবেন, স্বাভাবিক নীতি ও বিবেকও তা মেনে নেবে, কারণ তা নিশ্চিতভাবে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকেই。
'তখন তুমি সেই মন-ভাঙা লোকদের দলে শামিল হয়ে যাবে, যাদের মানবিক ইচ্ছা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, স্বভাবজাত প্রবৃত্তি দূর করে দেওয়া হয়েছে এবং এর বদলে তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে রবেরই পবিত্র ইচ্ছা ও তাঁর দেওয়া সৌন্দর্যপূর্ণ বিভিন্ন চাহিদা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছেন-
"তোমাদের এই দুনিয়ার মধ্য থেকে (পবিত্র) নারী (তথা স্ত্রী) ও সুগন্ধি আমার নিকট প্রিয় করে দেওয়া হয়েছে; আর আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে সালাতে।”[১]
'নবীজির মধ্য থেকে এই বস্তুগুলোর প্রতি মানবিক যেই দুর্বলতা, সেটা মুছে যাওয়ার পরে আল্লাহর তরফ থেকে এগুলোকে তাঁর প্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টিই আমি এতক্ষণ বলতে চেয়েছি। আল্লাহ তাআলার বাণী এসেছে হাদিসে- “আমার সন্তুষ্টির জন্য যাদের মন ভেঙেছে, আমি তাদের অতি নিকটে...。" তার পরে বলা হয়েছে- “নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা ধীরে ধীরে আমার নিকটে পৌঁছুতে থাকে।”” [২]
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১২২৯৩; নাসায়ি, হাদিস-ক্রম: ৩৯৩৯
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৫০২
📄 প্রাণবিশিষ্ট কেউই ইচ্ছাশক্তি-বিহীন নয়
এ-পর্যায়ে শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, আপনারা তো নিশ্চয় শাইখ জিলানির বাণী পুরোপুরি অনুধাবন করতে এবং এ-বিষয়ে আমার বক্তব্য জানতে আগ্রহী!'
আমি বললাম, 'জি, মুহতারাম, বিশেষত আমরা শাইখ জিলানির বক্তব্য থেকে বাহ্যত এটাই বুঝতে পেরেছি যে, তিনি সম্পূর্ণভাবে বান্দার ইচ্ছা-ইরাদা বাতিল করছেন, কিন্তু এই বিষয়টা সহিহ হলেও তো মানতে পারছি না!'
শাইখ বললেন, 'আমি আপনাদের এই সমস্যার সমাধান করব, ইনশাআল্লাহ। তো, এই অংশটি শাইখের পুরো বক্তব্যের শেষাংশ। সংক্ষেপে তাঁর কথার মানে হলো, রবের তরফ থেকে কোনো কিছুর ইরাদা করার আদেশ থাকলেই শুধু বান্দা সেই বস্তুর ইরাদা করবে; নতুবা কোনো কিছুর ইচ্ছা-ইরাদা করবে না। তিনি যে বলেছেন “আল্লাহর ফয়সালার সামনে তুমি কখনো কোনো কিছুর ইরাদাই করবে না”, এর অর্থ হলো, শরিয়তের পক্ষ থেকে যে বিষয়ের ইরাদা করতে বলা হয়নি সেটার ইরাদা তুমি করবে না; কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যার ইরাদা করতে বলেছেন, তার ইরাদা তো ওয়াজিব বা মুস্তাহাব; ফলে সেটার ইরাদা না-করাটা গুনাহ, ক্ষেত্রবিশেষে গুনাহ না হলেও অন্তত কমতি ও অসম্পূর্ণতার কারণ হবে。
'এই ক্ষেত্রেই অনেক সালিক বুঝতে ভুল করেন। তারা মনে করেন, কামেল ও পরিপূর্ণ তরিকত হলো, বান্দা একেবারেই সবরকম ইচ্ছা-ইরাদা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া。
'আর আবু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ যে বলেছেন "আমার ইরাদা (ইচ্ছা) হলো, আমি কোনো কিছুর ইরাদা করব না”- এটি স্ববিরোধী ও অপূর্ণাঙ্গ একটি কথা। কারণ, তিনি ইরাদা না-করার কথা বলেও ইরাদা করে ফেলেছেন। অনেকে এ-নিয়ে এমন কতক শাইখের কথা দিয়ে দলিল দেয়, যারা নাকি সবরকম ইচ্ছা- ইরাদা ত্যাগ করে প্রশংসিত হয়েছেন। এ-কথা যারা বলে, তারা পুরোপুরি একটা ভুল কথা বলে; কারণ, এটা (সবরকম ইচ্ছা-ইরাদা পরিত্যাগ করাটা) কারও সাধ্যেও নেই, আবার শরিয়তও এমনটা করার আদেশ করেনি。
'আসলে প্রাণশীল যে, তার তো কোনো-না-কোনো ইরাদা থাকবেই; কারও প্রাণ আছে, কিন্তু তার কোনো ইরাদা-ই নেই-এটা অসম্ভব। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেই ইরাদা পছন্দ করেন, যেই ইরাদা করার প্রতি আবশ্যক বা ঐচ্ছিক আদেশ জারি করেন, সেটা তো (জরুরি আদেশের বেলায়) কোনো কাফির, ফাসিক ও পাপাচারী কিংবা (ঐচ্ছিক আদেশের বেলায়) কল্যাণ পরিত্যাগকারী ব্যতীত অন্য কেউই বর্জন করতে পারে না。
'আল্লাহ তাআলা এমন ইরাদা প্রসঙ্গে নবী ও সিদ্দীকগণের প্রশংসা করেছেন; ইরশাদ হয়েছে-
وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ
"আর তাদেরকে বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-বিকাল স্বীয় পালকর্তার ইবাদত করে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।" [১]
وَمَا لِأَحَدٍ عِندَهُ مِن نِعْمَةٍ تُجْزَى . إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَىٰ
"তার ওপর কারও কোনো প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না, তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত।"[১]
إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءُ وَلَا شُكُورًا
"তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি, এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।"[২]
وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا
"পক্ষান্তরে, যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকাল কামনা করো, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।”[৩]
وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مشْكُورًا
"আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় পরকালের জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।” [৪]
إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
"আমি আপনার প্রতি এ কিতাব যথার্থরূপে নাজিল করেছি। অতএব, আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করুন। জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্তে।”[৫]
قُلِ اللَّهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَّهُ دِينِي | “বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তাআলারই ইবাদত করি।”[১]
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ - شَيْئًا “আল্লাহর ইবাদত করো, এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না।”[২]
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ | “আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।”[৩]
'আর, আল্লাহ যে বিষয়টির ইরাদা করেছেন এবং যেটি করার আদেশ করেছেন, বান্দার জন্য সেটিই তো মূলত ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ “হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে...।”[৪]
'অর্থাৎ, আল্লাহর জন্য নিয়তকে খালেস করেছে。
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ “আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে খাঁটি করে...'।[৫]
'আল্লাহর জন্য দ্বীনকে খাঁটি করার অর্থ হলো, ইবাদতের বেলায় একমাত্র তাঁকেই উদ্দেশ্য বানানো। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—
يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ :
“তিনি তাদেরকে ভালোবাসবেন; তারাও তাঁকে ভালোবাসবে।”[১]
وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ | “মুমিনরা আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পোষণকারী।”[২]
অন্যত্র বলেছেন—
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ “বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদিগকে ভালবাসবেন...।”[৩]
‘প্রত্যেক প্রেমিকই কিন্তু ইরাদা পোষণ করে। ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালাম বলেছিলেন—
لَا أُحِبُّ الْأَفِلِينَ | “আমি অস্তগামীদেরকে ভালোবাসি না।”[৪]
‘এরপর বলেছেন—
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ “আমি আমাকে ওই সত্তার অভিমুখী করেছি, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।”[৫]
‘এমন বহু আয়াত আছে কুরআনে; এগুলোতে আল্লাহ বান্দাকে তাঁর প্রতি এবং তাঁর আদিষ্ট বিষয়ের প্রতি ইরাদা করতে বলেছেন; আবার গাইরুল্লাহর এবং আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তুর ইরাদা করতে মানা করেছেন。
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
إِنما الأعمال بالنيات ، وإنما لكل امرئ ما نوى ، فمن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو إلى امرأة ينكحها فهجرته إلى ما هاجر إليه
"কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী; আর, মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে; তাই, যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের জন্য, অথবা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই (গণ্য) হবে, যে জন্যে সে হিজরত করেছে。" [১]
'এখানে ইরাদা ও নিয়ত দুটি; এর মধ্যে একটি আল্লাহর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক, অপরটি অপছন্দনীয় ও অসন্তোষজনক; বরং দ্বিতীয়টি হয়তো নিষিদ্ধ, অথবা নিষিদ্ধ না-হলেও আদেশকৃত নয়।'
টিকাঃ
[১] সূরা আনআম, আয়াত: ৫২
[১] সূরা সূরা লাইল, আয়াত-ক্রম: ১৯-২০
[২] সুরা ইনসান/দাহর, আয়াত-ক্রম: ০৯
[৩] সুরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ২৯
[৪] সুরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ১৯
[৫] সুরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ২-৩
[১] সুরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ১৪
[২] সুরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৩৬
[৩] সুরা যারিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৫৬
[৪] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১১২
[৫] সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত-ক্রম: ০৫
[১] সুরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম : ৫৪
[২] সুরা বাকারা, আয়াত-ক্রম : ১৬৫
[৩] সুরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম : ৩১
[৪] সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম : ৭৬
[৫] সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম : ৭৯
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ০১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩; মুসলিম ২৩/৪৫ হাদিস-ক্রম: ১৯০৭; আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১৬৮
📄 ইচ্ছাশক্তির বিবেচনায় মানুষের প্রকারভেদ
আমি বললাম, 'তাহলে, সব মানুষই ইচ্ছার অধিকারী হলেও এ-ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন প্রকারের হবে!'
শাইখ বললেন, 'ইচ্ছার ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকারের। এক প্রকারের লোক নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী ইরাদা করে ফেলে। এরা আসলে নফস ও শয়তানের গোলাম。
আরেক প্রকারের লোক মনে করে, তারা সম্পূর্ণভাবে ইচ্ছা-ইরাদা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে, আল্লাহর তাকদির ব্যতীত তাদের নিজস্ব কোনো উদ্দিষ্ট বস্তু নেই; এই প্রকারের লোকদের ধারণা, তাদের ধরে-নেওয়া এই স্তরটিই সবচেয়ে কামালিয়ত ও পূর্ণাঙ্গতার স্তর; যে এই স্তরটি লাভ করে সে-ই হাকিকতে পৌঁছুয়; আর, হাকিকত হলো, সৃষ্টি ও তাকদিরগত বাস্তবতা; এবং এমন লোকই আল্লাহর সর্বব্যাপী বিরাজিত ক্ষমতার দর্শন লাভ করেছে। তারা আরও ধারণা করে যে, ফানা হলো রবের তাওহিদের দর্শন ও অনুভব লাভ করা; এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য ও গন্তব্য। তারা এই পুরো বিষয়টির নাম দিয়েছে— জমা, ফানা ও ইসত্বিলাম; তথা, একত্রকরণ, বিলীন হওয়া, এবং মূল থেকে উপড়ে আনা。
'এরকম বহু উদ্ভট কথাবার্তা সুফিদের মাঝে প্রচলিত আছে; বহু শাইখ যেখানে পদস্খলনের শিকার হয়েছেন。
'এই বিষয়টিতে এসে শাইখ জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ ও তাঁর একদল সুফি-সাথির মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে তাঁরা সবাই রবের তাওহিদের দর্শন এবং আল্লাহ তাআলা যে সবকিছুর স্রষ্টা, রব ও অধিকর্তা—এর অনুভবের ব্যাপারে একমত হয়েছেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন “শুহুদুল কদর” তথা তাকদিরের দর্শন ও অনুভব। আবার একে “মাকামুল জমা”-ও বলেছেন, অর্থাৎ, একত্রকরণ-স্তর; কারণ, এর মাধ্যমে বান্দা "প্রথম-বিচ্ছিন্নতা” থেকে বেরিয়ে যায়। “প্রথম বিচ্ছিন্নতা” হলো, "স্বভাবী বিচ্ছিন্নতা"; যার ফলে ব্যক্তি স্বাধীনভাবে কোনো একটা কিছুর ইরাদা করে; আবার অন্য আরেকটাকে অপছন্দ করে; কোনো কাজ করা-না-করার বেলায় নিজস্ব মত ব্যক্ত করে। আসলে মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত রবের তাওহিদের অনুভব ও দর্শন লাভ না-করে, ততক্ষণ সে মাখলুকের জন্য কোনো একটা কাজ করে ফেলা বৈধ মনে করে, যেটার ফলে তার মন মাখলুকের কর্ম অনুভবের ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে; পরিণামে, সে স্বভাব ও প্রবৃত্তির অনুসারীতে পরিণত হয়। এরপর, যখনই সে হক ও সত্যের ইরাদা করে, তখনই তার এই ইরাদার মাধ্যমে স্বভাব ও প্রবৃত্তির ইরাদা থেকে সে বেরিয়ে আসে। তখন সে অনুভব করতে পারে, যে, আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর স্রষ্টা; সবকিছুকে এইভাবে এক বিন্দুতে একত্র করার অনুভবের ফলে, সে আগের বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসে。
'এই বক্তব্যে যখন তাঁরা সবাই একমত হলেন, তখন জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহ তাঁদের কাছে “দ্বিতীয় বিচ্ছিন্নতা" তুলে ধরলেন; যা ওই "একত্রকরণ”-এর পরে হবে; আর, সেটা হলো "শরয়ি বিচ্ছিন্নতা”। তিনি বললেন, “দেখুন, শরিয়ত আমাদেরকে যেটার আদেশ করে, আমরা সেটারই ইরাদা করার (বৈধ) ক্ষমতা রাখি; যেটা থেকে আমাদেরকে নিষেধ করে, সেটার ইরাদা করার (বৈধ) স্বাধীনতা আমাদের নেই; এমনিভাবে আমরা অনুভব করি, আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত, অন্য কেউ নয়; আবার, তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যও হয় তাঁর রাসূলগণের অনুসরণের মাধ্যমে। তো, এভাবেই আল্লাহর আদেশকৃত ও নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও পার্থক্য তৈরি হয়, পার্থক্য হয় তাঁর দোস্ত-দুশমনদের মধ্যেও। এ-পর্যায়ে পৌঁছুলেই অনুভব করা যায় উনার তাওহিদ。
'এই বিচ্ছিন্নতার কথায় এসেই সাথিরা জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে দ্বিমত করে বসে।'
পাঠক! আত্মার ব্যাধি ও তার প্রতিকার বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া'র চমৎকার ও দীর্ঘ দীর্ঘ মজলিসগুলোর এখানেই সমাপ্তি। এই মজলিসগুলোতে শাইখের একেকটি শব্দ-বাক্য শ্রোতাদের হৃদয়-গহীনে এমনভাবে রেখাপাত করেছে, যে, এমন মধু-বাক্য শ্রবণের প্রতি তারা আরও বেশি তৃষাতুর হয়ে উঠেছে; একপর্যায়ে সুস্থ রুচির হৃদয়গুলো ওই অমৃত শরাব পান করেই পরিতৃপ্তি লাভ করেছে এবং অবগাহন করেছে সৌভাগ্যের ঝরনাধারায়। কিছু ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরও ঈমানি চিকিৎসার প্রভাবে সুস্থতায় সজীব হয়ে উঠেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আগের মতো অসুখী রয়ে গেছে দুর্ভাগা কিছু মন。