📄 ভাগ্য নির্ধারিত থাকাটা আমলের পরিপন্থী নয়
শাইখ একটু থামলেও তাঁর মধ্যে আপত্তি নিরসনের আগ্রহ দেখে আমরা একে গনিমত মনে করলাম; ভাবলাম, শাইখ তাহলে এবার কতক সূফি কর্তৃক প্রচারিত তাকদির-বিষয়ক একটি ভুল মতের জবাব দেবেন। কতক সূফি বলেন, 'সবকিছু নির্ধারিত হয়ে গেছে'; এটা বলে তারা বোঝাতে চান, যে, সবকিছু তাকদির- অনুযায়ীই হয়; মাধ্যম ও উপায়-উপকরণ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। তো, খানিক বাদেই শাইখ বলতে শুরু করলেন, 'অনেকে যে বলে, "সবকিছু স্থিরকৃত হয়ে গেছে (তাই, কোনো উপায়-উপকরণ গ্রহণের প্রয়োজন নেই)"; এটা ওই লোকদের কথার মতো, যারা বলে, "দুআর কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ, প্রার্থিত বস্তুটি তাকদিরে থাকলে এটাকে দুআ করে চাওয়ার প্রয়োজন নেই; আর, তাকদিরে না-থাকলে, চেয়েও কোনো লাভ নেই।” এমন কথা আসলে বিবেক ও শরিয়ত-উভয় বিবেচনায়ই অত্যন্ত ফালতু ও গর্হিত। এমনিভাবে, কেউ কেউ বলে, “তাওয়াক্কুল ও দুআর মাধ্যমে না-কোনো ফায়দা হয়, আর না-কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়; বরং এগুলো স্রেফ ইবাদত। আর তাওয়াক্কুল আসলে নিজের সবকিছুকে চূড়ান্ত সমর্পণের নাম।”
'এসব কথা যদিও একদল মাশায়েখই বলেছেন, তবু এগুলো ভুল ও গলদ। এমনিভাবে, কিছু লোক বলে, “দুআ শুধু একটি ইবাদতমাত্র।” এই ধরনের কথা যারা বলে, তাদের সবার মূল সমস্যা একটি জায়গায়; তা হলো, এরা সবাই মনে করেছে, সবকিছু তাকদিরে থাকা ও নির্ধারিত হওয়ার অর্থ সেগুলো মানুষের কর্মসংশ্লিষ্ট কোনো উপায়-উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারবে না। অথচ এরা এ কথা জানে না যে, আল্লাহ তাআলা সবকিছুর তাকদির ও ফয়সালা লিখে দেন এমন উপায়-উপকরণের ওপর নির্ভর করে, যেগুলোর কতক, মানুষের কর্মসংশ্লিষ্ট, আর কতক, সংশ্লিষ্ট নয়। এ-জন্যই মাশায়েখদের ওই বক্তব্য প্রকারান্তরে সমস্ত আমলকে বাতিল বানিয়ে দেওয়ার শামিল。
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ-নিয়ে বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল; তিনি জবাবও দিয়েছিলেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত আছে-
✓✓ "নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, 'জান্নাতি ও জাহান্নামিরা কি আগ থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' বলা হলো, 'তাহলে আমল কীসের জন্য?' তিনি বললেন, 'প্রত্যেকের জন্য তার পরিণতির পথ সহজ করে দেওয়া হয়।”[১]
'বুখারি ও মুসলিমে আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
"আমরা রাসূলের সঙ্গে এক জানাযায় ছিলাম; তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল; একপর্যায়ে তিনি সেটি দ্বারা মাটিতে দাগ দিতে লাগলেন; কিছুক্ষণ বাদে মাথা তুলে বললেন, 'প্রতিটি নবজাতকের ব্যাপারেও জান্নাত বা জাহান্নামের ফয়সালা লিখে দেওয়া হয়েছে; সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের তাকদির নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে।” আলি বলেন, “তখন উপস্থিতদের এক লোক বলল—‘হে আল্লাহর নবী! তাকদিরের ওপর ঠিক থাকার জন্য আমাদের কি আমল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়? কারণ যে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান সে তো সৌভাগ্যের দিকে যাবেই; আবার দুর্ভাগা যে সে-ও তো দুর্ভাগ্যের পিছুই ছুটবে।’ নবীজি বললেন—‘আমল করতে থাকো; প্রত্যেকের জন্য তার পরিণতির পথ সহজ করে দেওয়া হবে; সৌভাগ্যবানের জন্য সৌভাগ্যের পথ সহজ করে দেওয়া হবে; আর, দুর্ভাগার জন্য দুর্ভাগ্যের ঠিকানা সহজ করে দেওয়া হবে।’ এরপর নবীজি তেলাওয়াত করলেন; যার মর্ম হলো—‘যে দান করেছে, তাকওয়া অবলম্বন করেছে, এবং সৌন্দর্যমাখা কালামকে সত্যায়ন করেছে, আমি তার জন্য সহজ করে দিই সুখের পথ; আর যে কৃপণতা করেছে, অমুখাপেক্ষিতার বড়াই দেখিয়েছে এবং সৌন্দর্যমাখা কালামকে মিথ্যা আখ্যা দিয়েছে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দিই।”[১]
‘কুতুবে সিত্তাহ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ি ও ইবনু মাজাহ)-সহ বিভিন্ন সুনান ও মুসনাদে এই হাদিসটি আনা হয়েছে。
‘ইমাম তিরমিযি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন— “রাসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘যে সকল ওষুধ দ্বারা আমরা চিকিৎসা করি, যে ঝাড়ফুঁক করি, এবং যে সকল প্রতিরোধমূলক বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি, সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী? সেগুলো কি আল্লাহ-নির্ধারিত তাকদির কিছুমাত্র রদ করতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘সেগুলোও তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত।’
‘একই রকম কথা বিভিন্ন হাদিসে এসেছে। নবীজি বলেছেন, সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগা হবে কারা—এটা আগ থেকেই আল্লাহ তাআলার ইলম ও তাকদিরে নির্দিষ্ট হয়ে থাকলেও তাদের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যটা নেক ও বদ আমলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। কারণ, আল্লাহ তো প্রতিটি বস্তুর পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞাত; ফলে, তিনি জানেন যে, অমুক লোকটি নেক আমলের মাধ্যমে সৌভাগ্যবান হবে আর অমুক লোকটা বদআমলের কারণে দুর্ভাগা হবে। তাই, তিনি সৌভাগ্যবানের জন্য নেকআমলের পথ সহজ করে দেন; আর দুর্ভাগার জন্য দুর্ভাগ্যের গহ্বর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে তার বদআমলের কারণে। মোটকথা, প্রত্যেকের জন্যই তার পরিণতির পথ সহজ করে দেওয়া হয়。 এটা আসলে সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফল; যার কথা বলা হয়েছে কুরআনের এই আয়াতে-
وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ۱۱۸ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
“তোমার পালনকর্তা যাদের ওপর রহম করেছেন, তারা ব্যতীত সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে; আর এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।”[১]
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৪৯; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪৭০৯
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৪৯৪৯; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৬৬২৬; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৪৭০৯; তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২১৩৬; ইবনু মাজাহ ৭৮; জামিউল উসুল ১০/১০৮
[২] তিরমিযি এটিকে সহিহ বলেছেন, হাদিস-ক্রম: ২০৬৫; সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৩৪৩৭; জামিউল উসুল ৭/৫৫৪
[১] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ১১৮-১১৯
📄 সৃষ্টি সংক্রান্ত ও দ্বীন-সংশ্লিষ্ট বিষয়
আমি বললাম, 'শাইখ, আপনার কথা থেকে বুঝলাম, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা দুরকমের; সৃষ্টি সংক্রান্ত ও দ্বীন-সংশ্লিষ্ট। অনুগ্রহপূর্বক এ-বিষয়ে আমাদেরকে যদি আরও বিস্তারিত আলোচনা শোনাতেন!'
শাইখ বললেন, 'আল্লাহ আপনাদেরকে তাওফিক দান করুন। জেনে রাখবেন, কুরআনে উল্লিখিত আদেশ, ইচ্ছা, অনুমতি, কিতাব, হুকুম, ফয়সালা, নিষেধ ও কালিমা ইত্যাদির মধ্যে দ্বীন-সংশ্লিষ্ট যত বিষয় আছে প্রত্যেকটির আলোচনাতেই এগুলোর সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁর ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও শরয়ি-হুকুমের সম্পর্ক বয়ান করেছেন, এবং সৃষ্টি সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টি-সংশ্লিষ্ট ইচ্ছার মিল দেখিয়েছেন। যেমন-দ্বীন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَنِ وَإِيتَايِ ذِي الْقُرْبَى
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আদেশ করেন ইনসাফ, ইহসান ও আত্মীয়দেরকে দান করার।"[১]
'অন্যত্র বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمْنَتِ إِلَى أَهْلِهَا
"আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন, তোমরা যেন আমানত পৌঁছে দাও এর হকদারের কাছে।”[২]
আর সৃষ্টি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বলেছেন-
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيَّا أَن يَقُولَ لَهُ كُن فَيَكُونُ
"তাঁর অবস্থা হলো, কোনো কিছুর ইচ্ছা করলে সেটিকে বলেন, 'হও!' তখন তা হয়ে যায়।”[৩]
وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ
"আর যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার সম্পদশালীদেরকে (সৎকাজের) আদেশ করি। অতঃপর তারা তাতে সীমালঙ্ঘন করে। তখন তাদের উপর নির্দেশটি সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।”[৪]
'আবার দেখুন দ্বীন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ | "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান; কঠোরতা চান না।”[১]
يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ "আল্লাহ চান তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করতে, তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ প্রদর্শন করতে এবং তোমাদের তাওবা কবুল করতে। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” [২]
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ "আল্লাহ তোমাদের জন্য কোনো কষ্ট-সমস্যা রাখতে চান না, বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান।”[৩]
'সৃষ্টি সংক্রান্ত ইচ্ছা নিয়ে আরও বলেছেন—
وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ “আল্লাহ চাইলে, তারা পরস্পরে লড়াই করত না; কিন্তু তিনি তো যা ইচ্ছা, তা-ই করেন।” [৪]
'আরও ইরশাদ করেছেন—
فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَمْ ۖ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ “আল্লাহ যাকে হিদায়াত করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য খুলে দেন; আর, যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ ও সংকটগ্রস্ত করে দেন; যেন সে প্রবল বেগে আকাশে আরোহণ করছে।"[১]
وَلَا يَنفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدتُ أن أنصح لَكُمْ إِن كَانَ اللَّهُ يُرِيدُ أَن يُغْوِيَكُمْ "আমি তোমাদের নসিহত করতে চাইলেও, তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না; যদি আল্লাহ তোমাদেরকে গোমরাহ করতে চান।”[২]
'দ্বীন-সংশ্লিষ্টতার আলোচনায় বলেছেন-
مَا قَطَعْتُم مِّن لِينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَآئِمَةً عَلَى أُصُولِهَا فَبِإِذْنِ اللَّهِ "তোমরা যে কিছু কিছু খর্জুর-বৃক্ষ কেটে দিয়েছ এবং কতক না-কেটে ছেড়ে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই আদেশ ও অনুমতিতে।” [৩]
'সৃষ্টি-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বলেছেন-
وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ "তারা আল্লাহর আদেশ/হুকুম ব্যতীত জাদু দ্বারা কারও ক্ষতি করতে পারত না।” [৪]
'দ্বীন-সংশ্লিষ্ট ফয়সালার ক্ষেত্রে বলেছেন-
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ "তোমার রব ফয়সালা (তথা, আদেশ) করেছেন, যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে।” [৫]
'সৃষ্টি সংক্রান্ত ফয়সালার বর্ণনায় বলেছেন-
فَقَضَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ
"ফলে, সেগুলোকে সাতটি আসমানরূপে ফয়সালা করেছেন (তথা, বানিয়েছেন) দুই দিনে।" [১]
'দ্বীন-সংশ্লিষ্ট হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—
أحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَمِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ
"তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, যা তোমাদের কাছে বিবৃত হবে তা ব্যতীত। কিন্তু ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে কোরো না; নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন, নির্দেশ দেন।” [২]
ذلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ
“এটা আল্লাহর বিধান; তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন।”[৩]
'ইয়াকুব আলাইহিস সালামের এক পুত্রের জবানেও এই বিষয়টি এসেছে—
فَلَنْ أَبْرَحَ الْأَرْضَ حَتَّى يَأْذَنَ لِي أَبِي أَوْ يَحْكُمَ اللَّهُ لِي ۖ وَهُوَ خَيْرُ الْحَكِمِينَ
"আমার বাবা অনুমতি না-দিলে, বা আল্লাহ আমার জন্য (কোনো) ফয়সালা না-করলে, আমি যাব না; তিনি তো শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।” [৪]
قُل رَبِّ احْكُمْ بِالْحَقِّ وَ رَبُّنَا الرَّحْمَنُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ
"নবী বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি ন্যায়ানুগ ফয়সালা করে দিন। আমাদের পালনকর্তা তো দয়াময়, তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।” [৫]
'দ্বীন-সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞায় তিনি বলেন—
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ
"তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত ও শুকরের গোশত।"[১]
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَتُكُمْ
"তোমাদের জন্য তোমাদের মা, মেয়ে ও বোনদেরকে (বিয়ে করা) হারাম করা হয়েছে।”[২]
'সৃষ্টি সংক্রান্ত নিষেধের উদাহরণ এসেছে—
فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ
“এই দেশ তাদের জন্য চল্লিশ বছর পর্যন্ত হারাম করা হলো; তারা ভূপৃষ্ঠে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।”[৩]
'দ্বীন-সংশ্লিষ্ট কালিমার ক্ষেত্রে এসেছে—
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَهِمَ رَبُّهُ بِكَلِمَتٍ فَأَتَمَّهُنَّ
“ইবরাহিমের রব যখন তাকে কিছু কালিমা দ্বারা পরীক্ষা করেছেন; তখন তিনি সেগুলো পূর্ণ করেছেন।”[৪]
'সৃষ্টি-সংক্রান্ত কালিমার উদাহরণ—
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ الْحُسْنَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ بِمَا صَبَرُوا
"এবং বনি ইসরাইলের ওপর তোমার রবের উত্তম বাণী পরিপূর্ণ হলো। কারণ তারা ধৈর্য ধারণ করেছে।”[৫]
'বিভিন্ন সহিহ হাদিসের সংকলন সুনান ও মুসনাদে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যে, নবীজি বলতেন-
"আমি আল্লাহর সেসব কালিমার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেগুলোকে অতিক্রম করতে পারে না কোনো নেককার বা বদকার।"[১]
জানা কথা-যে ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা ও তাকবিন থেকে কেউই বের হতে পারে না, সেটা জগত-সংক্রান্তই; কারণ, দ্বীন-সংশ্লিষ্ট কালিমার বিরোধিতা তো কাফেররা গুনাহের মাধ্যমে করতেই থাকে। তাই, হাদিসের ওই কালিমাগুলো জগত-সংক্রান্তই。
'মোটকথা, নবীজি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষকে যেসব পরিণতির জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য, সেগুলোর জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করে দেওয়া হয় এমন-সব-আমলের মাধ্যমে, যেগুলো তাদেরকে ওই পরিণতির ঘাটে পৌঁছে দেবে। অন্যান্য মাখলুকের অবস্থাও একই。
'বিয়ের মাধ্যমে দুজন নারী-পুরুষের একত্রবাসের ফলে কিংবা নর ও মাদি প্রাণীর বিশেষ 'পানি' মিশ্রণের পরিণামে আল্লাহ তাআলা নারী ও মাদির গর্ভে সন্তান সৃষ্টি করেন। এখন, কোনো লোক যদি বলে, "আমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম, স্ত্রীর সঙ্গে মিলন করব না, আমার তাকদিরে সন্তান থাকলে এমনিতেই আসবে, নইলে সন্তান আমার দরকার নাই, তারপরও আমি স্ত্রী-মিলন করব না।' তাহলে, এই লোকের চেয়ে অথর্ব আর কেউ নেই। পক্ষান্তরে, যদি মিলনের পর বীর্যপাত "বাইরে" করে, তাহলেও আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, অনেক সময় ব্যক্তির অনিচ্ছাতেও বীর্য নারীর "ভেতরে” রয়ে যায়। আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে সহিহ হাদিসে এসেছে, তিনি রলেন,
✓ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমরা বনি মুস্তালিক যুদ্ধে ছিলাম; কিছু আরব যুদ্ধবন্দী আমাদের হস্তগত হয়; তখন আমাদের স্ত্রীদের কথা মনে পড়ে; (কেননা) দূর-নিঃসঙ্গ জীবন আমাদের জন্য পীড়াদায়ক হয়ে পড়েছিল। (সে সময়) আমরা আযল (যৌনাঙ্গের বাইরে বীর্যপাত) করতে চাইলাম, (বাঁদির সঙ্গে সহবাস করে); এ সম্পর্কে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, 'এরূপ না করলে তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা, কিয়ামত পর্যন্ত যাদের জন্ম নির্ধারিত রয়েছে তাদের আগমন ঘটবেই।”[১]
'সহিহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أن رجلا أتى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال إن لي جارية هي خادمنا وسانيتنا وأنا أطوف عليها وأنا أكره أن تحمل . فقال “ اعزل عنها إن شئت فإنه سيأتيها ما قدر لها " . فلبث الرجل ثم أتاه فقال إن الجارية قد حبلت . فقال " قد أخبرتك أنه سيأتيها ما قدر لها
"এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, 'আমার একটি দাসী আছে, যে আমাদের খিদমত ও পানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত। আমি তার নিকট 'আসা-যাওয়া' করে থাকি, কিন্তু আমি চাই না সে গর্ভবতী হোক।' তখন তিনি বললেন, 'তুমি ইচ্ছে করলে তার সাথে 'আযল (যৌনাঙ্গের বাইরে বীর্যপাত) করতে পারো। তবে তার তাকদিরে সন্তান থাকলে তা তার মাধ্যমে আসবেই।' লোকটি কিছু দিন পর আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, 'দাসীটি গর্ভবতী হয়েছে।' তিনি বললেন, 'আমি তোমাকে এ মর্মে জানিয়েছিলাম যে, তার তাকদিরে যা আছে, তা আসবেই।”[২]
'তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা চাইলে মা-বাবা ছাড়াই সন্তান সৃষ্টি করতে পারেন; যেমন—আদম আলাইহিস সালামকে করেছেন; চাইলে কাউকে শুধু পুরুষ থেকে সৃষ্টি করতে পারেন; যেমন, হওয়া আলাইহাস সালামকে আদমের ছোট পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে; চাইলে শুধু নারী থেকেও কাউকে সৃষ্টি করতে পারেন; ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম যেমন। তবে সেসবের বেলায়ও খেয়াল রাখতে হবে, যে, তাঁদের সৃষ্টিতেও আল্লাহ তাআলা কোনো-না-কোনো উপায়- উপকরণকে মাধ্যমরূপে রেখেছেন; যদিও উপকরণগুলো সাধারণ ও স্বাভাবিক ছিল না।'
এ-পর্যন্ত বলে শাইখ মজলিসের ইতি টানেন; যদিও আরও অনেক কথাই বলতে পারতেন, তবু, যেহেতু বিভিন্ন স্থানে এই বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন এবং এ-বিষয়ক আলাপ-আলোচনা এমনিতেও বেশ দীর্ঘ, তাই এখানে আর কথা লম্বা না-করে যা বলেছেন তা-ই যথেষ্ট হবে—এই বিবেচনায় এতটুকুতেই ক্ষান্তি দিয়েছেন; অতঃপর হামদ-সানা ও দরূদ-সালাম পাঠের মাধ্যমে মজলিসের সমাপ্তি টেনেছেন。
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯০
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[৩] সূরা ইয়াসীন, আয়াত-ক্রম: ৮২
[৪] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ১৬
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৮৫
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ২৬
[৩] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম : ০৬
[৪] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৫৩
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১২৫
[২] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৩৪
[৩] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ০৫
[৪] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১০২
[৫] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ২৩
[১] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ১২
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ০১
[৩] সূরা মুমতাহিনাহ, আয়াত-ক্রম: ১০
[৪] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৮০
[৫] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ১১২
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম : ০৩
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ২৩
[৩] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ২৬
[৪] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১২৪
[৫] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৩৭
[১] মুআত্তা মালেকে ইয়াহয়া ইবনু সায়িদের সূত্রে মুরসাল সনদে হাদিসে আনা হয়েছে ২/৯৫০-৯৫১
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৫৪২; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৩৪৩
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৩৪৪৮, জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু'র বর্ণনা থেকে。