📄 গাইরুল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অশুভ পরিণতি
'অনেক সময় ভালোবাসা হয় উপকার ও ইহসানের ফলে। কারণ, মনের গতি-প্রকৃতিই এমন যে, তাতে মুহসিন ও উপকারকারীর প্রতি ভালোবাসা জমে। এটা আসলে ওই উপকারেরই ভালোবাসা—উপকারকারীর নয়; এবং উপকার না পেলে এই ভালোবাসা খুব স্বাভাবিভাবেই হ্রাস পেয়ে বিলীন হয়ে যায়; এমনকি ঘৃণায়ও পরিণত হয়; কারণ, এই ভালোবাসা আল্লাহর জন্য ছিল না。
'কারণ, কেউ আমাকে দান করবে এজন্য আমি তাকে ভালোবাসি—এমন যদি হয় ব্যাপারটা তাহলে তো এই ভালোবাসা বাস্তবে দানকারীর প্রতি নয়, বরং দানের প্রতি। কেউ যদি জবাবে বলে, "আমি তাকে ভালোবাসি, যে আমাকে আল্লাহর জন্য দান করে।” তাহলে এটা হবে মিথ্যা, বানোয়াট ও অবাস্তব একটা কথা। এমনিভাবে, কেউ সাহায্য করবে বলে তাকে ভালোবাসলে সেটা মূলত ওই সাহায্যের প্রতিই ভালোবাসা。
'এসব হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ; কারণ, এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি তাকেই ভালোবাসে, যে তার স্বার্থোদ্ধার করে দিতে পারে; কিংবা তাকে কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে। ফলে, তার ভালোবাসাটা হয় মূলত স্বার্থোদ্ধার বা ক্ষতিরোধের প্রতি; এবং স্বার্থ ও চাহিদার বিষয় অর্জনে যে ব্যক্তি মাধ্যম হয়, তার প্রতি সে ভালোবাসা দেখায়।'
আমি বললাম, 'এই ধরনের ভালোবাসার কোনো পুরস্কার কি বান্দা পরকালে পাবে?'
শাইখ বললেন, 'না, পরকালে এর কোনো পুরস্কার তারা পাবে না; এটা তাদের কোনো উপকারেও আসবে না; বরং এমন ভালোবাসা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির মধ্যে নিফাক ও চাটুকারিতা সৃষ্টি করে। ফলে, এটা এমন বন্ধুত্বের উৎস হয়, যা আখিরাতে সেই ব্যক্তিদেরকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে খাড়া করাবে; তবে মুত্তাকিগণের ভালোবাসা ও ভালোবাসার প্রতিদান এদের চাইতে আলাদা。
'আখিরাতে শুধু এমন ভালোবাসাই উপকারে আসবে-যা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়ে; এবং শুধু তাঁরই জন্য। পক্ষান্তরে কারও কাছ থেকে কোনো উপকার বা সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার আশা করলে এবং পরবর্তীতে সেই ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসাকে আল্লাহর জন্য বলে দাবি করলে তা নফসের ধোঁকা আর মিথ্যার বেসাতি বৈ কিছুই হবে না。
'তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর ভালোবাসার পাত্র যাঁরা আছেন (যেমন, নবী- রাসূল আলাইহিমুস সালাম ও নেককারগণ) তাঁদেরকে ভালোবাসা বান্দার জন্য ফায়দাজনক ও উপকারী হবে। কারণ, এঁদের ভালোবাসাটা বান্দাকে ধীরে ধীরে আল্লাহপ্রেমের উদ্যানের নিকটবর্তী করতে থাকে; এবং এঁরাই নিজেদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসাপ্রাপ্তির হকদার。
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় ঈমানের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য প্রিয়জনদের বাদ দিয়ে অন্যদেরকে বিভিন্ন বস্তু দিয়ে দিতেন। আর তাঁর এমন (অর্থাৎ, প্রিয়জনদেরকে বঞ্চিত করা) করার কারণ ছিল-তাঁদের হৃদয়ে গাঁথা ঈমানের ওপর তাঁর প্রবল ভরসা এবং গ্রহীতাদের ঈমান বিষয়ক অন্তরস্থ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও নড়বড়ে অবস্থা। তিনি চাইতেন, এই দানের মাধ্যমে যেন সেই লোকদের হৃদয়ে ইসলাম ও আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা সৃষ্টি হয়。
'দানের মাধ্যমে এই যে "আল্লাহর ভালোবাসা পোষণ” এবং 'সে-ভালোবাসার পরিপন্থী বিষয় বর্জন”-এর প্রতি নবীজি দাওয়াত দিতেন, এর কারণ ছিল সেই লোকদের তিনি জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইতেন। যার ফলে, এমন লোকদেরও দান করতেন, যাদের ব্যাপারে আশঙ্কা ছিল যে, পাপের ফলে আল্লাহ তাদেরকে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে (উপুড় করে) জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। তাঁর দান করা ও না-করাটা হয়েছিল আল্লাহর জন্য। ওই যে তিনি ইরশাদ করেছেন-
"যার ভালোবাসা ও ঘৃণা আল্লাহর জন্য হয়, এবং যার দান করা ও না- করাটাও হয় আল্লাহর জন্যই; সে-ই পূর্ণ ঈমানের অধিকারী।” [১]
'সহিহ বুখারিতে এসেছে-
إنا أنا قاسم لا أعطي أحدا ولا أمنع أحدا ولكن أضع حيث أمرت
"আমি তো বিতরণকারী মাত্র; (নিজের ইচ্ছেমতো) কাউকে দিই না, আবার কাউকে না দিয়ে বিরত থাকতে চাই না; বরং যেখানে দিতে আমি আদিষ্ট হই সেখানেই দিই।"[১]
'প্রেমাস্পদের যেই রূপ ও অবয়ব হৃদয়ে ভেসে থাকে, প্রেমিক সেটারই অনুগামী হয়। সেই রূপটা যেই ধরনেরই হোক—সেটার চাহিদা ও অনুমতি সাপেক্ষেই ঘটে প্রেমিকের ঘৃণা-ভালোবাসা, হাসি-আনন্দ, মনের অস্থিরতা ও প্রফুল্লতা। ফলে, প্রেমিকের মনের মধ্যে প্রেমাস্পদের সেই রূপটা নিজের একটা আদেশ- নিষেধের কর্তৃত্ব দাঁড় করিয়ে ফেলে; প্রেমিক অনুভব করে, যে, সেটা তাকে কখনো কোনো আদেশ করছে, আবার কখনো কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। যেমন—অনেকে স্বপ্নে নিজের ভালোবাসার মানুষ বা কোনো শ্রদ্ধাভাজনকে এভাবে দেখে যে, তিনি তাকে বিভিন্ন বিষয়ে আদেশ-নিষেধ করছেন কিংবা কোনো খবরাখবর দিচ্ছেন。
'আবার, মুশরিকদের বেলায় তাদের দেব-দেবি'র সুরতে শয়তানরাই তাদেরকে বিভিন্ন আদেশ-নিষেধ করে। আসলে, তারা নফসের চাহিদারই পূজা করে। আল্লাহর পছন্দমতো ও সন্তোষজনক পন্থার ইবাদত তাদের ভালো লাগে না; তারা মনে করে, এভাবে ইবাদত করলে, ওলির পর্যায় থেকে তাদের অবনতি ঘটবে। তাই, তারা নিজেদের ধারণামতো শক্তিশালী (!) এক ভালোবাসা আবিষ্কার করেছে, বানিয়েছে নিজেদের মনমতো ইবাদত ও ইলাহ'র স্বীকৃতির অন্য এক রূপ; এবং আবেগ ও দুনিয়াবিরাগের ভিন্নরকম পন্থা উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু আফসোস, তাদের আবিষ্কৃত সবকিছুতে মিশে আছে শিরক ও বিদআতের সর্বনাশী বিষ। ফলে, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে না হওয়ায়, আল্লাহর জন্য ভালোবাসাটাও কোনো কাজে আসবে না তাদের。
টিকাঃ
[১] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬৮১
[১] মুসনাদু আহমাদ ২/৪৮২
📄 তাওহিদি ভালোবাসার কয়েকটি আবশ্যক প্রতিক্রিয়া
মজলিসের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে শাইখ 'তাওহিদি ভালোবাসা'র তাৎপর্য বলতে লাগলেন-
'তাওহিদি ভালোবাসা হলো রাসূলের অনুসরণে একমাত্র আল্লাহকে ভালোবাসা। কুরআনে যেমন এসেছে-
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
"বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসলে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। [১]
'একারণে যারা প্রকৃতই রাসুলের অনুসারী, তাদের ভালোবাসায় জিহাদের উপস্থিতি থাকে; জিহাদ না-থাকলে সেটির আকাঙ্ক্ষা অন্তত থাকে। তাদের ভালোবাসা ও ঘৃণা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হয়; তারা থাকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর সেই সাথিদের মিল্লাতের ওপর; যারা নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে বলেছিল-
إِنَّا بُرَعَؤُا مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ .
"আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা পূজা করো, তাদের থেকে মুক্ত: আমরা তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করলাম; এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আগ পর্যন্ত তোমাদের ও আমাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রকাশ্য বিরোধ ও শত্রুতা স্থাপিত হলো।”[২]
'ওই সম্প্রদায়ের সম্বোধিত লোকেরা আল্লাহকে ভালোবাসলেও তাতে শিরক মিশ্রিত ছিল; তারা রাসূলের অনুসারী ছিল না; জিহাদ করত না; এর মানে হলো, তাদের ভালোবাসাটাই খাঁটি ও খালেস ছিল না; ছিল মেকি ও শিরক- তাওহিদের মিশ্ররূপ。
‘এই বিষয়টি আলোচনার জন্যই শাইখ আবু তালিব মাক্কি নিজের কিতাবের নাম দিয়েছেন—“কুতুল কুলুব ফি মুআমালাতিল মাহবুব ওয়া ওয়াস্ফু তারিকিল মুরিদ ইলা মাকামিত তাওহিদ”।'
এই অবধি বলার পর শাইখ তাঁর মজলিসের সমাপ্তি টানলেন; মহান রবের নিকট দুআ করলেন এই আশা ব্যক্ত করে, তিনি যেন আবারও আমাদেরকে আগামী মজলিসে একত্র হওয়ার তাওফিক দান করেন。
টিকাঃ
[১] সূরা আলি ইমরান, অয়াত-ক্রম: ৩১
[২] সূরা মুমতাহিনাহ, অয়াত-ক্রম: ০৪