📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ইবাদতে নিষ্ঠা ও ইখলাস সব সন্দেহ-সংশয় ও প্রবৃত্তিপূজার অবসান ঘটায়

📄 ইবাদতে নিষ্ঠা ও ইখলাস সব সন্দেহ-সংশয় ও প্রবৃত্তিপূজার অবসান ঘটায়


আমি বললাম, 'শাইখ, আমাদের প্রত্যেকেই তো প্রবৃত্তি ও মনের কামনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, কিন্তু চেষ্টা-মেহনত সত্ত্বেও গুনাহ হয়ে যায়; এক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় বলে মনে করেন?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, আসলে নফস যখন তার প্রতি আল্লাহর আদিষ্ট বিষয়ের (তথা, অসৎকর্ম বর্জন ও সৎকর্ম সম্পাদন) অনুগত হয় না, তখন ওই গুনাহগুলো সংঘটিত হয়। কিন্তু নফস তার প্রতি আদিষ্ট বিষয়ের অনুগত হলে কখনোই গুনাহ হতে পারে না। কারণ, গুনাহে লিপ্ত হওয়া আর নফসের প্রতি আদিষ্ট বিষয়ের (তথা, অসৎকর্ম বর্জন করে সৎকর্ম সম্পাদন) আনুগত্য করা-এ দুটো পরস্পরবিরোধী。
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
كذلك لنصرف عنه السوء والفحشاء إنه من عبادنا المخلصين
“এভাবেই আমি তার থেকে পাপাচার দূরে রেখেছি; সে তো আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।”[১]
'অন্যত্র বলেছেন-
إن عبادي ليس لك عليهم سلطان
"নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই।”[১]
বোঝা গেল, আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদেরকে শয়তান গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করতে পারে না। গোমরাহি হলো সুপথ প্রাপ্তির উল্টোটা। অর্থাৎ, প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং কারও মন কোনো গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট হলে তার কর্তব্য হলো— ইখলাস নিয়ে আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেছেন, সেভাবে আল্লাহর কোনো ইবাদত করা; সেই ইবাদতও ভয় আর ভালোবাসা নিয়ে একমাত্র আল্লাহর জন্যই করা। এর ফলে আল্লাহ তাআলা তার থেকে সব পাপ ও অসৎকর্ম দূরে রাখবেন。
‘গুনাহ সংঘটিত হওয়ার পর বান্দা তাওবা করলে, সেটা অসম্পূর্ণ হলেও তার গুনাহ মোচন করে দেয়। তাওবা আসলে বিষের প্রতিষেধকের মতো; বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেলেও বিষের প্রভাবকে যা রোধ করে দিতে পারে। বা, তাওবা হলো খাবার-পানীয় গ্রহণ করার মতো; ক্ষুধার্তের একমাত্র সমাধান। তাওবাকে আপনি হালাল উপভোগ্য বস্তুর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, যা মনকে হারাম বস্তুর চাহিদা থেকে বিরত রাখে, এবং যা পেলে মন থেকে সব হারামের খাহেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়。
‘কোনো বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান যেমন সে বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হতে দেয় না বা থাকলেও তা দূর করে দেয়, তাওবাও ঠিক তেমনই; কিবা চিকিৎসা যেমন সুস্থতা ঠিক রাখে এবং অসুস্থতা রোধ করে, তাওবা তেমন। এমনিভাবে তাওবা অন্তরে থাকা ঈমান ও এর সহায়ক আনুষাঙ্গিক বিষয়াদির হেফাজত করে। যখন ঐ সংশয়-সন্দেহ বা প্রবৃত্তির কামনা জাতীয় কোন অসুখ অন্তরকে আচ্ছন্ন করে তখন তাওবা হয় সেই অসুখ এর প্রতিকার。
‘আবার সুস্থতার উপায়-উপকরণে ঘাটতি হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে তেমনই ঈমানে কমতি ও ত্রুটি হলেই অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আর ঈমান ও কুফর তো হলো পরস্পরে বিরোধী বিষয় যার একটি অপরটিকে কখনো রোধ করে, কখনো করে মূলোৎপাটিত।'

টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[১] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৪২

আমি বললাম, 'শাইখ, আমাদের প্রত্যেকেই তো প্রবৃত্তি ও মনের কামনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, কিন্তু চেষ্টা-মেহনত সত্ত্বেও গুনাহ হয়ে যায়; এক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয় বলে মনে করেন?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, আসলে নফস যখন তার প্রতি আল্লাহর আদিষ্ট বিষয়ের (তথা, অসৎকর্ম বর্জন ও সৎকর্ম সম্পাদন) অনুগত হয় না, তখন ওই গুনাহগুলো সংঘটিত হয়। কিন্তু নফস তার প্রতি আদিষ্ট বিষয়ের অনুগত হলে কখনোই গুনাহ হতে পারে না। কারণ, গুনাহে লিপ্ত হওয়া আর নফসের প্রতি আদিষ্ট বিষয়ের (তথা, অসৎকর্ম বর্জন করে সৎকর্ম সম্পাদন) আনুগত্য করা-এ দুটো পরস্পরবিরোধী。
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
كذلك لنصرف عنه السوء والفحشاء إنه من عبادنا المخلصين
“এভাবেই আমি তার থেকে পাপাচার দূরে রেখেছি; সে তো আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।”[১]
'অন্যত্র বলেছেন-
إن عبادي ليس لك عليهم سلطان
"নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই।”[১]
বোঝা গেল, আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদেরকে শয়তান গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করতে পারে না। গোমরাহি হলো সুপথ প্রাপ্তির উল্টোটা। অর্থাৎ, প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং কারও মন কোনো গুনাহের প্রতি আকৃষ্ট হলে তার কর্তব্য হলো— ইখলাস নিয়ে আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেছেন, সেভাবে আল্লাহর কোনো ইবাদত করা; সেই ইবাদতও ভয় আর ভালোবাসা নিয়ে একমাত্র আল্লাহর জন্যই করা। এর ফলে আল্লাহ তাআলা তার থেকে সব পাপ ও অসৎকর্ম দূরে রাখবেন。
‘গুনাহ সংঘটিত হওয়ার পর বান্দা তাওবা করলে, সেটা অসম্পূর্ণ হলেও তার গুনাহ মোচন করে দেয়। তাওবা আসলে বিষের প্রতিষেধকের মতো; বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেলেও বিষের প্রভাবকে যা রোধ করে দিতে পারে। বা, তাওবা হলো খাবার-পানীয় গ্রহণ করার মতো; ক্ষুধার্তের একমাত্র সমাধান। তাওবাকে আপনি হালাল উপভোগ্য বস্তুর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, যা মনকে হারাম বস্তুর চাহিদা থেকে বিরত রাখে, এবং যা পেলে মন থেকে সব হারামের খাহেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়。
‘কোনো বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান যেমন সে বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হতে দেয় না বা থাকলেও তা দূর করে দেয়, তাওবাও ঠিক তেমনই; কিবা চিকিৎসা যেমন সুস্থতা ঠিক রাখে এবং অসুস্থতা রোধ করে, তাওবা তেমন। এমনিভাবে তাওবা অন্তরে থাকা ঈমান ও এর সহায়ক আনুষাঙ্গিক বিষয়াদির হেফাজত করে। যখন ঐ সংশয়-সন্দেহ বা প্রবৃত্তির কামনা জাতীয় কোন অসুখ অন্তরকে আচ্ছন্ন করে তখন তাওবা হয় সেই অসুখ এর প্রতিকার。
‘আবার সুস্থতার উপায়-উপকরণে ঘাটতি হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে তেমনই ঈমানে কমতি ও ত্রুটি হলেই অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে আর ঈমান ও কুফর তো হলো পরস্পরে বিরোধী বিষয় যার একটি অপরটিকে কখনো রোধ করে, কখনো করে মূলোৎপাটিত।'

টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[১] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৪২

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 আল্লাহর ভালোবাসাই লাভ হয় ঈমানের মিষ্টতা

📄 আল্লাহর ভালোবাসাই লাভ হয় ঈমানের মিষ্টতা


শাইখ কিছুটা সময় চুপ করে রইলেন। সম্ভবত তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলেন যে, সকলে তাঁর কথা বুঝতে পেরেছে কিনা; এজন্য তিনি প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ যখন কোনো প্রশ্ন করল না, তখন তিনি একটু নড়েচড়ে বসলেন এবং দীর্ঘশ্বাস নিলেন যেন বুকের মধ্যে জমে থাকা কোনো কথা তিনি ব্যক্ত করতে চাইছেন। একটু পর বলতে শুরু করলেন, 'আল্লাহ আপনাদেরকে ঈমান ও নেক আমলের ভরপুর তৌফিক দান করুন, আপনাদের অন্তরগুলোকে সুদৃঢ় ও বিশ্বাসের সৌরভে সিক্ত করুন। একটি কথা মনে রাখবেন, হৃদয়ের সঙ্গে যখন ঈমানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অন্তঃপুরে ছড়িয়ে পড়ে ঈমানের আনন্দ-ভরা আলো, তখন এক অন্যরকম স্বাদ-আনন্দ ও উৎফুল্লতা তৈরি হয় সেখানে— যে এই স্বাদ উপভোগ করেনি তাকে কখনোই বোঝানো যাবে না। তবে ঈমানের এই স্বাদ উপভোগের ক্ষেত্রেও সব মানুষের অনুভূতি সমান নয়। আবার অন্তরে যেই আনন্দ ও উৎফুল্লতা অনুভূত হয় বাহ্যিকভাবেও তার একটা আলোকমাখা ছায়া পড়ে; যার ফলে অন্তরের সুখ কেবলই বাড়ে আর বাড়ে。
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ "বলুন, আল্লাহর দয়া ও করুণাতেই হয়েছে; সুতরাং তারা যেন তা নিয়ে আনন্দিত হয়; এটা তাদের জমাকৃত বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম।" [১]
'অন্যত্র বলেছেন-
وَالَّذِينَ ءَاتَيْنَهُمُ الْكِتَبَ يَفْرَحُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمِنَ الْأَحْزَابِ مَن يُنكِرُ بَعْضَهُ "যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনার কাছে আমার অবতীর্ণ বিষয় নিয়ে আনন্দিত হয়, কিন্তু গোষ্ঠীগুলোর কিছু লোক আছে, যারা তা অপছন্দ করে।” [২]
'আরেক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةً فَمِنْهُم مِّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمُنَا فَأَمَّا الَّذِينَ ءَامَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَنًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ
“যখনই কোনো সূরা নাজিল হয়, তখনই তাদের কেউ কেউ বলে, এই সূরা তোমাদের কার কার ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছে? বস্তুত যারা ঈমানদার, সূরা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তা থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করে।”[১]
'এখানে আল্লাহ তাআলা বললেন, মুমিনরা তার অবতীর্ণ কুরআন থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করে, আর সুসংবাদ গ্রহণ করাটাই খুশি ও আনন্দ; এটা তাদের এজন্য হয়, যেহেতু তারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ফলে মনের মধ্যে এক অপূর্ব স্বাদ ও আনন্দ অনুভব করেছে。
'স্বাদ ও আনন্দ তো সর্বদা ভালোবাসার অনুগামী। অর্থাৎ, কারও যদি কোনো বস্তুর প্রতি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সেই বস্তু তার অর্জনের পর তার ভেতরে স্বাদ ও আনন্দ অনুভূত হয়। যওক বা স্বাদ হলো, প্রিয় বস্তুটা অর্জিত হওয়া, এবং বাহ্যিক আনন্দ লাভ করা। যেমন—খাবারের ক্ষেত্রে মানুষ কোনো একটা খাবার পছন্দ করে সেটার প্রতি আগ্রহী হয়; একপর্যায়ে সেটা পেয়ে গেলে নিজের মধ্যে এক-ধরনের মিষ্টতা অনুভব করে এবং আনন্দিত হয়। বিয়ে ও এজাতীয় বহু বিষয় এটার উদাহরণ হতে পারে。
'মহান রবের প্রতি মুমিন বান্দাদের যে ভালোবাসা, তার চেয়ে মহান, উন্নত ও পরিপূর্ণ কোনো ভালোবাসা সৃষ্টিকুলের কারও নেই। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত জগতে এমন কেউ নেই, যে সত্তাগতভাবে সর্ববিবেচনায় ভালোবাসার উপযুক্ত হতে পারে; বরং তিনি ব্যতীত কাউকে ভালোবাসা যায় শুধু তার ভালোবাসার অনুগামী হয়েই; এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণেই ভালবাসতে হয়; আল্লাহর আনুগত্য ও ফরমাবরদারির জন্যই নবীজির অনুগত ও ফরমাবরদার হতে হয়। যেমন কুরআনে এসেছে—
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ "(নবীজি, আপনি) বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসলে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।"[১]
'হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "আল্লাহ তোমাদেরকে রিজিকস্বরূপ তাঁর যে নিয়ামত খাইয়েছেন, তার জন্য আল্লাহকে ভালোবাসো; আমাকে ভালোবাসো আল্লাহর ভালোবাসার কারণে; আর আমার কারণে ভালোবাসো আমার পরিবারকে।” [২]
'আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
قُلْ إِن كَانَ ءَابَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَنُكُمْ وَأَزْوَجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَلٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجْرَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ - وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ - فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ "তোমাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বেরাদার, স্ত্রী-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, জমাকৃত সম্পদ, সেই ব্যবসা-যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করো এবং তোমাদের পছন্দের ঘর-বাড়ি যদি তোমাদের কাছে বেশি প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে, তবে তোমরা আল্লাহর শাস্তি চলে আসার অপেক্ষা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।" [৩]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না সে আমাকে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সমস্ত মানবজাতি থেকে বেশি ভালবাসবে।” [৪]
'সুনানে তিরমিযিতে এসেছে—
“আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে ভালবাসে, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে যে ঘৃণা করে, আল্লাহর জন্যই যে দান করে এবং দান করা থেকে বিরত থাকে, সে-ই নিজের ঈমান পূর্ণ করেছে।”[১]
'কুরআনে এসেছে—
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
“কতক মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে তাঁর কিছু শরিক বানিয়ে নিয়েছে, যাদেরকে তারা আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে ভালোবাসে; কিন্তু যারা মুমিন, তারা তো আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে প্রবল ভালোবাসা পোষণ করে।”[২]
'বোঝা গেল, মুমিনগণ আল্লাহকে যতটা ভালোবাসে, দুনিয়ার কোনো প্রেমাষ্পদের প্রতি তার প্রেমিকের অতটা ভালোবাসা হতে পারে না। এখানে এটা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মুমিনরা যে ভালোবাসা পোষণ করে, তার ফলস্বরূপে তারা সেটার অন্যরকম একটা স্বাদ-আনন্দ অনুভব করে। এ কারণেই নবীজি ওই স্বাদ অনুভব করাটাকে শর্তযুক্ত করে বলেছেন—
“তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে। এক. অন্য সবার চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বেশি ভালবাসা পোষণ করবে;
দুই. কাউকে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে。
তিন. পুনরায় কুফরে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিপতিত হওয়ার চেয়েও বেশি অপছন্দ করবে।”[৩]
'এ সবই হলো তাওহিদ, ইখলাস, তাওয়াক্কুল ও একমাত্র আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার সুফল।'
এতক্ষণে শাইখ যেন শান্ত হলেন; মনের কথাগুলো সুহৃদদের নিকটে ব্যক্ত করতে ও পৌঁছাতে পারায় শান্তি অনুভব করলেন, এবং আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করলেন, নবীজির প্রতি প্রেরণ করলেন দরূদ ও সালাম। এরপর আবার সকলের একত্র হওয়ার দুআ করে মজলিস সমাপ্ত করলেন。

টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[২] সূরা রাদ, আয়াত-ক্রম: ৩৬
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম : ১২৪
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৩১
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৭৮৯
[৩] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ২৪
[৪] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২৫২১
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৬

শাইখ কিছুটা সময় চুপ করে রইলেন। সম্ভবত তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলেন যে, সকলে তাঁর কথা বুঝতে পেরেছে কিনা; এজন্য তিনি প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ যখন কোনো প্রশ্ন করল না, তখন তিনি একটু নড়েচড়ে বসলেন এবং দীর্ঘশ্বাস নিলেন যেন বুকের মধ্যে জমে থাকা কোনো কথা তিনি ব্যক্ত করতে চাইছেন। একটু পর বলতে শুরু করলেন, 'আল্লাহ আপনাদেরকে ঈমান ও নেক আমলের ভরপুর তৌফিক দান করুন, আপনাদের অন্তরগুলোকে সুদৃঢ় ও বিশ্বাসের সৌরভে সিক্ত করুন। একটি কথা মনে রাখবেন, হৃদয়ের সঙ্গে যখন ঈমানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অন্তঃপুরে ছড়িয়ে পড়ে ঈমানের আনন্দ-ভরা আলো, তখন এক অন্যরকম স্বাদ-আনন্দ ও উৎফুল্লতা তৈরি হয় সেখানে— যে এই স্বাদ উপভোগ করেনি তাকে কখনোই বোঝানো যাবে না। তবে ঈমানের এই স্বাদ উপভোগের ক্ষেত্রেও সব মানুষের অনুভূতি সমান নয়। আবার অন্তরে যেই আনন্দ ও উৎফুল্লতা অনুভূত হয় বাহ্যিকভাবেও তার একটা আলোকমাখা ছায়া পড়ে; যার ফলে অন্তরের সুখ কেবলই বাড়ে আর বাড়ে。
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ "বলুন, আল্লাহর দয়া ও করুণাতেই হয়েছে; সুতরাং তারা যেন তা নিয়ে আনন্দিত হয়; এটা তাদের জমাকৃত বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম।" [১]
'অন্যত্র বলেছেন-
وَالَّذِينَ ءَاتَيْنَهُمُ الْكِتَبَ يَفْرَحُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمِنَ الْأَحْزَابِ مَن يُنكِرُ بَعْضَهُ "যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনার কাছে আমার অবতীর্ণ বিষয় নিয়ে আনন্দিত হয়, কিন্তু গোষ্ঠীগুলোর কিছু লোক আছে, যারা তা অপছন্দ করে।” [২]
'আরেক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةً فَمِنْهُم مِّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمُنَا فَأَمَّا الَّذِينَ ءَامَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَنًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ
“যখনই কোনো সূরা নাজিল হয়, তখনই তাদের কেউ কেউ বলে, এই সূরা তোমাদের কার কার ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছে? বস্তুত যারা ঈমানদার, সূরা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তা থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করে।”[১]
'এখানে আল্লাহ তাআলা বললেন, মুমিনরা তার অবতীর্ণ কুরআন থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করে, আর সুসংবাদ গ্রহণ করাটাই খুশি ও আনন্দ; এটা তাদের এজন্য হয়, যেহেতু তারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ফলে মনের মধ্যে এক অপূর্ব স্বাদ ও আনন্দ অনুভব করেছে。
'স্বাদ ও আনন্দ তো সর্বদা ভালোবাসার অনুগামী। অর্থাৎ, কারও যদি কোনো বস্তুর প্রতি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সেই বস্তু তার অর্জনের পর তার ভেতরে স্বাদ ও আনন্দ অনুভূত হয়। যওক বা স্বাদ হলো, প্রিয় বস্তুটা অর্জিত হওয়া, এবং বাহ্যিক আনন্দ লাভ করা। যেমন—খাবারের ক্ষেত্রে মানুষ কোনো একটা খাবার পছন্দ করে সেটার প্রতি আগ্রহী হয়; একপর্যায়ে সেটা পেয়ে গেলে নিজের মধ্যে এক-ধরনের মিষ্টতা অনুভব করে এবং আনন্দিত হয়। বিয়ে ও এজাতীয় বহু বিষয় এটার উদাহরণ হতে পারে。
'মহান রবের প্রতি মুমিন বান্দাদের যে ভালোবাসা, তার চেয়ে মহান, উন্নত ও পরিপূর্ণ কোনো ভালোবাসা সৃষ্টিকুলের কারও নেই। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত জগতে এমন কেউ নেই, যে সত্তাগতভাবে সর্ববিবেচনায় ভালোবাসার উপযুক্ত হতে পারে; বরং তিনি ব্যতীত কাউকে ভালোবাসা যায় শুধু তার ভালোবাসার অনুগামী হয়েই; এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণেই ভালবাসতে হয়; আল্লাহর আনুগত্য ও ফরমাবরদারির জন্যই নবীজির অনুগত ও ফরমাবরদার হতে হয়। যেমন কুরআনে এসেছে—
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ "(নবীজি, আপনি) বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসলে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।"[১]
'হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "আল্লাহ তোমাদেরকে রিজিকস্বরূপ তাঁর যে নিয়ামত খাইয়েছেন, তার জন্য আল্লাহকে ভালোবাসো; আমাকে ভালোবাসো আল্লাহর ভালোবাসার কারণে; আর আমার কারণে ভালোবাসো আমার পরিবারকে।” [২]
'আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
قُلْ إِن كَانَ ءَابَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَنُكُمْ وَأَزْوَجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَلٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجْرَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ - وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ - فَتَرَبَّصُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ "তোমাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বেরাদার, স্ত্রী-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, জমাকৃত সম্পদ, সেই ব্যবসা-যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করো এবং তোমাদের পছন্দের ঘর-বাড়ি যদি তোমাদের কাছে বেশি প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে, তবে তোমরা আল্লাহর শাস্তি চলে আসার অপেক্ষা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।" [৩]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ-না সে আমাকে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সমস্ত মানবজাতি থেকে বেশি ভালবাসবে।” [৪]
'সুনানে তিরমিযিতে এসেছে—
“আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে ভালবাসে, তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে যে ঘৃণা করে, আল্লাহর জন্যই যে দান করে এবং দান করা থেকে বিরত থাকে, সে-ই নিজের ঈমান পূর্ণ করেছে।”[১]
'কুরআনে এসেছে—
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
“কতক মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে তাঁর কিছু শরিক বানিয়ে নিয়েছে, যাদেরকে তারা আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে ভালোবাসে; কিন্তু যারা মুমিন, তারা তো আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে প্রবল ভালোবাসা পোষণ করে।”[২]
'বোঝা গেল, মুমিনগণ আল্লাহকে যতটা ভালোবাসে, দুনিয়ার কোনো প্রেমাষ্পদের প্রতি তার প্রেমিকের অতটা ভালোবাসা হতে পারে না। এখানে এটা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মুমিনরা যে ভালোবাসা পোষণ করে, তার ফলস্বরূপে তারা সেটার অন্যরকম একটা স্বাদ-আনন্দ অনুভব করে। এ কারণেই নবীজি ওই স্বাদ অনুভব করাটাকে শর্তযুক্ত করে বলেছেন—
“তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে। এক. অন্য সবার চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বেশি ভালবাসা পোষণ করবে;
দুই. কাউকে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে。
তিন. পুনরায় কুফরে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিপতিত হওয়ার চেয়েও বেশি অপছন্দ করবে।”[৩]
'এ সবই হলো তাওহিদ, ইখলাস, তাওয়াক্কুল ও একমাত্র আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার সুফল।'
এতক্ষণে শাইখ যেন শান্ত হলেন; মনের কথাগুলো সুহৃদদের নিকটে ব্যক্ত করতে ও পৌঁছাতে পারায় শান্তি অনুভব করলেন, এবং আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করলেন, নবীজির প্রতি প্রেরণ করলেন দরূদ ও সালাম। এরপর আবার সকলের একত্র হওয়ার দুআ করে মজলিস সমাপ্ত করলেন。

টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[২] সূরা রাদ, আয়াত-ক্রম: ৩৬
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম : ১২৪
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৩১
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৭৮৯
[৩] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ২৪
[৪] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২৫২১
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00