📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 বান্দা ও রবের মধ্যে ভালোবাসার বিনিময়

📄 বান্দা ও রবের মধ্যে ভালোবাসার বিনিময়


আমি বললাম, 'শাইখ, এক-পক্ষীয় ভালোবাসা কি হতে পারে? মানে, এটা কি সম্ভব যে, বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, কিন্তু তিনি বান্দাকে ভালোবাসবেন না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, যে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাঁকে ভালোবাসবেনই; এটা হতেই পারে না যে, কোনো বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে কিন্তু তিনি তাকে ভালোবাসবেন না! বরং বান্দা তার রবকে যতটা ভালোবাসে রবও বান্দাকে ততটাই ভালোবাসেন। অবশ্য, রবের ভালোবাসা তো তাঁর শান অনুযায়ী-সুমহান। যেমন- সহিহ হাদিসে মহান আল্লাহর বাণী বিবৃত হয়েছে-
قال الله عز وجل: مَنْ تقرب إلي شبرا تقربت إليه ذراعا ومن تقرب إلى ذراعا تقربت إليه باعا وإذا أقبل إلى يمشي أقبلت إليه أهزول " .
'আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, "কেউ আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হলে, আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ এক হাত অগ্রসর হলে, আমি এক গজ পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসলে, আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।" [১]
'আল্লাহ তাআলা তো ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি ভালোবাসেন মুত্তাকিদের, ভালোবাসেন ইহসানকারী ও ধৈর্যশীলদের, ভালোবাসেন তাদেরও, যারা বেশি বেশি তাওবা করে আর পবিত্রতা অর্জন করে ভালোভাবে। বরং তাঁর নির্দেশিত আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করলেও বান্দা তাঁর ভালোবাসার পরশ পায়。
'সহিহ হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله قال : ما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به
'আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে; এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’”[১]
'যুহদ ও ইবাদতের বেলায় অনেক শাইখের এমন কিছু ভ্রান্ত অনুসারী আছে, যারা খ্রিষ্টানদের মতো নানা গোমরাহির ফাঁদে পড়ে। যেমন, শরিয়াহ-বিরোধী পন্থায় আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করা; আল্লাহর পথে সংগ্রাম (জিহাদ) পরিত্যাগ করা。
'এরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীন মানতে গিয়ে খ্রিষ্টানদের মতো বহু ভুল ও গলদ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। যেমন-এরা মানুষের সামনে বিভিন্ন অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক কথা বলে, এমন বহু গল্প-ঘটনা বর্ণনা করে, যার কথকের সততা জানা নেই; বরং কথককে সত্যবাদী ধরে নিলেও অন্তত নিষ্পাপ কেউ নয় সে। ফলে, এই ভ্রান্ত অনুসারীরা নিজেদের অনুসৃতদেরকে দ্বীনপ্রণেতা বানিয়ে ফেলে; খ্রিষ্টানরা যেমন পাদ্রী-পুরোহিতদেরকে বানিয়েছিল ধর্মীয় সর্ববিষয়ের হর্তাকর্তা। এমনকি, আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামিও সীমিত করে ফেলে এরা; মনে করে, বিশেষ ব্যক্তিরা এই দাসত্বের ঊর্ধ্বে; ঠিক যেমন ধারণা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের। নবী ঈসা ও তাঁর মাতাকে খ্রিষ্টানরা যেমন আল্লাহর একরকম শরিক বানিয়ে ফেলে, এরাও তেমন বিশেষ ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর অংশীদার আখ্যা দেয়। মোটকথা, এমন বহু ভ্রান্তি এদের আছে, সবগুলোর বর্ণনা এখানে দিতে গেলে কথা বেশি দীর্ঘ হয়ে যাবে।'
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে শাইখ তাঁর কথা থামিয়ে দিলেন। সম্ভবত তিনি আজকের মতো সমাপ্ত করতে চাইছিলেন। আমি বললাম, 'শাইখ, নানামুখী কথাবার্তায় আলোচনা বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। পুরো আলোচনাটার সার যদি আমাদেরকে বলে দিতেন আমরা উপকৃত হতাম; আর আমরা সবসময়ের মতো এখনও আপনার প্রতি জ্ঞাপন করছি আন্তরিক শুকরিয়া।'
শাইখ বললেন, 'শুনুন তাহলে! আল্লাহ আপনাদের তাওফিক নসিব করুন; দ্বীনে হক হলো সর্বোতভাবে আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরে তাঁর ভালোবাসার পরশ অর্জন। আসলে, রবের দাসত্বের পূর্ণতা অনুসারেই তাঁর প্রতি বান্দার ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে; আবার, বান্দার প্রতি রবের ভালোবাসায়ও পূর্ণতার মাপকাঠি ওই দাসত্ব। অপরদিকে, রবের দাসত্বে কমতি হলে বান্দা ও রবের ভালোবাসায়ও হানা দেয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার আধার。
'বান্দার অন্তরে গাইরুল্লাহর ভালোবাসা থাকলে সেই অনুপাতে গাইরুল্লাহর দাসত্বও থাকে। এমনিভাবে অন্তরে গাইরুল্লাহর দাসত্ব থাকলে তার সমপরিমাণে থাকে গাইরুল্লাহর ভালোবাসাও। আর এ তো জানা কথা, যে ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি নয় এবং যেই আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়—উভয়টা বাতিল, ব্যর্থ ও অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং যা আল্লাহর জন্য, তা ব্যতীত দুনিয়া ও এর মধ্যস্থিত সব কিছু অভিশপ্ত। আর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু পছন্দ করে অনুমোদন করেছেন, তা-ই তো কেবল আল্লাহর জন্য。
'তাই যে আমলে গাইরুল্লাহ উদ্দেশ্য হয় কিংবা যে আমল শরিয়াহ-পরিপন্থী, তা আল্লাহর জন্য হতে পারে না। মোটকথা, যা কিছু কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার অনুগামী হবে, তা-ই শুধু আল্লাহর জন্য বলে গণ্য হবে। আর ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
"অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।"[১]
'সুতরাং সৎকাজ (তথা, ওয়াজিব ও মুস্তাহাবগুলো) করে যেতে হবে এবং তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনে যেমন এসেছে—
بَلَىٰ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
“হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে, তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[২]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
مَن عَمِلَ عَمَلًا ليسَ عليه أَمْرُنَا فَهو رَدُّ “
"যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"[১]
'অন্যত্র বলেছেন—
إِنَّما الأعمال بالنيات وإنَّما لامرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله ومن كانت هجرته لدنيا يُصيبها أو امرأة يتزوجها فهجرته إلى ما هاجر إليه
"সকল কাজ নিয়ত অনুযায়ী হয়। কোনো ব্যক্তি যা নিয়ত করে সেটা তাই হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হলো এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থে অথবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে যা সে নিয়ত করেছে।”[২]
'হাদিসে বর্ণিত এই নীতিই শরিয়তের মূলনীতি; এই নীতির বাস্তবায়ন যতটা ঘটবে, দ্বীনের আলোও ততটাই ছড়াবে। এই নীতির বার্তা নিয়েই প্রেরিত হয়েছেন বহু রাসূল, অবতীর্ণ হয়েছে অগুনতি কিতাব। আমাদের নবীজিও এই নীতির দাওয়াতই দিয়েছেন মানুষকে, এই নীতির ভিত্তিতেই জিহাদ করেছেন, সৎকাজের আদেশ করেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই নীতিতে জীবন রাঙাতে; কারণ, এই নীতিই হলো দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় সমস্ত দ্বীনি বিষয়।'
এতটুকু বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। হামদ ও সানা পড়লেন; উপস্থিত সুধীবৃন্দকে জানালেন, আবার সাক্ষাত হবে আগামী মজলিসে ইনশাআল্লাহ。

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৪০৫; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৬৭/২৬৬৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২০২
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ৪০৮৫
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৫৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৯০৭; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ২২০১

আমি বললাম, 'শাইখ, এক-পক্ষীয় ভালোবাসা কি হতে পারে? মানে, এটা কি সম্ভব যে, বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, কিন্তু তিনি বান্দাকে ভালোবাসবেন না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, যে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাঁকে ভালোবাসবেনই; এটা হতেই পারে না যে, কোনো বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে কিন্তু তিনি তাকে ভালোবাসবেন না! বরং বান্দা তার রবকে যতটা ভালোবাসে রবও বান্দাকে ততটাই ভালোবাসেন। অবশ্য, রবের ভালোবাসা তো তাঁর শান অনুযায়ী-সুমহান। যেমন- সহিহ হাদিসে মহান আল্লাহর বাণী বিবৃত হয়েছে-
قال الله عز وجل: مَنْ تقرب إلي شبرا تقربت إليه ذراعا ومن تقرب إلى ذراعا تقربت إليه باعا وإذا أقبل إلى يمشي أقبلت إليه أهزول " .
'আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, "কেউ আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হলে, আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ এক হাত অগ্রসর হলে, আমি এক গজ পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসলে, আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।" [১]
'আল্লাহ তাআলা তো ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি ভালোবাসেন মুত্তাকিদের, ভালোবাসেন ইহসানকারী ও ধৈর্যশীলদের, ভালোবাসেন তাদেরও, যারা বেশি বেশি তাওবা করে আর পবিত্রতা অর্জন করে ভালোভাবে। বরং তাঁর নির্দেশিত আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করলেও বান্দা তাঁর ভালোবাসার পরশ পায়。
'সহিহ হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله قال : ما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به
'আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে; এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’”[১]
'যুহদ ও ইবাদতের বেলায় অনেক শাইখের এমন কিছু ভ্রান্ত অনুসারী আছে, যারা খ্রিষ্টানদের মতো নানা গোমরাহির ফাঁদে পড়ে। যেমন, শরিয়াহ-বিরোধী পন্থায় আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করা; আল্লাহর পথে সংগ্রাম (জিহাদ) পরিত্যাগ করা。
'এরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীন মানতে গিয়ে খ্রিষ্টানদের মতো বহু ভুল ও গলদ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। যেমন-এরা মানুষের সামনে বিভিন্ন অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক কথা বলে, এমন বহু গল্প-ঘটনা বর্ণনা করে, যার কথকের সততা জানা নেই; বরং কথককে সত্যবাদী ধরে নিলেও অন্তত নিষ্পাপ কেউ নয় সে। ফলে, এই ভ্রান্ত অনুসারীরা নিজেদের অনুসৃতদেরকে দ্বীনপ্রণেতা বানিয়ে ফেলে; খ্রিষ্টানরা যেমন পাদ্রী-পুরোহিতদেরকে বানিয়েছিল ধর্মীয় সর্ববিষয়ের হর্তাকর্তা। এমনকি, আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামিও সীমিত করে ফেলে এরা; মনে করে, বিশেষ ব্যক্তিরা এই দাসত্বের ঊর্ধ্বে; ঠিক যেমন ধারণা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের। নবী ঈসা ও তাঁর মাতাকে খ্রিষ্টানরা যেমন আল্লাহর একরকম শরিক বানিয়ে ফেলে, এরাও তেমন বিশেষ ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর অংশীদার আখ্যা দেয়। মোটকথা, এমন বহু ভ্রান্তি এদের আছে, সবগুলোর বর্ণনা এখানে দিতে গেলে কথা বেশি দীর্ঘ হয়ে যাবে।'
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে শাইখ তাঁর কথা থামিয়ে দিলেন। সম্ভবত তিনি আজকের মতো সমাপ্ত করতে চাইছিলেন। আমি বললাম, 'শাইখ, নানামুখী কথাবার্তায় আলোচনা বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। পুরো আলোচনাটার সার যদি আমাদেরকে বলে দিতেন আমরা উপকৃত হতাম; আর আমরা সবসময়ের মতো এখনও আপনার প্রতি জ্ঞাপন করছি আন্তরিক শুকরিয়া।'
শাইখ বললেন, 'শুনুন তাহলে! আল্লাহ আপনাদের তাওফিক নসিব করুন; দ্বীনে হক হলো সর্বোতভাবে আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরে তাঁর ভালোবাসার পরশ অর্জন। আসলে, রবের দাসত্বের পূর্ণতা অনুসারেই তাঁর প্রতি বান্দার ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে; আবার, বান্দার প্রতি রবের ভালোবাসায়ও পূর্ণতার মাপকাঠি ওই দাসত্ব। অপরদিকে, রবের দাসত্বে কমতি হলে বান্দা ও রবের ভালোবাসায়ও হানা দেয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার আধার。
'বান্দার অন্তরে গাইরুল্লাহর ভালোবাসা থাকলে সেই অনুপাতে গাইরুল্লাহর দাসত্বও থাকে। এমনিভাবে অন্তরে গাইরুল্লাহর দাসত্ব থাকলে তার সমপরিমাণে থাকে গাইরুল্লাহর ভালোবাসাও। আর এ তো জানা কথা, যে ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি নয় এবং যেই আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়—উভয়টা বাতিল, ব্যর্থ ও অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং যা আল্লাহর জন্য, তা ব্যতীত দুনিয়া ও এর মধ্যস্থিত সব কিছু অভিশপ্ত। আর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু পছন্দ করে অনুমোদন করেছেন, তা-ই তো কেবল আল্লাহর জন্য。
'তাই যে আমলে গাইরুল্লাহ উদ্দেশ্য হয় কিংবা যে আমল শরিয়াহ-পরিপন্থী, তা আল্লাহর জন্য হতে পারে না। মোটকথা, যা কিছু কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার অনুগামী হবে, তা-ই শুধু আল্লাহর জন্য বলে গণ্য হবে। আর ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
"অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।"[১]
'সুতরাং সৎকাজ (তথা, ওয়াজিব ও মুস্তাহাবগুলো) করে যেতে হবে এবং তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনে যেমন এসেছে—
بَلَىٰ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
“হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে, তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[২]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
مَن عَمِلَ عَمَلًا ليسَ عليه أَمْرُنَا فَهو رَدُّ “
"যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"[১]
'অন্যত্র বলেছেন—
إِنَّما الأعمال بالنيات وإنَّما لامرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله ومن كانت هجرته لدنيا يُصيبها أو امرأة يتزوجها فهجرته إلى ما هاجر إليه
"সকল কাজ নিয়ত অনুযায়ী হয়। কোনো ব্যক্তি যা নিয়ত করে সেটা তাই হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হলো এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থে অথবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে যা সে নিয়ত করেছে।”[২]
'হাদিসে বর্ণিত এই নীতিই শরিয়তের মূলনীতি; এই নীতির বাস্তবায়ন যতটা ঘটবে, দ্বীনের আলোও ততটাই ছড়াবে। এই নীতির বার্তা নিয়েই প্রেরিত হয়েছেন বহু রাসূল, অবতীর্ণ হয়েছে অগুনতি কিতাব। আমাদের নবীজিও এই নীতির দাওয়াতই দিয়েছেন মানুষকে, এই নীতির ভিত্তিতেই জিহাদ করেছেন, সৎকাজের আদেশ করেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই নীতিতে জীবন রাঙাতে; কারণ, এই নীতিই হলো দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় সমস্ত দ্বীনি বিষয়।'
এতটুকু বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। হামদ ও সানা পড়লেন; উপস্থিত সুধীবৃন্দকে জানালেন, আবার সাক্ষাত হবে আগামী মজলিসে ইনশাআল্লাহ。

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৪০৫; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৬৭/২৬৬৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২০২
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ৪০৮৫
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৫৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৯০৭; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ২২০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00