📄 আল্লাহপ্রেমিকদের নানারকম হালত
আমি বললাম, 'শাইখ! যারা ভালোবাসা ও এ-জাতীয় বিষয়ের বিকৃতি ঘটায়, অনুগ্রহপূর্বক তাদের ওই বিকৃতি ও বিচ্যুতির কারণ যদি বলে দিতেন, আমাদের বিরাট উপকার হতো তাহলে!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, ওই বিচ্যুতি ও বিকৃতির কারণ হলো, রাসূলগণের বক্তৃতায় এবং তাঁদের নিয়ে লিখিত আদেশ ও নিষেধে যেই উবুদিয়্যাহর কথা বিবৃত হয়েছে, তা সম্পর্কে স্বল্প ও ভাসাভাসা জানাশোনা; বরং যেই বোধ-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ উবুদিয়্যাহ অনুধাবন করতে পারবে, সেই বোধ-বুদ্ধির দুর্বলতাও ওই বিচ্যুতির অন্যতম কারণ। মানুষের বুদ্ধি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, সঙ্গে দ্বীনি ইলমেও ঘাটতি থাকে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে ভালোবাসা, তখন অন্তর নানাবিধ বোকামিতে জড়িয়ে পড়ে。
'যেমন-মানুষ কারও ভালোবাসায় বোকামি ও অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ করেও গর্বিত হয়; সংকোচ অনুভব করে না; বলে, আমি তো প্রেমিক, তাই কোনো কর্মের (হোক না সেটা অজ্ঞতা বা শত্রুতামূলক কিছু) জন্যই আমি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হব না। হায় রে, এ তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তি: ইহুদিদের কথার সঙ্গে এটা মিলে যায়; ওদের বক্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرَىٰ نَحْنُ أَبْنُوا اللَّهِ وَأَحِبُّؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ
“ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, 'আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন'। আপনি বলুন, তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি প্রদান করবেন? বরং সত্য তো এই যে, তোমরাও তাঁর সৃষ্ট (সাধারণ) মানুষেরই অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন।" [১]
'পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার অর্থ হলো, তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় কেউ নয় এবং তাঁর সঙ্গে সন্তান হিসেবে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই; বরং তারা তাঁর সাধারণ বান্দা ও মাখলুক。
'আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে তাঁর পছন্দের কাজে নিয়োজিত রাখেন; সে কুফর, ফিসক (পাপাচার) ও অবাধ্যতার মতো আল্লাহর অসন্তোষের কোনো কিছুতে আর লিপ্ত হয় না। অপরদিকে, কেউ কবিরা (বড় ধরনের) গুনাহ বারবার করতে থাকলে এবং তাওবাও না করলে আল্লাহ তাআলা তার ওই ব্যাপারটায় অসন্তুষ্ট হন। আল্লাহ তাআলার চাওয়া, বান্দা ভালো ও নেক কাজগুলোতে লিপ্ত থাকুক। কারণ, বান্দার ঈমান ও তাকওয়া-অনুপাতে তিনি তাকে ভালোবাসেন。
'কেউ যদি মনে করে-আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। তাই বারবার পাপ করলেও কোনো সমস্যা নেই; তার অবস্থা তো ওই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যে নিয়মিতই বিষ পান করছে, কিন্তু সুস্থতার জন্য ওষুধ সেবন করছে না; আবার, মনে মনে ভাবছে-এই বিষ আমার কোনো ক্ষতি করবে না!
'অনেক সালিককে দেখা গেছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে দ্বীনি বিষয়ে বিভিন্নরকম অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে; কেউ হয়তো আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে তাঁর সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে; কেউবা তাঁর হক নষ্ট করেছে; কেউ আবার এমনসব উদ্ভট ও ভ্রান্ত দাবি করে বসেছে, যা নিতান্তই ফালতু ও ভিত্তিহীন。
'যেমন—কোনো একজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কাউকে জাহান্নামে একা ছেড়ে আসলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!” আরেকজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কোনো মুমিনকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে দিলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই!”
'দেখুন, প্রথমজন তার মুরিদকে এমন স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে যে, সে প্রতিটা জাহান্নামিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রাখে! (নাউযুবিল্লাহ)। আর দ্বিতীয়জন তার মুরিদকে আরও শক্তিশালী সাব্যস্ত করে দিচ্ছে যে, কবিরা গুনাহকারীদেরকেও সে জাহান্নামে প্রবেশ করা থেকে বাঁচাতে পারবে!
'কোনো সালেক এমন কথাও বলেছে যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের সামনে তার তাঁবু খাটানো হবে, যেন একটি মানুষও জাহান্নামে দাখিল হতে না পারে!
'এ-জাতীয় বক্তব্য প্রসিদ্ধ অনেক শাইখের নামে বর্ণিত আছে; আসলে, এগুলো হয়তো তাদের নামে বানানো অথবা তারা বলে থাকলেও কথাগুলো তো ভুলই। অনেক সময় নেশাগ্রস্ত, আত্মিক অবস্থার নিকট পরাভূত ও আত্মবিলীন-হওয়া মানুষ এ-ধরনের কথাবার্তা বলে; যখন তার বিবেচনা-বোধ লোপ পায় বা তা দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সে বুঝতে পারে না—কী করছে কী বলছে। সঙ্গে একটু বলে রাখি, 'নেশাগ্রস্ততা' হলো, বিবেচনা-বোধ লুপ্ত অবস্থায় একধরনের স্বাদ অনুভব করা। এজন্যই ওরকম মাশায়েখের অনেককেই দেখা গেছে, হুঁশ ফিরে আসলে তারা তাদের ওই ভুলভাল কথাবার্তা থেকে ইস্তিগফার করতেন।'
টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১৮
আমি বললাম, 'শাইখ! যারা ভালোবাসা ও এ-জাতীয় বিষয়ের বিকৃতি ঘটায়, অনুগ্রহপূর্বক তাদের ওই বিকৃতি ও বিচ্যুতির কারণ যদি বলে দিতেন, আমাদের বিরাট উপকার হতো তাহলে!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, ওই বিচ্যুতি ও বিকৃতির কারণ হলো, রাসূলগণের বক্তৃতায় এবং তাঁদের নিয়ে লিখিত আদেশ ও নিষেধে যেই উবুদিয়্যাহর কথা বিবৃত হয়েছে, তা সম্পর্কে স্বল্প ও ভাসাভাসা জানাশোনা; বরং যেই বোধ-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ উবুদিয়্যাহ অনুধাবন করতে পারবে, সেই বোধ-বুদ্ধির দুর্বলতাও ওই বিচ্যুতির অন্যতম কারণ। মানুষের বুদ্ধি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, সঙ্গে দ্বীনি ইলমেও ঘাটতি থাকে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে ভালোবাসা, তখন অন্তর নানাবিধ বোকামিতে জড়িয়ে পড়ে。
'যেমন-মানুষ কারও ভালোবাসায় বোকামি ও অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ করেও গর্বিত হয়; সংকোচ অনুভব করে না; বলে, আমি তো প্রেমিক, তাই কোনো কর্মের (হোক না সেটা অজ্ঞতা বা শত্রুতামূলক কিছু) জন্যই আমি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হব না। হায় রে, এ তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তি: ইহুদিদের কথার সঙ্গে এটা মিলে যায়; ওদের বক্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرَىٰ نَحْنُ أَبْنُوا اللَّهِ وَأَحِبُّؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ
“ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, 'আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন'। আপনি বলুন, তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি প্রদান করবেন? বরং সত্য তো এই যে, তোমরাও তাঁর সৃষ্ট (সাধারণ) মানুষেরই অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন।" [১]
'পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার অর্থ হলো, তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় কেউ নয় এবং তাঁর সঙ্গে সন্তান হিসেবে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই; বরং তারা তাঁর সাধারণ বান্দা ও মাখলুক。
'আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে তাঁর পছন্দের কাজে নিয়োজিত রাখেন; সে কুফর, ফিসক (পাপাচার) ও অবাধ্যতার মতো আল্লাহর অসন্তোষের কোনো কিছুতে আর লিপ্ত হয় না। অপরদিকে, কেউ কবিরা (বড় ধরনের) গুনাহ বারবার করতে থাকলে এবং তাওবাও না করলে আল্লাহ তাআলা তার ওই ব্যাপারটায় অসন্তুষ্ট হন। আল্লাহ তাআলার চাওয়া, বান্দা ভালো ও নেক কাজগুলোতে লিপ্ত থাকুক। কারণ, বান্দার ঈমান ও তাকওয়া-অনুপাতে তিনি তাকে ভালোবাসেন。
'কেউ যদি মনে করে-আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। তাই বারবার পাপ করলেও কোনো সমস্যা নেই; তার অবস্থা তো ওই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যে নিয়মিতই বিষ পান করছে, কিন্তু সুস্থতার জন্য ওষুধ সেবন করছে না; আবার, মনে মনে ভাবছে-এই বিষ আমার কোনো ক্ষতি করবে না!
'অনেক সালিককে দেখা গেছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে দ্বীনি বিষয়ে বিভিন্নরকম অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে; কেউ হয়তো আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে তাঁর সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে; কেউবা তাঁর হক নষ্ট করেছে; কেউ আবার এমনসব উদ্ভট ও ভ্রান্ত দাবি করে বসেছে, যা নিতান্তই ফালতু ও ভিত্তিহীন。
'যেমন—কোনো একজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কাউকে জাহান্নামে একা ছেড়ে আসলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!” আরেকজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কোনো মুমিনকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে দিলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই!”
'দেখুন, প্রথমজন তার মুরিদকে এমন স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে যে, সে প্রতিটা জাহান্নামিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রাখে! (নাউযুবিল্লাহ)। আর দ্বিতীয়জন তার মুরিদকে আরও শক্তিশালী সাব্যস্ত করে দিচ্ছে যে, কবিরা গুনাহকারীদেরকেও সে জাহান্নামে প্রবেশ করা থেকে বাঁচাতে পারবে!
'কোনো সালেক এমন কথাও বলেছে যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের সামনে তার তাঁবু খাটানো হবে, যেন একটি মানুষও জাহান্নামে দাখিল হতে না পারে!
'এ-জাতীয় বক্তব্য প্রসিদ্ধ অনেক শাইখের নামে বর্ণিত আছে; আসলে, এগুলো হয়তো তাদের নামে বানানো অথবা তারা বলে থাকলেও কথাগুলো তো ভুলই। অনেক সময় নেশাগ্রস্ত, আত্মিক অবস্থার নিকট পরাভূত ও আত্মবিলীন-হওয়া মানুষ এ-ধরনের কথাবার্তা বলে; যখন তার বিবেচনা-বোধ লোপ পায় বা তা দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সে বুঝতে পারে না—কী করছে কী বলছে। সঙ্গে একটু বলে রাখি, 'নেশাগ্রস্ততা' হলো, বিবেচনা-বোধ লুপ্ত অবস্থায় একধরনের স্বাদ অনুভব করা। এজন্যই ওরকম মাশায়েখের অনেককেই দেখা গেছে, হুঁশ ফিরে আসলে তারা তাদের ওই ভুলভাল কথাবার্তা থেকে ইস্তিগফার করতেন।'
টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১৮
📄 আল্লাহর প্রতি যথাযথ ভালোবাসার নীতি
'অনেকে বিভিন্ন শাইখের মজলিসে অনেক কাসিদা (দীর্ঘ কবিতা) শুনেছেন। কাসিদাগুলো আল্লাহর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা-ব্যাকুলতায় পূর্ণ থাকে; আবার, নফসের প্রতি তিরস্কার ও ভর্ৎসনাও থাকে সেগুলোতে। কাসিদার মাধ্যমে মূলত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার নীতি প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য আল্লাহপ্রেমিকদের জন্য আল্লাহ তাআলা একটি পরীক্ষা নির্ধারণ করেছেন; তাঁকে যারা ভালোবাসবে, তাদেরকেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়-এটিই তাঁর ভালোবাসার নীতি। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
"বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালবাসলে, আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন।" [১]
‘সুতরাং সত্যিকারার্থে আল্লাহর প্রেমিক সে-ই হতে পারবে, যে তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে; রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্যই তো উবুদিয়্যাহ তথা আল্লাহর দাসত্বের বাস্তব রূপ। অথচ দেখা যায়, অনেকে এমন ভালোবাসার দাবি করে, যা নবীজির শরিয়াহ ও সুন্নাহর বাইরে। অনেকে বিভিন্ন কাল্পনিক বিষয়াদিরও দাবি করে বসে ওই ভালোবাসায়, যেগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব না। এমনকি, কেউ কেউ তো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কথা বলে মনে করে শরিয়তের সব আদেশ তার জন্য রহিত হয়ে গেছে; এবং সব হারামও হালাল হয়ে গেছে তার জন্য! অথচ এটা তো রাসূলের শরিয়াহ, সুন্নাহ ও আনুগত্যের সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক বিষয়。
'কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, কখনো কখনো জিহাদের মতো সবচেয়ে কঠিন বিষয়কেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসারূপে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, জিহাদের মধ্যেই আল্লাহর সব আদিষ্ট বিষয়ের প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা এবং তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ সব বিষয়ের প্রতি চূড়ান্ত ঘৃণা সুপ্ত আছে। যেমন-আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন এবং তারাও ভালোবাসে তাঁকে-এমন বান্দাদের গুণ বর্ণনায় তিনি ইরশাদ করেছেন-
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
"তারা মুসলিমদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর; তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।” [২]
'এই জিহাদের কারণেই তো আল্লাহর প্রতি এই উম্মতের ভালোবাসা ও উবুদিয়্যাহ আগের সব উম্মতের চেয়ে বেশি ও পরিপূর্ণ। আর, এই উম্মতের মধ্যে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও উবুদিয়্যাহর অধিকারী হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম; এরপর হলেন তাঁরা, সর্বদিক থেকে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে যাঁদের অধিক মিল। এবার ভেবে দেখুন তো, ওইসব কাল্পনিক ভালোবাসার দাবিদাররা বাস্তব ভালোবাসা থেকে কত কত দূরে!'
এই পর্যন্ত এসে শাইখ যখন বুঝতে পারলেন, শ্রোতাবৃন্দ অত্যন্ত বিস্ময় ও ঘৃণা নিয়ে ওইসব ভণ্ডদের ভালোবাসা-বোধ ও বিকৃতির ব্যাপারে চিন্তা করছে, তখন তিনি বললেন, 'দোস্তগণ, এইটুকু শুনেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই; বরং একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনাদেরকে আশ্চর্য ও বিস্ময়ের কথা শোনাচ্ছি। কোনো কোনো শাইখ বলেছেন- “ভালোবাসা হলো এক আগুন, যা অন্তর থেকে প্রেমাস্পদ আল্লাহর 'ইচ্ছাকৃত বিষয়' ছাড়া আর সবকিছুকেই জ্বালিয়ে দেয়।” এ কথা দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন-জগতের সবকিছু আল্লাহর 'ইচ্ছা'য় সৃষ্টি হয়েছে, সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর বান্দা জগতের প্রত্যেকটা বস্তুকে ভালোবাসলেই হবে পরিপূর্ণ ভালোবাসা। এখন, যেহেতু কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাও জগতের 'সব কিছু'র অন্তর্ভুক্ত, তাই এগুলোকেও ভালোবাসতে হবে (নাউযুবিল্লাহ)।
'দেখুন, একজন মানুষ কিন্তু জগতের সব কিছুই ভালোবাসতে পারে না; বরং যা কিছু তার অনুকূলে ও উপকারী তা সে ভালোবাসে, আর যা কিছু প্রতিকূলে ও ক্ষতিকারক তা অপছন্দ করে। তবু, আমাদের ওই বন্ধুরা এই ধরণের ভ্রান্ত কথা বলে; কারণ, এর মাধ্যমে তারা প্রবৃত্তিপূজার সুযোগ পায়। ফলে প্রবৃত্তির চাহিদামতোই তারা ভালোবাসে অশ্লীল ছবি, পদ-পদবি, সম্পদের অপচয় ও ভ্রষ্টকারী বিদআত; আর, মনে করে, এ-ই বুঝি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। অথচ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত তো এ-ও যে, তাঁর অপছন্দের বিষয় অপছন্দ করতে হবে এবং যথাযথ ক্ষেত্রে প্রাণ ও সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করতে হবে。
'আসলে, তাদের ভ্রান্তির মূলে যেই কথাটি-“ভালোবাসা হলো এক আগুন, যা অন্তর থেকে প্রেমাস্পদ আল্লাহর 'ইচ্ছাকৃত বিষয়' ছাড়া আর সবকিছুকেই জ্বালিয়ে দেয়।”-সেটিতে ইচ্ছা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শরয়ি ও দ্বীনি ইচ্ছা; অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা। সুতরাং ওই কথাটির সঠিক অর্থ হলো- "ভালোবাসা এমন আগুন, যা অন্তর থেকে আল্লাহর সন্তোষজনক ও ভালোবাসার বিষয় ছাড়া অন্য সব কিছুকে জ্বালিয়ে দেয়।"
'কারণ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসার দাবি হলো, তিনি যা ভালোবাসবেন বান্দা শুধু তা-ই ভালোবাসবে। বান্দার ভালোবাসাটা আল্লাহর ভালোবাসার বিরোধী হলে তাঁর প্রতি ভালোবাসাটা হবে অসম্পূর্ণ। তখন তাঁর কৃত ফয়সালা ও তাকদিরের প্রতি বান্দার মধ্যে (একধরনের) ক্ষোভ, ঘৃণা, অপছন্দ ও দূরে থাকার মানসিকতা তৈরি হবে। কিন্তু ক্ষোভ, ঘৃণা ও অপছন্দের ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হতে না পারলে তাঁর প্রেমিক হওয়া যাবে না; বরং তিনি যা অপছন্দ করেন, সেটার প্রেমিক হওয়া যাবে。
একদিকে আল্লাহর প্রেমিক ও বন্ধুগণ, যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন এবং তারাও ভালোবাসে তাঁকে; অপরদিকে তারা, যারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করে তাঁর বিশাল ব্যাপক রুবুবিয়্যাহ দেখে, কিংবা যারা তাঁর ভালোবাসার দাবি করে শরিয়াহ-বিরোধী কিছু বিদআতের অনুসরণ করে। এই দুই পক্ষের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্যের মাপকাঠি হলো, শরিয়তের অনুসরণ ও জিহাদ প্রতিষ্ঠা। কারণ, যারা শুধুই ভালোবাসার দাবিদার, কিন্তু শরিয়তের অনুসারী ও জিহাদ প্রতিষ্ঠাকারী নয়, তাদের মনে তো নিফাক আছে, যেই নিফাকের ফলে মানুষ একেবারে জাহান্নামের তলদেশে গিয়ে পৌঁছুবে। আর, এমন ভালোবাসার দাবি কেবল ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দাবির সাথেই মেলে। অবশ্য, অনেক সময় ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দাবিটা এদের দাবির চেয়েও জঘন্য হয়, যখন এদের কুফরিটা ওদের পর্যায়ে না পৌঁছুয়। তাওরাত ও ইনজিলে আল্লাহর প্রতি এমন বহু ভালোবাসার কথা পাওয়া যায়, যেগুলোর ব্যাপারে ওরা সবাই একমত; বরং ওদের কাছে (ওদের) সেগুলোই শরিয়তের সবচেয়ে বড় অসিয়ত ও দাবি।'
টিকাঃ
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম : ৩১
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম : ৫৪
'অনেকে বিভিন্ন শাইখের মজলিসে অনেক কাসিদা (দীর্ঘ কবিতা) শুনেছেন। কাসিদাগুলো আল্লাহর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা-ব্যাকুলতায় পূর্ণ থাকে; আবার, নফসের প্রতি তিরস্কার ও ভর্ৎসনাও থাকে সেগুলোতে। কাসিদার মাধ্যমে মূলত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার নীতি প্রকাশ করাই উদ্দেশ্য আল্লাহপ্রেমিকদের জন্য আল্লাহ তাআলা একটি পরীক্ষা নির্ধারণ করেছেন; তাঁকে যারা ভালোবাসবে, তাদেরকেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়-এটিই তাঁর ভালোবাসার নীতি। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
"বলুন, তোমরা আল্লাহকে ভালবাসলে, আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন।" [১]
‘সুতরাং সত্যিকারার্থে আল্লাহর প্রেমিক সে-ই হতে পারবে, যে তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে; রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্যই তো উবুদিয়্যাহ তথা আল্লাহর দাসত্বের বাস্তব রূপ। অথচ দেখা যায়, অনেকে এমন ভালোবাসার দাবি করে, যা নবীজির শরিয়াহ ও সুন্নাহর বাইরে। অনেকে বিভিন্ন কাল্পনিক বিষয়াদিরও দাবি করে বসে ওই ভালোবাসায়, যেগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব না। এমনকি, কেউ কেউ তো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কথা বলে মনে করে শরিয়তের সব আদেশ তার জন্য রহিত হয়ে গেছে; এবং সব হারামও হালাল হয়ে গেছে তার জন্য! অথচ এটা তো রাসূলের শরিয়াহ, সুন্নাহ ও আনুগত্যের সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক বিষয়。
'কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, কখনো কখনো জিহাদের মতো সবচেয়ে কঠিন বিষয়কেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসারূপে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, জিহাদের মধ্যেই আল্লাহর সব আদিষ্ট বিষয়ের প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা এবং তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ সব বিষয়ের প্রতি চূড়ান্ত ঘৃণা সুপ্ত আছে। যেমন-আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন এবং তারাও ভালোবাসে তাঁকে-এমন বান্দাদের গুণ বর্ণনায় তিনি ইরশাদ করেছেন-
أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
"তারা মুসলিমদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর; তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।” [২]
'এই জিহাদের কারণেই তো আল্লাহর প্রতি এই উম্মতের ভালোবাসা ও উবুদিয়্যাহ আগের সব উম্মতের চেয়ে বেশি ও পরিপূর্ণ। আর, এই উম্মতের মধ্যে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও উবুদিয়্যাহর অধিকারী হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম; এরপর হলেন তাঁরা, সর্বদিক থেকে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে যাঁদের অধিক মিল। এবার ভেবে দেখুন তো, ওইসব কাল্পনিক ভালোবাসার দাবিদাররা বাস্তব ভালোবাসা থেকে কত কত দূরে!'
এই পর্যন্ত এসে শাইখ যখন বুঝতে পারলেন, শ্রোতাবৃন্দ অত্যন্ত বিস্ময় ও ঘৃণা নিয়ে ওইসব ভণ্ডদের ভালোবাসা-বোধ ও বিকৃতির ব্যাপারে চিন্তা করছে, তখন তিনি বললেন, 'দোস্তগণ, এইটুকু শুনেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই; বরং একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনাদেরকে আশ্চর্য ও বিস্ময়ের কথা শোনাচ্ছি। কোনো কোনো শাইখ বলেছেন- “ভালোবাসা হলো এক আগুন, যা অন্তর থেকে প্রেমাস্পদ আল্লাহর 'ইচ্ছাকৃত বিষয়' ছাড়া আর সবকিছুকেই জ্বালিয়ে দেয়।” এ কথা দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন-জগতের সবকিছু আল্লাহর 'ইচ্ছা'য় সৃষ্টি হয়েছে, সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর বান্দা জগতের প্রত্যেকটা বস্তুকে ভালোবাসলেই হবে পরিপূর্ণ ভালোবাসা। এখন, যেহেতু কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাও জগতের 'সব কিছু'র অন্তর্ভুক্ত, তাই এগুলোকেও ভালোবাসতে হবে (নাউযুবিল্লাহ)।
'দেখুন, একজন মানুষ কিন্তু জগতের সব কিছুই ভালোবাসতে পারে না; বরং যা কিছু তার অনুকূলে ও উপকারী তা সে ভালোবাসে, আর যা কিছু প্রতিকূলে ও ক্ষতিকারক তা অপছন্দ করে। তবু, আমাদের ওই বন্ধুরা এই ধরণের ভ্রান্ত কথা বলে; কারণ, এর মাধ্যমে তারা প্রবৃত্তিপূজার সুযোগ পায়। ফলে প্রবৃত্তির চাহিদামতোই তারা ভালোবাসে অশ্লীল ছবি, পদ-পদবি, সম্পদের অপচয় ও ভ্রষ্টকারী বিদআত; আর, মনে করে, এ-ই বুঝি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। অথচ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত তো এ-ও যে, তাঁর অপছন্দের বিষয় অপছন্দ করতে হবে এবং যথাযথ ক্ষেত্রে প্রাণ ও সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করতে হবে。
'আসলে, তাদের ভ্রান্তির মূলে যেই কথাটি-“ভালোবাসা হলো এক আগুন, যা অন্তর থেকে প্রেমাস্পদ আল্লাহর 'ইচ্ছাকৃত বিষয়' ছাড়া আর সবকিছুকেই জ্বালিয়ে দেয়।”-সেটিতে ইচ্ছা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শরয়ি ও দ্বীনি ইচ্ছা; অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা। সুতরাং ওই কথাটির সঠিক অর্থ হলো- "ভালোবাসা এমন আগুন, যা অন্তর থেকে আল্লাহর সন্তোষজনক ও ভালোবাসার বিষয় ছাড়া অন্য সব কিছুকে জ্বালিয়ে দেয়।"
'কারণ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসার দাবি হলো, তিনি যা ভালোবাসবেন বান্দা শুধু তা-ই ভালোবাসবে। বান্দার ভালোবাসাটা আল্লাহর ভালোবাসার বিরোধী হলে তাঁর প্রতি ভালোবাসাটা হবে অসম্পূর্ণ। তখন তাঁর কৃত ফয়সালা ও তাকদিরের প্রতি বান্দার মধ্যে (একধরনের) ক্ষোভ, ঘৃণা, অপছন্দ ও দূরে থাকার মানসিকতা তৈরি হবে। কিন্তু ক্ষোভ, ঘৃণা ও অপছন্দের ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে একাত্ম হতে না পারলে তাঁর প্রেমিক হওয়া যাবে না; বরং তিনি যা অপছন্দ করেন, সেটার প্রেমিক হওয়া যাবে。
একদিকে আল্লাহর প্রেমিক ও বন্ধুগণ, যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন এবং তারাও ভালোবাসে তাঁকে; অপরদিকে তারা, যারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করে তাঁর বিশাল ব্যাপক রুবুবিয়্যাহ দেখে, কিংবা যারা তাঁর ভালোবাসার দাবি করে শরিয়াহ-বিরোধী কিছু বিদআতের অনুসরণ করে। এই দুই পক্ষের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্যের মাপকাঠি হলো, শরিয়তের অনুসরণ ও জিহাদ প্রতিষ্ঠা। কারণ, যারা শুধুই ভালোবাসার দাবিদার, কিন্তু শরিয়তের অনুসারী ও জিহাদ প্রতিষ্ঠাকারী নয়, তাদের মনে তো নিফাক আছে, যেই নিফাকের ফলে মানুষ একেবারে জাহান্নামের তলদেশে গিয়ে পৌঁছুবে। আর, এমন ভালোবাসার দাবি কেবল ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দাবির সাথেই মেলে। অবশ্য, অনেক সময় ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দাবিটা এদের দাবির চেয়েও জঘন্য হয়, যখন এদের কুফরিটা ওদের পর্যায়ে না পৌঁছুয়। তাওরাত ও ইনজিলে আল্লাহর প্রতি এমন বহু ভালোবাসার কথা পাওয়া যায়, যেগুলোর ব্যাপারে ওরা সবাই একমত; বরং ওদের কাছে (ওদের) সেগুলোই শরিয়তের সবচেয়ে বড় অসিয়ত ও দাবি।'
টিকাঃ
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম : ৩১
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম : ৫৪
📄 বান্দা ও রবের মধ্যে ভালোবাসার বিনিময়
আমি বললাম, 'শাইখ, এক-পক্ষীয় ভালোবাসা কি হতে পারে? মানে, এটা কি সম্ভব যে, বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, কিন্তু তিনি বান্দাকে ভালোবাসবেন না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, যে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাঁকে ভালোবাসবেনই; এটা হতেই পারে না যে, কোনো বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে কিন্তু তিনি তাকে ভালোবাসবেন না! বরং বান্দা তার রবকে যতটা ভালোবাসে রবও বান্দাকে ততটাই ভালোবাসেন। অবশ্য, রবের ভালোবাসা তো তাঁর শান অনুযায়ী-সুমহান। যেমন- সহিহ হাদিসে মহান আল্লাহর বাণী বিবৃত হয়েছে-
قال الله عز وجل: مَنْ تقرب إلي شبرا تقربت إليه ذراعا ومن تقرب إلى ذراعا تقربت إليه باعا وإذا أقبل إلى يمشي أقبلت إليه أهزول " .
'আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, "কেউ আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হলে, আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ এক হাত অগ্রসর হলে, আমি এক গজ পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসলে, আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।" [১]
'আল্লাহ তাআলা তো ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি ভালোবাসেন মুত্তাকিদের, ভালোবাসেন ইহসানকারী ও ধৈর্যশীলদের, ভালোবাসেন তাদেরও, যারা বেশি বেশি তাওবা করে আর পবিত্রতা অর্জন করে ভালোভাবে। বরং তাঁর নির্দেশিত আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করলেও বান্দা তাঁর ভালোবাসার পরশ পায়。
'সহিহ হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله قال : ما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به
'আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে; এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’”[১]
'যুহদ ও ইবাদতের বেলায় অনেক শাইখের এমন কিছু ভ্রান্ত অনুসারী আছে, যারা খ্রিষ্টানদের মতো নানা গোমরাহির ফাঁদে পড়ে। যেমন, শরিয়াহ-বিরোধী পন্থায় আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করা; আল্লাহর পথে সংগ্রাম (জিহাদ) পরিত্যাগ করা。
'এরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীন মানতে গিয়ে খ্রিষ্টানদের মতো বহু ভুল ও গলদ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। যেমন-এরা মানুষের সামনে বিভিন্ন অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক কথা বলে, এমন বহু গল্প-ঘটনা বর্ণনা করে, যার কথকের সততা জানা নেই; বরং কথককে সত্যবাদী ধরে নিলেও অন্তত নিষ্পাপ কেউ নয় সে। ফলে, এই ভ্রান্ত অনুসারীরা নিজেদের অনুসৃতদেরকে দ্বীনপ্রণেতা বানিয়ে ফেলে; খ্রিষ্টানরা যেমন পাদ্রী-পুরোহিতদেরকে বানিয়েছিল ধর্মীয় সর্ববিষয়ের হর্তাকর্তা। এমনকি, আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামিও সীমিত করে ফেলে এরা; মনে করে, বিশেষ ব্যক্তিরা এই দাসত্বের ঊর্ধ্বে; ঠিক যেমন ধারণা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের। নবী ঈসা ও তাঁর মাতাকে খ্রিষ্টানরা যেমন আল্লাহর একরকম শরিক বানিয়ে ফেলে, এরাও তেমন বিশেষ ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর অংশীদার আখ্যা দেয়। মোটকথা, এমন বহু ভ্রান্তি এদের আছে, সবগুলোর বর্ণনা এখানে দিতে গেলে কথা বেশি দীর্ঘ হয়ে যাবে।'
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে শাইখ তাঁর কথা থামিয়ে দিলেন। সম্ভবত তিনি আজকের মতো সমাপ্ত করতে চাইছিলেন। আমি বললাম, 'শাইখ, নানামুখী কথাবার্তায় আলোচনা বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। পুরো আলোচনাটার সার যদি আমাদেরকে বলে দিতেন আমরা উপকৃত হতাম; আর আমরা সবসময়ের মতো এখনও আপনার প্রতি জ্ঞাপন করছি আন্তরিক শুকরিয়া।'
শাইখ বললেন, 'শুনুন তাহলে! আল্লাহ আপনাদের তাওফিক নসিব করুন; দ্বীনে হক হলো সর্বোতভাবে আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরে তাঁর ভালোবাসার পরশ অর্জন। আসলে, রবের দাসত্বের পূর্ণতা অনুসারেই তাঁর প্রতি বান্দার ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে; আবার, বান্দার প্রতি রবের ভালোবাসায়ও পূর্ণতার মাপকাঠি ওই দাসত্ব। অপরদিকে, রবের দাসত্বে কমতি হলে বান্দা ও রবের ভালোবাসায়ও হানা দেয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার আধার。
'বান্দার অন্তরে গাইরুল্লাহর ভালোবাসা থাকলে সেই অনুপাতে গাইরুল্লাহর দাসত্বও থাকে। এমনিভাবে অন্তরে গাইরুল্লাহর দাসত্ব থাকলে তার সমপরিমাণে থাকে গাইরুল্লাহর ভালোবাসাও। আর এ তো জানা কথা, যে ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি নয় এবং যেই আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়—উভয়টা বাতিল, ব্যর্থ ও অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং যা আল্লাহর জন্য, তা ব্যতীত দুনিয়া ও এর মধ্যস্থিত সব কিছু অভিশপ্ত। আর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু পছন্দ করে অনুমোদন করেছেন, তা-ই তো কেবল আল্লাহর জন্য。
'তাই যে আমলে গাইরুল্লাহ উদ্দেশ্য হয় কিংবা যে আমল শরিয়াহ-পরিপন্থী, তা আল্লাহর জন্য হতে পারে না। মোটকথা, যা কিছু কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার অনুগামী হবে, তা-ই শুধু আল্লাহর জন্য বলে গণ্য হবে। আর ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
"অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।"[১]
'সুতরাং সৎকাজ (তথা, ওয়াজিব ও মুস্তাহাবগুলো) করে যেতে হবে এবং তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনে যেমন এসেছে—
بَلَىٰ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
“হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে, তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[২]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
مَن عَمِلَ عَمَلًا ليسَ عليه أَمْرُنَا فَهو رَدُّ “
"যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"[১]
'অন্যত্র বলেছেন—
إِنَّما الأعمال بالنيات وإنَّما لامرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله ومن كانت هجرته لدنيا يُصيبها أو امرأة يتزوجها فهجرته إلى ما هاجر إليه
"সকল কাজ নিয়ত অনুযায়ী হয়। কোনো ব্যক্তি যা নিয়ত করে সেটা তাই হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হলো এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থে অথবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে যা সে নিয়ত করেছে।”[২]
'হাদিসে বর্ণিত এই নীতিই শরিয়তের মূলনীতি; এই নীতির বাস্তবায়ন যতটা ঘটবে, দ্বীনের আলোও ততটাই ছড়াবে। এই নীতির বার্তা নিয়েই প্রেরিত হয়েছেন বহু রাসূল, অবতীর্ণ হয়েছে অগুনতি কিতাব। আমাদের নবীজিও এই নীতির দাওয়াতই দিয়েছেন মানুষকে, এই নীতির ভিত্তিতেই জিহাদ করেছেন, সৎকাজের আদেশ করেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই নীতিতে জীবন রাঙাতে; কারণ, এই নীতিই হলো দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় সমস্ত দ্বীনি বিষয়।'
এতটুকু বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। হামদ ও সানা পড়লেন; উপস্থিত সুধীবৃন্দকে জানালেন, আবার সাক্ষাত হবে আগামী মজলিসে ইনশাআল্লাহ。
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৪০৫; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৬৭/২৬৬৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২০২
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ৪০৮৫
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৫৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৯০৭; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ২২০১
আমি বললাম, 'শাইখ, এক-পক্ষীয় ভালোবাসা কি হতে পারে? মানে, এটা কি সম্ভব যে, বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে, কিন্তু তিনি বান্দাকে ভালোবাসবেন না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ, যে আল্লাহকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাঁকে ভালোবাসবেনই; এটা হতেই পারে না যে, কোনো বান্দা আল্লাহকে ভালোবাসবে কিন্তু তিনি তাকে ভালোবাসবেন না! বরং বান্দা তার রবকে যতটা ভালোবাসে রবও বান্দাকে ততটাই ভালোবাসেন। অবশ্য, রবের ভালোবাসা তো তাঁর শান অনুযায়ী-সুমহান। যেমন- সহিহ হাদিসে মহান আল্লাহর বাণী বিবৃত হয়েছে-
قال الله عز وجل: مَنْ تقرب إلي شبرا تقربت إليه ذراعا ومن تقرب إلى ذراعا تقربت إليه باعا وإذا أقبل إلى يمشي أقبلت إليه أهزول " .
'আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, "কেউ আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হলে, আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ এক হাত অগ্রসর হলে, আমি এক গজ পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ আমার দিকে পায়ে হেঁটে আসলে, আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।" [১]
'আল্লাহ তাআলা তো ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি ভালোবাসেন মুত্তাকিদের, ভালোবাসেন ইহসানকারী ও ধৈর্যশীলদের, ভালোবাসেন তাদেরও, যারা বেশি বেশি তাওবা করে আর পবিত্রতা অর্জন করে ভালোভাবে। বরং তাঁর নির্দেশিত আবশ্যিক বা ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করলেও বান্দা তাঁর ভালোবাসার পরশ পায়。
'সহিহ হাদিসে এসেছে-
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن الله قال : ما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به
'আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে; এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’”[১]
'যুহদ ও ইবাদতের বেলায় অনেক শাইখের এমন কিছু ভ্রান্ত অনুসারী আছে, যারা খ্রিষ্টানদের মতো নানা গোমরাহির ফাঁদে পড়ে। যেমন, শরিয়াহ-বিরোধী পন্থায় আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করা; আল্লাহর পথে সংগ্রাম (জিহাদ) পরিত্যাগ করা。
'এরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীন মানতে গিয়ে খ্রিষ্টানদের মতো বহু ভুল ও গলদ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। যেমন-এরা মানুষের সামনে বিভিন্ন অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক কথা বলে, এমন বহু গল্প-ঘটনা বর্ণনা করে, যার কথকের সততা জানা নেই; বরং কথককে সত্যবাদী ধরে নিলেও অন্তত নিষ্পাপ কেউ নয় সে। ফলে, এই ভ্রান্ত অনুসারীরা নিজেদের অনুসৃতদেরকে দ্বীনপ্রণেতা বানিয়ে ফেলে; খ্রিষ্টানরা যেমন পাদ্রী-পুরোহিতদেরকে বানিয়েছিল ধর্মীয় সর্ববিষয়ের হর্তাকর্তা। এমনকি, আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামিও সীমিত করে ফেলে এরা; মনে করে, বিশেষ ব্যক্তিরা এই দাসত্বের ঊর্ধ্বে; ঠিক যেমন ধারণা ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের। নবী ঈসা ও তাঁর মাতাকে খ্রিষ্টানরা যেমন আল্লাহর একরকম শরিক বানিয়ে ফেলে, এরাও তেমন বিশেষ ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর অংশীদার আখ্যা দেয়। মোটকথা, এমন বহু ভ্রান্তি এদের আছে, সবগুলোর বর্ণনা এখানে দিতে গেলে কথা বেশি দীর্ঘ হয়ে যাবে।'
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে শাইখ তাঁর কথা থামিয়ে দিলেন। সম্ভবত তিনি আজকের মতো সমাপ্ত করতে চাইছিলেন। আমি বললাম, 'শাইখ, নানামুখী কথাবার্তায় আলোচনা বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। পুরো আলোচনাটার সার যদি আমাদেরকে বলে দিতেন আমরা উপকৃত হতাম; আর আমরা সবসময়ের মতো এখনও আপনার প্রতি জ্ঞাপন করছি আন্তরিক শুকরিয়া।'
শাইখ বললেন, 'শুনুন তাহলে! আল্লাহ আপনাদের তাওফিক নসিব করুন; দ্বীনে হক হলো সর্বোতভাবে আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরে তাঁর ভালোবাসার পরশ অর্জন। আসলে, রবের দাসত্বের পূর্ণতা অনুসারেই তাঁর প্রতি বান্দার ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে; আবার, বান্দার প্রতি রবের ভালোবাসায়ও পূর্ণতার মাপকাঠি ওই দাসত্ব। অপরদিকে, রবের দাসত্বে কমতি হলে বান্দা ও রবের ভালোবাসায়ও হানা দেয় ত্রুটি ও অপূর্ণতার আধার。
'বান্দার অন্তরে গাইরুল্লাহর ভালোবাসা থাকলে সেই অনুপাতে গাইরুল্লাহর দাসত্বও থাকে। এমনিভাবে অন্তরে গাইরুল্লাহর দাসত্ব থাকলে তার সমপরিমাণে থাকে গাইরুল্লাহর ভালোবাসাও। আর এ তো জানা কথা, যে ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি নয় এবং যেই আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়—উভয়টা বাতিল, ব্যর্থ ও অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং যা আল্লাহর জন্য, তা ব্যতীত দুনিয়া ও এর মধ্যস্থিত সব কিছু অভিশপ্ত। আর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু পছন্দ করে অনুমোদন করেছেন, তা-ই তো কেবল আল্লাহর জন্য。
'তাই যে আমলে গাইরুল্লাহ উদ্দেশ্য হয় কিংবা যে আমল শরিয়াহ-পরিপন্থী, তা আল্লাহর জন্য হতে পারে না। মোটকথা, যা কিছু কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার অনুগামী হবে, তা-ই শুধু আল্লাহর জন্য বলে গণ্য হবে। আর ওয়াজিব ও মুস্তাহাব বিষয়গুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
"অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।"[১]
'সুতরাং সৎকাজ (তথা, ওয়াজিব ও মুস্তাহাবগুলো) করে যেতে হবে এবং তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনে যেমন এসেছে—
بَلَىٰ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
“হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে, তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[২]
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
مَن عَمِلَ عَمَلًا ليسَ عليه أَمْرُنَا فَهو رَدُّ “
"যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।"[১]
'অন্যত্র বলেছেন—
إِنَّما الأعمال بالنيات وإنَّما لامرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله ومن كانت هجرته لدنيا يُصيبها أو امرأة يتزوجها فهجرته إلى ما هاجر إليه
"সকল কাজ নিয়ত অনুযায়ী হয়। কোনো ব্যক্তি যা নিয়ত করে সেটা তাই হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হলো এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থে অথবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করল, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে যা সে নিয়ত করেছে।”[২]
'হাদিসে বর্ণিত এই নীতিই শরিয়তের মূলনীতি; এই নীতির বাস্তবায়ন যতটা ঘটবে, দ্বীনের আলোও ততটাই ছড়াবে। এই নীতির বার্তা নিয়েই প্রেরিত হয়েছেন বহু রাসূল, অবতীর্ণ হয়েছে অগুনতি কিতাব। আমাদের নবীজিও এই নীতির দাওয়াতই দিয়েছেন মানুষকে, এই নীতির ভিত্তিতেই জিহাদ করেছেন, সৎকাজের আদেশ করেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এই নীতিতে জীবন রাঙাতে; কারণ, এই নীতিই হলো দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় সমস্ত দ্বীনি বিষয়।'
এতটুকু বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। হামদ ও সানা পড়লেন; উপস্থিত সুধীবৃন্দকে জানালেন, আবার সাক্ষাত হবে আগামী মজলিসে ইনশাআল্লাহ。
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৪০৫; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৬৭/২৬৬৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫২০২
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ৪০৮৫
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৫৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৯০৭; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম : ২২০১