📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ভালোবাসার শীর্ষ চূড়া

📄 ভালোবাসার শীর্ষ চূড়া


'আসলে, বন্ধুত্বই হলো ভালোবাসার শীর্ষচূড়া, যার আবশ্যিক ফলরূপে বান্দার মধ্যে প্রকাশ পায় রবের পূর্ণ দাসত্ব। আবার, রবের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বটা হলো তাঁর সেই বান্দাদের প্রতি পূর্ণ রুবুবিয়্যাতের প্রকাশ, যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন এবং তাঁকেও ভালোবাসে যারা। উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব) শব্দটিতে চূড়ান্ত নীচুতা যেমন আছে, তেমন আছে চূড়ান্ত ভালোবাসাও। কারণ, আরবরা প্রেমাস্পদের দাসত্বে লিপ্ত অন্তরকে বলে- قَلْبٌ مُتَيَّمٌ مُتَيَّمٌ এর অর্থ হলো দাস। আবার ওরা বলে- (تَمَّمَ اللهُ) আল্লাহ তাকে ‘তাইম’ বানিয়েছেন); অর্থাৎ দাস বানিয়েছেন।
‘ভালোবাসার এই চূড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল দুজনের, নবী ইবরাহিম ও নবীজি মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালাম-এর। এজন্য জগতে নবীজির কোনো ‘বন্ধু’ ছিল না; কারণ, বন্ধুত্বে অংশীদারত্ব চলে না। ওই যে কবি বলেছেন— “তুমি আমার শ্বাসনালীতে এসে দাঁড়িয়েছ আরে, এজন্যই তো বন্ধুকে ‘বন্ধু’ বলা হয়।”
‘তবে সাধারণ ভালোবাসা তো ছিলই। সহিহ হাদিসে এসেছে, হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে নবীজি বলেছেন— اللهمَّ إِنِّي أُحِبُّهما فأحبهما وأحبَّ مَن يحبهما “হে আল্লাহ, এদেরকে আমি ভালোবাসি, তুমিও ভালোবাসো; এবং তাদেরকেও ভালোবাসো, যারা এদেরকে ভালোবাসে।” [১]
‘আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— أَيُّ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَيْكَ ؟ قَالَ : عَائِشَةُ قُلتُ : مِنَ الرِّجالِ ؟ قال : أبوها ‘কোন মানুষটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আয়েশা।’ আমি বলেছিলাম, ‘পুরুষদের মধ্যে কে?’ নবীজি বলেছিলেন, ‘আয়েশার বাবা।” [২]
‘আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দিষ্ট করে নবীজি বলেছিলেন— لأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ | “আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেবো, আল্লাহ ও রাসূলকে যে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও যাকে ভালোবাসেন।”[১]
‘ভালোবাসার এমন অনেক বর্ণনা আছে। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি তাকওয়া অবলম্বনকারীদেরকে ভালোবাসেন; ইহসানকারী ও ন্যায় বিচারকদেরকে ভালোবাসেন; তাওবাকারী, পবিত্রতা অর্জনকারী ও সীসাঢালা প্রাচীরের মতো সারিবদ্ধভাবে তাঁর পথে লড়াইকারীদেরকেও ভালোবাসেন। মুমিন বান্দাদের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন—
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ :
“শিগগির আল্লাহ এমন এক (মুমিন) সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও ভালোবাসবে তাঁকে।”[২]
'আবার, তাঁর প্রতি মুমিনদের ভালোবাসার কথাও ব্যক্ত করেছেন; ইরশাদ করেছেন—
وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
| “আল্লাহর প্রতি মুমিনদের ভালোবাসা প্রবল।”[৩]
'অপরদিকে বন্ধুত্ব হলো বিশেষ। অনেকের ধারণা এমন যে, বন্ধুত্বের চেয়ে ভালোবাসা উপরের জিনিস। তাই তারা বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব (ভালোবাসার পাত্র); আর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হলেন আল্লাহর খলিল (বন্ধু)। তাদের এই কথা ও ধারণা নিতান্তই দুর্বল। কারণ, প্রসিদ্ধ বহু সহিহ হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত, যে, নবীজি খলিলও। যে বর্ণনায় আছে “আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাশর একজন হাবিব ও একজন খলিলের মাঝে হবে”—এটা স্রেফ জাল বর্ণনা; এগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু বলা শুদ্ধ নয়。
'বন্ধুগণ, আমরা আগেও বলেছি, আল্লাহ যা কিছু ভালোবাসেন, সেসবকে ভালোবাসাও আল্লাহকে ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। বুখারি ও মুসলিমে যেমন এসেছে—

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৭৪৯; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৬১৫০
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৬৬২
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৪০৪
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ৫৪
[৩] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫

'আসলে, বন্ধুত্বই হলো ভালোবাসার শীর্ষচূড়া, যার আবশ্যিক ফলরূপে বান্দার মধ্যে প্রকাশ পায় রবের পূর্ণ দাসত্ব। আবার, রবের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বটা হলো তাঁর সেই বান্দাদের প্রতি পূর্ণ রুবুবিয়্যাতের প্রকাশ, যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন এবং তাঁকেও ভালোবাসে যারা। উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব) শব্দটিতে চূড়ান্ত নীচুতা যেমন আছে, তেমন আছে চূড়ান্ত ভালোবাসাও। কারণ, আরবরা প্রেমাস্পদের দাসত্বে লিপ্ত অন্তরকে বলে- قَلْبٌ مُتَيَّمٌ مُتَيَّمٌ এর অর্থ হলো দাস। আবার ওরা বলে- (تَمَّمَ اللهُ) আল্লাহ তাকে ‘তাইম’ বানিয়েছেন); অর্থাৎ দাস বানিয়েছেন।
‘ভালোবাসার এই চূড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল দুজনের, নবী ইবরাহিম ও নবীজি মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালাম-এর। এজন্য জগতে নবীজির কোনো ‘বন্ধু’ ছিল না; কারণ, বন্ধুত্বে অংশীদারত্ব চলে না। ওই যে কবি বলেছেন— “তুমি আমার শ্বাসনালীতে এসে দাঁড়িয়েছ আরে, এজন্যই তো বন্ধুকে ‘বন্ধু’ বলা হয়।”
‘তবে সাধারণ ভালোবাসা তো ছিলই। সহিহ হাদিসে এসেছে, হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে নবীজি বলেছেন— اللهمَّ إِنِّي أُحِبُّهما فأحبهما وأحبَّ مَن يحبهما “হে আল্লাহ, এদেরকে আমি ভালোবাসি, তুমিও ভালোবাসো; এবং তাদেরকেও ভালোবাসো, যারা এদেরকে ভালোবাসে।” [১]
‘আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— أَيُّ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَيْكَ ؟ قَالَ : عَائِشَةُ قُلتُ : مِنَ الرِّجالِ ؟ قال : أبوها ‘কোন মানুষটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আয়েশা।’ আমি বলেছিলাম, ‘পুরুষদের মধ্যে কে?’ নবীজি বলেছিলেন, ‘আয়েশার বাবা।” [২]
‘আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দিষ্ট করে নবীজি বলেছিলেন— لأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ رَجُلًا يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ، وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ | “আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেবো, আল্লাহ ও রাসূলকে যে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও যাকে ভালোবাসেন।”[১]
‘ভালোবাসার এমন অনেক বর্ণনা আছে। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি তাকওয়া অবলম্বনকারীদেরকে ভালোবাসেন; ইহসানকারী ও ন্যায় বিচারকদেরকে ভালোবাসেন; তাওবাকারী, পবিত্রতা অর্জনকারী ও সীসাঢালা প্রাচীরের মতো সারিবদ্ধভাবে তাঁর পথে লড়াইকারীদেরকেও ভালোবাসেন। মুমিন বান্দাদের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন—
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ :
“শিগগির আল্লাহ এমন এক (মুমিন) সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও ভালোবাসবে তাঁকে।”[২]
'আবার, তাঁর প্রতি মুমিনদের ভালোবাসার কথাও ব্যক্ত করেছেন; ইরশাদ করেছেন—
وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
| “আল্লাহর প্রতি মুমিনদের ভালোবাসা প্রবল।”[৩]
'অপরদিকে বন্ধুত্ব হলো বিশেষ। অনেকের ধারণা এমন যে, বন্ধুত্বের চেয়ে ভালোবাসা উপরের জিনিস। তাই তারা বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হাবিব (ভালোবাসার পাত্র); আর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হলেন আল্লাহর খলিল (বন্ধু)। তাদের এই কথা ও ধারণা নিতান্তই দুর্বল। কারণ, প্রসিদ্ধ বহু সহিহ হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত, যে, নবীজি খলিলও। যে বর্ণনায় আছে “আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাশর একজন হাবিব ও একজন খলিলের মাঝে হবে”—এটা স্রেফ জাল বর্ণনা; এগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু বলা শুদ্ধ নয়。
'বন্ধুগণ, আমরা আগেও বলেছি, আল্লাহ যা কিছু ভালোবাসেন, সেসবকে ভালোবাসাও আল্লাহকে ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। বুখারি ও মুসলিমে যেমন এসেছে—

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৭৪৯; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৬১৫০
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৬৬২
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৪০৪
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ৫৪
[৩] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ঈমানের মিষ্টতা : আল্লাহর প্রতি বান্দার উপচানো ভালোবাসার নির্যাস

📄 ঈমানের মিষ্টতা : আল্লাহর প্রতি বান্দার উপচানো ভালোবাসার নির্যাস


عن أنس ، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ أَن يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَن يُحِبْ الْمَرْءُ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا اللَّهِ ، وَأَن يَّكْرَهَ أَن يَعُوْدَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَن يُقْذَفَ في النار
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে:
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যার কাছে অন্য সকল কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবেন;
২. যে অন্যকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে;
৩. যে কুফরিতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মতো অপছন্দ করবে।"[১]
'দেখুন, এখানে নবীজি জানালেন, এই তিনটি গুণ থাকলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যাবে; কেন? কারণ হলো, কোনো জিনিসকে ভালোবাসলে এর প্রভাব হিসেবে তার মাধ্যমে বিশেষ স্বাদ অনুভূত হয়। কেউ কোনো জিনিসের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ বোধ করার পর সেটা অর্জিত হয়ে গেলে এক অন্যরকম স্বাদ, মিষ্টতা ও খুশি অনুভব করে সে। কারণ, স্বাদ হলো এমন অনুভূতি, মনমতো আগ্রহ ও ভালোবাসার বস্তু অর্জিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় যা সৃষ্টি হয়।'
আমি বললাম, 'শাইখ, আপনি কি অনেক দার্শনিক ও ডাক্তারদের মতের বিরোধিতা করছেন, যারা বলে, স্বাদ হলো মনমতো কোনো কিছু অর্জন করা?'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, স্বাদ বলতে যারা বোঝে শুধু মনমতো বা অনুকূল কিছু অর্জন করা, আমি তাদের এ মতকে স্পষ্ট ভুল মনে করি। কারণ, অর্জন করাটা তো ভালোবাসা ও স্বাদ লাগার মধ্যবর্তী ব্যাপার। যেমন ধরুন, খাবারের প্রতি একজনের খুব আগ্রহ (এটা হলো তার ভালোবাসা)। সে প্রথমে খাবারটা গ্রহণ করে (এ-ই হলো ভালোবাসার বস্তুটা অর্জন)। তারপর স্বাদ অনুভব করে। এমনিভাবে, কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাতের আগ্রহ হলে দৃষ্টি নিক্ষেপের পর স্বাদের অনুভূতি হয়; দৃষ্টি নিক্ষেপটাই কিন্তু স্বাদ না; বরং তাকানো ও দৃষ্টি দেওয়ার পরে যেই অনুভূতি হয়, সেটাই হলো স্বাদ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَفِيهَا مَا تَشْتهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ
"সেখানে (জান্নাতে) আছে মনমতো ও দর্শনে স্বাদ অনুভব করার সব উপকরণ।"[১]
'এভাবেই প্রিয় কিছুর অনুভবের ফলে অন্তরে স্বাদ ও আনন্দ অনুভূত হয়, আর অপ্রিয় কিছুর অনুভবের পরিণতিতে কষ্ট ও পেরেশানি অনুভূত হয়। প্রিয় বা অপ্রিয় কিছুর অনুভবটাই স্বয়ং ওই আনন্দ বা পেরেশানি নয়。
'ঈমানের যেই স্বাদ ও আনন্দমিশ্রিত মিষ্টতা অনুভব করে কোনো মুমিন, সেটা কেবল আল্লাহর প্রতি বান্দার হৃদয়-উপচানো ভালোবাসার পরেই হয়ে থাকে। তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে এটি হয়— ১. ভালোবাসা পরিপূর্ণ করা; ২. ভালোবাসার বিস্তার ঘটানো; ৩. বিরোধী ও ক্ষতিকারক সব কিছু থেকে ভালোবাসাকে রক্ষা করা。
'প্রথম বিষয় ভালোবাসা পরিপূর্ণ করা। কীভাবে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অন্য সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে; কারণ, এ দুজনের বেলায় সাধারণ ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; বরং সর্বোচ্চ ভালোবাসা জরুরি。
'দ্বিতীয় বিষয় ভালোবাসার বিস্তার ঘটানো। কীভাবে? কাউকে (বা কোনো বস্তু-বিষয়কে) শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসতে হবে。
'তৃতীয় বিষয় বিরোধী ও ক্ষতিকারক সব কিছু থেকে ভালোবাসাকে রক্ষা করা। কীভাবে? এর উপায় হলো, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়েও ঈমান-বিরোধী সব কিছুকে বেশি অপছন্দ ও ভয়াবহ মনে করা。
'উপরের আলোচনা থেকে পরিস্কার হয়েছে—রাসূল ও মুমিনদেরকে ভালোবাসা আল্লাহকে ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। রাসূল নিজেও সেই মুমিনদেরকে ভালোবাসেন, যাদেরকে ভালোবাসেন আল্লাহ; কারণ, তিনি (রাসূল) সব মানুষের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন; ফলে, আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন, তাদেরকে তিনিও ভালোবাসেন; আল্লাহ যাদেরকে অপছন্দ করেন, তিনিও তাদেরকে অপছন্দ করেন; অপরদিকে, আল্লাহ ছাড়া কোনো বন্ধু নেই তাঁর; তিনি তো বলেছেনই—
وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيْلًا لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا
| “আমি কাউকে বন্ধু বানালে, আবু বকরকেই বানাতাম”।[১]
তাই বোঝা গেল, সাধারণ ভালোবাসার চেয়ে বন্ধুত্বের স্তর অনেক ঊর্ধ্বে।'

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৬, ২১, ৬০৪১, ৬৯৪১; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৪৩
[১] সূরা যুখরুফ; আয়াত-ক্রম: ৭১
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৮২

عن أنس ، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ثَلَاثَ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ أَن يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَن يُحِبْ الْمَرْءُ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا اللَّهِ ، وَأَن يَّكْرَهَ أَن يَعُوْدَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَن يُقْذَفَ في النار
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে:
১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যার কাছে অন্য সকল কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবেন;
২. যে অন্যকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে;
৩. যে কুফরিতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মতো অপছন্দ করবে।"[১]
'দেখুন, এখানে নবীজি জানালেন, এই তিনটি গুণ থাকলে ঈমানের স্বাদ পাওয়া যাবে; কেন? কারণ হলো, কোনো জিনিসকে ভালোবাসলে এর প্রভাব হিসেবে তার মাধ্যমে বিশেষ স্বাদ অনুভূত হয়। কেউ কোনো জিনিসের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ বোধ করার পর সেটা অর্জিত হয়ে গেলে এক অন্যরকম স্বাদ, মিষ্টতা ও খুশি অনুভব করে সে। কারণ, স্বাদ হলো এমন অনুভূতি, মনমতো আগ্রহ ও ভালোবাসার বস্তু অর্জিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় যা সৃষ্টি হয়।'
আমি বললাম, 'শাইখ, আপনি কি অনেক দার্শনিক ও ডাক্তারদের মতের বিরোধিতা করছেন, যারা বলে, স্বাদ হলো মনমতো কোনো কিছু অর্জন করা?'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, স্বাদ বলতে যারা বোঝে শুধু মনমতো বা অনুকূল কিছু অর্জন করা, আমি তাদের এ মতকে স্পষ্ট ভুল মনে করি। কারণ, অর্জন করাটা তো ভালোবাসা ও স্বাদ লাগার মধ্যবর্তী ব্যাপার। যেমন ধরুন, খাবারের প্রতি একজনের খুব আগ্রহ (এটা হলো তার ভালোবাসা)। সে প্রথমে খাবারটা গ্রহণ করে (এ-ই হলো ভালোবাসার বস্তুটা অর্জন)। তারপর স্বাদ অনুভব করে। এমনিভাবে, কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাতের আগ্রহ হলে দৃষ্টি নিক্ষেপের পর স্বাদের অনুভূতি হয়; দৃষ্টি নিক্ষেপটাই কিন্তু স্বাদ না; বরং তাকানো ও দৃষ্টি দেওয়ার পরে যেই অনুভূতি হয়, সেটাই হলো স্বাদ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَفِيهَا مَا تَشْتهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ
"সেখানে (জান্নাতে) আছে মনমতো ও দর্শনে স্বাদ অনুভব করার সব উপকরণ।"[১]
'এভাবেই প্রিয় কিছুর অনুভবের ফলে অন্তরে স্বাদ ও আনন্দ অনুভূত হয়, আর অপ্রিয় কিছুর অনুভবের পরিণতিতে কষ্ট ও পেরেশানি অনুভূত হয়। প্রিয় বা অপ্রিয় কিছুর অনুভবটাই স্বয়ং ওই আনন্দ বা পেরেশানি নয়。
'ঈমানের যেই স্বাদ ও আনন্দমিশ্রিত মিষ্টতা অনুভব করে কোনো মুমিন, সেটা কেবল আল্লাহর প্রতি বান্দার হৃদয়-উপচানো ভালোবাসার পরেই হয়ে থাকে। তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে এটি হয়— ১. ভালোবাসা পরিপূর্ণ করা; ২. ভালোবাসার বিস্তার ঘটানো; ৩. বিরোধী ও ক্ষতিকারক সব কিছু থেকে ভালোবাসাকে রক্ষা করা。
'প্রথম বিষয় ভালোবাসা পরিপূর্ণ করা। কীভাবে? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অন্য সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে; কারণ, এ দুজনের বেলায় সাধারণ ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; বরং সর্বোচ্চ ভালোবাসা জরুরি。
'দ্বিতীয় বিষয় ভালোবাসার বিস্তার ঘটানো। কীভাবে? কাউকে (বা কোনো বস্তু-বিষয়কে) শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসতে হবে。
'তৃতীয় বিষয় বিরোধী ও ক্ষতিকারক সব কিছু থেকে ভালোবাসাকে রক্ষা করা। কীভাবে? এর উপায় হলো, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার চেয়েও ঈমান-বিরোধী সব কিছুকে বেশি অপছন্দ ও ভয়াবহ মনে করা。
'উপরের আলোচনা থেকে পরিস্কার হয়েছে—রাসূল ও মুমিনদেরকে ভালোবাসা আল্লাহকে ভালোবাসার অন্তর্ভুক্ত। রাসূল নিজেও সেই মুমিনদেরকে ভালোবাসেন, যাদেরকে ভালোবাসেন আল্লাহ; কারণ, তিনি (রাসূল) সব মানুষের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন; ফলে, আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন, তাদেরকে তিনিও ভালোবাসেন; আল্লাহ যাদেরকে অপছন্দ করেন, তিনিও তাদেরকে অপছন্দ করেন; অপরদিকে, আল্লাহ ছাড়া কোনো বন্ধু নেই তাঁর; তিনি তো বলেছেনই—
وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيْلًا لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيْلًا
| “আমি কাউকে বন্ধু বানালে, আবু বকরকেই বানাতাম”।[১]
তাই বোঝা গেল, সাধারণ ভালোবাসার চেয়ে বন্ধুত্বের স্তর অনেক ঊর্ধ্বে।'

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৬, ২১, ৬০৪১, ৬৯৪১; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৪৩
[১] সূরা যুখরুফ; আয়াত-ক্রম: ৭১
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৮২

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 দাসত্বের হাকিকত ও স্বরূপ

📄 দাসত্বের হাকিকত ও স্বরূপ


এতক্ষণ শাইখ 'বন্ধুত্বে'র উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন; সাথে এই আলোচনাও করেছেন যে, স্বাদ অনুভূত হওয়া আর প্রিয় বস্তু অর্জন করা এক নয়; দুইটা আলাদা। একটা বিষয়ে অনেকে ভুল বোঝে, মনে করে, উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব) মানে শুধু মাবুদের সামনে নীচতা ও হীনতা, ভালোবাসার কোনো ব্যাপার নেই এতে। অথচ ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমেই উবুদিয়্যাহ পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই, শাইখ বললেন, 'প্রিয় বন্ধুগণ, আসলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বই মাবুদের দাসত্ব বাস্তবায়িত করে। সেসব লোক স্পষ্ট ভুলের মধ্যে আছে, যারা মনে করে, দাসত্বে শুধুই নীচতা ও হীনতা আছে, কোনো ভালোবাসা নেই। কিংবা যারা মনে করে, ভালোবাসা মানে শুধু অনৈতিক আনন্দের পসরা; অথবা ভালোবাসায়ও এমন সম্মানহানি মিশে থাকে, রবের শানে যা শোভা পায় না。
'এ কারণে শাইখ যুন্নুন রাহিমাহুল্লাহকে লোকেরা মহব্বত ও ভালোবাসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি বলেছিলেন, “ভাই, এটা আলোচনা করে লাভ নেই, কেউ শুনবে না; বাদ দাও।”
'যারা ভয়বিহীন ভালোবাসার কথা বলে, বহু আলিম ও তাসাউফের অনেক শাইখ অমন লোকদের সঙ্গ-সাহচর্যের ব্যাপারে অপছন্দনীয়তা ব্যক্ত করেছেন। জনৈক সালাফ বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধু 'ভালোবাসা' নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জিন্দিক; শুধু 'আশা' নিয়ে যে তাঁর ইবাদত করে, সে মুরজিয়া; শুধু 'ভয়' নিয়ে তাঁর ইবাদত যে করে, সে হারুরি; কিন্তু ভয়, আশা ও ভালোবাসা নিয়ে যে আল্লাহর ইবাদত করে সে-ই মূলত তাওহিদবাদী মুমিন।"
'এজন্যই সালাফের পরবর্তী যুগে এমন অনেককে দেখা যায় যারা ভালোবাসার দাবিতে ব্যাপকতা আনতে আনতে বিষয়টিকে এক প্রকারের ঔদাস্য ও বেখেয়ালিপনায় পরিণত করেছেন। অথচ যেই দাবি উবুদিয়্যাহর পরিপন্থী, যেই দাবির ফলে একমাত্র আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন রুবুবিয়্যাহতে বান্দারও কিছুটা দখল সাব্যস্ত হয়, এমনিভাবে উম্মাহর কোনো সদস্যের যেই দাবি নবীদের চেয়েও ওপরের স্তরের হয়, বা যেই দাবির মাধ্যমে এমন বিষয় কামনা করা হয়, যা কেবল আল্লাহর জন্য বিশেষায়িত-এসমস্ত দাবি-দাওয়ার কোনোটাই তো নবী-রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) জন্যও জায়েজ নেই。

এতক্ষণ শাইখ 'বন্ধুত্বে'র উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন; সাথে এই আলোচনাও করেছেন যে, স্বাদ অনুভূত হওয়া আর প্রিয় বস্তু অর্জন করা এক নয়; দুইটা আলাদা। একটা বিষয়ে অনেকে ভুল বোঝে, মনে করে, উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব) মানে শুধু মাবুদের সামনে নীচতা ও হীনতা, ভালোবাসার কোনো ব্যাপার নেই এতে। অথচ ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমেই উবুদিয়্যাহ পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই, শাইখ বললেন, 'প্রিয় বন্ধুগণ, আসলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বই মাবুদের দাসত্ব বাস্তবায়িত করে। সেসব লোক স্পষ্ট ভুলের মধ্যে আছে, যারা মনে করে, দাসত্বে শুধুই নীচতা ও হীনতা আছে, কোনো ভালোবাসা নেই। কিংবা যারা মনে করে, ভালোবাসা মানে শুধু অনৈতিক আনন্দের পসরা; অথবা ভালোবাসায়ও এমন সম্মানহানি মিশে থাকে, রবের শানে যা শোভা পায় না。
'এ কারণে শাইখ যুন্নুন রাহিমাহুল্লাহকে লোকেরা মহব্বত ও ভালোবাসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি বলেছিলেন, “ভাই, এটা আলোচনা করে লাভ নেই, কেউ শুনবে না; বাদ দাও।”
'যারা ভয়বিহীন ভালোবাসার কথা বলে, বহু আলিম ও তাসাউফের অনেক শাইখ অমন লোকদের সঙ্গ-সাহচর্যের ব্যাপারে অপছন্দনীয়তা ব্যক্ত করেছেন। জনৈক সালাফ বলেছেন, "যে ব্যক্তি শুধু 'ভালোবাসা' নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জিন্দিক; শুধু 'আশা' নিয়ে যে তাঁর ইবাদত করে, সে মুরজিয়া; শুধু 'ভয়' নিয়ে তাঁর ইবাদত যে করে, সে হারুরি; কিন্তু ভয়, আশা ও ভালোবাসা নিয়ে যে আল্লাহর ইবাদত করে সে-ই মূলত তাওহিদবাদী মুমিন।"
'এজন্যই সালাফের পরবর্তী যুগে এমন অনেককে দেখা যায় যারা ভালোবাসার দাবিতে ব্যাপকতা আনতে আনতে বিষয়টিকে এক প্রকারের ঔদাস্য ও বেখেয়ালিপনায় পরিণত করেছেন। অথচ যেই দাবি উবুদিয়্যাহর পরিপন্থী, যেই দাবির ফলে একমাত্র আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন রুবুবিয়্যাহতে বান্দারও কিছুটা দখল সাব্যস্ত হয়, এমনিভাবে উম্মাহর কোনো সদস্যের যেই দাবি নবীদের চেয়েও ওপরের স্তরের হয়, বা যেই দাবির মাধ্যমে এমন বিষয় কামনা করা হয়, যা কেবল আল্লাহর জন্য বিশেষায়িত-এসমস্ত দাবি-দাওয়ার কোনোটাই তো নবী-রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) জন্যও জায়েজ নেই。

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 আল্লাহপ্রেমিকদের নানারকম হালত

📄 আল্লাহপ্রেমিকদের নানারকম হালত


আমি বললাম, 'শাইখ! যারা ভালোবাসা ও এ-জাতীয় বিষয়ের বিকৃতি ঘটায়, অনুগ্রহপূর্বক তাদের ওই বিকৃতি ও বিচ্যুতির কারণ যদি বলে দিতেন, আমাদের বিরাট উপকার হতো তাহলে!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, ওই বিচ্যুতি ও বিকৃতির কারণ হলো, রাসূলগণের বক্তৃতায় এবং তাঁদের নিয়ে লিখিত আদেশ ও নিষেধে যেই উবুদিয়্যাহর কথা বিবৃত হয়েছে, তা সম্পর্কে স্বল্প ও ভাসাভাসা জানাশোনা; বরং যেই বোধ-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ উবুদিয়্যাহ অনুধাবন করতে পারবে, সেই বোধ-বুদ্ধির দুর্বলতাও ওই বিচ্যুতির অন্যতম কারণ। মানুষের বুদ্ধি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, সঙ্গে দ্বীনি ইলমেও ঘাটতি থাকে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে ভালোবাসা, তখন অন্তর নানাবিধ বোকামিতে জড়িয়ে পড়ে。
'যেমন-মানুষ কারও ভালোবাসায় বোকামি ও অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ করেও গর্বিত হয়; সংকোচ অনুভব করে না; বলে, আমি তো প্রেমিক, তাই কোনো কর্মের (হোক না সেটা অজ্ঞতা বা শত্রুতামূলক কিছু) জন্যই আমি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হব না। হায় রে, এ তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তি: ইহুদিদের কথার সঙ্গে এটা মিলে যায়; ওদের বক্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرَىٰ نَحْنُ أَبْنُوا اللَّهِ وَأَحِبُّؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ
“ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, 'আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন'। আপনি বলুন, তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি প্রদান করবেন? বরং সত্য তো এই যে, তোমরাও তাঁর সৃষ্ট (সাধারণ) মানুষেরই অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন।" [১]
'পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার অর্থ হলো, তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় কেউ নয় এবং তাঁর সঙ্গে সন্তান হিসেবে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই; বরং তারা তাঁর সাধারণ বান্দা ও মাখলুক。
'আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে তাঁর পছন্দের কাজে নিয়োজিত রাখেন; সে কুফর, ফিসক (পাপাচার) ও অবাধ্যতার মতো আল্লাহর অসন্তোষের কোনো কিছুতে আর লিপ্ত হয় না। অপরদিকে, কেউ কবিরা (বড় ধরনের) গুনাহ বারবার করতে থাকলে এবং তাওবাও না করলে আল্লাহ তাআলা তার ওই ব্যাপারটায় অসন্তুষ্ট হন। আল্লাহ তাআলার চাওয়া, বান্দা ভালো ও নেক কাজগুলোতে লিপ্ত থাকুক। কারণ, বান্দার ঈমান ও তাকওয়া-অনুপাতে তিনি তাকে ভালোবাসেন。
'কেউ যদি মনে করে-আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। তাই বারবার পাপ করলেও কোনো সমস্যা নেই; তার অবস্থা তো ওই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যে নিয়মিতই বিষ পান করছে, কিন্তু সুস্থতার জন্য ওষুধ সেবন করছে না; আবার, মনে মনে ভাবছে-এই বিষ আমার কোনো ক্ষতি করবে না!
'অনেক সালিককে দেখা গেছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে দ্বীনি বিষয়ে বিভিন্নরকম অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে; কেউ হয়তো আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে তাঁর সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে; কেউবা তাঁর হক নষ্ট করেছে; কেউ আবার এমনসব উদ্ভট ও ভ্রান্ত দাবি করে বসেছে, যা নিতান্তই ফালতু ও ভিত্তিহীন。
'যেমন—কোনো একজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কাউকে জাহান্নামে একা ছেড়ে আসলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!” আরেকজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কোনো মুমিনকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে দিলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই!”
'দেখুন, প্রথমজন তার মুরিদকে এমন স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে যে, সে প্রতিটা জাহান্নামিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রাখে! (নাউযুবিল্লাহ)। আর দ্বিতীয়জন তার মুরিদকে আরও শক্তিশালী সাব্যস্ত করে দিচ্ছে যে, কবিরা গুনাহকারীদেরকেও সে জাহান্নামে প্রবেশ করা থেকে বাঁচাতে পারবে!
'কোনো সালেক এমন কথাও বলেছে যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের সামনে তার তাঁবু খাটানো হবে, যেন একটি মানুষও জাহান্নামে দাখিল হতে না পারে!
'এ-জাতীয় বক্তব্য প্রসিদ্ধ অনেক শাইখের নামে বর্ণিত আছে; আসলে, এগুলো হয়তো তাদের নামে বানানো অথবা তারা বলে থাকলেও কথাগুলো তো ভুলই। অনেক সময় নেশাগ্রস্ত, আত্মিক অবস্থার নিকট পরাভূত ও আত্মবিলীন-হওয়া মানুষ এ-ধরনের কথাবার্তা বলে; যখন তার বিবেচনা-বোধ লোপ পায় বা তা দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সে বুঝতে পারে না—কী করছে কী বলছে। সঙ্গে একটু বলে রাখি, 'নেশাগ্রস্ততা' হলো, বিবেচনা-বোধ লুপ্ত অবস্থায় একধরনের স্বাদ অনুভব করা। এজন্যই ওরকম মাশায়েখের অনেককেই দেখা গেছে, হুঁশ ফিরে আসলে তারা তাদের ওই ভুলভাল কথাবার্তা থেকে ইস্তিগফার করতেন।'

টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১৮

আমি বললাম, 'শাইখ! যারা ভালোবাসা ও এ-জাতীয় বিষয়ের বিকৃতি ঘটায়, অনুগ্রহপূর্বক তাদের ওই বিকৃতি ও বিচ্যুতির কারণ যদি বলে দিতেন, আমাদের বিরাট উপকার হতো তাহলে!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, ওই বিচ্যুতি ও বিকৃতির কারণ হলো, রাসূলগণের বক্তৃতায় এবং তাঁদের নিয়ে লিখিত আদেশ ও নিষেধে যেই উবুদিয়্যাহর কথা বিবৃত হয়েছে, তা সম্পর্কে স্বল্প ও ভাসাভাসা জানাশোনা; বরং যেই বোধ-বুদ্ধি দিয়ে মানুষ উবুদিয়্যাহ অনুধাবন করতে পারবে, সেই বোধ-বুদ্ধির দুর্বলতাও ওই বিচ্যুতির অন্যতম কারণ। মানুষের বুদ্ধি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, সঙ্গে দ্বীনি ইলমেও ঘাটতি থাকে, কিন্তু হৃদয়ে থাকে ভালোবাসা, তখন অন্তর নানাবিধ বোকামিতে জড়িয়ে পড়ে。
'যেমন-মানুষ কারও ভালোবাসায় বোকামি ও অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ করেও গর্বিত হয়; সংকোচ অনুভব করে না; বলে, আমি তো প্রেমিক, তাই কোনো কর্মের (হোক না সেটা অজ্ঞতা বা শত্রুতামূলক কিছু) জন্যই আমি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হব না। হায় রে, এ তো সুস্পষ্ট ভ্রান্তি: ইহুদিদের কথার সঙ্গে এটা মিলে যায়; ওদের বক্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصْرَىٰ نَحْنُ أَبْنُوا اللَّهِ وَأَحِبُّؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ
“ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলে, 'আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন'। আপনি বলুন, তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি প্রদান করবেন? বরং সত্য তো এই যে, তোমরাও তাঁর সৃষ্ট (সাধারণ) মানুষেরই অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন।" [১]
'পাপের কারণে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার অর্থ হলো, তারা আল্লাহর বিশেষ প্রিয় কেউ নয় এবং তাঁর সঙ্গে সন্তান হিসেবে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই; বরং তারা তাঁর সাধারণ বান্দা ও মাখলুক。
'আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে তাঁর পছন্দের কাজে নিয়োজিত রাখেন; সে কুফর, ফিসক (পাপাচার) ও অবাধ্যতার মতো আল্লাহর অসন্তোষের কোনো কিছুতে আর লিপ্ত হয় না। অপরদিকে, কেউ কবিরা (বড় ধরনের) গুনাহ বারবার করতে থাকলে এবং তাওবাও না করলে আল্লাহ তাআলা তার ওই ব্যাপারটায় অসন্তুষ্ট হন। আল্লাহ তাআলার চাওয়া, বান্দা ভালো ও নেক কাজগুলোতে লিপ্ত থাকুক। কারণ, বান্দার ঈমান ও তাকওয়া-অনুপাতে তিনি তাকে ভালোবাসেন。
'কেউ যদি মনে করে-আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। তাই বারবার পাপ করলেও কোনো সমস্যা নেই; তার অবস্থা তো ওই ব্যক্তির মতো হয়ে গেল, যে নিয়মিতই বিষ পান করছে, কিন্তু সুস্থতার জন্য ওষুধ সেবন করছে না; আবার, মনে মনে ভাবছে-এই বিষ আমার কোনো ক্ষতি করবে না!
'অনেক সালিককে দেখা গেছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে দ্বীনি বিষয়ে বিভিন্নরকম অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে; কেউ হয়তো আল্লাহর ভালোবাসার দাবি করতে গিয়ে তাঁর সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে; কেউবা তাঁর হক নষ্ট করেছে; কেউ আবার এমনসব উদ্ভট ও ভ্রান্ত দাবি করে বসেছে, যা নিতান্তই ফালতু ও ভিত্তিহীন。
'যেমন—কোনো একজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কাউকে জাহান্নামে একা ছেড়ে আসলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই!” আরেকজন বলেছে— "আমার কোনো মুরিদ কোনো মুমিনকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে দিলে ওই মুরিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই!”
'দেখুন, প্রথমজন তার মুরিদকে এমন স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে যে, সে প্রতিটা জাহান্নামিকে মুক্ত করার ক্ষমতা রাখে! (নাউযুবিল্লাহ)। আর দ্বিতীয়জন তার মুরিদকে আরও শক্তিশালী সাব্যস্ত করে দিচ্ছে যে, কবিরা গুনাহকারীদেরকেও সে জাহান্নামে প্রবেশ করা থেকে বাঁচাতে পারবে!
'কোনো সালেক এমন কথাও বলেছে যে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামের সামনে তার তাঁবু খাটানো হবে, যেন একটি মানুষও জাহান্নামে দাখিল হতে না পারে!
'এ-জাতীয় বক্তব্য প্রসিদ্ধ অনেক শাইখের নামে বর্ণিত আছে; আসলে, এগুলো হয়তো তাদের নামে বানানো অথবা তারা বলে থাকলেও কথাগুলো তো ভুলই। অনেক সময় নেশাগ্রস্ত, আত্মিক অবস্থার নিকট পরাভূত ও আত্মবিলীন-হওয়া মানুষ এ-ধরনের কথাবার্তা বলে; যখন তার বিবেচনা-বোধ লোপ পায় বা তা দুর্বল হয়ে পড়ে, যার ফলে সে বুঝতে পারে না—কী করছে কী বলছে। সঙ্গে একটু বলে রাখি, 'নেশাগ্রস্ততা' হলো, বিবেচনা-বোধ লুপ্ত অবস্থায় একধরনের স্বাদ অনুভব করা। এজন্যই ওরকম মাশায়েখের অনেককেই দেখা গেছে, হুঁশ ফিরে আসলে তারা তাদের ওই ভুলভাল কথাবার্তা থেকে ইস্তিগফার করতেন।'

টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00