📄 তাসাউফের কিছু পরিভাষার ব্যাখ্যা
আমি বললাম, 'শাইখ, স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে মিলিয়ে ফেলা যদি নিষিদ্ধ ও জঘন্য হয়, তাহলে অনেক সূফি শাইখের "আল্লাহ ব্যতীত আমি কাউকে দেখি না"-জাতীয় কথার অর্থ কী?'
শাইখ বললেন, 'আসলে সত্যপন্থী শাইখগণ যখন বলেন, "আল্লাহকে ব্যতীত আমি কাউকে দেখি না” বা “আল্লাহ ব্যতীত আর কারও দিকে নজর দিই না”, তখন তাঁদের এ কথার উদ্দেশ্য হয়—আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে আমি রব ও ইলাহরূপে এবং স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী হিসেবে দেখি না। আমি আল্লাহ ব্যতীত আর কারও দিকে ভয়, ভক্তি কিংবা আশার নজরে তাকাই না。
'কারণ, অন্তর যেদিকে ঝুঁকে, চোখের নজরও সেদিকেই যায়। তাই কারও প্রতি ভয়, ভক্তি কিংবা আশা থাকলেই তার দিকে নজর ওঠে। এখন যার প্রতি অন্তরের কোনো ধরনের অনুভূতিই নেই, কোনো ভক্তি, ঘৃণা, ভয় বা আশা যার কাছে নেই, স্বাভাবিকভাবে তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করার, তাকে দেখার বা তার দিকে তাকানোর কোনো আগ্রহও হবে না। বরং ঘটনাক্রমে দেখে ফেললেও সেটা মনের মধ্যে কোনো দাগ কাটবে না; সাধারণ কোনো পাথুরে দেয়াল দেখলে যেমন কোনো অনুভূতি জাগে না।'
'আসলে বুজুর্গ শাইখগণ তাওহিদ ও ইখলাস অর্জনের জন্য কিছু বিষয় এমনভাবে উল্লেখ করেন, যেন বান্দা কেবল আল্লাহর প্রতিই ঝোঁকে এবং ভয়, ভক্তি ও ভালোবাসায় শুধু তাঁর দিকেই নজর দেয়। পাশাপাশি বান্দার মনোজগত যেন সম্পূর্ণরূপে মাখলুকের প্রভাবমুক্ত হয়, বরং মাখলুকের প্রতি তার নজরও যেন হয় আল্লাহর নূর দ্বারা প্রভাবিত। এর ফলে, বান্দার দেখা-শোনা-ধরা-চলা- সবকিছু হবে আল্লাহর পথ ও মতে। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন বা ঘৃণা করেন বান্দাও তাকে ভালোবাসবে বা ঘৃণা করবে। দোস্তি ও দুশমনিতেও সে আল্লাহর অনুগত হবে। মাখলুকের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে মাখলুককে ভয় করবে না। মাখলুকের কাছ থেকে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আল্লাহর কাছে আশা করবে, আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কিছু পেতে মাখলুকের কাছে ধর্ণা দেবে না। শুদ্ধতা ও পবিত্রতার এসব গুণ অর্জন করলেই অন্তর হবে-একনিষ্ঠ, নিরাপদ, তাওহিদবাদী, রবের নিকট আত্মসমর্পণকারী এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাসী; পাশাপাশি নবী-রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) তাওহিদ, পরিচয় ও কর্ম সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত থাকবে。
'মাশায়েখ ও বুযুর্গদের ওই কথার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, আমি চোখে যেই মাখলুক দেখি সেই মাখলুকই আসমান-জমিনের রব। কারণ, এমন কথা তো কেবল চূড়ান্ত ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত ব্যক্তিই বলতে পারে; যার আকল বা আকিদা নষ্ট হয়ে গেছে অথবা যে হয়তো পাগল নইলে বেদ্বীন।'
'মানুষ দ্বীনি বিষয়ে যেসকল শাইখের অনুসরণ করে, তাঁরা প্রত্যেকেই উম্মাহর সালাফে সালিহীন ও ইমামগণের এই কথার সঙ্গে একমত যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি মাখলুক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা; তাঁর সত্তার কোনো কিছুই কোনো মাখলুকের মধ্যে নেই, আবার মাখলুকের কোনো কিছুও নেই তাঁর সত্তায়। ফলে অবিনশ্বর সত্তাকে নম্বর বস্তু থেকে পৃথক করা এবং খালিককে মাখলুক থেকে আলাদা করাটা জরুরি। এই কথাটুকু ওই শাইখগণের বক্তব্যে অসংখ্যবার এসেছে।'
'আসলে বিভিন্ন সময় মানুষের আত্মিক বিভিন্ন রোগ ও সংশয় সম্পর্কে তারা বক্তব্য পেশ করেছেন। তখন একথাও বলেছেন, কারও কারও অবস্থা হলো এমন—অন্তরে বিচার-বিবেচনা-বোধ না থাকায় সৃষ্টিকুলকে দেখে মনে করে, এগুলো নিজেই নিজের স্রষ্টা। যেমন এক লোক সূর্যের রশ্মি দেখে একেই আকাশে-থাকা মূল সূর্য ভেবে বসে আছে।'
আমি বললাম, 'শাইখ, সুফিগণ অনেক সময় তাঁদের বক্তব্যে একটি পরিভাষা ব্যবহার করেন, “আল-জামউ ওয়াল-ফারকু” অর্থাৎ স্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা। এটা বোঝা আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিক হিসেবে এটাও যদি আলোচনা করে দিতেন!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, তাঁদের ফানা-বিষয়ক বক্তব্যের মতো এই স্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা-বিষয়ক বক্তব্যগুলোতেও বিভিন্ন জটিল বাক্য ঢুকে গেছে; ফলে এটা অনেকের জন্য মুশকিল হয়ে গেছে。
'দেখুন, বান্দা যখন মাখলুকের বিভিন্ন রকমফের ও আধিক্য দেখে, তখন এগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং এগুলোর প্রতি ভয়, ভক্তি ও আশা পোষণ করে। এর প্রভাবে তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আবার যখন সে স্থিরতার প্রতি আগ্রহী হয়, তখন তার মন এক লা-শরিক আল্লাহর তাওহিদ ও ইবাদতে স্থির হয়ে যায়। মাখলুক থেকে সরিয়ে খালিকের প্রতি নজর করার ফলে তার ভয়, প্রার্থনা, আশা ও ভালোবাসা—সব হতে থাকে এক আল্লাহর জন্য। তখন দেখা যায় মাখলুকের প্রতি আলাদাভাবে ভ্রূক্ষেপের অবস্থা তার থাকে না যে, খালিক ও মাখলুকের মধ্যে সে পার্থক্য করবে। বরং সে মাখলুক-বিমুখ হয়ে খালিকের আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষাতেই ডুবে থাকে। এটা মূলত ফানা'র দ্বিতীয় প্রকারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।'
'বান্দার মধ্যে বিক্ষিপ্ততা বা পার্থক্যকরণের ব্যাপার তৈরি হয়। অর্থাৎ, সে যখন দেখে—সব সৃষ্টি আল্লাহর ইচ্ছাধীনেই টিকে আছে, তাঁর চাহিদামতোই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে, পাশাপাশি যখন সে এটা অনুভব করে যে, এক আল্লাহর সামনে বিপুল সংখ্যক সৃষ্টির সবকিছুই অস্তিত্বহীন, তিনিই সব কিছুর খালিক, মালিক, ইলাহ ও রব তখন অন্তরে আল্লাহর জন্য ইখলাস, ভয়, ভরসা, আশা, ভালোবাসা, প্রার্থনা, বন্ধুত্ব ও শত্রুতার গুণগুলো থাকা সত্ত্বেও খালিক ও মাখলুকের মধ্যে পার্থক্য করার প্রতি নজর করতে পারে; এবং উভয়কে আলাদা করতে পারে।'
'সে মাখলুকের বিভিন্নতা ও আধিক্য দেখার পরও এই সাক্ষ্য দেয় যে, এই সব কিছুর খালিক, মালিক, রব ও ইলাহ এক আল্লাহই—যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। এটিই সরল ও বিশুদ্ধ সাক্ষ্য। এই সাক্ষ্য অন্তরের সার্বিক হালতে (তথা মাকসাদ, ইবাদত, ইচ্ছা, মহব্বত, বন্ধুত্ব ও আনুগত্য ইত্যাদি), ইলমে, সাক্ষ্যদানে, যিকিরে ও মারেফাতে জরুরি। এবং এটিই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যে সাক্ষ্য, তার বাস্তবরূপ। কারণ, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য বান্দার মনে আল্লাহর ইলাহ হওয়াকে দৃঢ় করে, অন্য সবার ইলাহ হওয়াকে বাতিল করে দেয়। এতে করে সমস্ত মাখলুকের বিপরীতে বান্দা আসমান ও জমিনের রবকেই ইলাহরূপে গ্রহণ করে। সমস্ত মাখলুক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক আল্লাহর ওপরই তার মন স্থির হয়। তখন নিজের ইলম, মারেফাত, মাকসাদ, মহব্বত, ইচ্ছা ও সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে সে খালিক ও মাখলুকের পার্থক্য করতে পারে।'
'সে আল্লাহ সম্পর্কে জানে, তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর মারেফাত হাসিল করে; সাথে সাথে এ-ও জানে যে, তিনি স্বীয় মাখলুকের বিপরীত এবং তিনি মাখলুক থেকে আলাদা ও একক। ফলে সে কেবল আল্লাহকেই ভালোবাসে, আর কাউকে নয়; কেবল তাঁরই ইবাদত করে, তাঁকেই ভয় পায়, তাঁর কাছেই আশা করে, তাঁরই নিকট সাহায্য কামনা করে, তাঁর ওপরই ভরসা করে এবং তাঁর দিকে তাকিয়েই করে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা। মোটকথা, ইলাহ'র সঙ্গে যুক্ত সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকেই সে গ্রহণ করে, অন্য কাউকে নয়। আর সবাইকে ছেড়ে আল্লাহকে এভাবে ইলাহরূপে মেনে নেওয়ার মধ্যেই আছে তাঁকে রব হিসেবে মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি। তিনিই তো সবকিছুর খালিক, মালিক, রব ও পরিচালক। ফলে এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বান্দা পূর্ণরূপে একত্ববাদী হয়ে ওঠে। এজন্যই এ কথা স্পষ্ট যে, শ্রেষ্ঠ যিকির হলো—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ইমাম তিরমিযি ও ইবনু আবিদ দুনিয়া-সহ অনেকেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই বিষয়টি মারফু সনদে বর্ণনা করেছেন; নবীজি বলেছেন—
أَفْضَلُ الذِّكْرِ : لا إله إلا اللهُ ، وأَفضلُ الدُّعَاءِ : الْحَمْدُ للهِ
| “শ্রেষ্ঠ যিকির লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আর শ্রেষ্ঠ দুআ আলহামদুলিল্লাহ।”[১]
'মুআত্তা-সহ বিভিন্ন কিতাবে তালহা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কাসিরের সূত্রে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন—
أَفْضَلُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ
"আমার ও পূর্ববর্তী নবীগণের-বলা শ্রেষ্ঠ কথা হলো, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই।" [১]
এই পর্যন্ত বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। মজলিসের শুরুর মতো শেষেও হামদ-সালাত পাঠ করলেন। আজকের মজলিসে আলোচ্য বিষয়ের সর্বদিক নিয়ে আলোচনা করে তিনি আমাদেরকে কৃতজ্ঞ করেছেন। কোনো দ্বিধা বা অস্পষ্টতার অবকাশ রাখেননি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আমাদের হয়ে সর্বোত্তম বদলা দান করুন。
টিকাঃ
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৮৩; ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৩৮০০; তাখরিজু সহিহ ইবনি হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ৮৪৬; তাখরিজু সিয়ারি আলামিন নুবালা, হাদিস-ক্রম: ৬/১৬৯; শাইখ শুয়াইব আরনাউত এই সনদকে হাসান বলেছেন。
[১] মুআত্তা মালেক, হাদিস-ক্রম: ৪৮৬ ও ৯৪১; হাদিসটি ইমাম মালেক থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত。