📄 ইখলাসের স্বাদ ও সুফল
'আপনারা তো জানেনই যে, বান্দার অন্তর যখন আল্লাহর দাসত্ব ও ভালোবাসার স্বাদ পেয়ে যায়, তখন আল্লাহর নিকট পৌঁছুনোর আগ পর্যন্ত জগতের আর কোনো বস্তুই তার কাছে অতো ভালো লাগে না। এ কারনেই মুখলিস বান্দা থেকে পাপ ও অশ্লীল ব্যাপারাদি দূরে সরে যায়। কুরআন যেমনটি বলছে-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
“এভাবেই আমি তাঁর কাছ থেকে দূরে রেখেছি পাপ ও অশ্লীল ব্যাপারাদি; সে তো আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের একজন।” [১]
'আসলে মুখলিস বান্দা তো আল্লাহর দাসত্ব ও ভালোবাসার স্বাদ পেয়ে যায়। ফলে, এটাই তাকে অন্য কারও দাসত্ব ও ভালোবাসা থেকে বিরত রাখে। কারণ, আল্লাহর দাসত্ব, ভালোবাসা, তাঁর জন্য দ্বীনকে খালেস করা—এই সব মিলে পূর্ণ ঈমানের যেই স্বাদ, মুমিন-অন্তরের কাছে আর কোনো বস্তুকেই এরচেয়ে মিষ্ট, স্বাদু, তৃপ্তিকর ও আরামদায়ক বলে অনুভূত হয় না। এই বিষয়টিই অন্তরকে আল্লাহর প্রতি টেনে নেয়। ফলে, অন্তর হয় আল্লাহমুখী। সে তাঁকে ভয় পায়; আবার, তাঁরই নিকট আশা করে সব। কুরআনেও তো এমনটিই এসেছে—
مَّنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيْبٍ
“যে না-দেখে রহমানকে ভয় করে; আর আগমন করে আল্লাহমুখী-এক অন্তরসহ।” [২]
'কারণ, যে ভালোবাসে সে-ই তো তার উদ্দিষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে থাকে। তাই, আল্লাহর বান্দা সবসময়েই আশা ও ভয়ের সঙ্গে বসবাস করবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-
أُوْلَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا
“এরাই তো রবের নিকট দু'আয় মধ্যস্থতাকারী খোঁজে, যে, এদের মধ্যে রবের সবচেয়ে নৈকট্যপ্রাপ্ত কে। তারা রবের রহম আশা করে, আর ভয় পায় তাঁর আযাব; নিশ্চয় আপনার রবের আযাব ভয়াবহ।”[১]
'বান্দা যখন সবকিছুতে ইখলাস ধারণ করে; তখন আল্লাহ তাকে নির্বাচিত করেন; এবং তার অন্তর সজীব করে দেন। তাকে কাছে টেনে নিয়ে পাপ ও অশ্লীলতার মতো সবরকম ক্ষতিকর ব্যাপার তার থেকে দূরে সরিয়ে দেন। আর সে নিজেও এসব ঘটে যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকে। পক্ষান্তরে, আল্লাহর জন্য যে অন্তর খালেস হয় না সে তো অবাধ ইচ্ছা, অপরিসীম চাহিদা আর লাগামহীন ভালোবাসায় ডুবে থাকে। যা মনে আসে, তার প্রতিই আগ্রহী হয়ে ওঠে; যা মন চায়, তাতেই জড়িয়ে পড়ে। এমন অন্তর হলো দুর্বল ডালের মতো; পাশ দিয়ে বাতাস বইলেই যা নুয়ে পড়ে।'
'কখনো দেখা যায়, বৈধ-অবৈধ ছবির প্রতি তার ঝোঁক বেড়ে যায়; কখনো-বা এমন কারও জালে বন্দী হয়ে দাসে পরিণত হয়, যাকে নিজের দাসরূপে গ্রহণ করাও ছিল তার জন্য লজ্জাজনক। কখনো নেতৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিকে মন টানে; মনমতো কথা শুনলে তখন ভালো লাগে, নইলে রাগ ওঠে; প্রশংসাকারীরা তাকে বানোয়াটি কথা দিয়েও গোলামে পরিণত করে; কিন্তু ন্যায়ভাবেও কেউ তিরস্কার করলে সে তার শত্রু বনে যায়। কখনো টাকা-পয়সার মতো মন টানে এমন নানা বস্তুর সেবাদাস হয়ে যায়। সেসবে জড়িয়ে থাকতেই মন চায় তার। ফলে, মনের চাহিদাকেই সে গ্রহণ করে নিজের রব হিসেবে; এবং আল্লাহর হিদায়াত ছেড়ে ওই মন-চাহিদারই অনুগামী হয়।'
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য খালেস ও একনিষ্ঠ বান্দা হয় না, যার মন এক লা-শরিক রবের ইবাদতগাহে পরিণত হয় না, জগতের সবকিছুর চেয়ে মহান আল্লাহ যার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হন না, মহামহিম রবের সামনে যে দাঁড়ায় না অবনত ও তুচ্ছ এক সৃষ্টিরূপে, দেখা যায়-সে হয়ে যায় সৃষ্টিকুলের সবার গোলাম; শয়তানের অনুগতরা তার মনে দখল কায়েম করে; ফলে সে পথভ্রষ্ট হয়ে দিন দিন পরিণত হয় শয়তানের ঘনিষ্ঠ ভাইয়ে। তার সমগ্র সত্তায় এমন বহু বহু পাপ ও অশ্লীলতা ছেয়ে যায়, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই যেগুলো জানতে ও ধরতে পারে না।'
'তাই ইখলাস খুবই স্পর্শকাতর ও জরুরি একটি বিষয়; এখানে ছলচাতুরি চলে না। কারও অন্তর যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহমুখী না হয়, তাহলে সে মুশরিক হয়ে যাবে। আল্লাহ যেমন বলেছেন-
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ . لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
"আপনি নিজেকে একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন; এটিই আল্লাহর দেওয়া প্রকৃতি, যা দিয়ে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো বিবর্তন নেই; এটাই সরল দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।" [১]
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
| “প্রত্যেক দলই নিজেদের চিন্তা-ধারণা নিয়ে সন্তুষ্ট।””[২]
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[২] সূরা কাফ, আয়াত-ক্রম: ৩৩
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৫৭
[১] সূরা রোম, আয়াত-ক্রম: ৩০
[২] সূরা রোম, আয়াত-ক্রম: ৩২
📄 সুপথ ও বিপথের নেতা যারা
'যারা আল্লাহপ্রেমিক, যাদের দ্বীন ও ইবাদত একনিষ্ঠ থাকে আল্লাহরই জন্য, তাদের ইমাম ও নেতারূপে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাহিস সালাম ও তাঁর বংশধরকে নির্ধারণ করেছেন। অপরদিকে প্রবৃত্তিপূজারী মুশরিকদের নেতা বানিয়েছেন ফেরাউন ও তার দোসরদেরকে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَهُ وَكُلًّا جَعَلْنَا صَلِحِينَ. وَجَعَلْتُهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَوْةِ وَكَانُوا لَنَا عَبِدِينَ
| “আমি তাকে (ইবরাহিমকে) দান করেছি ইসহাক এবং অতিরিক্তরূপে ইয়াকুব; আমি এদের প্রত্যেককেই নেককার ও এমন নেতা বানিয়েছি, যারা আমার কথামতো (মানুষকে) পথ দেখাত। আমি তাদের কাছে ওহি প্রেরণ করেছি সৎকর্ম সম্পাদন, সালাত প্রতিষ্ঠা ও যাকাত আদায় সম্পর্কে; তারা ছিল আমার ইবাদতগুজার।" [১]
'আর ফিরাউন ও তার দলবল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন— وَجَعَلْتُهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَيَوْمَ الْقِيمَةِ لَا يُنصَرُونَ . وَأَتْبَعْتُهُمْ فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيمَةِ هُم مِّنَ الْمَقْبُوحِينَ
"আমি তাদেরকে এমন নেতা বানিয়েছি, যারা আহ্বান করে জাহান্নামের দিকে; দুনিয়ায় তাদের পেছনে আমি লাগিয়ে দিয়েছি অভিশাপ; আর কিয়ামতের দিন তারা হবে দুর্দশাগ্রস্ত।””[২]
'এ কারণে ফেরাউন ও তার দোসরদের অনুসরণের ফল স্বরূপ প্রথম সমস্যা হলো- বান্দা তার রবের পছন্দ ও ভালোবাসার বিষয়াদি আলাদা করে বুঝতে পারে না, তাঁর ফয়সালা ও তাকদির ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পারে না, সবকিছুকে আল্লাহর সাধারণ ইচ্ছার ফল ব্যতীত আর কিছুই ভাবতে পারে না। এভাবে সবশেষে গিয়ে অবস্থা হয়- ফিরাউন-অনুসারী বান্দা স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্য ভুলে যায়; মনে করে, সৃষ্টির অস্তিত্ব তার নিজেরই ব্যাপার; এই ভ্রষ্ট অনুসারীদের মধ্যে যারা গবেষক হয়ে ওঠে, তারা বলে— শরিয়ত হলো আনুগত্য ও অবাধ্যতার সমষ্টি; হাকিকত বা প্রকৃতি হলো কেবলই অবাধ্যতার জায়গা; কোনো আনুগত্য নেই সেখানে। তাদের মতে তাহকিক বা নিরেট গবেষণায় আনুগত্য বা অবাধ্যতা—কোনোটাই নেই।'
'এই হলো ফিরাউন ও তার দোসরদের অনুসৃত পথের বিশ্লেষণ; যারা স্বীকার করে না—স্রষ্টা বলে কেউ আছেন, মূসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে স্রষ্টা কথা বলেছেন, কিংবা মূসাকে তিনি বিভিন্ন বিধি-নিষেধসহ পাঠিয়েছেন।'
'অপরদিকে ইবরাহিম, তাঁর সত্যানুসারী বংশধর ও অন্য নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) বিশ্বাস হলো— স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে অনস্বীকার্য পার্থক্য রয়েছে; এমনিভাবে পার্থক্য আছে আনুগত্য ও অবাধ্যতায়। আর বান্দা যতই গবেষণা করে, ততই আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা, ইবাদত ও আনুগত্য বাড়তে থাকে; ততই সে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে অন্য সবার ভালোবাসা, ইবাদত ও আনুগত্য থেকে।'
'তাই, ভ্রষ্ট মুশরিকরা যেখানে আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার পার্থক্য মুছে ফেলত, ইবরাহিম সেখানে বলতেন—
قَالَ أَفَرَعَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ . أَنتُمْ وَءَابَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ . فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لَّي . إِلَّا رَبَّ الْعَلَمِينَ
"তোমরা ও তোমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদারা কীসের পূজা করতে, ভেবে দেখেছ? জগতসমূহের প্রতিপালক ব্যতীত এরা সবাই-ই তো আমার শত্রু।"[১]
'আর, ওরা তখন পূর্বসূরীদের বিভিন্ন বাণী দিয়ে দলিল দিত; পরবর্তীকালে খ্রিষ্টানরা যেমন করেছিল।'
টিকাঃ
[১] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৭২-৭৩
[২] সূরা কাসাস, আয়াত-ক্রম: ৪১-৪২
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৭৫-৭৭
📄 ফানা বা আত্মবিলোপের সঙ্গে ইখলাসের সম্পর্ক ও তার প্রকারভেদ
আমি বললাম-'শাইখ, আপনাদের সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী অনেকের, বিশেষত সুফিদের কিতাবাদিতে আমরা একটি বিষয় পড়েছি-ফানা বা আত্মবিলোপ। তাঁদের কাছে এর মানে হলো-অন্তরজুড়ে কেবল আল্লাহরই মহব্বতের সুরভি যখন পূর্ণরূপে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তা ওই 'ফানা'র স্তরে পৌঁছায়। তাঁদের অনেকে এই ফানা নিয়ে বাড়াবাড়িমূলক কথাবার্তাও বলেছেন। তো, জানতে চাচ্ছি-ইনসাফ ও মধ্যমপন্থী মত কোনটি? কখন এই 'ফানা' দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুতি বলে সাব্যস্ত হবে?'
শাইখ বললেন, 'এ বিষয়টি আসলে বহু ব্যাপক ও বিস্তৃত; তবে আমি আপনাদের সামনে, মোটামুটি সংক্ষেপে উপস্থাপনের চেষ্টা করব; আল্লাহই তাওফিকদাতা।
ফানা মোট তিন প্রকার। এক. নবী ও এমনসব ওলির ফানা, যাঁরা মারেফাতের পূর্ণতায় পৌঁছেছেন। দুই. সেসব ওলি ও নেককারের ফানা, যাঁরা এ পথে চলতে শুরু করেছেন। তিন. মুনাফিক ও বদদ্বীনদের ফানা。
'প্রথম প্রকার ফানা হলো-আল্লাহ ব্যতীত সব চাওয়া-পাওয়া থেকে আত্মবিলোপ। অর্থাৎ, কেবল আল্লাহকেই ভালোবাসবে, তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর ওপরেই ভরসা করবে, নিজের উদ্দেশ্য পূরণে তাঁকে ছাড়া আর কাউকেই তালাশ করবে না। শাইখ আবু ইয়াযিদের ভাষায়, বান্দার জন্য এইরকম ফানা অবলম্বন করা আবশ্যক। তিনি বলেন- “আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে আমার কোনো ইচ্ছা থাকুক এমনটা চাই না আমি।” অর্থাৎ, আল্লাহর ইচ্ছাই বান্দার কাছে সন্তোষজনক ও প্রিয়তম হবে। আর দ্বীনি ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা বলতেও এটিই বোঝায়। বান্দার পূর্ণতা তো আসলে এর মধ্যে যে, তার ও আল্লাহর ইচ্ছা-পছন্দ-ভালোবাসায় কোনো ব্যবধান থাকবে না। এমনটা যদি হয় তাহলে আল্লাহর প্রতিটি আবশ্যক ও ঐচ্ছিক আদেশ তার কাছে হয়ে উঠবে আকাঙ্ক্ষিত; আল্লাহর ভালোবাসার পাত্ররা, যেমন-ফেরেশতা, নবী ও নেককারগণ হবে তার কাছে প্রিয়তম। কুরআনে এটাই বলা হয়েছে-
إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ | “নিরাপদ হৃদয় নিয়ে যে আসবে আল্লাহর কাছে।”[১]
'মুফাসসিরিনে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, “নিরাপদ” বলতে বোঝানো হয়েছে- গাইরুল্লাহ থেকে, গাইরুল্লাহর ইচ্ছা, ইবাদত ও মহব্বত থেকে নিরাপদ হওয়া।'
'তো, ব্যাপার আসলে আলাদা কিছু না। একে আপনি ফানা বলুন বা না-বলুন, এটিই ইসলামের শুরু ও শেষ; দ্বীনের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ রূপ এটিই।'
'দ্বিতীয় প্রকার ফানা হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে দেখা থেকে আত্মবিলোপ; সর্বদিকে কেবল আল্লাহকেই দেখতে পাওয়া। আসলে অনেক সালেকেরই (মারেফাতের পথিক) এমনটি হয়ে থাকে। আল্লাহর যিকির ইবাদত ও মহব্বতের প্রতি তাঁদের অত্যধিক নেশা; এবং মাবুদ ও মাকসুদের (উদ্দিষ্ট সত্তা) বাইরে অন্য কিছু তাদের অন্তরে না আসার ফলে কেবল আল্লাহর রূপই তাঁদের মনে উদয় হয়। এ ছাড়া আর কাউকে তাঁরা অনুভবও করতে পারেন না। কুরআন যেমন বলছে-
وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَرِنَا إِن كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ -
"মূসার মা মনভোলা হয়ে গিয়েছিল; আমি তার মন শক্ত না করলে তো সে প্রকাশই করে দিচ্ছিল প্রায়।"[১]
'এখানে “মনভোলা” মানে হলো—তিনি মূসার কথা ছাড়া আর সব ভুলে গিয়েছিলেন। আসলে ভয়, আশা ও ভালোবাসার মতো বিভিন্ন বিষয়ের প্রচণ্ডতায় মানুষ এমন মনভোলা হয়ে পড়ে; তখন ওই ভয়ের, আশার বা ভালোবাসার বস্তু ছাড়া আর সব কিছু সে ভুলে যায়; বরং ওই বস্তুতে একেবারে নিমগ্ন হয়ে গেলে অন্য কিছু টেরও পায় না আর।'
'ফানার এই স্তরে পৌঁছে যাওয়া বান্দার মনে আল্লাহর যিকির, ইবাদত ও মহব্বত যখন প্রবল হয়ে ওঠে, তখন সেই বিষয়ের অস্তিত্বে সে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়, সেই বিষয়ের দর্শনে নিজের দর্শন ভুলে যায়, সেই বিষয়ের স্মরণ ও পরিচয়ে নিজের স্মরণ ও পরিচয় বিস্মৃত হয়ে যায়। এভাবে একপর্যায়ে বান্দার মন থেকে পূজিত মাখলুকের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়; যা আগেও ছিল অস্তিত্বহীন; কেবল সর্বস্থায়ী প্রতিপালকের রূপখানিই মনের মাটিতে আলো ছড়িয়ে রয়ে যায়।'
'উদ্দেশ্য হলো—বান্দার স্মরণ ও দর্শন থেকে সেসব মাখলুক হারিয়ে যাওয়া, আর বান্দাও সেগুলোর অনুভব ও সংবেদন বিস্মৃত হওয়া। এমন অবস্থা প্রবল হয়ে গেলে প্রেমিক বান্দা দুর্বল হয়ে পড়ে, নিজের ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য করা তার পক্ষে মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়, সে মনে করে—নিজেই বুঝি নিজের প্রেমাস্পদ সে!'
'প্রচলিত একটা গল্প আছে—এক লোক সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে। পেছনে তার ভক্তও ঝাঁপ দিয়েছে। লোকটি ভক্তকে বলল, "আমি তো নিজেই ফেলেছি নিজেকে, কিন্তু তোমাকে ফেলল কে?” সে বলল, "আমি নিজেকে আপনার মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি; ফলে আমার মনে হয়েছে, আমি মূলত আপনিই!””
আমি বললাম, 'শাইখ, এভাবে উভয়ে একটি সত্তায় পরিণত হয়ে যাওয়া— এই ব্যাপারটিকেই কি তারা প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের একাকার (ইত্তেহাদ) হয়ে যাওয়া বলেন?'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, এই বিষয়টিকে একাকার হয়ে যাওয়া মনে করে বহু মানুষের পদস্খলন হয়েছে। তারা মনে করেছে—প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ এমনভাবে একাকার হয়ে যায় যে, উভয়ের মধ্যে মৌলিকভাবে আর কোনো পার্থক্য থাকে না; অথচ এই চিন্তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ, স্রষ্টার সঙ্গে কোনো কিছু একাকার হতে পারে না; বরং কোনো বস্তুই আরেকটা বস্তুর সঙ্গে অস্তিত্বহীন কিংবা বিনষ্ট হয়ে যাওয়া ছাড়া একাকার হতে পারে না। আর দুইটা বস্তু পরস্পরে মিশে গেলেও সেটা তৃতীয় কোনো কিছুর রূপ নেয়, আগের কোনোটিরই মৌলিক অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট থাকে না। যেমন—পানি ও দুধ; অথবা পানি ও মদ। এখানে মিশ্র বস্তুটাকে না বলা যাবে পানি আর না বলা যাবে দুধ বা মদ। বরং দুজনের ইচ্ছা ও পছন্দ-অপছন্দ এবং পছন্দ-অপছন্দের ধরন মিলে যেতে পারে। ফলে প্রেমাস্পদ যা ভালোবাসবে, প্রেমিকও তা ভালোবাসবে; প্রেমাস্পদ যা ঘৃণা করবে, প্রেমিকও তা ঘৃণা করবে। মোটকথা, সর্বক্ষেত্রে প্রেমাস্পদের পছন্দ-অপছন্দ, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি এবং বন্ধুতা ও শত্রুতার অনুগামী হবে প্রেমিক। এই ধরনের ফানা বা আত্মবিলোপে তো ওই একাকার হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি পুরাপুরি নেই।'
এই পর্যন্ত বলার পর শাইখ ওই ভ্রান্তির-শিকার-হওয়া লোকদের জন্য আফসোস করতে লাগলেন। আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, 'শাইখ! তাদের ওই (একাকার হয়ে যাওয়ার) দাবি বিন্দু পরিমাণ সত্য ও সঠিক হলে তো সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেই সেটা বেশি পরিলক্ষিত হতো; কারণ, এই উম্মতের মধ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে তাঁদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ তো আর কেউ নেই।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, এ কথা তো ঠিকই। দেখুন, নবীগণ তো বহু দূর, তাদের পরে বড় ওলি যাঁরা—আবু বকর, উমর এবং মুহাজির-আনসারদের মধ্যে প্রথম ও পূর্ববর্তী দল—এঁদের কারোরই তো অমন (একাকার হয়ে যাওয়ার) ফানা'র হালত সৃষ্টি হয়নি; বরং সাহাবা-জমানার পরে এরকম কিছু ব্যাপার ঘটেছে। এমনিভাবে অন্তরে ঈমানের বিভিন্ন অবস্থা হওয়ার দরুণ এরকম যত বোধ-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনাহীন ব্যাপার ঘটেছে, সবই সাহাবায়ে কেরামের পরে। কারণ, সাহাবায়ে কেরাম ঈমানের সর্বরকম হালতে ছিলেন পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী; ছিলেন অটল-অবিচল। ফলে এসবের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বোধহীনতা, আচ্ছন্নতা বা অজ্ঞানতা পায়নি তাদেরকে; এবং (একাকার হয়ে যাওয়ার মতো) কোনো আত্মবিলোপ, নেশাগ্রস্ততা, বাকহীনতা বা পাগলামির কবলেও পড়েননি তাঁরা।'
'এই ব্যাপারগুলো প্রথম ঘটেছিল তাবিয়িদের সময়ে বসরার আবিদদের মধ্যে। দেখা যেত কুরআন তিলাওয়াত শুনেই তাদের অনেকে বেহুঁশ হয়ে পড়েছে। আবার, আবু জুহাইর জারির ও বসরার বিচারক যুরারাহ ইবনু আওফার মতো লোক তো তিলাওয়াত শ্রবণে মৃত্যুই বরণ করেছিলেন。
'আবু ইয়াযিদ, আবুল হুসাইন নূরি ও আবু বকর শিবলির মতো অনেক সূফি-শাইখের বেলায় দেখা যেত, এরকম জ্ঞান হারানো ও ফানা'র অবস্থায় তাঁরা উল্টা-পাল্টা কথাবার্তা বলতেন, হুঁশ ফিরলে বুঝতে পারতেন সেগুলো ভুল ছিল। কিন্তু আবু সুলাইমান দারানি, মারুফ কারখি ও ফুযাইল ইবনু ইয়ায, জুনাইদ রাহিমাহুমুল্লাহর অবস্থা ছিল পূর্বোল্লিখিতদের বিপরীত। সর্বাবস্থায় তাঁদের বিবেক ও বোধ-বুদ্ধি ঠিক থাকত; ফলে কখনো তাঁরা অমন (হুঁশজ্ঞানহীন) ফানা বা নেশাগ্রস্ততায় পড়েননি।'
'আসলে কামেল ওলিদের হৃদয়ে তো শুধু আল্লাহর ভালোবাসা, ইবাদত আর তাঁকে পাওয়ার বাসনাই বিরাজ করে। এ কারণে তাঁরা নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা প্রতিটি বস্তুকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন। তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন প্রতিটি সৃষ্টিই মহান আল্লাহর হুকুমে প্রতিষ্ঠিত আছে, তাঁর ইচ্ছামতো এগুলো পরিচালিত হচ্ছে; বরং সবকিছু তাঁরই ডাকে সাড়া দেওয়ার আনুগত্য নিয়ে বিরাজ করছে ধরণীর বুকজুড়ে। ফলে, তাঁদের হৃদয়গত ইখলাস, তাওহিদ ও এক লা-শরিক রবের ইবাদতের চেতনা আরও দৃঢ় মজবুত আর শাণিত হয়।'
'কুরআন মূলত এই বাস্তবতার আহ্বানই করে; উলামায়ে কেরাম ও মারেফাতের শাইখগণ এই পথেই চলেছেন। বলা বাহুল্য, নবীজি ছিলেন এঁদের সবার শ্রেষ্ঠ ও শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। তাই তো ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ, সেখানকার বহু বিষয়ের দর্শন এবং মহামহিম রবের একান্ত ওহির কোনো কিছুই তাঁর মধ্যে আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। সকালে মানুষের মাঝে ফিরে আসার পর তাঁর মধ্যে রাতের সফরের কোনো ছাপও দেখা যায়নি। পক্ষান্তরে মূসা আলাইহিস সালামের অবস্থা দেখুন! তিনি কিন্তু বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন আল্লাহর তাজাল্লি দেখে। (কারণ, তিনি নবীজির মতো সর্বশীর্ষ ছিলেন না)।'
শাইখ তৃতীয় প্রকার ফানা'র আলোচনা শুরুর আগে আমি বললাম, 'মুহতারাম, আপনি কথার ফাঁকে বেশ কয়েকজন সূফি শাইখের নাম নিয়েছেন; কিন্তু শাইখ আবদুল কাদির জিলানি'র নাম নিলেন না যে? এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তো আরও প্রসিদ্ধ!' শাইখ বললেন, 'আপনারা চাইলে আগামীকাল পুরো মজলিসই হতে পারে শাইখ জিলানির বক্তব্য নিয়ে। তবে আজকে আমরা যা শুরু করেছি, তা শেষ করি আগে।'
'তৃতীয় প্রকার ফানা—এই ব্যাপারটাকেও অনেকে 'ফানা' বলেছেন যে, "অস্তিত্ব কেবল আল্লাহরই, মাখলুকের কোনো অস্তিত্ব নেই, বরং আল্লাহর অস্তিত্বই মাখলুকের অস্তিত্ব”—এমন বিশ্বাস রাখা। ফলে, মহান রব আর তাঁর তুচ্ছ বান্দার মধ্যে কোনো পার্থক্য অবশিষ্ট থাকে না। আসলে এমন ফানা ভ্রষ্ট ও বদদ্বীন লোকদের বিষয়; যারা স্রষ্টা ও সৃষ্টি—পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে একাকার হয়ে যাওয়ার জঘন্য চিন্তায় ডুবে আছে।'
টিকাঃ
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৮৯
[১] সূরা কাসাস, আয়াত-ক্রম: ১০
📄 তাসাউফের কিছু পরিভাষার ব্যাখ্যা
আমি বললাম, 'শাইখ, স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে মিলিয়ে ফেলা যদি নিষিদ্ধ ও জঘন্য হয়, তাহলে অনেক সূফি শাইখের "আল্লাহ ব্যতীত আমি কাউকে দেখি না"-জাতীয় কথার অর্থ কী?'
শাইখ বললেন, 'আসলে সত্যপন্থী শাইখগণ যখন বলেন, "আল্লাহকে ব্যতীত আমি কাউকে দেখি না” বা “আল্লাহ ব্যতীত আর কারও দিকে নজর দিই না”, তখন তাঁদের এ কথার উদ্দেশ্য হয়—আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে আমি রব ও ইলাহরূপে এবং স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী হিসেবে দেখি না। আমি আল্লাহ ব্যতীত আর কারও দিকে ভয়, ভক্তি কিংবা আশার নজরে তাকাই না。
'কারণ, অন্তর যেদিকে ঝুঁকে, চোখের নজরও সেদিকেই যায়। তাই কারও প্রতি ভয়, ভক্তি কিংবা আশা থাকলেই তার দিকে নজর ওঠে। এখন যার প্রতি অন্তরের কোনো ধরনের অনুভূতিই নেই, কোনো ভক্তি, ঘৃণা, ভয় বা আশা যার কাছে নেই, স্বাভাবিকভাবে তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করার, তাকে দেখার বা তার দিকে তাকানোর কোনো আগ্রহও হবে না। বরং ঘটনাক্রমে দেখে ফেললেও সেটা মনের মধ্যে কোনো দাগ কাটবে না; সাধারণ কোনো পাথুরে দেয়াল দেখলে যেমন কোনো অনুভূতি জাগে না।'
'আসলে বুজুর্গ শাইখগণ তাওহিদ ও ইখলাস অর্জনের জন্য কিছু বিষয় এমনভাবে উল্লেখ করেন, যেন বান্দা কেবল আল্লাহর প্রতিই ঝোঁকে এবং ভয়, ভক্তি ও ভালোবাসায় শুধু তাঁর দিকেই নজর দেয়। পাশাপাশি বান্দার মনোজগত যেন সম্পূর্ণরূপে মাখলুকের প্রভাবমুক্ত হয়, বরং মাখলুকের প্রতি তার নজরও যেন হয় আল্লাহর নূর দ্বারা প্রভাবিত। এর ফলে, বান্দার দেখা-শোনা-ধরা-চলা- সবকিছু হবে আল্লাহর পথ ও মতে। আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন বা ঘৃণা করেন বান্দাও তাকে ভালোবাসবে বা ঘৃণা করবে। দোস্তি ও দুশমনিতেও সে আল্লাহর অনুগত হবে। মাখলুকের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে মাখলুককে ভয় করবে না। মাখলুকের কাছ থেকে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আল্লাহর কাছে আশা করবে, আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কিছু পেতে মাখলুকের কাছে ধর্ণা দেবে না। শুদ্ধতা ও পবিত্রতার এসব গুণ অর্জন করলেই অন্তর হবে-একনিষ্ঠ, নিরাপদ, তাওহিদবাদী, রবের নিকট আত্মসমর্পণকারী এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাসী; পাশাপাশি নবী-রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) তাওহিদ, পরিচয় ও কর্ম সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত থাকবে。
'মাশায়েখ ও বুযুর্গদের ওই কথার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, আমি চোখে যেই মাখলুক দেখি সেই মাখলুকই আসমান-জমিনের রব। কারণ, এমন কথা তো কেবল চূড়ান্ত ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত ব্যক্তিই বলতে পারে; যার আকল বা আকিদা নষ্ট হয়ে গেছে অথবা যে হয়তো পাগল নইলে বেদ্বীন।'
'মানুষ দ্বীনি বিষয়ে যেসকল শাইখের অনুসরণ করে, তাঁরা প্রত্যেকেই উম্মাহর সালাফে সালিহীন ও ইমামগণের এই কথার সঙ্গে একমত যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি মাখলুক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা; তাঁর সত্তার কোনো কিছুই কোনো মাখলুকের মধ্যে নেই, আবার মাখলুকের কোনো কিছুও নেই তাঁর সত্তায়। ফলে অবিনশ্বর সত্তাকে নম্বর বস্তু থেকে পৃথক করা এবং খালিককে মাখলুক থেকে আলাদা করাটা জরুরি। এই কথাটুকু ওই শাইখগণের বক্তব্যে অসংখ্যবার এসেছে।'
'আসলে বিভিন্ন সময় মানুষের আত্মিক বিভিন্ন রোগ ও সংশয় সম্পর্কে তারা বক্তব্য পেশ করেছেন। তখন একথাও বলেছেন, কারও কারও অবস্থা হলো এমন—অন্তরে বিচার-বিবেচনা-বোধ না থাকায় সৃষ্টিকুলকে দেখে মনে করে, এগুলো নিজেই নিজের স্রষ্টা। যেমন এক লোক সূর্যের রশ্মি দেখে একেই আকাশে-থাকা মূল সূর্য ভেবে বসে আছে।'
আমি বললাম, 'শাইখ, সুফিগণ অনেক সময় তাঁদের বক্তব্যে একটি পরিভাষা ব্যবহার করেন, “আল-জামউ ওয়াল-ফারকু” অর্থাৎ স্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা। এটা বোঝা আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিক হিসেবে এটাও যদি আলোচনা করে দিতেন!'
শাইখ বললেন, 'আসলে, তাঁদের ফানা-বিষয়ক বক্তব্যের মতো এই স্থিরতা ও বিক্ষিপ্ততা-বিষয়ক বক্তব্যগুলোতেও বিভিন্ন জটিল বাক্য ঢুকে গেছে; ফলে এটা অনেকের জন্য মুশকিল হয়ে গেছে。
'দেখুন, বান্দা যখন মাখলুকের বিভিন্ন রকমফের ও আধিক্য দেখে, তখন এগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং এগুলোর প্রতি ভয়, ভক্তি ও আশা পোষণ করে। এর প্রভাবে তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আবার যখন সে স্থিরতার প্রতি আগ্রহী হয়, তখন তার মন এক লা-শরিক আল্লাহর তাওহিদ ও ইবাদতে স্থির হয়ে যায়। মাখলুক থেকে সরিয়ে খালিকের প্রতি নজর করার ফলে তার ভয়, প্রার্থনা, আশা ও ভালোবাসা—সব হতে থাকে এক আল্লাহর জন্য। তখন দেখা যায় মাখলুকের প্রতি আলাদাভাবে ভ্রূক্ষেপের অবস্থা তার থাকে না যে, খালিক ও মাখলুকের মধ্যে সে পার্থক্য করবে। বরং সে মাখলুক-বিমুখ হয়ে খালিকের আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষাতেই ডুবে থাকে। এটা মূলত ফানা'র দ্বিতীয় প্রকারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।'
'বান্দার মধ্যে বিক্ষিপ্ততা বা পার্থক্যকরণের ব্যাপার তৈরি হয়। অর্থাৎ, সে যখন দেখে—সব সৃষ্টি আল্লাহর ইচ্ছাধীনেই টিকে আছে, তাঁর চাহিদামতোই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে, পাশাপাশি যখন সে এটা অনুভব করে যে, এক আল্লাহর সামনে বিপুল সংখ্যক সৃষ্টির সবকিছুই অস্তিত্বহীন, তিনিই সব কিছুর খালিক, মালিক, ইলাহ ও রব তখন অন্তরে আল্লাহর জন্য ইখলাস, ভয়, ভরসা, আশা, ভালোবাসা, প্রার্থনা, বন্ধুত্ব ও শত্রুতার গুণগুলো থাকা সত্ত্বেও খালিক ও মাখলুকের মধ্যে পার্থক্য করার প্রতি নজর করতে পারে; এবং উভয়কে আলাদা করতে পারে।'
'সে মাখলুকের বিভিন্নতা ও আধিক্য দেখার পরও এই সাক্ষ্য দেয় যে, এই সব কিছুর খালিক, মালিক, রব ও ইলাহ এক আল্লাহই—যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। এটিই সরল ও বিশুদ্ধ সাক্ষ্য। এই সাক্ষ্য অন্তরের সার্বিক হালতে (তথা মাকসাদ, ইবাদত, ইচ্ছা, মহব্বত, বন্ধুত্ব ও আনুগত্য ইত্যাদি), ইলমে, সাক্ষ্যদানে, যিকিরে ও মারেফাতে জরুরি। এবং এটিই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যে সাক্ষ্য, তার বাস্তবরূপ। কারণ, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য বান্দার মনে আল্লাহর ইলাহ হওয়াকে দৃঢ় করে, অন্য সবার ইলাহ হওয়াকে বাতিল করে দেয়। এতে করে সমস্ত মাখলুকের বিপরীতে বান্দা আসমান ও জমিনের রবকেই ইলাহরূপে গ্রহণ করে। সমস্ত মাখলুক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক আল্লাহর ওপরই তার মন স্থির হয়। তখন নিজের ইলম, মারেফাত, মাকসাদ, মহব্বত, ইচ্ছা ও সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে সে খালিক ও মাখলুকের পার্থক্য করতে পারে।'
'সে আল্লাহ সম্পর্কে জানে, তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর মারেফাত হাসিল করে; সাথে সাথে এ-ও জানে যে, তিনি স্বীয় মাখলুকের বিপরীত এবং তিনি মাখলুক থেকে আলাদা ও একক। ফলে সে কেবল আল্লাহকেই ভালোবাসে, আর কাউকে নয়; কেবল তাঁরই ইবাদত করে, তাঁকেই ভয় পায়, তাঁর কাছেই আশা করে, তাঁরই নিকট সাহায্য কামনা করে, তাঁর ওপরই ভরসা করে এবং তাঁর দিকে তাকিয়েই করে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা। মোটকথা, ইলাহ'র সঙ্গে যুক্ত সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকেই সে গ্রহণ করে, অন্য কাউকে নয়। আর সবাইকে ছেড়ে আল্লাহকে এভাবে ইলাহরূপে মেনে নেওয়ার মধ্যেই আছে তাঁকে রব হিসেবে মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি। তিনিই তো সবকিছুর খালিক, মালিক, রব ও পরিচালক। ফলে এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বান্দা পূর্ণরূপে একত্ববাদী হয়ে ওঠে। এজন্যই এ কথা স্পষ্ট যে, শ্রেষ্ঠ যিকির হলো—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ইমাম তিরমিযি ও ইবনু আবিদ দুনিয়া-সহ অনেকেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই বিষয়টি মারফু সনদে বর্ণনা করেছেন; নবীজি বলেছেন—
أَفْضَلُ الذِّكْرِ : لا إله إلا اللهُ ، وأَفضلُ الدُّعَاءِ : الْحَمْدُ للهِ
| “শ্রেষ্ঠ যিকির লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আর শ্রেষ্ঠ দুআ আলহামদুলিল্লাহ।”[১]
'মুআত্তা-সহ বিভিন্ন কিতাবে তালহা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কাসিরের সূত্রে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন—
أَفْضَلُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ
"আমার ও পূর্ববর্তী নবীগণের-বলা শ্রেষ্ঠ কথা হলো, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই।" [১]
এই পর্যন্ত বলে শাইখ তাঁর মজলিস সমাপ্ত করলেন। মজলিসের শুরুর মতো শেষেও হামদ-সালাত পাঠ করলেন। আজকের মজলিসে আলোচ্য বিষয়ের সর্বদিক নিয়ে আলোচনা করে তিনি আমাদেরকে কৃতজ্ঞ করেছেন। কোনো দ্বিধা বা অস্পষ্টতার অবকাশ রাখেননি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আমাদের হয়ে সর্বোত্তম বদলা দান করুন。
টিকাঃ
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৮৩; ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৩৮০০; তাখরিজু সহিহ ইবনি হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ৮৪৬; তাখরিজু সিয়ারি আলামিন নুবালা, হাদিস-ক্রম: ৬/১৬৯; শাইখ শুয়াইব আরনাউত এই সনদকে হাসান বলেছেন。
[১] মুআত্তা মালেক, হাদিস-ক্রম: ৪৮৬ ও ৯৪১; হাদিসটি ইমাম মালেক থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত。