📄 আল্লাহর ‘জন্য’ এবং আল্লাহর ‘সঙ্গে’ ভালোবাসা
এরপর শাইখ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। হয়তো শ্রোতাদেরকে কোনো প্রশ্ন বা ইস্তেগফারের সুযোগ দিলেন। কেউ যখন কিছু বলল না, তখন শাইখ বললেন, 'দোস্তগণ, আগের কথার সঙ্গে আমি আরেকটি কথা যুক্ত করতে চাইছি; সম্ভবত আপনারাও সেটি বুঝতে পেরেছেন। কথাটি হলো, কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আর কাউকে আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসা—এ দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে।'
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো মাখলুককে ভালোবাসে আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ভালোবাসে-এ দুজনের মধ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পার্থক্য করেছেন। প্রথমজন-আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসে কোনো মাখলুককে, আল্লাহই হবেন তার মাহবুব ও মাবুদ (তথা প্রেমাস্পদ ও ইবাদতযোগ্য সত্তা); আল্লাহই হবেন তার ইবাদত ও ভালোবাসার গন্তব্য ও চূড়ান্ত সীমা; আল্লাহর সঙ্গে (সমানভাবে) আর কাউকে ভালোবাসবে না। তবে যখন সে জানবে, আল্লাহ তাঁর নবীগণ ও নেককার বান্দাদের ভালোবাসেন; তখন সে আল্লাহর জন্যই তাদেরকেও ভালোবাসবে। এমনিভাবে, যখন সে জানবে আদিষ্ট কাজগুলো করা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা পছন্দ করেন আল্লাহ তাআলা তখন সে-ও তা-ই করতে পছন্দ করবে। ফলে যা কিছুই সে ভালোবাসবে, তার সব ভালোবাসাই আল্লাহর ভালোবাসার অনুগামী হবে; বরং তাঁর ভালোবাসারই শাখা ও অংশে পরিণত হবে।'
'পক্ষান্তরে দ্বিতীয় জন-আল্লাহর সঙ্গে (সমানভাবে) কোনো মাখলুককেও যে ভালোবেসেছে, সে তার ভালোবাসার সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করেছে; ফলে সেই সত্তার কাছে সে আশা করে, তাকে ভয় পায়, তার অনুসরণ করে, অথচ জানে না যে, ওই সত্তার অনুসরণ করাটা আল্লাহর অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা; মনে করে-ওই সত্তা আল্লাহর নিকট তার জন্য সুপারিশ করবে; অথচ সে জানেই না, আল্লাহ তার জন্য ওই সত্তাকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন কিনা।'
'আল্লাহ তাআলা বলেন- وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ اللَّهِ "তারা আল্লাহকে ছেড়ে এমন জিনিসের ইবাদত করে, যা তাদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, অথচ তারা বলে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশকারী।" [১]
'অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَنَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَحِدًا لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
“তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পাদ্রী, পণ্ডিত ও মারইয়ামের পুত্র মাসিহকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে; অথচ তাঁরা আদিষ্ট হয়েছিলেন এক ইলাহ'র ইবাদত করতে; তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই; তারা তাঁর সঙ্গে যা কিছু শরিক করে, সেসব থেকে তিনি পূতপবিত্র।”[১]
‘এই আয়াত শুনে আদি রাদিয়াল্লাহু আনহু (যিনি ইসলাম কবুলের আগে খ্রিষ্টান ছিলেন) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, "তারা তো ওই পাদ্রী-পণ্ডিতদের ইবাদত করত না।” নবীজি বললেন,
أَحَلُّوا لَهُمُ الْحَرَامَ فَأَطَاعُوْهُمْ ، وَحَرَّمُوْا عَلَيْهِمُ الْحَلَالَ فَأَطَاعُوْهُمْ فَكَانَتْ تِلْكَ عِبَادَتُهُمْ إِيَّاهُمْ
"পাদ্রীরা তাদের জন্য হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানিয়ে দিয়েছিল, আর তারা (সাধারণ খ্রিষ্টানরা) তাদের (পাদ্রীদের) অনুসরণ করেছিল। এটাই তো তাদের পক্ষ থেকে পাদ্রীদের ইবাদত।”[২]
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَمْ لَهُمْ شُرَكَوْا شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنُ بِهِ اللَّهُ
"নাকি তাদের এমন কোনো শরিকদাররা আছে, যারা তাদের জন্য আল্লাহর অননুমোদিত কোনো নিয়ম জারি করেছে ধর্মে?”[৩]
'অন্যত্র বলেন-
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا . يُوَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنسَنِ خَذُولًا
“সেদিন জালিম তার দুহাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায়, আফসোস! আমি যদি রাসূলের সঙ্গ-পথ গ্রহণ করতাম! হায়, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পরেও সে আমাকে তা থেকে পথহারা করেছে। আসলে, শয়তান মানুষকে অপদস্থকারী।”[১]
'মূলত রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করাই ওয়াজিব। কারণ, রাসূলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য। তাঁর কথামতোই হালাল-হারাম নির্ধারিত হবে। তিনি যেই বিধান বলবেন, সেটাই দ্বীন। তিনি ব্যতীত যত আলিম, শাইখ, আমির ও বাদশা আছেন তাদের আনুগত্য করাটা আবশ্যক হবে, যখন তা আল্লাহর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাদের আনুগত্যের কথা যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তরফ থেকে আসবে, তখনই কেবল তাদের আনুগত্যটা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য বলে গণ্য হবে। আল্লাহ বলেন—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো; আর আনুগত্য করো তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর, তাদের।”[২]
'আবার, অনেকে কোনো খলিফা, আলেম, শাইখ বা কোনো আমিরকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলে; যদিও সে মুখে মুখে আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে।
'তাই, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেলাফে অন্য কারও আদেশ-নিষেধকে চূড়ান্ত মান্য হিসেবে গ্রহণ করল, সে ওই ব্যক্তি বা সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলল। ফলে, কখনো সে তার সঙ্গে তেমন আচরণ করা শুরু করবে, যেমন আচরণ খ্রিষ্টানরা করেছিল ঈসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে। সে তার কাছে দুআ করবে, সাহায্য চাইবে, তার বন্ধুদেরকে বন্ধু এবং শত্রুদেরকে শত্রুরূপে গ্রহণ করবে, তার করা প্রতিটি আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারাম মান্য করবে। মোটকথা, তাকে আল্লাহ ও আল্লাহর বার্তাবাহক রাসূলের জায়গায় বসিয়ে দেবে। আর এটাই তো সেই শিরক, যা করে থাকে কুরআন-বর্ণিত আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্তকারীরা। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-"কতক মানুষ অন্য কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং সেসবকে ভালোবাসে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে; অথচ মুমিনরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে আল্লাহকে।” [১]
টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ৩১
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩০৯৫; তাবারানি, হাদিস-ক্রম: কাবীর ১৭/৯২; তাফসিরে ইবনু জারির তবারি ১০/১১৪। গুতাইফ ইবনু আ'য়ুনের সনদে আবদুস সালাম ইবনু হারব থেকে এই বর্ণনাটি আনা হয়েছে। তিরমিযি বলেন, এটি একটি হাদিসে গরিব; আবদুস সালামের সনদেই শুধু এটি জানি আমরা; আর গুতাইফ হাদিসের ক্ষেত্রে চেনাজানা নয়。
[৩] সূরা শুরা, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] সূরা ফুরকান; আয়াত-ক্রম: ২৭-২৯
[২] সূরা নিসা; আয়াত-ক্রম: ৫৯
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
এরপর শাইখ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। হয়তো শ্রোতাদেরকে কোনো প্রশ্ন বা ইস্তেগফারের সুযোগ দিলেন। কেউ যখন কিছু বলল না, তখন শাইখ বললেন, 'দোস্তগণ, আগের কথার সঙ্গে আমি আরেকটি কথা যুক্ত করতে চাইছি; সম্ভবত আপনারাও সেটি বুঝতে পেরেছেন। কথাটি হলো, কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আর কাউকে আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসা—এ দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে।'
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো মাখলুককে ভালোবাসে আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ভালোবাসে-এ দুজনের মধ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পার্থক্য করেছেন। প্রথমজন-আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসে কোনো মাখলুককে, আল্লাহই হবেন তার মাহবুব ও মাবুদ (তথা প্রেমাস্পদ ও ইবাদতযোগ্য সত্তা); আল্লাহই হবেন তার ইবাদত ও ভালোবাসার গন্তব্য ও চূড়ান্ত সীমা; আল্লাহর সঙ্গে (সমানভাবে) আর কাউকে ভালোবাসবে না। তবে যখন সে জানবে, আল্লাহ তাঁর নবীগণ ও নেককার বান্দাদের ভালোবাসেন; তখন সে আল্লাহর জন্যই তাদেরকেও ভালোবাসবে। এমনিভাবে, যখন সে জানবে আদিষ্ট কাজগুলো করা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা পছন্দ করেন আল্লাহ তাআলা তখন সে-ও তা-ই করতে পছন্দ করবে। ফলে যা কিছুই সে ভালোবাসবে, তার সব ভালোবাসাই আল্লাহর ভালোবাসার অনুগামী হবে; বরং তাঁর ভালোবাসারই শাখা ও অংশে পরিণত হবে।'
'পক্ষান্তরে দ্বিতীয় জন-আল্লাহর সঙ্গে (সমানভাবে) কোনো মাখলুককেও যে ভালোবেসেছে, সে তার ভালোবাসার সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করেছে; ফলে সেই সত্তার কাছে সে আশা করে, তাকে ভয় পায়, তার অনুসরণ করে, অথচ জানে না যে, ওই সত্তার অনুসরণ করাটা আল্লাহর অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা; মনে করে-ওই সত্তা আল্লাহর নিকট তার জন্য সুপারিশ করবে; অথচ সে জানেই না, আল্লাহ তার জন্য ওই সত্তাকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন কিনা।'
'আল্লাহ তাআলা বলেন- وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ اللَّهِ "তারা আল্লাহকে ছেড়ে এমন জিনিসের ইবাদত করে, যা তাদের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, অথচ তারা বলে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশকারী।" [১]
'অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَنَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَحِدًا لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
“তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পাদ্রী, পণ্ডিত ও মারইয়ামের পুত্র মাসিহকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে; অথচ তাঁরা আদিষ্ট হয়েছিলেন এক ইলাহ'র ইবাদত করতে; তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই; তারা তাঁর সঙ্গে যা কিছু শরিক করে, সেসব থেকে তিনি পূতপবিত্র।”[১]
‘এই আয়াত শুনে আদি রাদিয়াল্লাহু আনহু (যিনি ইসলাম কবুলের আগে খ্রিষ্টান ছিলেন) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, "তারা তো ওই পাদ্রী-পণ্ডিতদের ইবাদত করত না।” নবীজি বললেন,
أَحَلُّوا لَهُمُ الْحَرَامَ فَأَطَاعُوْهُمْ ، وَحَرَّمُوْا عَلَيْهِمُ الْحَلَالَ فَأَطَاعُوْهُمْ فَكَانَتْ تِلْكَ عِبَادَتُهُمْ إِيَّاهُمْ
"পাদ্রীরা তাদের জন্য হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানিয়ে দিয়েছিল, আর তারা (সাধারণ খ্রিষ্টানরা) তাদের (পাদ্রীদের) অনুসরণ করেছিল। এটাই তো তাদের পক্ষ থেকে পাদ্রীদের ইবাদত।”[২]
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَمْ لَهُمْ شُرَكَوْا شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنُ بِهِ اللَّهُ
"নাকি তাদের এমন কোনো শরিকদাররা আছে, যারা তাদের জন্য আল্লাহর অননুমোদিত কোনো নিয়ম জারি করেছে ধর্মে?”[৩]
'অন্যত্র বলেন-
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا . يُوَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنسَنِ خَذُولًا
“সেদিন জালিম তার দুহাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায়, আফসোস! আমি যদি রাসূলের সঙ্গ-পথ গ্রহণ করতাম! হায়, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পরেও সে আমাকে তা থেকে পথহারা করেছে। আসলে, শয়তান মানুষকে অপদস্থকারী।”[১]
'মূলত রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করাই ওয়াজিব। কারণ, রাসূলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য। তাঁর কথামতোই হালাল-হারাম নির্ধারিত হবে। তিনি যেই বিধান বলবেন, সেটাই দ্বীন। তিনি ব্যতীত যত আলিম, শাইখ, আমির ও বাদশা আছেন তাদের আনুগত্য করাটা আবশ্যক হবে, যখন তা আল্লাহর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাদের আনুগত্যের কথা যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তরফ থেকে আসবে, তখনই কেবল তাদের আনুগত্যটা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য বলে গণ্য হবে। আল্লাহ বলেন—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো; আর আনুগত্য করো তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর, তাদের।”[২]
'আবার, অনেকে কোনো খলিফা, আলেম, শাইখ বা কোনো আমিরকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলে; যদিও সে মুখে মুখে আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে।
'তাই, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খেলাফে অন্য কারও আদেশ-নিষেধকে চূড়ান্ত মান্য হিসেবে গ্রহণ করল, সে ওই ব্যক্তি বা সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলল। ফলে, কখনো সে তার সঙ্গে তেমন আচরণ করা শুরু করবে, যেমন আচরণ খ্রিষ্টানরা করেছিল ঈসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে। সে তার কাছে দুআ করবে, সাহায্য চাইবে, তার বন্ধুদেরকে বন্ধু এবং শত্রুদেরকে শত্রুরূপে গ্রহণ করবে, তার করা প্রতিটি আদেশ-নিষেধ ও হালাল-হারাম মান্য করবে। মোটকথা, তাকে আল্লাহ ও আল্লাহর বার্তাবাহক রাসূলের জায়গায় বসিয়ে দেবে। আর এটাই তো সেই শিরক, যা করে থাকে কুরআন-বর্ণিত আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্তকারীরা। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-"কতক মানুষ অন্য কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং সেসবকে ভালোবাসে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে; অথচ মুমিনরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে আল্লাহকে।” [১]
টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ৩১
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩০৯৫; তাবারানি, হাদিস-ক্রম: কাবীর ১৭/৯২; তাফসিরে ইবনু জারির তবারি ১০/১১৪। গুতাইফ ইবনু আ'য়ুনের সনদে আবদুস সালাম ইবনু হারব থেকে এই বর্ণনাটি আনা হয়েছে। তিরমিযি বলেন, এটি একটি হাদিসে গরিব; আবদুস সালামের সনদেই শুধু এটি জানি আমরা; আর গুতাইফ হাদিসের ক্ষেত্রে চেনাজানা নয়。
[৩] সূরা শুরা, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] সূরা ফুরকান; আয়াত-ক্রম: ২৭-২৯
[২] সূরা নিসা; আয়াত-ক্রম: ৫৯
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
📄 অন্তরের ‘কথা-কাজে’ও শিরক হয়
আমি বললাম, 'শাইখের কথায় আমরা বুঝলাম, তাওহিদ ও শিরক-উভয়টাই হয় অন্তরের কথায় ও কাজে।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, বন্ধুগণ! এটিই শুদ্ধ কথা; আমি তো এই বিষয়টিই আপনাদের মনে ভালোভাবে গেঁথে দিতে চাইছি যে, তাওহিদ ও শিরক অন্তরের কথার মধ্যে যেমন হয়, অন্তরের কাজের মধ্যেও হয়।'
'এজন্যই জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাওহিদ হলো অন্তরের কথা; আর তাওয়াক্কুল হলো অন্তরের কাজ।' এখানে তাওহিদ বলতে তাসদিক (তথা, রাসূলকে তাঁর আনীত সব বিধানের ক্ষেত্রে সত্যায়ন করা) উদ্দেশ্য। কারণ, এটাকে তাওয়াক্কুলের সঙ্গে আনার ফলে এটা হয়ে গেছে তাওয়াক্কুলের মূল। নতুবা শুধু তাওহিদ ব্যবহার করলে সাধারণত এর দ্বারা অন্তরের কথা-কাজ উভয়টিই উদ্দেশ্য হয়। আর তাওয়াক্কুল হয় তাওহিদেরই অন্যতম অংশ।'
আমি বললাম, 'শাইখের কথায় আমরা বুঝলাম, তাওহিদ ও শিরক-উভয়টাই হয় অন্তরের কথায় ও কাজে।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, বন্ধুগণ! এটিই শুদ্ধ কথা; আমি তো এই বিষয়টিই আপনাদের মনে ভালোভাবে গেঁথে দিতে চাইছি যে, তাওহিদ ও শিরক অন্তরের কথার মধ্যে যেমন হয়, অন্তরের কাজের মধ্যেও হয়।'
'এজন্যই জুনাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাওহিদ হলো অন্তরের কথা; আর তাওয়াক্কুল হলো অন্তরের কাজ।' এখানে তাওহিদ বলতে তাসদিক (তথা, রাসূলকে তাঁর আনীত সব বিধানের ক্ষেত্রে সত্যায়ন করা) উদ্দেশ্য। কারণ, এটাকে তাওয়াক্কুলের সঙ্গে আনার ফলে এটা হয়ে গেছে তাওয়াক্কুলের মূল। নতুবা শুধু তাওহিদ ব্যবহার করলে সাধারণত এর দ্বারা অন্তরের কথা-কাজ উভয়টিই উদ্দেশ্য হয়। আর তাওয়াক্কুল হয় তাওহিদেরই অন্যতম অংশ।'
📄 অন্তরের নিজস্ব সত্যায়ন অনুসারে আমল করার আবশ্যকতা
যেহেতু আগের আলোচনাটি শাইখ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন তাই এ কথাটি জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন মনে করছি যে, আমল না থাকলে হক ও সত্য সম্পর্কে অন্তরের শুধু জানা স্বীকার করা ও বিশ্বাস করাই যথেষ্ট হবে নাকি এই জানা ও স্বীকার করা থেকে আমলটা বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, যেমন বিচ্ছিন্ন হতে পারে না অন্তরের কথা ও কাজ?'
শাইখ বললেন, 'এই প্রশ্নটি খুবই সুন্দর ও স্থানোপযোগী হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, আমি যা বলছি তা আপনারা বুঝতে ও অনুধাবন করতে পারছেন; আলহামদুলিল্লাহ।'
'বন্ধুগণ, শুনুন। ঈমান শব্দটি "আল-আমনু” (তথা, নিরাপত্তা) থেকে গৃহীত; তাই মুমিন হলো নিরাপত্তার অধিকারী। এমনিভাবে "الإفرارُ” হলো “الْقَرُ" থেকে গৃহীত; তাই "مُقِرُّ” ব্যক্তি স্বীকার ও স্থিরতার অধিকারী। তাই, এক্ষেত্রে অন্তরের সত্যায়ন, বা অন্তরের সত্য-জানা-অনুসারে আমল থাকা জরুরি। যেমন-অন্তর যখন জানবে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তখন এই জানার সঙ্গে মুহাম্মাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তৈরি না হলে, বরং তাঁর প্রতি ঘৃণা ও হিংসা সৃষ্টি হলে, অহংকার বশত তাঁর অনুসরণ না করলে, এই ব্যক্তি আর মুমিন হবে না, কাফিরই থেকে যাবে।'
'ইবলিস, ফেরাউন এবং আহলে কিতাব লোকেরা (তথা, ইহুদি ও নাসারা জাতি)- যারা নবীজিকে নিজের সন্তানের মতো স্পষ্টরূপে চিনত-এদের সবার কুফরটা ওই ধরনেরই ছিল। ইবলিস তো কোনো আসমানি সংবাদ অস্বীকার করেনি, বা কোনো সংবাদদাতা নবী-রাসুলকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেনি, কেবল অহংকার করে রবের আদেশ অমান্য করেছিল।'
'আর ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا
“তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল; অথচ তাদের অন্তর সেসবের (সত্যতার) ব্যাপারে স্থির বিশ্বাসী ছিল।””[১]
মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনকে বললেন-
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ
"তুমি জানো যে, আসমানসমূহ ও জমিনের রবই এসব নাজিল করেছেন প্রত্যক্ষ নিদর্শনরূপে।””[২]
'আবার আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ ءَاتَيْتُهُمُ الْكِتُبَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُم
"যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম, তারা (তথা, ইহুদি-নাসারা) তাঁকে (তথা, মুহাম্মাদকে) নিজেদের সন্তানাদির মতোই চিনত।”[১]
'যেকোনো বিষয়ে অন্তরের শুধু ইলম থাকলেই চলবে না, তদানুসারে অন্তরের আমলও থাকতে হবে। অন্তর যে বিষয়কে হক ও সত্য বলে জানবে, সে বিষয়ের মুহব্বত ও আনুগত্য যদি অন্তরে না আসে, তাহলে শুধু ওই জানাটা কোনো কাজে আসবে না। বরং যে আলিমের ইলম তার কোনো উপকারে আসেনি, কিয়ামতের দিন সে সবচেয়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِن عِلْمٍ لا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبِ لا يَخْشَعُ ، وَمِنْ نَفْسٍ لا تَشْبَعُ ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَها
“হে আল্লাহ! অনোপকারী ইলম, অতৃপ্ত মন, অগ্রহণযোগ্য দুআ ও অবিনয়ী অন্তর থেকে আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই।”[২]
'কিন্তু জাহমিয়্যা সম্প্রদায় বলে, ঈমান শুধু অন্তরে সত্য বলে জানার নাম; শরিয়ত কাউকে কাফির বলে থাকলে সেটাও এই কারণে যে, ঈমানের ব্যাপারগুলোতে তার অন্তর অজ্ঞ। তাদের এই কথা তো আকল ও শরিয়া-উভয় বিবেচনায় চূড়ান্ত মূর্খতা বৈ কিছু নয়; কারণ, এ কথা মেনে নিলে মুমিন-কাফির সবাই সমান হয়ে যাবে। এজন্যই ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলসহ অনেক ইমাম জাহমিয়্যাদেরকে কাফির বলে ঘোষণা করেছেন। কারণ, দেখা যায়-একটা লোক সত্য জানার পরেও অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকায় সেটাকে অপছন্দ করে। এমনিভাবে অহংকার বশত সত্য-অস্বীকারকারী সবাই কিন্তু সেসম্পর্কে অজ্ঞ নয়। বোঝা গেল, ঈমানের বিষয়টি অন্তরে শুধু জানলেই হবে না, সেই অনুসারে অন্তরের আমলও লাগবে। সালাফের অনেকে এটা বোঝানোর জন্যই বলেছেন- “ঈমান হলো ইলম ও আমলের সমষ্টি।”
'এরপর, অন্তর যখন ঈমানের বিষয় সত্য বলে জেনে সেই অনুপাতে আমলও করবে; অর্থাৎ সে বিষয়ের প্রতি পূর্ণ মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ করবে, যার ফলে বাহ্যিক কর্মেরও পূর্ণ ইচ্ছা তৈরি হয়ে যাবে, তখন ব্যক্তির মধ্যে বাহ্যিক আমলগুলোও বিদ্যমান হওয়া আবশ্যক। কারণ, দৃঢ় ইচ্ছার সঙ্গে পূর্ণ শক্তি যুক্ত হলে, উদ্দিষ্ট বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই বাস্তবায়িত হবে। শক্তি বা ইচ্ছার কমতি থাকলেই উদ্দিষ্ট বিষয়টি বাস্তবায়িত হয় না; কিন্তু ইচ্ছাধীন বিষয়ে দৃঢ় ইচ্ছা ও পূর্ণ শক্তি থাকলে উদ্দিষ্ট বিষয়টি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।'
'এখন, অন্তর যখন পূর্ণরূপে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে এবং তাঁকে পুরোপুরি ভালোবাসবে, তখন যথেষ্ট শক্তি থাকা সত্ত্বেও মুখে সে শাহাদাতাইন (কালিমায়ে তয়্যিবাহ ও শাহাদাহ) উচ্চারণ করতে না পারাটা অযৌক্তিক ও অবাস্তব। তবে শক্তি না থাকলে ভিন্ন কথা। যেমন-বোবা হওয়ায় উচ্চারণে অক্ষম, বা ভয়ে উচ্চারণ করতে পারছে না।'
'আবার দেখুন, আবু তালিব তো জানতেন মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তিনি নবীজিকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর ভালোবাসাটা ছিল ভাতিজার প্রতি আত্মীয়তার কারণে; আল্লাহর জন্য ছিল না। তিনি নবীজির উত্থানকে ভালোবেসেছেন, কারণ, এতে তাঁর মর্যাদা ও নেতৃত্ব নিহিত ছিল। ফলে, তাঁর ভালোবাসাটা মূলত নেতৃত্বের প্রতি। মৃত্যুর সময় তাঁকে শাহাদাতাইন পড়তে বলা হলে তিনি অস্বীকার করেন। কারণ, এতে তাঁর এতদিনের ভালোবাসার ধর্ম মুছে যাবে। এর মানে হলো, ওই কুফরি ধর্ম তাঁর কাছে ভাতিজার চেয়েও বেশি ভালোবাসার। যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى . الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ . وَمَا لِأَحَدٍ عِندَهُ مِن نِعْمَةٍ تُجْزَى . إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى ، وَلَسَوْفَ يَرْضَى
"আমি সবচেয়ে খোদাভীরুকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখব; যে আত্মশুদ্ধির জন্য দান করে নিজের সম্পদ; এবং তার কাছে কারও প্রতিদানযোগ্য কোনো অনুগ্রহ নেই-তার পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ ব্যতীত। অতি শিগগির সে পরিতুষ্ট হবে।”[১]
'সেই আবু বকর যেমন ভালোবেসেছেন নবীজিকে, উমর, উসমান, আলি সহ অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং সব মুমিন যেমন শুধু আল্লাহর রাসূল হওয়ার কারণে নবীজিকে ভালোবেসেছেন, আবু তালিবও তাঁকে অমন করে শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে অবশ্যই শাহাদাতাইনের উচ্চারণ তাঁর নসিবে জুটত।'
'সারকথা হলো, আবু তালিব নবীজিকে আল্লাহর “জন্য” ভালোবাসেননি, আল্লাহর “সঙ্গে” ভালোবেসেছিলেন, তাই নবীজিকে তাঁর সাহায্য সহযোগিতা ও শক্তি যোগানো—কিছুই কবুল করেননি আল্লাহ। কারণ, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন যা তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়; তাঁর সন্তুষ্টি বিনে অন্য কিছু উদ্দেশ্য হলে সেই আমল তিনি কবুল করেন না।'
'বোঝা গেল, ঈমান ও তাওহিদের ক্ষেত্রে অন্তরের আমলও জরুরি। যেমন, অন্তরে ভালোবাসা পোষণ করা। তেমনিভাবে দ্বীনকে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করতে হবে। আর আমল ব্যতীত দ্বীন হয় না; কারণ, ইবাদত ও আনুগত্য দ্বীনের অংশ।'
'আল্লাহ তাআলা ইখলাস সম্পর্কে দুটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন; কাফিরুন ও ইখলাস। এর মধ্যে একটিতে আলোচনা করা হয়েছে কথা ও ইলমের তাওহিদ নিয়ে; অপরটির আলোচনা আমল ও ইচ্ছার তাওহিদ নিয়ে।'
'সূরা ইখলাসে তিনি বলছেন— قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ . اللَّهُ الصَّمَدُ . لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدُ . وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বলুন, তিনিই এক আল্লাহ; আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; তিনি (কাউকে) জন্ম দেননি এবং (কারও থেকে) জন্ম নেনও নি; তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”[২]
'এখানে তাওহিদকে বলতে আদেশ করা হয়েছে।
অপরটিতে বলেছেন-
قُلْ يَأَيُّهَا الْكَافِرُونَ . لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ . وَلَا أَنتُمْ عَبدُونَ مَا أَعْبُدُ ، وَلَا أَنَا عَابِدُ مَّا عَبَدتُّمْ . وَلَا أَنتُمْ عَبدُونَ مَا أَعْبُدُ . لَكُمْ دِينَكُمْ وَلِيَ دِينِ
"বলুন, হে কাফিররা, তোমরা যার পূজা করো, আমি তার পূজা করি না; আবার, আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও; তোমরা যার পূজা করো, আমি তার পূজক নই; আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও; আমার ও তোমাদের দ্বীন আলাদা।"[১]
'এখানে আল্লাহ তাআলা নবীজিকে গাইরুল্লাহর ইবাদত থেকে সম্পর্কহীনতা ও আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে খালেস করার ঘোষণা দিতে আদেশ করছেন।'
টিকাঃ
[১] সূরা নামল, আয়াত-ক্রম: ১৪
[২] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ১০২
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৪৬
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২২১।
[১] সূরা লাইল; আয়াত-ক্রম: ১৭-২১
[২] সূরা ইখলাস, আয়াত-ক্রম: ১-৪
[১] সূরা কাফিরুন, আয়াত: ১-৬
যেহেতু আগের আলোচনাটি শাইখ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন তাই এ কথাটি জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন মনে করছি যে, আমল না থাকলে হক ও সত্য সম্পর্কে অন্তরের শুধু জানা স্বীকার করা ও বিশ্বাস করাই যথেষ্ট হবে নাকি এই জানা ও স্বীকার করা থেকে আমলটা বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, যেমন বিচ্ছিন্ন হতে পারে না অন্তরের কথা ও কাজ?'
শাইখ বললেন, 'এই প্রশ্নটি খুবই সুন্দর ও স্থানোপযোগী হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, আমি যা বলছি তা আপনারা বুঝতে ও অনুধাবন করতে পারছেন; আলহামদুলিল্লাহ।'
'বন্ধুগণ, শুনুন। ঈমান শব্দটি "আল-আমনু” (তথা, নিরাপত্তা) থেকে গৃহীত; তাই মুমিন হলো নিরাপত্তার অধিকারী। এমনিভাবে "الإفرارُ” হলো “الْقَرُ" থেকে গৃহীত; তাই "مُقِرُّ” ব্যক্তি স্বীকার ও স্থিরতার অধিকারী। তাই, এক্ষেত্রে অন্তরের সত্যায়ন, বা অন্তরের সত্য-জানা-অনুসারে আমল থাকা জরুরি। যেমন-অন্তর যখন জানবে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তখন এই জানার সঙ্গে মুহাম্মাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তৈরি না হলে, বরং তাঁর প্রতি ঘৃণা ও হিংসা সৃষ্টি হলে, অহংকার বশত তাঁর অনুসরণ না করলে, এই ব্যক্তি আর মুমিন হবে না, কাফিরই থেকে যাবে।'
'ইবলিস, ফেরাউন এবং আহলে কিতাব লোকেরা (তথা, ইহুদি ও নাসারা জাতি)- যারা নবীজিকে নিজের সন্তানের মতো স্পষ্টরূপে চিনত-এদের সবার কুফরটা ওই ধরনেরই ছিল। ইবলিস তো কোনো আসমানি সংবাদ অস্বীকার করেনি, বা কোনো সংবাদদাতা নবী-রাসুলকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেনি, কেবল অহংকার করে রবের আদেশ অমান্য করেছিল।'
'আর ফিরাউন ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا
“তারা অন্যায় ও অহংকার করে নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল; অথচ তাদের অন্তর সেসবের (সত্যতার) ব্যাপারে স্থির বিশ্বাসী ছিল।””[১]
মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনকে বললেন-
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ
"তুমি জানো যে, আসমানসমূহ ও জমিনের রবই এসব নাজিল করেছেন প্রত্যক্ষ নিদর্শনরূপে।””[২]
'আবার আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ ءَاتَيْتُهُمُ الْكِتُبَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُم
"যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম, তারা (তথা, ইহুদি-নাসারা) তাঁকে (তথা, মুহাম্মাদকে) নিজেদের সন্তানাদির মতোই চিনত।”[১]
'যেকোনো বিষয়ে অন্তরের শুধু ইলম থাকলেই চলবে না, তদানুসারে অন্তরের আমলও থাকতে হবে। অন্তর যে বিষয়কে হক ও সত্য বলে জানবে, সে বিষয়ের মুহব্বত ও আনুগত্য যদি অন্তরে না আসে, তাহলে শুধু ওই জানাটা কোনো কাজে আসবে না। বরং যে আলিমের ইলম তার কোনো উপকারে আসেনি, কিয়ামতের দিন সে সবচেয়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِن عِلْمٍ لا يَنْفَعُ ، وَمِنْ قَلْبِ لا يَخْشَعُ ، وَمِنْ نَفْسٍ لا تَشْبَعُ ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لَا يُسْتَجَابُ لَها
“হে আল্লাহ! অনোপকারী ইলম, অতৃপ্ত মন, অগ্রহণযোগ্য দুআ ও অবিনয়ী অন্তর থেকে আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই।”[২]
'কিন্তু জাহমিয়্যা সম্প্রদায় বলে, ঈমান শুধু অন্তরে সত্য বলে জানার নাম; শরিয়ত কাউকে কাফির বলে থাকলে সেটাও এই কারণে যে, ঈমানের ব্যাপারগুলোতে তার অন্তর অজ্ঞ। তাদের এই কথা তো আকল ও শরিয়া-উভয় বিবেচনায় চূড়ান্ত মূর্খতা বৈ কিছু নয়; কারণ, এ কথা মেনে নিলে মুমিন-কাফির সবাই সমান হয়ে যাবে। এজন্যই ওয়াকি' ইবনুল জাররাহ ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলসহ অনেক ইমাম জাহমিয়্যাদেরকে কাফির বলে ঘোষণা করেছেন। কারণ, দেখা যায়-একটা লোক সত্য জানার পরেও অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকায় সেটাকে অপছন্দ করে। এমনিভাবে অহংকার বশত সত্য-অস্বীকারকারী সবাই কিন্তু সেসম্পর্কে অজ্ঞ নয়। বোঝা গেল, ঈমানের বিষয়টি অন্তরে শুধু জানলেই হবে না, সেই অনুসারে অন্তরের আমলও লাগবে। সালাফের অনেকে এটা বোঝানোর জন্যই বলেছেন- “ঈমান হলো ইলম ও আমলের সমষ্টি।”
'এরপর, অন্তর যখন ঈমানের বিষয় সত্য বলে জেনে সেই অনুপাতে আমলও করবে; অর্থাৎ সে বিষয়ের প্রতি পূর্ণ মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ করবে, যার ফলে বাহ্যিক কর্মেরও পূর্ণ ইচ্ছা তৈরি হয়ে যাবে, তখন ব্যক্তির মধ্যে বাহ্যিক আমলগুলোও বিদ্যমান হওয়া আবশ্যক। কারণ, দৃঢ় ইচ্ছার সঙ্গে পূর্ণ শক্তি যুক্ত হলে, উদ্দিষ্ট বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই বাস্তবায়িত হবে। শক্তি বা ইচ্ছার কমতি থাকলেই উদ্দিষ্ট বিষয়টি বাস্তবায়িত হয় না; কিন্তু ইচ্ছাধীন বিষয়ে দৃঢ় ইচ্ছা ও পূর্ণ শক্তি থাকলে উদ্দিষ্ট বিষয়টি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।'
'এখন, অন্তর যখন পূর্ণরূপে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে এবং তাঁকে পুরোপুরি ভালোবাসবে, তখন যথেষ্ট শক্তি থাকা সত্ত্বেও মুখে সে শাহাদাতাইন (কালিমায়ে তয়্যিবাহ ও শাহাদাহ) উচ্চারণ করতে না পারাটা অযৌক্তিক ও অবাস্তব। তবে শক্তি না থাকলে ভিন্ন কথা। যেমন-বোবা হওয়ায় উচ্চারণে অক্ষম, বা ভয়ে উচ্চারণ করতে পারছে না।'
'আবার দেখুন, আবু তালিব তো জানতেন মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তিনি নবীজিকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর ভালোবাসাটা ছিল ভাতিজার প্রতি আত্মীয়তার কারণে; আল্লাহর জন্য ছিল না। তিনি নবীজির উত্থানকে ভালোবেসেছেন, কারণ, এতে তাঁর মর্যাদা ও নেতৃত্ব নিহিত ছিল। ফলে, তাঁর ভালোবাসাটা মূলত নেতৃত্বের প্রতি। মৃত্যুর সময় তাঁকে শাহাদাতাইন পড়তে বলা হলে তিনি অস্বীকার করেন। কারণ, এতে তাঁর এতদিনের ভালোবাসার ধর্ম মুছে যাবে। এর মানে হলো, ওই কুফরি ধর্ম তাঁর কাছে ভাতিজার চেয়েও বেশি ভালোবাসার। যে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى . الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ . وَمَا لِأَحَدٍ عِندَهُ مِن نِعْمَةٍ تُجْزَى . إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَى ، وَلَسَوْفَ يَرْضَى
"আমি সবচেয়ে খোদাভীরুকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখব; যে আত্মশুদ্ধির জন্য দান করে নিজের সম্পদ; এবং তার কাছে কারও প্রতিদানযোগ্য কোনো অনুগ্রহ নেই-তার পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ ব্যতীত। অতি শিগগির সে পরিতুষ্ট হবে।”[১]
'সেই আবু বকর যেমন ভালোবেসেছেন নবীজিকে, উমর, উসমান, আলি সহ অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং সব মুমিন যেমন শুধু আল্লাহর রাসূল হওয়ার কারণে নবীজিকে ভালোবেসেছেন, আবু তালিবও তাঁকে অমন করে শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে অবশ্যই শাহাদাতাইনের উচ্চারণ তাঁর নসিবে জুটত।'
'সারকথা হলো, আবু তালিব নবীজিকে আল্লাহর “জন্য” ভালোবাসেননি, আল্লাহর “সঙ্গে” ভালোবেসেছিলেন, তাই নবীজিকে তাঁর সাহায্য সহযোগিতা ও শক্তি যোগানো—কিছুই কবুল করেননি আল্লাহ। কারণ, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন যা তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়; তাঁর সন্তুষ্টি বিনে অন্য কিছু উদ্দেশ্য হলে সেই আমল তিনি কবুল করেন না।'
'বোঝা গেল, ঈমান ও তাওহিদের ক্ষেত্রে অন্তরের আমলও জরুরি। যেমন, অন্তরে ভালোবাসা পোষণ করা। তেমনিভাবে দ্বীনকে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করতে হবে। আর আমল ব্যতীত দ্বীন হয় না; কারণ, ইবাদত ও আনুগত্য দ্বীনের অংশ।'
'আল্লাহ তাআলা ইখলাস সম্পর্কে দুটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন; কাফিরুন ও ইখলাস। এর মধ্যে একটিতে আলোচনা করা হয়েছে কথা ও ইলমের তাওহিদ নিয়ে; অপরটির আলোচনা আমল ও ইচ্ছার তাওহিদ নিয়ে।'
'সূরা ইখলাসে তিনি বলছেন— قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ . اللَّهُ الصَّمَدُ . لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدُ . وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বলুন, তিনিই এক আল্লাহ; আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; তিনি (কাউকে) জন্ম দেননি এবং (কারও থেকে) জন্ম নেনও নি; তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।”[২]
'এখানে তাওহিদকে বলতে আদেশ করা হয়েছে।
অপরটিতে বলেছেন-
قُلْ يَأَيُّهَا الْكَافِرُونَ . لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ . وَلَا أَنتُمْ عَبدُونَ مَا أَعْبُدُ ، وَلَا أَنَا عَابِدُ مَّا عَبَدتُّمْ . وَلَا أَنتُمْ عَبدُونَ مَا أَعْبُدُ . لَكُمْ دِينَكُمْ وَلِيَ دِينِ
"বলুন, হে কাফিররা, তোমরা যার পূজা করো, আমি তার পূজা করি না; আবার, আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও; তোমরা যার পূজা করো, আমি তার পূজক নই; আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও; আমার ও তোমাদের দ্বীন আলাদা।"[১]
'এখানে আল্লাহ তাআলা নবীজিকে গাইরুল্লাহর ইবাদত থেকে সম্পর্কহীনতা ও আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে খালেস করার ঘোষণা দিতে আদেশ করছেন।'
টিকাঃ
[১] সূরা নামল, আয়াত-ক্রম: ১৪
[২] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ১০২
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৪৬
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২২১।
[১] সূরা লাইল; আয়াত-ক্রম: ১৭-২১
[২] সূরা ইখলাস, আয়াত-ক্রম: ১-৪
[১] সূরা কাফিরুন, আয়াত: ১-৬