📄 শিরককারীর জন্য তার শিরকটা ভয়ের কারণ
আমি বললাম, 'মুহতারাম! এতক্ষণ আপনার যে আলোচনা শুনলাম, এতে করে, শিরক যে একটা ব্যর্থতা, ভীতি ও অবিচার; এবং শিরককারী লোকটা যে নিজেই নিজের ওপর অবিচারী; সে তার সব স্বপ্ন-আশায় ব্যর্থ; আর, মুসলিম হয়ে থাকলে, সে তার শত্রুর ভয়ে ভীত—এ কথা কি আমরা বলতে পারি না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ! এ কথা আমরা অবশ্যই বলতে পারি; এবং তা সঠিকও। কারণ, শিরককারী লোকটার আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হলো মাখলুক; ফলে, এদের একটা প্রভাব তার ভেতরে সৃষ্টি হয়; এবং সে এদেরকে ভয় করে।'
'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
سَنُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَا أَشْرَكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سلطنا
"আল্লাহ যে জিনিসের পক্ষে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, সে জিনিসকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করার কারণে, আমি (আল্লাহ) কাফিরদের অন্তরে শিগগির ভীতি প্রক্ষেপণ করব।””[২]
'পক্ষান্তরে যে বান্দা শিরকমুক্ত সে পায় নিরাপত্তা। এমনটিই এসেছে কুরআনে—
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَنَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
"যারা ঈমান গ্রহণের পর একে জুলুমের কালিতে কলুষিত করেনি; তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা; আর তারাই সুপথপ্রাপ্ত।”[১]
'এ আয়াতে বিবৃত "জুলুম” শব্দটাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করেছেন "শিরক” বলে। সাহাবী ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে সহিহ হাদিসে এসেছে-
لَمَّا نَزَلَتْ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّنَا لَا يَظْلِمُ نَفْسَهُ قَالَ لَيْسَ كَمَا تَقُوْلُوْنَ لَمْ يَلْبِسُوا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ بِشَرْكٍ أَوَلَمْ تَسْمَعُوْا إِلَى قَوْلِ لُقْمَانَ لِابْنِهِ يُيُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, "যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো- 'যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি-(সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৮২)' তখন (আমাদের জন্য তা কঠিন হয়ে দাঁড়াবার কারণে) আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে নিজের ওপর জুলুম করেনি!' নবীজি বললেন, 'তোমরা যা ভাবছ, তা নয়; আরে, এটা (সাধারণ কোনো জুলুম নয়; বরং এটা) হলো শিরক; তোমরা কি লুকমান (আলাইহিস সালাম)-এর সেই কথাটি শোনোনি? তিনি স্বীয় পুত্রকে লক্ষ্য করে বলেছেন, 'বেটা! আল্লাহর সঙ্গে শিরক কোরো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো মহাজুলুম!”[২]
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ۖ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ. إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُواْ وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ. وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَتَتَبَرأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا ۗ كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَلَهُمْ حَسَرَتٍ عَلَيْهِمْ وَمَا هُم بِخْرِجِينَ مِنَ النَّارِ
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, এবং সেগুলোকে তেমন ভালোবাসে, যেমন ভালোবাসতে হয় আল্লাহকে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর। হায়, এ জালিমগণ (দুনিয়ায়) যখন কোন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে তখনই যদি এটা বুঝত যে, সমস্ত শক্তি আল্লাহরই এবং আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। স্মরণ করো সে সময় যখন যাদেরকে অনুসরণ করা হয়েছে, তারা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা অনুসরণ করেছে তারা বলবে, 'যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে।' এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। তারা কিন্তু জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।”[১]
'অন্যত্র বলেন-
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ - فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا. أُوْلَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا
“বলুন, আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা ইলাহ মনে করো, ডাকো না তাদের! (আরে), তারা তো তোমাদের কষ্ট দূর করা বা এটা পরিবর্তন করার ক্ষমতাও রাখে না। (আসলে) এরা যাদেরকে (ইলাহ মনে করে) ডাকে, তারাও তো রবের নিকটে মধ্যস্থতাকারী তালাশ করে, যে, নিজেদের মধ্যে কে বেশি রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত; তারা তো রবের রহম প্রত্যাশা করে, আর ভয় করে তাঁর আযাব; নিশ্চয়ই আপনার রবের আযাব ভয়াবহ।”[২]
'মোটকথা, আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উপকরণ ও মাধ্যমের কথা উল্লেখ করে, সেগুলোর ওপর ভরসা করতে নিষেধ করেন; এবং সবকিছু শুধু তাঁর নিকটেই আশা করতে বলেন।'
'আল্লাহ যখন ফেরেশতা অবতীর্ণ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন—
وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَىٰ لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُم بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
“আল্লাহ তাকে তোমাদের জন্য কেবলই সুসংবাদ বানিয়েছেন; যেন তার মাধ্যমে তোমাদের অন্তর স্থির-প্রশান্ত হয়; আর সাহায্য তো হয় শুধু পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান আল্লাহর তরফ থেকেই।”[১]
'অন্যত্র বলেন—
إِن يَنصُرُكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِن يَخْذُلْكُمْ فَمَن ذَا الَّذِي يَنصُرُكُم مِّنْ بَعْدِهِ وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
"আল্লাহ সাহায্য করলে, কেউ তোমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না; কিন্তু তিনি লাঞ্ছিত করলে, তাঁর মুকাবেলায় কে এমন আছে যে তোমাদের সাহায্য করবে! তাই মুমিনরা যেন আল্লাহর ওপরই ভরসা করে।”[২]
টিকাঃ
[২] সূরা আলি ইমরান; আয়াত-ক্রম: ১৫১
[১] সূরা আনআম; আয়াত-ক্রম: ৮২
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৩০
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫-১৬৭
[২] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৫৬-৫৭
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১২৬
[২] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৬০
আমি বললাম, 'মুহতারাম! এতক্ষণ আপনার যে আলোচনা শুনলাম, এতে করে, শিরক যে একটা ব্যর্থতা, ভীতি ও অবিচার; এবং শিরককারী লোকটা যে নিজেই নিজের ওপর অবিচারী; সে তার সব স্বপ্ন-আশায় ব্যর্থ; আর, মুসলিম হয়ে থাকলে, সে তার শত্রুর ভয়ে ভীত—এ কথা কি আমরা বলতে পারি না?'
শাইখ বললেন, 'বন্ধুগণ! এ কথা আমরা অবশ্যই বলতে পারি; এবং তা সঠিকও। কারণ, শিরককারী লোকটার আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হলো মাখলুক; ফলে, এদের একটা প্রভাব তার ভেতরে সৃষ্টি হয়; এবং সে এদেরকে ভয় করে।'
'আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
سَنُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ بِمَا أَشْرَكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سلطنا
"আল্লাহ যে জিনিসের পক্ষে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, সে জিনিসকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করার কারণে, আমি (আল্লাহ) কাফিরদের অন্তরে শিগগির ভীতি প্রক্ষেপণ করব।””[২]
'পক্ষান্তরে যে বান্দা শিরকমুক্ত সে পায় নিরাপত্তা। এমনটিই এসেছে কুরআনে—
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَنَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
"যারা ঈমান গ্রহণের পর একে জুলুমের কালিতে কলুষিত করেনি; তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা; আর তারাই সুপথপ্রাপ্ত।”[১]
'এ আয়াতে বিবৃত "জুলুম” শব্দটাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাখ্যা করেছেন "শিরক” বলে। সাহাবী ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে সহিহ হাদিসে এসেছে-
لَمَّا نَزَلَتْ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّنَا لَا يَظْلِمُ نَفْسَهُ قَالَ لَيْسَ كَمَا تَقُوْلُوْنَ لَمْ يَلْبِسُوا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ بِشَرْكٍ أَوَلَمْ تَسْمَعُوْا إِلَى قَوْلِ لُقْمَانَ لِابْنِهِ يُيُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, "যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলো- 'যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি-(সুরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৮২)' তখন (আমাদের জন্য তা কঠিন হয়ে দাঁড়াবার কারণে) আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে নিজের ওপর জুলুম করেনি!' নবীজি বললেন, 'তোমরা যা ভাবছ, তা নয়; আরে, এটা (সাধারণ কোনো জুলুম নয়; বরং এটা) হলো শিরক; তোমরা কি লুকমান (আলাইহিস সালাম)-এর সেই কথাটি শোনোনি? তিনি স্বীয় পুত্রকে লক্ষ্য করে বলেছেন, 'বেটা! আল্লাহর সঙ্গে শিরক কোরো না; নিশ্চয়ই শিরক হলো মহাজুলুম!”[২]
'আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ۖ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ. إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُواْ وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ. وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَتَتَبَرأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا ۗ كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَلَهُمْ حَسَرَتٍ عَلَيْهِمْ وَمَا هُم بِخْرِجِينَ مِنَ النَّارِ
“আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, এবং সেগুলোকে তেমন ভালোবাসে, যেমন ভালোবাসতে হয় আল্লাহকে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর। হায়, এ জালিমগণ (দুনিয়ায়) যখন কোন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে তখনই যদি এটা বুঝত যে, সমস্ত শক্তি আল্লাহরই এবং আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। স্মরণ করো সে সময় যখন যাদেরকে অনুসরণ করা হয়েছে, তারা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা অনুসরণ করেছে তারা বলবে, 'যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হতো, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে।' এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। তারা কিন্তু জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।”[১]
'অন্যত্র বলেন-
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ - فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا. أُوْلَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا
“বলুন, আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা ইলাহ মনে করো, ডাকো না তাদের! (আরে), তারা তো তোমাদের কষ্ট দূর করা বা এটা পরিবর্তন করার ক্ষমতাও রাখে না। (আসলে) এরা যাদেরকে (ইলাহ মনে করে) ডাকে, তারাও তো রবের নিকটে মধ্যস্থতাকারী তালাশ করে, যে, নিজেদের মধ্যে কে বেশি রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত; তারা তো রবের রহম প্রত্যাশা করে, আর ভয় করে তাঁর আযাব; নিশ্চয়ই আপনার রবের আযাব ভয়াবহ।”[২]
'মোটকথা, আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উপকরণ ও মাধ্যমের কথা উল্লেখ করে, সেগুলোর ওপর ভরসা করতে নিষেধ করেন; এবং সবকিছু শুধু তাঁর নিকটেই আশা করতে বলেন।'
'আল্লাহ যখন ফেরেশতা অবতীর্ণ করেছিলেন, তখন বলেছিলেন—
وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَىٰ لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُم بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
“আল্লাহ তাকে তোমাদের জন্য কেবলই সুসংবাদ বানিয়েছেন; যেন তার মাধ্যমে তোমাদের অন্তর স্থির-প্রশান্ত হয়; আর সাহায্য তো হয় শুধু পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান আল্লাহর তরফ থেকেই।”[১]
'অন্যত্র বলেন—
إِن يَنصُرُكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِن يَخْذُلْكُمْ فَمَن ذَا الَّذِي يَنصُرُكُم مِّنْ بَعْدِهِ وَ عَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
"আল্লাহ সাহায্য করলে, কেউ তোমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না; কিন্তু তিনি লাঞ্ছিত করলে, তাঁর মুকাবেলায় কে এমন আছে যে তোমাদের সাহায্য করবে! তাই মুমিনরা যেন আল্লাহর ওপরই ভরসা করে।”[২]
টিকাঃ
[২] সূরা আলি ইমরান; আয়াত-ক্রম: ১৫১
[১] সূরা আনআম; আয়াত-ক্রম: ৮২
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৩৩০
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫-১৬৭
[২] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৫৬-৫৭
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১২৬
[২] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৬০
📄 আশার উপায়-মাধ্যম
পাঠক! যেহেতু অন্তরের সব স্বপ্ন-আশার মূলে থাকবেন আল্লাহ তাআলা; তাই আমরা নিজেদের মধ্যে এই রকমের স্বপ্ন-আশা কী করে জাগিয়ে তুলব, এর উপায়-মাধ্যমই বা কী—সে সম্পর্কেও শাইখকেই জিজ্ঞেস করা ভালো মনে করছি।
এ ব্যাপারে শাইখকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তিনি জবাব দিলেন, 'অন্তরে আল্লাহ-কেন্দ্রিক স্বপ্ন-আশা জাগিয়ে তোলার মাধ্যম হলো দুআ। দুআ আবার দুই প্রকার; ইবাদত হিসেবে দুআ, কোনো কিছু চাওয়ার হিসেবে দুআ। এই উভয় প্রকার দুআর কোনোটিই কিন্তু গাইরুল্লাহর কাছে করা যাবে না। তাই, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ইলাহ সাব্যস্তকারীর পরিণাম হলো ভর্ৎসনা ও লাঞ্ছনা।'
'আশা ও স্বপ্নপোষা-মানুষ যেহেতু আখেরে কোনো কিছুর প্রার্থী ও অন্বেষীই; এজন্য যেকোনো কিছুর আশা ও প্রার্থনা কেবল আল্লাহর কাছেই করতে হবে; অন্য কারও কাছে নয়।'
'এজন্যই সহিহ হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا أَتَاكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ سَائِلٍ وَلَا مُشْرِفِ فَخُذْهُ ، وَمَا لَا فَلَا تُتْبِعُه نَفْسَكَ
“(আল্লাহ ছাড়া অন্য) কারও কাছে প্রার্থনা ও আকাঙ্ক্ষা ব্যতীতই তোমার কাছে কোনো সম্পদ এলে, সেটা গ্রহণ করতে পারো; অন্যথায় সেটার পেছনে পড়ো না।”[১]
'আকাঙ্ক্ষাকারী তো নিজের মনে মনে আকাঙ্ক্ষা করে; আর প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করে নিজের জবান দিয়ে।'
'বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَصَابَتْنَا فَاقَةٌ فَجِئْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَسْأَلَهُ فَوَجَدْتُهُ يَخْطُبُ النَّاسَ وَهُوَ يَقُوْلُ أَيُّهَا النَّاسُ ، وَاللَّهِ مَهْمَا يَكُنْ عِنْدَنَا مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ نَدَّخِرَهُ عَنْكُمْ ، وَإِنَّهُ مَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّةٌ اللهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرْهُ اللهُ ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدُ عَطَاءً خَيْراً وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ “
"আহার না পাওয়ার কষ্টে একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম কিছু চাইতে। দেখি, তিনি মানুষদেরকে বলছেন, 'হে লোকেরা! আল্লাহর শপথ! আমাদের নিকট কিছু থাকলে সেটা তোমাদেরকে না দিয়ে জমা করে রাখি না; তবে (জেনে রেখো), যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী থাকতে চায়, তাকে আল্লাহ অমুখাপেক্ষীই রাখেন; যে (কারও কাছে চাওয়া থেকে) পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন; যে সবর অবলম্বন করতে চায়, আল্লাহ তাকে সবরের তাওফিক দেন; আর কখনো সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।" [১]
'এখানে অমুখাপেক্ষিতা মানে, কারও কাছে মনে মনে কোনো কিছুর আশা বা কামনা না করা। আর পবিত্র থাকার মানে, জবানে কারও কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকা।'
'ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি জবাবে বলেছিলেন- “তাওয়াক্কুল হলো, মাখলুকের কাছ থেকে আশা ছিন্ন করা; অর্থাৎ, কেউ তোমাকে কোনো কিছু দেবে-এমন আশা পরিত্যাগ করা।'
'লোকেরা বলল, “এটার দলিল কী?” তিনি বললেন, "জিবরিল আ. যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে কিনা? তখন ইবরাহিম আ. বলেছিলেন, আপনার কাছে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।""
'এ-জাতীয় উদাহরণ থেকে এটাই বোঝা যায় যে, বান্দা নিজের ভালো কামনা করলে, কিংবা মন্দ থেকে বাঁচতে চাইলে আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে; অন্য কারও দিকে নয়। এজন্যই বিপদগ্রস্ত নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর দুআয় বলেছেন-“(হে আল্লাহ) আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।””
'বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বিবৃত হয়েছে, তিনি বলেন, বিপদের সময় নবীজি পড়তেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ العظيم ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
"মহামহিম ও ধৈর্যশীল আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই; মহান আরশের অধিপতি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আসমানসমূহ ও জমিনের রব, মর্যাদাপূর্ণ আরশের রব আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই।"[১]
'নবীজি এই শব্দ-বাক্যগুলো উচ্চারণ করতেন। কারণ, এগুলোতে তাওহিদের মূলরূপ ফুটে ওঠে; বান্দার পক্ষ থেকে নিজের প্রতিপালককে ইলাহরূপে মেনে নেওয়া হয়; এবং ওই একক ও অদ্বিতীয় সত্তার নিকটেই যে বান্দার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা সে কথা স্পষ্ট হয়। ফলে, এগুলো সংবাদ-মূলক বাক্য হলেও এতে প্রশংসিত ওই সুমহান সত্তার নিকটে বান্দার প্রার্থনাও উহ্য থাকে।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৪৫; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে。
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৬৯; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৫৩; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩৪৬; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৩০
পাঠক! যেহেতু অন্তরের সব স্বপ্ন-আশার মূলে থাকবেন আল্লাহ তাআলা; তাই আমরা নিজেদের মধ্যে এই রকমের স্বপ্ন-আশা কী করে জাগিয়ে তুলব, এর উপায়-মাধ্যমই বা কী—সে সম্পর্কেও শাইখকেই জিজ্ঞেস করা ভালো মনে করছি।
এ ব্যাপারে শাইখকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তিনি জবাব দিলেন, 'অন্তরে আল্লাহ-কেন্দ্রিক স্বপ্ন-আশা জাগিয়ে তোলার মাধ্যম হলো দুআ। দুআ আবার দুই প্রকার; ইবাদত হিসেবে দুআ, কোনো কিছু চাওয়ার হিসেবে দুআ। এই উভয় প্রকার দুআর কোনোটিই কিন্তু গাইরুল্লাহর কাছে করা যাবে না। তাই, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ইলাহ সাব্যস্তকারীর পরিণাম হলো ভর্ৎসনা ও লাঞ্ছনা।'
'আশা ও স্বপ্নপোষা-মানুষ যেহেতু আখেরে কোনো কিছুর প্রার্থী ও অন্বেষীই; এজন্য যেকোনো কিছুর আশা ও প্রার্থনা কেবল আল্লাহর কাছেই করতে হবে; অন্য কারও কাছে নয়।'
'এজন্যই সহিহ হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا أَتَاكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ سَائِلٍ وَلَا مُشْرِفِ فَخُذْهُ ، وَمَا لَا فَلَا تُتْبِعُه نَفْسَكَ
“(আল্লাহ ছাড়া অন্য) কারও কাছে প্রার্থনা ও আকাঙ্ক্ষা ব্যতীতই তোমার কাছে কোনো সম্পদ এলে, সেটা গ্রহণ করতে পারো; অন্যথায় সেটার পেছনে পড়ো না।”[১]
'আকাঙ্ক্ষাকারী তো নিজের মনে মনে আকাঙ্ক্ষা করে; আর প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করে নিজের জবান দিয়ে।'
'বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَصَابَتْنَا فَاقَةٌ فَجِئْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَسْأَلَهُ فَوَجَدْتُهُ يَخْطُبُ النَّاسَ وَهُوَ يَقُوْلُ أَيُّهَا النَّاسُ ، وَاللَّهِ مَهْمَا يَكُنْ عِنْدَنَا مِنْ خَيْرٍ فَلَنْ نَدَّخِرَهُ عَنْكُمْ ، وَإِنَّهُ مَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ ، وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّةٌ اللهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرْهُ اللهُ ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدُ عَطَاءً خَيْراً وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ “
"আহার না পাওয়ার কষ্টে একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম কিছু চাইতে। দেখি, তিনি মানুষদেরকে বলছেন, 'হে লোকেরা! আল্লাহর শপথ! আমাদের নিকট কিছু থাকলে সেটা তোমাদেরকে না দিয়ে জমা করে রাখি না; তবে (জেনে রেখো), যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী থাকতে চায়, তাকে আল্লাহ অমুখাপেক্ষীই রাখেন; যে (কারও কাছে চাওয়া থেকে) পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন; যে সবর অবলম্বন করতে চায়, আল্লাহ তাকে সবরের তাওফিক দেন; আর কখনো সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।" [১]
'এখানে অমুখাপেক্ষিতা মানে, কারও কাছে মনে মনে কোনো কিছুর আশা বা কামনা না করা। আর পবিত্র থাকার মানে, জবানে কারও কাছে কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকা।'
'ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি জবাবে বলেছিলেন- “তাওয়াক্কুল হলো, মাখলুকের কাছ থেকে আশা ছিন্ন করা; অর্থাৎ, কেউ তোমাকে কোনো কিছু দেবে-এমন আশা পরিত্যাগ করা।'
'লোকেরা বলল, “এটার দলিল কী?” তিনি বললেন, "জিবরিল আ. যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে কিনা? তখন ইবরাহিম আ. বলেছিলেন, আপনার কাছে কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।""
'এ-জাতীয় উদাহরণ থেকে এটাই বোঝা যায় যে, বান্দা নিজের ভালো কামনা করলে, কিংবা মন্দ থেকে বাঁচতে চাইলে আল্লাহর দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে; অন্য কারও দিকে নয়। এজন্যই বিপদগ্রস্ত নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর দুআয় বলেছেন-“(হে আল্লাহ) আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।””
'বুখারি ও মুসলিম শরিফে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বিবৃত হয়েছে, তিনি বলেন, বিপদের সময় নবীজি পড়তেন-
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ العظيم ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
"মহামহিম ও ধৈর্যশীল আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই; মহান আরশের অধিপতি আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আসমানসমূহ ও জমিনের রব, মর্যাদাপূর্ণ আরশের রব আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই।"[১]
'নবীজি এই শব্দ-বাক্যগুলো উচ্চারণ করতেন। কারণ, এগুলোতে তাওহিদের মূলরূপ ফুটে ওঠে; বান্দার পক্ষ থেকে নিজের প্রতিপালককে ইলাহরূপে মেনে নেওয়া হয়; এবং ওই একক ও অদ্বিতীয় সত্তার নিকটেই যে বান্দার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা সে কথা স্পষ্ট হয়। ফলে, এগুলো সংবাদ-মূলক বাক্য হলেও এতে প্রশংসিত ওই সুমহান সত্তার নিকটে বান্দার প্রার্থনাও উহ্য থাকে।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৪৫; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে。
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৬৯; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৫৩; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩৪৬; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৩০
📄 কালিমায়ে তাওহিদের মর্ম অনুধাবন : মানুষের শ্রেণিভেদ
আমি বললাম, 'শাইখের অনুমতি নিয়ে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই— মহাপবিত্র কালিমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"র মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে সব মানুষ কি সম স্তরের? বিষয়টি একটু খোলাসা করে বয়ান করবেন—আশা করছি।'
শাইখ বললেন, 'যদিও সব মানুষই মুখে মুখে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে; কিন্তু খালেস মনে বান্দা যখন এই কালিমা উচ্চারণ করে; তখন এর মর্মটাও হয় অন্যদের চেয়ে আলাদা; অন্যরকম। আসলে তাওহিদের বাস্তবায়ন বা অর্জন অনুপাতেই ইবাদতে পূর্ণতা আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَونَهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا، أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَمِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
“যে নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে, আপনি কি তাকে দেখেছেন? নাকি তার জিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন, যে, তাদের অধিকাংশজন শোনে বা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুরই মতো; বরং সেগুলোর চেয়েও ভ্রষ্ট।”[২]
'যে ব্যক্তি মনের চাহিদার পূজা করে, সে-ই মূলত নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করে। এই অবস্থাটাই হলো মুশরিকদের; কোনো কিছু ভালো লাগলেই তারা সেটার পূজা করতে শুরু করে। ফলে, তারা আল্লাহর বহু সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ফেলে এবং আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে সেগুলোকে ভালোবাসে।'
'এ কারণেই ইবরাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বলেছেন,
لَا أُحِبُّ الْأَفِلِينَ | “আমি অস্ত যাওয়া কাউকে পছন্দ করি না।”[১]
'কারণ, তাঁর সম্প্রদায় স্রষ্টাকে অস্বীকার করত না; কিন্তু সূর্য, চন্দ্র, তারকা, নক্ষত্র-এসবের যাকে ভালো লাগত, তাকেই উপকারী মনে করে তার পূজা করতে থাকত। তাই তিনি এটা স্পষ্ট করে দিলেন যে, অস্ত যাওয়া বস্তুটি ও তার পূজকের মাঝে তো বহু আড়াল সৃষ্টি হয়ে যায়, ফলে সেই বস্তুটা তার পূজককে দেখতে পায়; পূজকের কথা শোনে না; তার অবস্থা জানে না; তাকে কোনো মাধ্যমে বা মাধ্যম ছাড়া ক্ষতি, উপকার-কিছুই করতে পারে না; সুতরাং এমন অথর্বের পূজা বা ইবাদতের কী অর্থ!'
টিকাঃ
[২] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৪৩-৪৪
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৭৬
আমি বললাম, 'শাইখের অনুমতি নিয়ে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই— মহাপবিত্র কালিমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"র মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে সব মানুষ কি সম স্তরের? বিষয়টি একটু খোলাসা করে বয়ান করবেন—আশা করছি।'
শাইখ বললেন, 'যদিও সব মানুষই মুখে মুখে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে; কিন্তু খালেস মনে বান্দা যখন এই কালিমা উচ্চারণ করে; তখন এর মর্মটাও হয় অন্যদের চেয়ে আলাদা; অন্যরকম। আসলে তাওহিদের বাস্তবায়ন বা অর্জন অনুপাতেই ইবাদতে পূর্ণতা আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَونَهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا، أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَمِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
“যে নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে, আপনি কি তাকে দেখেছেন? নাকি তার জিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন, যে, তাদের অধিকাংশজন শোনে বা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুরই মতো; বরং সেগুলোর চেয়েও ভ্রষ্ট।”[২]
'যে ব্যক্তি মনের চাহিদার পূজা করে, সে-ই মূলত নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করে। এই অবস্থাটাই হলো মুশরিকদের; কোনো কিছু ভালো লাগলেই তারা সেটার পূজা করতে শুরু করে। ফলে, তারা আল্লাহর বহু সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ফেলে এবং আল্লাহকে ভালোবাসার মতো করে সেগুলোকে ভালোবাসে।'
'এ কারণেই ইবরাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালাম বলেছেন,
لَا أُحِبُّ الْأَفِلِينَ | “আমি অস্ত যাওয়া কাউকে পছন্দ করি না।”[১]
'কারণ, তাঁর সম্প্রদায় স্রষ্টাকে অস্বীকার করত না; কিন্তু সূর্য, চন্দ্র, তারকা, নক্ষত্র-এসবের যাকে ভালো লাগত, তাকেই উপকারী মনে করে তার পূজা করতে থাকত। তাই তিনি এটা স্পষ্ট করে দিলেন যে, অস্ত যাওয়া বস্তুটি ও তার পূজকের মাঝে তো বহু আড়াল সৃষ্টি হয়ে যায়, ফলে সেই বস্তুটা তার পূজককে দেখতে পায়; পূজকের কথা শোনে না; তার অবস্থা জানে না; তাকে কোনো মাধ্যমে বা মাধ্যম ছাড়া ক্ষতি, উপকার-কিছুই করতে পারে না; সুতরাং এমন অথর্বের পূজা বা ইবাদতের কী অর্থ!'
টিকাঃ
[২] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৪৩-৪৪
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৭৬
📄 ইখলাস : জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায়
শাইখের সময়ে, তাঁর সময়ের আগে-পরে এবং আমাদের সময়েও যেহেতু আমরা এটা দেখি যে, বহুসংখ্যক মানুষ প্রবৃত্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে এর মধ্যেই ডুবে থাকে; তাই, এটাই ভালো, বরং জরুরি ছিল যে, শাইখ আমাদেরকে বলে দেবেন-কী করে মানুষের অন্তর থেকে সেই খারাপ প্রবৃত্তির প্রভাব দূর করা যাবে; যেন মানুষের মানস-জগতটি পুরোপুরি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত হয়ে যায়। এজন্যই শাইখ বলেছেন, 'শুনুন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার সময় বান্দার মনে ইখলাস থাকলে তার অন্তর থেকে প্রবৃত্তিপূজা দূর হয়ে যায় এবং সবরকম পাপ ও নাফরমানি তার কাছ থাকে রুদ্ধ হয়ে যায়। যেমনটি বলেছেন আল্লাহ তাআলা-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءُ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ | “এভাবেই তার থেকে আমি দূরে রেখেছি সব রকম পাপ ও অশ্লীলতা; সে তো আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের একজন।"[১]
'এখানে ইউসুফ আলাইহিস সালাম থেকে পাপকর্ম ও অশ্লীলতা দূরে রাখার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, তিনি আল্লাহ তাআলার নিষ্ঠাবান বান্দা ছিলেন। এই খালেস বান্দাদের ব্যাপারেই বলা হয়েছে-
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَنٌ "তাদের ওপর (হে শয়তান) তোর কোনো প্রভাব থাকবে না।” [২]
'শয়তান বলেছিল-
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ . إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ "আপনার মর্যাদার কসম! আমি তাদের (তথা বনি আদমের) সবাইকে পথভ্রষ্ট করব; কেবল আপনার নিষ্ঠাবান বান্দাগণ ছাড়া।””[৩]
'সহিহ হাদিসে তো এসেছেই-
مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُخْلِصًا مِنْ قَلْبِهِ حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ "মনে ইখলাস নিয়ে যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন।”” [৪]
'কারণ, জাহান্নামে প্রবেশের সব উপকরণ তো শেষ করে দেয় ইখলাস। তাই, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়েছে এমন কেউ জাহান্নামে গেলে বোঝা যাবে তার অন্তরে পূর্ণ ইখলাস বা নিষ্ঠা ছিল না; কোনো একরকম শিরক তার মনে রয়েই গিয়েছিল; সেজন্যই সে এমন কিছুতে জড়িয়ে পড়েছে, যা তাকে জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে।'
'আর শিরক মানুষের জন্য পিঁপড়ের যে চলার গতি, তারচেয়েও সূক্ষ্ম; তাই প্রত্যেক নামাজে পড়তে বলা হয়েছে-“إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ” অর্থাৎ, আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই। [১]
'আবার, শয়তান বলে শিরক করতে; মনও তার কথা শোনে। ফলে, মন সারাক্ষণ গাইরুল্লাহমুখী হয়ে থাকে-হয়তো ভয়ে, নয়তো আশায়। তাই, সবসময়েই বান্দাকে তার মন সাফ রাখতে হয় শিরকের কলুষতা থেকে। ইবনু আবি আসিম ও অন্য অনেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবীজি বলেছেন-
فَإِنَّ إِبْلِيسَ قَالَ أَهْلَكْتُ النَّاسَ بِالذُّنُوبِ وَأَهْلَكُونِي بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَالْإِسْتِغْفَارِ فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ أَهْلَكْتُهُمْ بِالْأَهْوَاءِ فَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ
"শয়তান বলে, আমি মানুষকে ধ্বংস করি গুনাহর মাধ্যমে; আর, তারা আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও ইস্তেগফার (তথা ক্ষমা প্রার্থনা) দিয়ে। তো, যখনই আমি তাদেরকে ওটা করতে দেখি, তখনই তাদেরকে বিভিন্ন খায়েশপূর্ণ কাজে লিপ্ত করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাই; ফলে, তারা (গুনাহ তো করতে থাকে; কিন্তু ইস্তেগফার করে না) নিজেদেরকে সুপথপ্রাপ্ত বলেই মনে করতে থাকে।” [২]
'এজন্য আল্লাহর হিদায়াত ও দিকনির্দেশের তোয়াক্কা না করে যে ব্যক্তি মনখুশি- মতো চলে, সেও একভাবে প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে। আর এই গ্রহণ করাটাও শিরক; এ শিরকই তাকে ইসতেগফার থেকে আটকে রাখে। পক্ষান্তরে, যার মধ্যে সত্যিকার তাওহিদ ও ইস্তেগফার থাকবে, সে অবশ্যই বেঁচে যাবে সবরকম অনিষ্ট থেকে। (চাই সেটা যেমন অনিষ্টই হোক না কেন। আর, বলাই বাহুল্য, যে, শিরকের চেয়ে বড় কোনো অনিষ্ট নেই)। তাই তো নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-
فَنَادَى فِي الظُّلُمَتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
“(হে রব) আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি-আমিই তো আসলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।” [৩]
'কুরআনে এজন্যই বহু জায়গায় তাওহিদ ও ইস্তেগফারের কথা একত্রে আনা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَأَعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ
"জেনে রেখো-আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; নিজের ও মুমিন নর-নারীদের গুনাহর জন্য ইস্তেগফার করো।" [১]
'অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ ٢ وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ
"তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদত কোরো না; আমি তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্য ভীতিপ্রদর্শক ও সুসংবাদবাহী; তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করে রবের নিকট ফিরে আসো।”” [২]
'অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَقَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ إِنْ أَنتُمْ إِلَّا مُفْتَرُونَ. يَقَوْمِ لَا أَسْلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُونَ
"আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে প্রেরণ করেছি। তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত করো; আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো ইলাহ নেই; তোমরা তো কেবলই মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। হে আমার সম্প্রদায়! আমি এ-জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না, আমার মজুরি তাঁরই কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; তবু কি তোমরা বুঝবে না? হে আমার সম্প্রদায়! ক্ষমা প্রার্থনা করে তোমরা রবের নিকট ফিরে আসো।”” [৩]
'আরেক জায়গায় এসেছে— فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ | “তাঁর প্রতি বিশ্বাসেই অটল থাকো, আর ক্ষমা প্রার্থনা করো।”[১]
'এমনিভাবে মজলিস বা বৈঠক শেষ করার যেই দুআটি, سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করেই শেষ করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে ফিরে আসছি আপনার কাছেই।) সেটিতেও তাওহিদ ও ইস্তেগফারকে একত্র করা হয়েছে। মজলিসটি ভালো হয়ে থাকলে এই দুআটি সেই ভালো মজলিসের সিল-মোহরস্বরূপ হয়; আর অহেতুক বা অযাচিত কোনো মজলিস হয়ে থাকলে দুআটি তার কাফফারা হয়ে যায়।[২] বর্ণিত আছে, ওজুর শেষেও এই দুআটি পড়বে। তবে সেসময় এটি পড়ার আগে আরেকটি দুআ পড়বে। সেটি এই[৩]— أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ ، اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
এ পর্যন্ত আলোচনা করে শাইখ তাঁর আগের কথায় ফিরে আসলেন যে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র বাস্তবায়ন বা একে ধারণের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। শাইখ বললেন, 'যদিও সব মুসলিমই এই কালিমা উচ্চারণ করে কিন্তু একে বাস্তবায়ন বা ধারণের বেলায় তাদের পার্থক্য এত অধিক সংখ্যক যে, আমরা তা গুণে শেষ করতে পারব না। এমনকি, এদের অনেকেই তো মনে করে আল্লাহকে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা বলে স্বীকার করলে এবং মেনে নিলেই সম্পন্ন হয়ে যাবে তাওহিদের ফরজ। তারা তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করা (তথা, পালনকর্তার একত্ববাদ) আর তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ'র (তথা, মাবুদ বা ইবাদতযোগ্য সত্তার একত্ববাদ) মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
অথচ আরবের মুশরিকরাও তো তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ স্বীকার করত; কিন্তু নবীজি তাদেরকে আহ্বান করতেন তাওহিদুল উলুহিয়্যাহর প্রতিও। বরং ওই মুসলিমরা মৌখিক ও কর্মগত তাওহিদের মধ্যেও ফারাক করতে পারে না।'
'কারণ, মুশরিকরাও তো এটা বলত না যে, এই জগতের স্রষ্টা দুজন; কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো রব আছে, যেই রব কিছু জিনিস সৃষ্টি করেছে। তাদের কথা তো 'আল্লাহ তাআলাই বিবৃত করেছেন-
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مِّنْ خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ "আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা কে—জিজ্ঞেস করলে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।"[১]
'অন্যত্র বলেন—
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ | “তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে শিরকসহ।”[২]
'আরেক জায়গায় বলেন—
قُل لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَن فِيهَا إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ . قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَوتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ . قُلْ مَنْ بِيَدِهِ - مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ "জেনে থাকলে বলো তো, জমিন ও তাতে যা আছে—এসবের মালিক কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ।' বলুন, তোমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না? বলুন, সাত আসমান ও মহা আরশের রব কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, তবু কি (তাঁকে) ভয় করবে না তোমরা? বলুন, জানলে বলো তো, সবকিছুর কর্তৃত্ব যার হাতে, যিনি রক্ষা করেন, যার হাত থেকে রক্ষা করা যায় না-তিনি কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ।' বলুন, তাহলে জাদুগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছ কোথায়?"[১]
'ওসব মুশরিক স্রষ্টা হিসেবে এক আল্লাহকে মানলেও তাঁর সঙ্গে আরও অনেক ইলাহ সাব্যস্ত করত। মনে করত, সেগুলো তাঁর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। তারা বলত—“এগুলো আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেবে—এই আশায়ই তো আমরা এগুলোর পূজা করি।” ফলে আল্লাহর মতো করেই সেগুলোকে ভালোবাসত। তারা মনে করত মহব্বত, ইবাদত, দুআ ও প্রার্থনায় শিরক করাটা আকিদা-বিশ্বাস ও স্বীকৃতির শিরকের চেয়ে আলাদা। এই বিষয়টিই স্পষ্ট করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ
"কতক মানুষ আল্লাহর কিছু সমকক্ষ সাব্যস্ত করে সেসবকে আল্লাহর মতো ভালোবাসে; কিন্তু মুমিনরা তো সবচেয়ে বেশি আল্লাহকেই ভালোবাসে।” [২]
'তাই, কেউ খালিককে ভালোবাসার মতো করে কোনো মাখলুককে ভালোবাসলে সে শিরক করল এবং আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করল। উভয়কেই সে সমান ভালোবাসে। যদিও স্বীকার করে তার খালিক একমাত্র আল্লাহ।'
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[২] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৪২
[৩] সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৮২-৮৩
[৪] হাদিসের কিতাবাদিতেই স্তর্গের কালো হাদিদা থাকলেও, এটি আমিরী পাইনি।
[১] সূরা ফাতিহা, আয়াত-ক্রম: ০৪
[২] হাদিসটি যঈফ; তাফসিরু ইবনি কাসির ২/১০৫
[৩] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[১] সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত-ক্রম: ১৯
[২] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ২-৩
[৩] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৫০-৫২
[১] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ০৬
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৩৩; মুসনদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১০৪১৫। হাদিসটি সহিহ。
[৩] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৪; হাদিসটির প্রথম অংশ সহিহ। اللهم اجعلني থেকে বাকি অংশটুকু ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেননি। এই অংশটুকু তিরমিযিতে (হাদিস-ক্রম: ৫৫) আসলেও সে সনদে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।
[১] সূরা লুকমান, আয়াত-ক্রম: ২৫
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ১০৬
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্রম : ৮৪-৮৯
[২] সূরা বাকারা; আয়াত-ক্রম: ১৬৫
শাইখের সময়ে, তাঁর সময়ের আগে-পরে এবং আমাদের সময়েও যেহেতু আমরা এটা দেখি যে, বহুসংখ্যক মানুষ প্রবৃত্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে এর মধ্যেই ডুবে থাকে; তাই, এটাই ভালো, বরং জরুরি ছিল যে, শাইখ আমাদেরকে বলে দেবেন-কী করে মানুষের অন্তর থেকে সেই খারাপ প্রবৃত্তির প্রভাব দূর করা যাবে; যেন মানুষের মানস-জগতটি পুরোপুরি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত হয়ে যায়। এজন্যই শাইখ বলেছেন, 'শুনুন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার সময় বান্দার মনে ইখলাস থাকলে তার অন্তর থেকে প্রবৃত্তিপূজা দূর হয়ে যায় এবং সবরকম পাপ ও নাফরমানি তার কাছ থাকে রুদ্ধ হয়ে যায়। যেমনটি বলেছেন আল্লাহ তাআলা-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءُ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ | “এভাবেই তার থেকে আমি দূরে রেখেছি সব রকম পাপ ও অশ্লীলতা; সে তো আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের একজন।"[১]
'এখানে ইউসুফ আলাইহিস সালাম থেকে পাপকর্ম ও অশ্লীলতা দূরে রাখার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, তিনি আল্লাহ তাআলার নিষ্ঠাবান বান্দা ছিলেন। এই খালেস বান্দাদের ব্যাপারেই বলা হয়েছে-
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَنٌ "তাদের ওপর (হে শয়তান) তোর কোনো প্রভাব থাকবে না।” [২]
'শয়তান বলেছিল-
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ . إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ "আপনার মর্যাদার কসম! আমি তাদের (তথা বনি আদমের) সবাইকে পথভ্রষ্ট করব; কেবল আপনার নিষ্ঠাবান বান্দাগণ ছাড়া।””[৩]
'সহিহ হাদিসে তো এসেছেই-
مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُخْلِصًا مِنْ قَلْبِهِ حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ "মনে ইখলাস নিয়ে যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন।”” [৪]
'কারণ, জাহান্নামে প্রবেশের সব উপকরণ তো শেষ করে দেয় ইখলাস। তাই, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়েছে এমন কেউ জাহান্নামে গেলে বোঝা যাবে তার অন্তরে পূর্ণ ইখলাস বা নিষ্ঠা ছিল না; কোনো একরকম শিরক তার মনে রয়েই গিয়েছিল; সেজন্যই সে এমন কিছুতে জড়িয়ে পড়েছে, যা তাকে জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে।'
'আর শিরক মানুষের জন্য পিঁপড়ের যে চলার গতি, তারচেয়েও সূক্ষ্ম; তাই প্রত্যেক নামাজে পড়তে বলা হয়েছে-“إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ” অর্থাৎ, আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই। [১]
'আবার, শয়তান বলে শিরক করতে; মনও তার কথা শোনে। ফলে, মন সারাক্ষণ গাইরুল্লাহমুখী হয়ে থাকে-হয়তো ভয়ে, নয়তো আশায়। তাই, সবসময়েই বান্দাকে তার মন সাফ রাখতে হয় শিরকের কলুষতা থেকে। ইবনু আবি আসিম ও অন্য অনেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবীজি বলেছেন-
فَإِنَّ إِبْلِيسَ قَالَ أَهْلَكْتُ النَّاسَ بِالذُّنُوبِ وَأَهْلَكُونِي بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَالْإِسْتِغْفَارِ فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ أَهْلَكْتُهُمْ بِالْأَهْوَاءِ فَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ
"শয়তান বলে, আমি মানুষকে ধ্বংস করি গুনাহর মাধ্যমে; আর, তারা আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও ইস্তেগফার (তথা ক্ষমা প্রার্থনা) দিয়ে। তো, যখনই আমি তাদেরকে ওটা করতে দেখি, তখনই তাদেরকে বিভিন্ন খায়েশপূর্ণ কাজে লিপ্ত করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাই; ফলে, তারা (গুনাহ তো করতে থাকে; কিন্তু ইস্তেগফার করে না) নিজেদেরকে সুপথপ্রাপ্ত বলেই মনে করতে থাকে।” [২]
'এজন্য আল্লাহর হিদায়াত ও দিকনির্দেশের তোয়াক্কা না করে যে ব্যক্তি মনখুশি- মতো চলে, সেও একভাবে প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে। আর এই গ্রহণ করাটাও শিরক; এ শিরকই তাকে ইসতেগফার থেকে আটকে রাখে। পক্ষান্তরে, যার মধ্যে সত্যিকার তাওহিদ ও ইস্তেগফার থাকবে, সে অবশ্যই বেঁচে যাবে সবরকম অনিষ্ট থেকে। (চাই সেটা যেমন অনিষ্টই হোক না কেন। আর, বলাই বাহুল্য, যে, শিরকের চেয়ে বড় কোনো অনিষ্ট নেই)। তাই তো নবী ইউনুস আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-
فَنَادَى فِي الظُّلُمَتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّلِمِينَ
“(হে রব) আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি-আমিই তো আসলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।” [৩]
'কুরআনে এজন্যই বহু জায়গায় তাওহিদ ও ইস্তেগফারের কথা একত্রে আনা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَأَعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ
"জেনে রেখো-আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; নিজের ও মুমিন নর-নারীদের গুনাহর জন্য ইস্তেগফার করো।" [১]
'অন্যত্র আল্লাহ বলেন-
أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ ٢ وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ
"তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদত কোরো না; আমি তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্য ভীতিপ্রদর্শক ও সুসংবাদবাহী; তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করে রবের নিকট ফিরে আসো।”” [২]
'অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَقَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ إِنْ أَنتُمْ إِلَّا مُفْتَرُونَ. يَقَوْمِ لَا أَسْلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُونَ
"আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে প্রেরণ করেছি। তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত করো; আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো ইলাহ নেই; তোমরা তো কেবলই মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। হে আমার সম্প্রদায়! আমি এ-জন্য তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না, আমার মজুরি তাঁরই কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; তবু কি তোমরা বুঝবে না? হে আমার সম্প্রদায়! ক্ষমা প্রার্থনা করে তোমরা রবের নিকট ফিরে আসো।”” [৩]
'আরেক জায়গায় এসেছে— فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ | “তাঁর প্রতি বিশ্বাসেই অটল থাকো, আর ক্ষমা প্রার্থনা করো।”[১]
'এমনিভাবে মজলিস বা বৈঠক শেষ করার যেই দুআটি, سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করেই শেষ করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে ফিরে আসছি আপনার কাছেই।) সেটিতেও তাওহিদ ও ইস্তেগফারকে একত্র করা হয়েছে। মজলিসটি ভালো হয়ে থাকলে এই দুআটি সেই ভালো মজলিসের সিল-মোহরস্বরূপ হয়; আর অহেতুক বা অযাচিত কোনো মজলিস হয়ে থাকলে দুআটি তার কাফফারা হয়ে যায়।[২] বর্ণিত আছে, ওজুর শেষেও এই দুআটি পড়বে। তবে সেসময় এটি পড়ার আগে আরেকটি দুআ পড়বে। সেটি এই[৩]— أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ ، اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
এ পর্যন্ত আলোচনা করে শাইখ তাঁর আগের কথায় ফিরে আসলেন যে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র বাস্তবায়ন বা একে ধারণের ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। শাইখ বললেন, 'যদিও সব মুসলিমই এই কালিমা উচ্চারণ করে কিন্তু একে বাস্তবায়ন বা ধারণের বেলায় তাদের পার্থক্য এত অধিক সংখ্যক যে, আমরা তা গুণে শেষ করতে পারব না। এমনকি, এদের অনেকেই তো মনে করে আল্লাহকে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা বলে স্বীকার করলে এবং মেনে নিলেই সম্পন্ন হয়ে যাবে তাওহিদের ফরজ। তারা তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করা (তথা, পালনকর্তার একত্ববাদ) আর তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ'র (তথা, মাবুদ বা ইবাদতযোগ্য সত্তার একত্ববাদ) মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
অথচ আরবের মুশরিকরাও তো তাওহিদুর রবুবিয়্যাহ স্বীকার করত; কিন্তু নবীজি তাদেরকে আহ্বান করতেন তাওহিদুল উলুহিয়্যাহর প্রতিও। বরং ওই মুসলিমরা মৌখিক ও কর্মগত তাওহিদের মধ্যেও ফারাক করতে পারে না।'
'কারণ, মুশরিকরাও তো এটা বলত না যে, এই জগতের স্রষ্টা দুজন; কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো রব আছে, যেই রব কিছু জিনিস সৃষ্টি করেছে। তাদের কথা তো 'আল্লাহ তাআলাই বিবৃত করেছেন-
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مِّنْ خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ "আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা কে—জিজ্ঞেস করলে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।"[১]
'অন্যত্র বলেন—
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ | “তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে শিরকসহ।”[২]
'আরেক জায়গায় বলেন—
قُل لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَن فِيهَا إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ . قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَوتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ . قُلْ مَنْ بِيَدِهِ - مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ . سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ "জেনে থাকলে বলো তো, জমিন ও তাতে যা আছে—এসবের মালিক কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ।' বলুন, তোমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না? বলুন, সাত আসমান ও মহা আরশের রব কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, তবু কি (তাঁকে) ভয় করবে না তোমরা? বলুন, জানলে বলো তো, সবকিছুর কর্তৃত্ব যার হাতে, যিনি রক্ষা করেন, যার হাত থেকে রক্ষা করা যায় না-তিনি কে? তারা বলবে, 'আল্লাহ।' বলুন, তাহলে জাদুগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছ কোথায়?"[১]
'ওসব মুশরিক স্রষ্টা হিসেবে এক আল্লাহকে মানলেও তাঁর সঙ্গে আরও অনেক ইলাহ সাব্যস্ত করত। মনে করত, সেগুলো তাঁর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। তারা বলত—“এগুলো আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেবে—এই আশায়ই তো আমরা এগুলোর পূজা করি।” ফলে আল্লাহর মতো করেই সেগুলোকে ভালোবাসত। তারা মনে করত মহব্বত, ইবাদত, দুআ ও প্রার্থনায় শিরক করাটা আকিদা-বিশ্বাস ও স্বীকৃতির শিরকের চেয়ে আলাদা। এই বিষয়টিই স্পষ্ট করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ
"কতক মানুষ আল্লাহর কিছু সমকক্ষ সাব্যস্ত করে সেসবকে আল্লাহর মতো ভালোবাসে; কিন্তু মুমিনরা তো সবচেয়ে বেশি আল্লাহকেই ভালোবাসে।” [২]
'তাই, কেউ খালিককে ভালোবাসার মতো করে কোনো মাখলুককে ভালোবাসলে সে শিরক করল এবং আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করল। উভয়কেই সে সমান ভালোবাসে। যদিও স্বীকার করে তার খালিক একমাত্র আল্লাহ।'
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[২] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৪২
[৩] সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৮২-৮৩
[৪] হাদিসের কিতাবাদিতেই স্তর্গের কালো হাদিদা থাকলেও, এটি আমিরী পাইনি।
[১] সূরা ফাতিহা, আয়াত-ক্রম: ০৪
[২] হাদিসটি যঈফ; তাফসিরু ইবনি কাসির ২/১০৫
[৩] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ৮৭
[১] সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত-ক্রম: ১৯
[২] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ২-৩
[৩] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৫০-৫২
[১] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ০৬
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৪৩৩; মুসনদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১০৪১৫। হাদিসটি সহিহ。
[৩] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৩৪; হাদিসটির প্রথম অংশ সহিহ। اللهم اجعلني থেকে বাকি অংশটুকু ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেননি। এই অংশটুকু তিরমিযিতে (হাদিস-ক্রম: ৫৫) আসলেও সে সনদে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।
[১] সূরা লুকমান, আয়াত-ক্রম: ২৫
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ১০৬
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্রম : ৮৪-৮৯
[২] সূরা বাকারা; আয়াত-ক্রম: ১৬৫