📄 প্রাণবস্তুতা অন্তরকে মন্দ বিষয় থেকে দূরে রাখে
'আসলে তোমাদের নিয়ে যে বিষয়টি আজ আমি বিশেষভাবে আলোচনা করতে চাচ্ছি তা হলো-অন্তর ও অন্যান্য সবকিছুর মধ্যে হায়াত বা প্রাণশক্তি বলতে যে নিছক অনুভূতি ও ঐচ্ছিক-সঞ্চালনা-শক্তি বোঝানো হয়, তা যথার্থ নয়। এমনকি শুধুই ইলম-জ্ঞান ও কুদরত-সক্ষমতা বুঝলেও তা ঠিক হবে না। যেমনটি বিশ্লেষক বা দার্শনিকদের অনেকে বলে থাকেন। তাঁদের একজন আবুল হাসান আল-বাসরি। আমি বরং বলব, হায়াত তথা প্রাণ, প্রাণীর সঙ্গে জুড়ে থাকা এমন এক বৈশিষ্ট্য যা-কিনা ঐচ্ছিক সকল কাজের ক্ষেত্রে ইলম-জ্ঞান, ইরাদা-ইচ্ছা এবং কুদরত-সক্ষমতার শর্ত স্বরূপ। এবং এটি এর জন্য আবশ্যকও। সুতরাং প্রাণী মাত্রই অনুভূতি, ইচ্ছাশক্তি ও স্বেচ্ছায় কোনো কাজ করার সক্ষমতা-সম্পন্ন। তাই যা কিছুর মধ্যে ইরাদা-ইচ্ছা ও ঐচ্ছিক কর্মক্ষমতা পাওয়া যাবে, তাকেই প্রাণী হিসেবে অভিহিত করা হবে।'
'আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, হায়াত তথা প্রাণ থেকেই কিন্তু হায়া তথা লজ্জার উৎপত্তি ঘটেছে। জীবিত অন্তর-সম্পন্ন মানুষের মধ্যে লজ্জা থাকে, যা তাকে যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। কেননা অন্তরের জীবনীশক্তিই মূলত মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বাধা প্রদানকারী, আবার এই মন্দ কাজই একসময় অন্তরকে নষ্ট করে দেয়। এজন্যই তো নবীজি বলেন-
الْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنْ الْإِيمَانِ "লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।" [১]
'অন্য এক হাদিসে আছে, নবীজি বলেন- الحياء والعي شعبتان من الإِيمَان وَالْبذَاءِ وَالْبَيَانِ شعبتان من النِّفَاقِ “লজ্জা এবং বাকসংযম ঈমানের অঙ্গ; আর নির্লজ্জতা ও বাকপটুতা নিফাকের অংশ।””[২]
'হাদিসে এসকল বাণী এজন্যই এসেছে যে, জীবিত সকল প্রাণী নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। অপরদিকে মৃত প্রাণীর ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। এজন্য তাকে অনুভূতিহীন বা লাজহীন বলা হয়। নিতান্তই অনুভূতি ও লজ্জাহীন কোনো মানুষ শুষ্ক গাছের মতো, যাতে সজীবতা বা প্রাণের সঞ্চার নেই। যদি কেউ অনুভূতিশূন্য ও কঠিন অন্তরের অধিকারী হয়, তাহলে তার অন্তরে উল্লিখিত প্রাণশক্তি থাকে না-যা তার মধ্যে লাজ-লজ্জা তৈরি করবে এবং তাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। তার অবস্থা খরাক্রান্ত জমির মতো-যাতে পায়ের ছাপ পর্যন্ত লাগে না। অপরদিকে নরম ভূমিতে পা দেবে যায়। এজন্য প্রাণ-সম্পন্ন কারও মধ্যে মন্দ কাজের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তার মধ্যে মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার একটা ইচ্ছাও জাগ্রত হয়; অথচ যার মধ্যে ভালোমন্দ বোঝার অনুভূতিটুকু নেই এবং যার অন্তরে প্রাণশক্তি নেই, তার মধ্যে লাজ-লজ্জার ব্যাপারও নেই; নেই সেই ঈমানি শক্তিও, যা তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে রাখবে।'
'সুতরাং অন্তরে প্রাণ আছে এমন কোনো মানুষের আত্মা তার দেহত্যাগ করার মাধ্যমে যদি মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার নফসের দেহত্যাগই তার মৃত্যু বোঝাবে; কারণ নফসের হায়াত তথা আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার অর্থ তো তার মৃত্যু ঘটছে না। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَن يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَتُ بَلْ أَحْيَاء "যারা আল্লাহর রাহে মৃত্যুবরণ করেছে, তাঁদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো বরং জীবিত।"[১]
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَتَا بَلْ أَحْيَاءٌ “আল্লাহর পথে যারা জীবন দিল তাদেরকে তোমরা মৃত ধারণা করো না। তারা তো জীবন্ত।”[২]
'অর্থাৎ, এরা সবাই কিন্তু মৃত এবং ওই আয়াতের আওতাভুক্ত যেখানে ইরশাদ হচ্ছে-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ "প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”[৩]
إِنَّكَ مَيِّتْ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ “আপনি ইন্তেকাল করবেন এবং তারা মারা যাবে।”[৪]
وَهُوَ الَّذِي أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ "আর তিনিই ওই সত্তা যিনি তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে মৃত্যু দান করবেন, অতঃপর জীবন দান করবেন।”[১]
'উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে আমরা মৃত্যুর দুটি রূপ দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ একধরনের মৃত্যুকে কুরআন স্বীকৃতি দিচ্ছে, অপরটিকে দিচ্ছে না। তো স্বীকৃত মৃত্যুটি হলো—আত্মার দেহত্যাগ করা। আর যেটি অস্বীকৃত অবস্থায় বর্ণিত হয়েছে, সেটি হলো—সামগ্রিকভাবে আত্মার ও দেহের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় প্রকারটি হলো ঘুমের মতো—যাকে মৃত্যুর ভাই অভিহিত করা হয়। এ হিসেবেই ঘুমের অপর নাম হলো মৃত্যু। ঘুমন্ত মানুষ মৃতের সমতুল্য, যদিও সে জীবিতই থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى
"আল্লাহ প্রাণসমূহ কবজা করেন তাদের মৃত্যুর সময়, এবং এখনো যার মৃত্যু আসেনি, (তাকে কবজা করেন) তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তাকে নিজের কাছে রেখে দেন এবং অন্যদের ছেড়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে।”[২]
'নবীজি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে পাঠ করতেন—
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَمَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
"সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে মৃত্যুর পর জীবন দিয়েছেন। আর তাঁর কাছেই সকলকে প্রত্যাবর্তিত হতে হবে।”[৩]
'আরও এক হাদিসে আছে, নবীজি বলেন—
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي رَدَّ عَلَيَّ رُوحِي وَعَافَانِي فِي جَسَدِي وَأَذِنَ لِيْ بِذِكْرِهِ وَفَضَّلَنِيَ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيْلًا
| "সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমার দেহ সুস্থ রেখেছেন, তাঁর যিকির করার সুযোগ দিয়েছেন এবং আমাকে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।”[১]
'ঘুমাতে গেলে নবীজি পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ أَنْتَ خَلَقْتَ نَفْسِي وَأَنْتَ تَوَفَّاهَا لَكَ مَمَاتُهَا وَمَحْيَاهَا إِنْ أَمْسَكَتَهَا فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِيْنَ
“হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রাণ সৃষ্টি করেছেন, আপনিই তার মৃত্যু ঘটাবেন, আপনার জন্যই তার জীবন ও মরণ; আপনি (ঘুমের পর) তা ফিরিয়ে না দিলে তার প্রতি রহম করুন, আর ফিরিয়ে দিলে আপনার নেক বান্দাদের রুহের মতো হেফাজত করুন।”[২]
'ঘুমের আগে নবীজি বলতেন-
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتَ وَأَحْيَا
“হে আল্লাহ! আপনার নামে আমি মৃত্যুবরণ করি (ঘুমাই) এবং আপনার নামেই জীবিত হই (জেগে ওঠি)।”[৩]
শাইখ বিস্তারিত আলোচনা করার পর আমাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, 'এ বিষয়ে আমার যা জানা ছিল সব মোটামুটি বলা হলো, তবুও যদি তোমাদের কোনো অস্পষ্টতা থেকে থাকে বলতে পার, ইনশাআল্লাহ আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করব।'
আমি বললাম, 'না, শাইখ! আপনার কথা একদম স্পষ্ট। আমরা আপনার আলোচনা থেকে বুঝলাম যে, আমরা সাধারণত অন্তরের হায়াত বলতে শুধু একটি বৈশিষ্ট্য বুঝি; তবে সেটি নিছক অনুভব-অনুভূতি, ঐচ্ছিক সঞ্চালনশক্তি কিংবা ইলম-জ্ঞান ও কুদরত-সক্ষমতা নয়। বরং অন্তরের হায়াত হলো এমন এক শক্তি, যা মানুষকে সকল মন্দ কাজ ও পাপাচার থেকে দূরে রাখে।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, এটাই আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম। আল্লাহ চাইলে আগামী মজলিসে আবার দেখা হবে। ইনশাআল্লাহ সামনের হালকায় আমরা আত্মিক ব্যাধি প্রসঙ্গে আরও আলোচনা করব।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৯৩৬১ (সহিহ)
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২০২৭; সহিহ-আলবানি
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৫৪
[২] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৬৯
[৩] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৮৫
[৪] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৩০
[১] সূরা হাজ, আয়াত-ক্রম: ৬৬
[২] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৪২
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩২৪
[১] আল-আযকার, ইমাম নববি, পৃষ্ঠা ২১; আমালুল ইয়াওমি ওয়াল্লাইলি, ইবনুস সুন্নি (৯); وَفَضَّلَنِيَ থেকে অংশটুকু ভিন্ন বর্ণনায় (তিরমিযি, ৩৪৩২) এসেছে।
[২] এখানে মূলত দুটো হাদিসের কিছু অংশ। মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ২৭১২; فَاحْفَظْهَا থেকে বুখারিতে এসেছে, হাদিস-ক্রম: ৬৩২০
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩১২