📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 সুপথ অবলম্বনে সার্বক্ষণিক মুখাপেক্ষিতা

📄 সুপথ অবলম্বনে সার্বক্ষণিক মুখাপেক্ষিতা


সবাই চুপ থাকলেও আমি প্রশ্ন করে বসলাম; বললাম— 'শাইখ যেহেতু অনুমতি দিয়েছেন, তাই আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করে নিতে চাই; বিষয়টি হলো— একজন মুমিন-মুসলিমের হৃদয় যদি সততা ও সুপথের ওপর অবিচল থাকে, যদি তার অন্তর কার্যত জীবনীশক্তির অধিকারী হয়ে থাকে, তাহলে এমতাবস্থায় রবের কাছে তার হিদায়াত-প্রার্থনার কী এমন উপকার থাকতে পারে? বাহ্যত আমরা দেখি, সুপথের প্রার্থনা কেবল বিভ্রান্ত কারও জন্যই উপযোগী।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার উপলব্ধি হলো— ঈমান ও কুফরের যে-সকল শাখা-প্রশাখার কথা আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন এবং এর ভালো-মন্দের বিষয়-আশয় তুলে ধরেছেন, তা থেকে আমাদের সকলের উপকৃত হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে— اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ "আপনি আমাদেরকে সরল পথ দেখান!" [১] এর প্রেক্ষিতে যদি প্রশ্ন তোলা হয় যে, মুমিনরা তো সঠিক পথেই আছে, তাহলে তাদের আর সুপথের দিশা চাওয়ার কী প্রয়োজন? এর জবাবে সালাফের কেউ কেউ বলেছেন—“আপনি আমাদেরকে সরল পথ দেখান!"-এর উদ্দেশ্য হলো— "আমাদের সরল-সঠিক পথের ওপর অবিচল রাখুন!” যেমন : আরবরা ঘুমন্ত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলে থাকে—“আমি আসা পর্যন্ত তুমি ঘুমাতে থাকো!” আবার কেউ কেউ বলেছেন, এই আয়াতের অর্থ হলো— "আমাদের অন্তকরণসমূহ হিদায়াতের ওপর অবিচল ও সুদৃঢ় করে দিন!”—এই প্রার্থনা করা। আয়াতে মূলত অন্তরের বিষয়টি উহ্য রয়েছে। কেউ আবার এই অর্থও করেছেন যে, "আমার হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিন!”
'আসলে যে অর্থই করা হোক, আপত্তিটা মূলত আসে কাঙ্ক্ষিত সিরাতে মুস্তাকিম তথা সরল-সঠিক পথের প্রত্যাশা সম্পর্কে সুস্পষ্ট অবগতি না থাকার কারণে। কারণ সিরাতে মুস্তাকিম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জীবনের প্রতিটি ধাপে আল্লাহর সকল আদেশ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে দূরে থাকা।' [১]
'সাধারণ মানুষেরা যদিও স্বীকার করে থাকে যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সামগ্রিকভাবে কুরআন কারিম সত্য, তবে তাদের অধিকাংশেরই দুনিয়া- আখেরাতের ভালো-মন্দের জ্ঞানটুকু নেই। জীবনযাপনের বড়-ছোট সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে কিংবা সংক্ষিপ্তাকারে যাবতীয় বিধি-বিধান অনেকেরই জানা নেই; যতটুকু জানা আছে, তার অনেকটুকুই হয়তো আমলে নেই। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কেউ কুরআন ও সুন্নাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে অবগত হতে পেরেছে, কিন্তু সকল বিধান তো ব্যাপক এবং সামগ্রিকভাবে বর্ণিত, ব্যক্তি বিশেষ আলোচনা তো তাতে নেই। আর সাধারণ মানুষের পক্ষে এই সামগ্রিক আলোচনা থেকে নিজের জন্য প্রযোজ্য বিধানটি খুঁজে নেওয়া নিঃসন্দেহে সুকঠিন। এজন্যই মানুষকে এ-সকল ক্ষেত্রে সরল-সঠিক পথপ্রাপ্তির প্রার্থনা করতে আদেশ করা হয়েছে। আর সিরাতে মুস্তাকিমের হিদায়াতের মধ্যেই এসব কিছু নিহিত রয়েছে। এর মধ্যেই আছে নবীজি যা কিছু নিয়ে আগমন করেছেন তার সবিস্তার পরিচয়; তাঁর আদেশের আওতাভুক্ত সকল বিষয়াবলির আলোচনা এবং ইলম-জ্ঞান অনুসারে আমলের গুরুত্বারোপ। কারণ সত্য ও সততা সম্পর্কে নিছক জ্ঞান কোনো কাজেরই না, যদি তা অনুযায়ী আমল না থাকে। এজন্য হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে বলেন-
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ . نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا
"নিশ্চয় আমি আপনার জন্য এমন একটা ফয়সালা করে দিয়েছি, যা সুস্পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত-ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।" [১]
'মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামের শানে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَآتَيْنَاهُمَا الْكِتَابَ الْمُسْتَبِينَ . وَهَدَيْنَاهُمَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ | “আমি উভয়কে দিয়েছিলাম সুস্পষ্ট কিতাব। এবং তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করেছিলাম।"
'আমরা সাধারণত দেখতে পাই যে, মুসলিমরা আল্লাহপ্রদত্ত বিভিন্ন বিষয়, তথা ইলম-কালাম, আকিদা-বিশ্বাস ও আমল নিয়ে মারাত্মক মতবিরোধে লিপ্ত হয়; যদিও তারা সকলে এ বিষয়ে একমত যে, মুহাম্মাদ সত্য নবী এবং কুরআন আল্লাহর কালাম। আচ্ছা, যদি সবাই নিশ্চিতভাবে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর থাকত, তবে তারা ওই সকল বিষয়ে কেন মতবিরোধ করে, যে সকল বিষয়ে তারা (সালাফে সালেহীন) মতবিরোধ করতেন না। এ ছাড়াও আমরা দেখি যে, আল্লাহর বিধি-বিধান সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ তাঁর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত। তারা যদি সত্যিকার অর্থে সুপথে থাকত, তবে নিশ্চয় সকল কাজে আল্লাহর হুকুম মান্য করত।'
'উম্মতের মধ্যে আল্লাহ যাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন, যাদেরকে মুত্তাকি-পরহেজগার হিসেবে কবুল করেছেন, তাদের এই মহান সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁরা প্রত্যেক নামাজে দুআ করতেন- اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে সরল পথ দেখান! সেই সঙ্গে তাঁদের ছিল প্রয়োজন-পরিমাণ ইলম ও জ্ঞান, ছিল আল্লাহর কাছে সুপথপ্রাপ্তির নির্মোহ আকুতি। সরল-সঠিক পথে দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারার জন্য এই যে সার্বক্ষণিক দুআ ও কামনা, এটিই মূলত তাঁদেরকে আল্লাহর প্রিয় ও পরহেজগার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে সাহায্য করেছে।'
'সাহল ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে সংযোগের সবচেয়ে সহজ ও সুন্দর উপায় হলো তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।” সার্বক্ষণিক এই মুখাপেক্ষিতার কারণ হলো, অতীতে যে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, ভবিষ্যতেও তার হিদায়াতের প্রয়োজন রয়েছে। এটিই হলো ওই বক্তব্যের স্বরূপ, যাতে বলা হয়েছে-“হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনি সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং তাতে অবিচল রাখুন।""
আমার মাথায় আবার প্রশ্ন চাপল। বললাম, 'শাইখ! আপনার কথা যথার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে নিছক হিদায়াত বৃদ্ধির দুআ করার মধ্যে তো তেমন উপকারী কিছু দেখছি না, যদি-না হিদায়াতের সঙ্গে আমলও যুক্ত হয়। আর এটা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। তাই আমরা জানতে চাই, স্বতন্ত্রভাবে হিদায়াতের দুআর উপকারিতা ও প্রতিক্রিয়া ঠিক কী?'
শাইখ বললেন, 'কথাটি অবান্তর নয়। আমি বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলে স্পষ্ট করতে চেষ্টা করছি। দেখো, "আমাদেরকে হিদায়াত বাড়িয়ে দিন!” কথাটি উল্লিখিত সবগুলো অর্থই ধারণ করে। কিন্তু এই সবগুলো অর্থই ভবিষ্যতে তার সিরাতে মুস্তাকিমের হিদায়াতপ্রাপ্তিকে বোঝায়। কেননা ভবিষ্যতে ইলম অনুযায়ী তার আমল নাও হতে পারে-যেমনটি তোমরা বলেছ। এটা তো সত্যই-ভবিষ্যতে কেউ ইলম অনুযায়ী আমল না করলে তো তাকে হিদায়াতের ওপর আছে বলার সুযোগ নেই। আবার এমনও হতে পারে যে, ভবিষ্যতে তার ইলমই হাসিল হলো না। এমনকি তার অন্তর বিভ্রান্ত হয়ে গেল, কিংবা ইলম তো হাসিল হলো, কিন্তু তা অনুযায়ী আমল হলো না।'
'তাই বলা যায়-মানুষ মাত্রই এই দুআর দিকে মুখাপেক্ষী। এজন্য আল্লাহ তাআলা নামাজে (সূরা ফতিহায়) এই দুআ পাঠের ব্যবস্থা করেছেন। এই দুআর চেয়ে অধিক প্রয়োজনীয় দুআ আর নেই। কেননা যদি কারও হিদায়াত হাসিল হয়ে যায়, তার জন্য আল্লাহর সাহায্য, রিজিক থেকে শুরু করে মনের (বৈধ) সকল কামনা পূরণের ব্যবস্থা হয়ে যায়।'

টিকাঃ
[১] সূরা ফাতিহা, আয়াত-ক্রম: ৬
[১] সূরা ফাতহ, আয়াত-ক্রম: ১-২
[১] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ১১৭, ১১৮
[২] সূরা ফাতিহা, আয়াত-ক্রম: ৬

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 প্রাণবস্তুতা অন্তরকে মন্দ বিষয় থেকে দূরে রাখে

📄 প্রাণবস্তুতা অন্তরকে মন্দ বিষয় থেকে দূরে রাখে


'আসলে তোমাদের নিয়ে যে বিষয়টি আজ আমি বিশেষভাবে আলোচনা করতে চাচ্ছি তা হলো-অন্তর ও অন্যান্য সবকিছুর মধ্যে হায়াত বা প্রাণশক্তি বলতে যে নিছক অনুভূতি ও ঐচ্ছিক-সঞ্চালনা-শক্তি বোঝানো হয়, তা যথার্থ নয়। এমনকি শুধুই ইলম-জ্ঞান ও কুদরত-সক্ষমতা বুঝলেও তা ঠিক হবে না। যেমনটি বিশ্লেষক বা দার্শনিকদের অনেকে বলে থাকেন। তাঁদের একজন আবুল হাসান আল-বাসরি। আমি বরং বলব, হায়াত তথা প্রাণ, প্রাণীর সঙ্গে জুড়ে থাকা এমন এক বৈশিষ্ট্য যা-কিনা ঐচ্ছিক সকল কাজের ক্ষেত্রে ইলম-জ্ঞান, ইরাদা-ইচ্ছা এবং কুদরত-সক্ষমতার শর্ত স্বরূপ। এবং এটি এর জন্য আবশ্যকও। সুতরাং প্রাণী মাত্রই অনুভূতি, ইচ্ছাশক্তি ও স্বেচ্ছায় কোনো কাজ করার সক্ষমতা-সম্পন্ন। তাই যা কিছুর মধ্যে ইরাদা-ইচ্ছা ও ঐচ্ছিক কর্মক্ষমতা পাওয়া যাবে, তাকেই প্রাণী হিসেবে অভিহিত করা হবে।'
'আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, হায়াত তথা প্রাণ থেকেই কিন্তু হায়া তথা লজ্জার উৎপত্তি ঘটেছে। জীবিত অন্তর-সম্পন্ন মানুষের মধ্যে লজ্জা থাকে, যা তাকে যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। কেননা অন্তরের জীবনীশক্তিই মূলত মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বাধা প্রদানকারী, আবার এই মন্দ কাজই একসময় অন্তরকে নষ্ট করে দেয়। এজন্যই তো নবীজি বলেন-
الْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنْ الْإِيمَانِ "লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।" [১]
'অন্য এক হাদিসে আছে, নবীজি বলেন- الحياء والعي شعبتان من الإِيمَان وَالْبذَاءِ وَالْبَيَانِ شعبتان من النِّفَاقِ “লজ্জা এবং বাকসংযম ঈমানের অঙ্গ; আর নির্লজ্জতা ও বাকপটুতা নিফাকের অংশ।””[২]
'হাদিসে এসকল বাণী এজন্যই এসেছে যে, জীবিত সকল প্রাণী নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। অপরদিকে মৃত প্রাণীর ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। এজন্য তাকে অনুভূতিহীন বা লাজহীন বলা হয়। নিতান্তই অনুভূতি ও লজ্জাহীন কোনো মানুষ শুষ্ক গাছের মতো, যাতে সজীবতা বা প্রাণের সঞ্চার নেই। যদি কেউ অনুভূতিশূন্য ও কঠিন অন্তরের অধিকারী হয়, তাহলে তার অন্তরে উল্লিখিত প্রাণশক্তি থাকে না-যা তার মধ্যে লাজ-লজ্জা তৈরি করবে এবং তাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। তার অবস্থা খরাক্রান্ত জমির মতো-যাতে পায়ের ছাপ পর্যন্ত লাগে না। অপরদিকে নরম ভূমিতে পা দেবে যায়। এজন্য প্রাণ-সম্পন্ন কারও মধ্যে মন্দ কাজের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তার মধ্যে মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার একটা ইচ্ছাও জাগ্রত হয়; অথচ যার মধ্যে ভালোমন্দ বোঝার অনুভূতিটুকু নেই এবং যার অন্তরে প্রাণশক্তি নেই, তার মধ্যে লাজ-লজ্জার ব্যাপারও নেই; নেই সেই ঈমানি শক্তিও, যা তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে রাখবে।'
'সুতরাং অন্তরে প্রাণ আছে এমন কোনো মানুষের আত্মা তার দেহত্যাগ করার মাধ্যমে যদি মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার নফসের দেহত্যাগই তার মৃত্যু বোঝাবে; কারণ নফসের হায়াত তথা আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার অর্থ তো তার মৃত্যু ঘটছে না। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَن يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَتُ بَلْ أَحْيَاء "যারা আল্লাহর রাহে মৃত্যুবরণ করেছে, তাঁদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো বরং জীবিত।"[১]
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَتَا بَلْ أَحْيَاءٌ “আল্লাহর পথে যারা জীবন দিল তাদেরকে তোমরা মৃত ধারণা করো না। তারা তো জীবন্ত।”[২]
'অর্থাৎ, এরা সবাই কিন্তু মৃত এবং ওই আয়াতের আওতাভুক্ত যেখানে ইরশাদ হচ্ছে-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ "প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”[৩]
إِنَّكَ مَيِّتْ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ “আপনি ইন্তেকাল করবেন এবং তারা মারা যাবে।”[৪]
وَهُوَ الَّذِي أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ "আর তিনিই ওই সত্তা যিনি তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন, অনন্তর তিনি তোমাদেরকে মৃত্যু দান করবেন, অতঃপর জীবন দান করবেন।”[১]
'উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে আমরা মৃত্যুর দুটি রূপ দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ একধরনের মৃত্যুকে কুরআন স্বীকৃতি দিচ্ছে, অপরটিকে দিচ্ছে না। তো স্বীকৃত মৃত্যুটি হলো—আত্মার দেহত্যাগ করা। আর যেটি অস্বীকৃত অবস্থায় বর্ণিত হয়েছে, সেটি হলো—সামগ্রিকভাবে আত্মার ও দেহের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় প্রকারটি হলো ঘুমের মতো—যাকে মৃত্যুর ভাই অভিহিত করা হয়। এ হিসেবেই ঘুমের অপর নাম হলো মৃত্যু। ঘুমন্ত মানুষ মৃতের সমতুল্য, যদিও সে জীবিতই থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى
"আল্লাহ প্রাণসমূহ কবজা করেন তাদের মৃত্যুর সময়, এবং এখনো যার মৃত্যু আসেনি, (তাকে কবজা করেন) তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তাকে নিজের কাছে রেখে দেন এবং অন্যদের ছেড়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে।”[২]
'নবীজি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে পাঠ করতেন—
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَمَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
"সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে মৃত্যুর পর জীবন দিয়েছেন। আর তাঁর কাছেই সকলকে প্রত্যাবর্তিত হতে হবে।”[৩]
'আরও এক হাদিসে আছে, নবীজি বলেন—
الْحَمْدُ للهِ الَّذِي رَدَّ عَلَيَّ رُوحِي وَعَافَانِي فِي جَسَدِي وَأَذِنَ لِيْ بِذِكْرِهِ وَفَضَّلَنِيَ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيْلًا
| "সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমার দেহ সুস্থ রেখেছেন, তাঁর যিকির করার সুযোগ দিয়েছেন এবং আমাকে তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।”[১]
'ঘুমাতে গেলে নবীজি পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ أَنْتَ خَلَقْتَ نَفْسِي وَأَنْتَ تَوَفَّاهَا لَكَ مَمَاتُهَا وَمَحْيَاهَا إِنْ أَمْسَكَتَهَا فَارْحَمْهَا وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِيْنَ
“হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রাণ সৃষ্টি করেছেন, আপনিই তার মৃত্যু ঘটাবেন, আপনার জন্যই তার জীবন ও মরণ; আপনি (ঘুমের পর) তা ফিরিয়ে না দিলে তার প্রতি রহম করুন, আর ফিরিয়ে দিলে আপনার নেক বান্দাদের রুহের মতো হেফাজত করুন।”[২]
'ঘুমের আগে নবীজি বলতেন-
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتَ وَأَحْيَا
“হে আল্লাহ! আপনার নামে আমি মৃত্যুবরণ করি (ঘুমাই) এবং আপনার নামেই জীবিত হই (জেগে ওঠি)।”[৩]
শাইখ বিস্তারিত আলোচনা করার পর আমাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, 'এ বিষয়ে আমার যা জানা ছিল সব মোটামুটি বলা হলো, তবুও যদি তোমাদের কোনো অস্পষ্টতা থেকে থাকে বলতে পার, ইনশাআল্লাহ আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করব।'
আমি বললাম, 'না, শাইখ! আপনার কথা একদম স্পষ্ট। আমরা আপনার আলোচনা থেকে বুঝলাম যে, আমরা সাধারণত অন্তরের হায়াত বলতে শুধু একটি বৈশিষ্ট্য বুঝি; তবে সেটি নিছক অনুভব-অনুভূতি, ঐচ্ছিক সঞ্চালনশক্তি কিংবা ইলম-জ্ঞান ও কুদরত-সক্ষমতা নয়। বরং অন্তরের হায়াত হলো এমন এক শক্তি, যা মানুষকে সকল মন্দ কাজ ও পাপাচার থেকে দূরে রাখে।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, এটাই আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম। আল্লাহ চাইলে আগামী মজলিসে আবার দেখা হবে। ইনশাআল্লাহ সামনের হালকায় আমরা আত্মিক ব্যাধি প্রসঙ্গে আরও আলোচনা করব।'

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৯৩৬১ (সহিহ)
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২০২৭; সহিহ-আলবানি
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৫৪
[২] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৬৯
[৩] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৮৫
[৪] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৩০
[১] সূরা হাজ, আয়াত-ক্রম: ৬৬
[২] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৪২
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩২৪
[১] আল-আযকার, ইমাম নববি, পৃষ্ঠা ২১; আমালুল ইয়াওমি ওয়াল্লাইলি, ইবনুস সুন্নি (৯); وَفَضَّلَنِيَ থেকে অংশটুকু ভিন্ন বর্ণনায় (তিরমিযি, ৩৪৩২) এসেছে।
[২] এখানে মূলত দুটো হাদিসের কিছু অংশ। মুসলিম, হাদিস-ক্রম : ২৭১২; فَاحْفَظْهَا থেকে বুখারিতে এসেছে, হাদিস-ক্রম: ৬৩২০
[৩] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৩১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00