📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 মনোব্যাধির জন্য কুফরি আবশ্যক নয়

📄 মনোব্যাধির জন্য কুফরি আবশ্যক নয়


শাইখ এই সকল আয়াত তিলাওয়াত করার পর একটু থামলেন। এই ফাঁকে আমি প্রশ্ন করলাম, 'শাইখ, এটি তো আমাদের সকলের কাছে স্পষ্ট যে, এই আয়াতগুলো যে দিকে ইঙ্গিত করছে তাতে আপনার পূর্বের আলোচনার ওপর একটি আপত্তি আসে। কেননা অন্তরের বধিরতা, দৃষ্টিশক্তিহীনতা এবং নির্বুদ্ধিতাসহ আরও যে সকল দোষের কথা আপনি আলোচনা করেছেন, তা তো কেবল কাফিরদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল এবং কোনো মুসলিম তো নয়ই বরং কোনো মুনাফিকও সেই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না বলেই উল্লিখিত হয়েছিল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে বিষয়টি ভিন্নরকম!'
তখন ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'আমি বিষয়টি উল্লেখ করেছি, এবং এমন আরও যেসকল বিশেষ আয়াতে কারিমা রয়েছে, সেসকল ক্ষেত্রে আমার মতামত কতক মুফাসসিরের মতের সঙ্গে অমিল থাকতে পারে। কেননা কতক মুফাসসির কুরআনের আয়াত—
وَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَن لَّمْ يَدْعُنَا إِلَىٰ ضُرٍ مَّسَّهُ
"আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দিই, কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয় কখনো কোনো কষ্টের সম্মুখীন হয়ে যেন সে ডাকেনি আমাকে।" [১]
'এবং এমন সকল আয়াতের ক্ষেত্রে তাদের মন্তব্য হলো, এ সকল আয়াতে ইনসান তথা মানুষের যে দোষত্রুটির বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে, তাতে কাফির উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আয়াতটি কেবল কাফিরদের বেলায়ই প্রযোজ্য হবে।'
'এই মত শোনার পর যে কারও মনে এই ধারণা হবে যে—অন্তত মুখে যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, সে এই আয়াতের ধমকির বাইরে। এবং এই ধমকি কেবল তাদের জন্যই যারা নিজেদের আচরণ ও উচ্চারণে কুফরি প্রকাশ করে; অথবা এই আয়াত ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের বেলায় প্রযোজ্য হবে; সঙ্গে এই ধারণাও হতে পারে যে, এই আয়াতে মুমিন বান্দাদের জন্য হিদায়াতের কিছু নেই।'
'এ ক্ষেত্রে প্রথমে আমি যে কথাটি বলব, যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে তারা মুমিন ও মুনাফিক—এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। ইসলামের প্রত্যেক যুগেই মুনাফিক ছিল, আছে এবং থাকবে। মুনাফিকের জায়গা হলো জাহান্নামের একেবারে তলানিতে।'
'দ্বিতীয়ত বলব, ঈমানের ধারক ও বাহক হওয়ার পরও মানুষের মনে কুফর ও নিফাকির কিছুটা ছায়া থেকে যায়। দেখো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
“চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে পাক্কা মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি আলামত বিদ্যমান থাকবে। সেগুলো হলো- ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করা; ২. কথা বললে মিথ্যা বলা; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করা; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা।”[১]
'হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওই সকল দোষের মধ্যে কোনো একটি থাকা মানে তার মধ্যে নিফাকির উপাদান থাকা। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন- “তোমার মধ্যে জাহেলিয়াত এখনো দেখা যাচ্ছে!” দেখো, আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবীজি এই কথা বললেন, অথচ তিনি যে খাঁটি মুমিন, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে? আরও এক সহিহ হাদিসে আছে-
أَرْبَعُ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ ، وَالنِّيَاحَةُ ، وَالإِسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ
"আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলি যুগের চারটি কুপ্রথা রয়ে গেছে, যা লোকেরা পরিত্যাগ করতে চাইছেই না-১. বংশের গৌরব, ২. অন্যকে বংশের ব্যাপারে অপবাদ দেওয়া, ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা, ৪. মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা।”[২]
'আরও এক হাদিসে আছে-
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ حَتَّى لَوْ dakhaltum juḥra ḍabbin ladakhaltumūhu qālū al-yahūda wan-naṣārā qāla faman
"অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দ্ববের গর্তেও ঢুকে, তবুও তোমরা তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কি ইহুদি-নাসারা? তিনি বললেন, তবে আর কারা!”[১]
আরও এক হাদিসে আছে-
لَتَأْخُذَنَّ أُمَّتِي مَا أَخَذَتِ الْأُمَمُ قَبْلَهَا شِبْرًا بِشِبْرٍ وذِرَاعًا بِذِرَاعٍ قَالُوْا فَارِسُ وَالرُّوْمُ قَالَ وَمِنْ أَنَاسٍ إِلَّا هَؤُلَاءِ
"আমার উম্মত অবশ্যই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পূর্ববর্তী উম্মতের অনুসরণ করবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, তারা কি পারস্য ও রোমের অধিবাসী? নবীজি বলেন, তবে আর কারা, বলো!””[২]
'ইবনু মুলাইকা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি ত্রিশজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছি। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজেকের ওপর নিফাকির আশঙ্কা করতেন।” হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- “মানুষ অন্তর চার ধরনের হয়। প্রথমত সর্বোত্তম-এতে প্রদীপ জ্বলজ্বল করে; এটি হলো মুমিনের অন্তর। দ্বিতীয়ত চরম উদাসীন-এটি হলো কাফিরের অন্তর। তৃতীয়ত বক্র অন্তর-এটি হলো মুনাফিকের অন্তর। চতুর্থত এমন অন্তর যাতে ঈমান-নিফাক উভয় উপাদানই বিদ্যমান। এরা ভালো-মন্দ সব আমলই কমবেশি করে থাকে।""

টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৯৩৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩২০; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৬৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১১৮০০ বুখারি, মুসলিম ও মুসনাদু আহমাদের বর্ণনার সাথে এই বর্ণনার শব্দগত তারতম্য আছে。
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩১৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৮৩০৮; অর্থগত মিল থাকলেও শব্দগত পার্থক্য বিদ্যমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00