📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ঈমান ও নিফাক আত্মিক শুদ্ধাশুদ্ধির জনক

📄 ঈমান ও নিফাক আত্মিক শুদ্ধাশুদ্ধির জনক


আমি বললাম, 'শাইখ, উল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে যে দিকে ইঙ্গিত পাচ্ছি, তা হলো-কলবের প্রাণশক্তি দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত, অর্থগত দিক থেকে যদিও সামান্য ব্যতিক্রম থাকতে পারে, তবে বিষয় এখানে দুটোর বেশি নয়। প্রথমত হলো-পানি, যার অপর নাম জীবন। দ্বিতীয়ত হলো-নূর তথা আলো, যা সবকিছু আলোকিত করে।'
শাইখ বললেন, 'তোমার কথা ঠিক আছে, যে আয়াতগুলো আমি উল্লেখ করেছি, তা স্পষ্টভাবেই সেদিকে ইঙ্গিত করছে। তবে এখানে মৌলিক বিষয়ের বাইরে তেমন কিছু নিয়ে বিশ্লেষণ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি আসলে বলতে চাই-ঈমানের মাধ্যমে অন্তরের প্রাণশক্তি বৃদ্ধি পায়, আর নিফাকের কারণে তা বিনষ্ট হয়। এ কারণে আল্লাহ তাআলা দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন। তিনি বলেন-
أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌ بِقَدَرِهَا فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَّابِيًّا وَمِمَّا يُوقِدُونَ عَلَيْهِ فِي النَّارِ ابْتِغَاءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَاعٍ زَبَدٌ مِثْلُهُ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ في الْأَرْضِ كَذَلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
"তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, ফলে নদীনালা আপন-আপন সামর্থ্য অনুযায়ী প্লাবিত হয়েছে, তারপর পানির ধারা স্ফীত ফেনারাশিকে ওপরে নিয়ে এসেছে। এমন ফেনা ওই সময়ও ওঠে যখন লোকে অলংকার অথবা পাত্র তৈরির জন্য যে আগুনে ধাতু উত্তপ্ত করে। এমনিভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেছেন যে, (উভয় প্রকারে) যা ফেনা, তা বাইরে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এভাবেই দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।”[১]
‘মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَّا يُبْصِرُونَ . صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ . أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ السَّمَاءِ فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكَافِرِينَ. يَكَادُ الْبَرْقُ يَخْطَفُ أَبْصَارَهُمْ كُلَّمَا أَضَاءَ لَهُم مَّشَوْا فِيهِ وَإِذَا أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“তাদের অবস্থা সে ব্যক্তির মতো, যে কোথাও আগুন প্রজ্জ্বলিত করল। এরপর যখন আগুন তার চারপাশ আলোকিত করল, ঠিক তখন আল্লাহ তাদের আলো নিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে এ অবস্থায় ছেড়ে দিলেন যে, তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না। অথবা, তাদের উদাহরণ সেসব লোকের মতো যারা দুর্যোগপূর্ণ ঝড়ো রাতে পথ চলে, যাতে থাকে আঁধার, গর্জন ও বিদ্যুৎচমক। মৃত্যুর ভয়ে গর্জনের সময় তারা কানে আঙুল দিয়ে রক্ষা পেতে চায়। অথচ সমস্ত কাফিরই আল্লাহ কর্তৃক পরিবেষ্টিত। মনে হয় যেন বিজলি তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেবে। বিজলিতে যখন সামান্য আলোকিত হয়, তারা কিছুটা পথ চলে। আবার যখন অন্ধকার হয়ে যায়, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তাহলে তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিতে পারেন। আল্লাহ যাবতীয় বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।”[২]
‘উল্লিখিত আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি—প্রথমত আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন, যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছে। যখনই আগুন আশপাশ আলোকিত করতে যাবে, তখনই আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন। আর দ্বিতীয়টি হলো পানি বা বৃষ্টি সংক্রান্ত উদাহরণ। অর্থাৎ, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এর সাথে থাকে বিদ্যুৎচমক ও বজ্রপাত। এসব উদাহরণ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা সময়সাপেক্ষ। আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য হলো অন্তরের জীবনীশক্তি ও দীপ্তি প্রসঙ্গে। দুআয়ে মাসুরায় আছে—
اجْعَلِ الْقُرْآنَ رَبِيْعَ قُلُوْبِنَا وَنُوْرَ صُدُوْرِنَا
"হে আল্লাহ! কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত ও অন্তরের আলো করে দিন।" [১]
'হাদিসে ربیع বা বসন্ত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর আরও একটি অর্থ হলো-- এমন বৃষ্টি, যা দ্বারা ফল-ফসলের গাছের অঙ্কুরোদগম হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
إِنَّ مِمَّا يُنْبِتُ الرَّبِيعُ مَا يَقْتُلُ حَبَطًا أَوْ يُلِمُّ
| “বসন্তকালীন উদ্ভিদ পশুকে ধ্বংস করে কিংবা ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়”।’
'যে ঋতুতে প্রথম এই বৃষ্টি নামে, তাকেই আরবরা বসন্তকাল বলে। কেননা এই ঋতুতে শস্যাদি উৎপাদনকারী বৃষ্টি বর্ষিত হয়। আর অনারবরা শীত-পরবর্তী ঋতুকে বলে বসন্তকাল। কেননা এই ঋতুতে গাছপালা ছেয়ে যায় ফুলে-ফলে, বৃক্ষশাখা বধূর সাজ ধারণ করে নতুন পত্রে।'

টিকাঃ
[১] সূরা রা'দ, আয়াত-ক্রম: ১৭
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৭-২০
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৩৭১২; হাদিসটির সনদ যঈফ। সনদের রাবী আবু সালামাহ আল জুহানী দ্বারা কে উদ্দেশ্য তা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মাঝে দীর্ঘ মতভেদ রয়েছে।

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 জীবিত ও মৃত অন্তরের ব্যবধান

📄 জীবিত ও মৃত অন্তরের ব্যবধান


আলোচনা চলছিল। হঠাৎ আমার মনে প্রশ্ন জাগল। তাই বিনয়ের সঙ্গে আরজ করলাম-'শাইখ, আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে; এটি সবার মনেই জাগার কথা। তা হলো-অন্তর যেহেতু দুই প্রকার তথা-জীবিত ও মৃত, কিংবা আলোকিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন; তাহলে জীবিত ও মৃত-উভয় প্রকার অন্তরে প্রাণ কীভাবে থাকতে পারে? এই উভয় প্রকারের অন্তরই কি দেখা, শোনা ও বোঝার সক্ষমতা রাখে? যদি তা-ই হয়ে থাকবে, তাহলে এমতাবস্থায় উভয়ের মধ্যে আর পার্থক্যের কী থাকল!'
বরাবরের মতো মৃদু হেসে শাইখ বললেন-'তোমার প্রশ্নে বুদ্ধিমত্তার ছাপ আছে, মাশাআল্লাহ! আল্লাহ তাওফিক দিলে তোমার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পেয়ে যাবে। দেখো, বাস্তবতা হলো-জীবিত ও আলোকিত অন্তরে নূর থাকে। এমন অন্তরে থাকে শোনার, দেখার ও বোঝার ক্ষমতাও। অপরদিকে মৃত অন্তরে শোনার কিংবা দেখার শক্তি থাকে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
“কাফিরদের উদাহরণ এমন, যেন কেউ এমন জন্তুকে ডাকছে, যে হাঁক- ডাক আর চিৎকার বৈ কিছুই শোনে না; তারা বধির বোবা এবং অন্ধ; সুতরাং তারা বোঝেও না।”[১]
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَمِنْهُم مَّن يَسْتَمِعُونَ إِلَيْكَ أَفَأَنتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ وَلَوْ كَانُوا لَا يََعْقِلُونَ .. وَمِنْهُم مَّن يَنظُرُ إِلَيْكَ ، أَفَأَنتَ تَهْدِي الْعُمْيَ وَلَوْ كَانُوا لَا يُبْصِرُونَ
"তাদের কেউ কেউ আপনার দিকে কর্ণপাত করে; কিন্তু বধিরদের আপনি কী শোনাবেন, যদি তাদের বিবেক-বুদ্ধি না থাকে! আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ আপনার দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে; কিন্তু অন্ধদের আপনি কী পথ দেখাবেন, যদি তারা মোটেও দেখতে না পারে!""[২]
'আরও ইরশাদ হচ্ছে-
وَمِنْهُم مَّن يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَن يَفْقَهُوهُ وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِن يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَّا يُؤْمِنُوا بِهَا حَتَّىٰ إِذَا جَاءُوكَ يُجَادِلُونَكَ يَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ
তাদের মধ্যে কিছু লোক এমন, যারা আপনার কথা কান লাগিয়ে শোনে। তবে আমি তাদের কানে পর্দা ফেলে দিয়েছি। ফলে তারা বোঝে না; তাদের কানে বধিরতা সৃষ্টি করে দিয়েছি। আর তারা এক-এক করে যদি সকল নিদর্শনও দেখে ফেলে তারপরও ঈমান আনবে না। এমনকি যখন তারা বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্য আপনার কাছে আসে, তখন কাফিররা বলে, এটা তো পূর্ববর্তীদের উপাখ্যান মাত্র।" [১]
'উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের এ বিষয়ে অবগত করছেন যে, এইসকল লোক অন্তর দিয়ে বোঝে না, কান দিয়ে শোনে না এবং তাদেরকে যে জাহান্নামের কথা বলা হয়েছে, তাও তারা বিশ্বাস করে না। পবিত্র কুরআনে তাদের এই অবস্থাও তাদের জবানেই বিবৃত হয়েছে এভাবে-
قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِن بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ "আপনি আমাদেরকে যে বিষয়ের দিকে দাওয়াত দেন, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে ঢাকা, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং আমাদের ও আপনার মাঝখানে আছে এক অন্তরাল।” [২]
'বক্ষ্যমাণ আয়াতে দেখতে পাচ্ছি এইসকল লোক নিজেদের মন, কান ও চোখের ওপর প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করছে। তাদের দেহে যদিও প্রাণ আছে, তাই তারা যাবতীয় আওয়াজ শুনতে পায়, সবকিছু দেখতে পায়; কিন্তু দেহে প্রাণ থাকতেও যাদের অন্তরে প্রাণ নেই, তাদের জীবন তো নিতান্তই পশুতুল্য। কেননা পশুরও কান আছে, চোখ আছে, মুখ আছে; এসব ব্যবহার করে এরা শুনতে, দেখতে ও খেতে পারে। পশুরা মেলামেশা করে, বাচ্চা জন্ম দেয়। অন্তরের প্রাণশক্তি ছাড়া মানুষ আর পশুর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এজন্যই তো কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً | "বস্তুত কাফিরদের উদাহরণ এমন, যেন কেউ এমন কোনো জন্তুকে ডাকছে, যে হাঁক-ডাক আর চিৎকার বৈ কিছুই শোনে না।"[১]
'আল্লাহ তাআলা তাদের উদাহরণ দিয়েছেন এমন পশুর সাথে, যা রাখালের হাঁক-ডাক ছাড়া আর কিছু শোনে না। এ প্রসঙ্গে আরও ইরশাদ হচ্ছে-
أَمْ تَحْسَبُ أَنْ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أضل سبيلا
"আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে বা বোঝে? (না,) তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং আরও বেশি পথভ্রান্ত।"
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
"আর আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তারা তা দ্বারা চিন্তা-ফিকির করে না; তাদের চোখ রয়েছে, তারা তা দ্বারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, তারা তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই (আল্লাহর হুকুম পালনে) উদাসীন।"[৩]

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৭১
[২] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৪২-৪৩
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ২৫
[২] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ৫
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৭১
[৩] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৭৯

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 মনোব্যাধির জন্য কুফরি আবশ্যক নয়

📄 মনোব্যাধির জন্য কুফরি আবশ্যক নয়


শাইখ এই সকল আয়াত তিলাওয়াত করার পর একটু থামলেন। এই ফাঁকে আমি প্রশ্ন করলাম, 'শাইখ, এটি তো আমাদের সকলের কাছে স্পষ্ট যে, এই আয়াতগুলো যে দিকে ইঙ্গিত করছে তাতে আপনার পূর্বের আলোচনার ওপর একটি আপত্তি আসে। কেননা অন্তরের বধিরতা, দৃষ্টিশক্তিহীনতা এবং নির্বুদ্ধিতাসহ আরও যে সকল দোষের কথা আপনি আলোচনা করেছেন, তা তো কেবল কাফিরদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল এবং কোনো মুসলিম তো নয়ই বরং কোনো মুনাফিকও সেই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না বলেই উল্লিখিত হয়েছিল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে বিষয়টি ভিন্নরকম!'
তখন ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'আমি বিষয়টি উল্লেখ করেছি, এবং এমন আরও যেসকল বিশেষ আয়াতে কারিমা রয়েছে, সেসকল ক্ষেত্রে আমার মতামত কতক মুফাসসিরের মতের সঙ্গে অমিল থাকতে পারে। কেননা কতক মুফাসসির কুরআনের আয়াত—
وَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَن لَّمْ يَدْعُنَا إِلَىٰ ضُرٍ مَّسَّهُ
"আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দিই, কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয় কখনো কোনো কষ্টের সম্মুখীন হয়ে যেন সে ডাকেনি আমাকে।" [১]
'এবং এমন সকল আয়াতের ক্ষেত্রে তাদের মন্তব্য হলো, এ সকল আয়াতে ইনসান তথা মানুষের যে দোষত্রুটির বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে, তাতে কাফির উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আয়াতটি কেবল কাফিরদের বেলায়ই প্রযোজ্য হবে।'
'এই মত শোনার পর যে কারও মনে এই ধারণা হবে যে—অন্তত মুখে যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, সে এই আয়াতের ধমকির বাইরে। এবং এই ধমকি কেবল তাদের জন্যই যারা নিজেদের আচরণ ও উচ্চারণে কুফরি প্রকাশ করে; অথবা এই আয়াত ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের বেলায় প্রযোজ্য হবে; সঙ্গে এই ধারণাও হতে পারে যে, এই আয়াতে মুমিন বান্দাদের জন্য হিদায়াতের কিছু নেই।'
'এ ক্ষেত্রে প্রথমে আমি যে কথাটি বলব, যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে তারা মুমিন ও মুনাফিক—এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। ইসলামের প্রত্যেক যুগেই মুনাফিক ছিল, আছে এবং থাকবে। মুনাফিকের জায়গা হলো জাহান্নামের একেবারে তলানিতে।'
'দ্বিতীয়ত বলব, ঈমানের ধারক ও বাহক হওয়ার পরও মানুষের মনে কুফর ও নিফাকির কিছুটা ছায়া থেকে যায়। দেখো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
“চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে পাক্কা মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি আলামত বিদ্যমান থাকবে। সেগুলো হলো- ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করা; ২. কথা বললে মিথ্যা বলা; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করা; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা।”[১]
'হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওই সকল দোষের মধ্যে কোনো একটি থাকা মানে তার মধ্যে নিফাকির উপাদান থাকা। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন- “তোমার মধ্যে জাহেলিয়াত এখনো দেখা যাচ্ছে!” দেখো, আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবীজি এই কথা বললেন, অথচ তিনি যে খাঁটি মুমিন, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে? আরও এক সহিহ হাদিসে আছে-
أَرْبَعُ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ ، وَالنِّيَاحَةُ ، وَالإِسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ
"আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলি যুগের চারটি কুপ্রথা রয়ে গেছে, যা লোকেরা পরিত্যাগ করতে চাইছেই না-১. বংশের গৌরব, ২. অন্যকে বংশের ব্যাপারে অপবাদ দেওয়া, ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা, ৪. মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা।”[২]
'আরও এক হাদিসে আছে-
لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ حَتَّى لَوْ dakhaltum juḥra ḍabbin ladakhaltumūhu qālū al-yahūda wan-naṣārā qāla faman
"অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দ্ববের গর্তেও ঢুকে, তবুও তোমরা তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কি ইহুদি-নাসারা? তিনি বললেন, তবে আর কারা!”[১]
আরও এক হাদিসে আছে-
لَتَأْخُذَنَّ أُمَّتِي مَا أَخَذَتِ الْأُمَمُ قَبْلَهَا شِبْرًا بِشِبْرٍ وذِرَاعًا بِذِرَاعٍ قَالُوْا فَارِسُ وَالرُّوْمُ قَالَ وَمِنْ أَنَاسٍ إِلَّا هَؤُلَاءِ
"আমার উম্মত অবশ্যই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পূর্ববর্তী উম্মতের অনুসরণ করবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, তারা কি পারস্য ও রোমের অধিবাসী? নবীজি বলেন, তবে আর কারা, বলো!””[২]
'ইবনু মুলাইকা রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি ত্রিশজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছি। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজেকের ওপর নিফাকির আশঙ্কা করতেন।” হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- “মানুষ অন্তর চার ধরনের হয়। প্রথমত সর্বোত্তম-এতে প্রদীপ জ্বলজ্বল করে; এটি হলো মুমিনের অন্তর। দ্বিতীয়ত চরম উদাসীন-এটি হলো কাফিরের অন্তর। তৃতীয়ত বক্র অন্তর-এটি হলো মুনাফিকের অন্তর। চতুর্থত এমন অন্তর যাতে ঈমান-নিফাক উভয় উপাদানই বিদ্যমান। এরা ভালো-মন্দ সব আমলই কমবেশি করে থাকে।""

টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ১২
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৪
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৯৩৪
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩২০; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৬৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১১৮০০ বুখারি, মুসলিম ও মুসনাদু আহমাদের বর্ণনার সাথে এই বর্ণনার শব্দগত তারতম্য আছে。
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩১৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৮৩০৮; অর্থগত মিল থাকলেও শব্দগত পার্থক্য বিদ্যমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00