📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 অন্তরের আরোগ্য ও প্রতিষেধক

📄 অন্তরের আরোগ্য ও প্রতিষেধক


'প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা! আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, অন্তরের শিফা-শুশ্রূষার জন্য এমন ঈমানি প্রতিষেধক অপরিহার্য, যা পর্যাপ্ত কার্যকরী ও যথেষ্ট শক্তিশালী। এই চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহী ও পরিপূর্ণরূপে প্রস্তুত-অন্তরের জন্য নিম্নোক্ত প্রতিষেধক প্রয়োগ করা যেতে পারে।
'প্রথম প্রতিষেধক—আল-কুরআন : কুরআন হলো অন্তরস্থ যাবতীয় ব্যাধির জন্য শিফা স্বরূপ—বিশেষত সংশয় ও সন্দেহের মতো রোগের জন্য তো মহৌষধ। কুরআনের বাণী-বর্ণনা, আয়াত ও নিদর্শন হক ও বাতিলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যরেখা টেনে দেয়; অনুভব-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বিনষ্টকারী এবং সংশয় উদ্রেককারী যাবতীয় ব্যাধি এমনভাবে সমূলে ধ্বংস করে যে, এরপর আর বান্দার সত্য-মিথ্যা চিনতে, হক-বাতিল বুঝতে বেগ পেতে হয় না; প্রতিটা বিষয় সে নিজস্ব রূপ ও প্রকৃতিতে দেখতে সক্ষম হয়।'
'কুরআনে রয়েছে প্রজ্ঞা-হিকমত, ওয়াজ-নসিহত, ভীতি-প্রদর্শন, সুসংবাদ- জ্ঞাপন এবং শিক্ষণীয় ঘটনাবলির বিবরণ, যা অন্তরের রোগমুক্তিকে একরকম অপরিহার্য করে তোলে। কুরআনের সংস্পর্শে এলে অন্তর সকল সৎকাজের প্রতি আগ্রহী হয় এবং যাবতীয় অনিষ্টতা ও কদর্যতা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে; ভালোবাসতে শুরু করে সরল-সঠিক পথ, ঘৃণা ও অবজ্ঞা তৈরি হয় ভ্রান্ত পন্থার প্রতি, যদিও একসময় ভুলের প্রতিই তার আসক্তি ছিল, ভালোর প্রতি ছিল অনীহা।'
'কুরআন হলো চিত্ত-বিনষ্টকারী রোগব্যাধির জন্য এমন এক প্রতিষেধক, যা রোগপ্রতিরোধ করেই যাবে, যতক্ষণ-না অন্তর সুস্থ হয়, চিন্তার পরিশুদ্ধি ঘটে এবং ওই স্বভাব ও প্রকৃতিতে ফিরে আসে, যেমন শরীর সুস্থ হলে তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ফিরে পায়। মানুষের অন্তরের খোরাক হলো ঈমান ও কুরআন। এই আহার গ্রহণে আত্মা পরিশুদ্ধ ও পরিপক্ক হয়। ঠিক যেমন পরিমিত পানাহারে মানুষের সুস্বাস্থ্য বহাল থাকে এবং স্থিতি লাভ করে। অধিকন্তু অন্তরের পরিশুদ্ধি দৈহিক সুস্বাস্থ্যের মতো।'
'দ্বিতীয় প্রতিষেধক—যাকাত : যাকাতের শাব্দিক অর্থ হলো বৃদ্ধি পাওয়া, পরিপক্ক হওয়া। এখানে এটিই উদ্দেশ্য। কিন্তু কীভাবে? যাকাত শব্দটিকে কর্তার সাথে সম্পৃক্ত করলে অর্থ দাঁড়ায়, কোনো কিছুর বৃদ্ধি ঘটা, সুপরিপক্ক হওয়া। দেহের মতো মনেরও উন্নতি-অগ্রগতির প্রয়োজন আছে। উপরন্তু পরিশুদ্ধ ও পরিপক্ক হওয়া অবধি অন্তরের সমৃদ্ধি ও উন্নতি একান্ত প্রয়োজনীয়।'
'তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, দৈহিক উন্নতি ও ঋদ্ধি অর্জনের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের পাশাপাশি যেমন ক্ষতিকর খাবার পরিহার করতে হয়, তেমনি মনের বেলায়ও এটি প্রযোজ্য। অর্থাৎ পরিমাণ মতো উপকারী খাবার খেলে এবং অখাদ্য-কুখাদ্য ত্যাগ করলে দৈহিক উন্নতি সাধিত হয়। অনুরূপভাবে আত্মিক ঋদ্ধি ও পরিশুদ্ধির জন্য উপকারী উপাদান গ্রহণ করা এবং ক্ষতিকর সবকিছু পরিহার করা আবশ্যক। কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও এই পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচর্যা ছাড়া ভালো ফলন আশা করা নিছক বোকামি।'
'তৃতীয় প্রতিষেধক-সাদাকাহ: সাদাকাহ সাধারণ কিছু নয়। এটি গুনাহকে এমনভাবে মুছে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। সাদাকাহর মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধি লাভ করে। তাছাড়া যাকাত শব্দটি গুনাহ থেকে পবিত্রতা হবার অর্থকে জোরালোভাব ফুটিয়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا
"আপনি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং যা তাদের পক্ষে বরকতের কারণ হবে।”[১]
'অনুরূপভাবে অশ্লীলতা-কদর্যতা, পাপাচার ও অনাচার ত্যাগ করলেও অন্তর পবিত্র হয়। মনের মধ্যে এসবের উপস্থিতি দেহের মধ্যে ক্ষতিকর উপাদান বিদ্যমান থাকার মতো। যেমন বিষাক্ত রক্ত বের করে ফেললে শরীর ব্যথামুক্ত হয়, প্রাকৃতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, স্বস্তি ও শান্তি অনুভূত হয়, অনন্তর স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়, একইভাবে বান্দা যখন গুনাহ থেকে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন তার আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, নেকআমলের প্রতি স্পৃহা জাগে এবং বিভিন্ন অনিষ্ট ও কদর্যতা থেকে মুক্ত থাকায় মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়। তাই বলা হয়-অন্তরের বৃদ্ধি ও ঋদ্ধি হলো পরিশুদ্ধি ও পরিপক্কতার মধ্যে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَىٰ مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا
“যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া তোমাদের প্রতি না থাকত, তবে তোমাদের কেউ কখনও পরিশুদ্ধ হতে পারতে না।”[২]
وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ "যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে-এটিই তোমাদের জন্যে অধিক পবিত্রতার।" [১]
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য সর্বাধিক পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা সম্পর্কে অবহিত।”[২]
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ . وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى "নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয় এবং আপন রবের নাম স্মরণ করে, অতঃপর নামাজ আদায় করে।”[৩]
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا . وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا “যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।” [৪]
وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَكَّى | “আপনি কী জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো।” [৫]
فَقُلْ هَل لَّكَ إِلَىٰ أَن تَزَكَّى . وَأَهْدِيَكَ إِلَى رَبِّكَ فَتَخْشَىٰ "সুতরাং (তাকে) বলুন, তোমার কি এ আগ্রহ আছে যে তুমি শুধরে যাবে? আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাব, যাতে তুমি তাঁকে ভয় কর।"[১]
আমি বললাম, 'শাইখের কথা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, পাপাচার ও অনাচার ত্যাগ করাই অন্তরের ঋদ্ধি ও পরিশুদ্ধির কারণ। তাছাড়া গুনাহ ও কুকর্ম যদিও বাস্তবতার বিবেচনায় একরকম কমতি ও ঘাটতি, কিন্তু যখন অন্তর গুনাহমুক্ত হয়, তখন এর পরিবর্তে তাতে বৃদ্ধি ও ঋদ্ধি ঘটে।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, বিষয়টি এমনই। অর্থাৎ যদিও তাযকিয়ার [২] মূলে হলো খাইর-বরকত বা বৃদ্ধি-সমৃদ্ধি, তথাপি এটি অর্জিত হয় অকল্যাণ দূরীকরণের মাধ্যমেই। একারণেই তাকিয়া উভয়টির সমন্বয়ে সাধিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ . الَّذِينَ لَا يُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
"আর মুশরিকদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ, যারা যাকাত আদায় করে না।” [৩]
'বক্ষ্যমাণ আয়াতে যাকাত দ্বারা উদ্দেশ্য—তাওহিদ ও ঈমান। অধিকন্তু এর মাধ্যমেই অন্তরের প্রাথমিক ও সর্ববৃহৎ পরিশুদ্ধি ঘটে। কেননা এটি ইসলামের এমন এক মূলমন্ত্র, যা অন্তরে আল্লাহর প্রভুত্বের ওপর দৃঢ়তা স্থাপন করে এবং সৃষ্টিকুলের দাসত্বের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। আর এটাই হলো পবিত্র কালিমা—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর হাকিকত তথা বাস্তবতা। আর এই প্রত্যয়ই কেবল আত্মশুদ্ধির দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে।'
'চতুর্থ প্রতিষেধক—তাযকিয়া: 'তাযকিয়ার শাব্দিক অর্থ হলো—কোনো কিছু পবিত্র করা। এই পবিত্রকরণ হতে পারে কারও ব্যক্তিসত্তায়। আবার হতে পারে কারও বিশ্বাস ও বর্ণনায়। প্রথমটির উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে— عدلته অর্থাৎ তাকে তুমি ন্যায়পরায়ণ বানালে; এভাবে তখন বলা যাবে, যখন তোমার ওসিলায় কারও নফস ন্যায়পরায়ণতার গুণে গুণান্বিত হবে। দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো কুরআনের আয়াত—
فَلَا تُرَكُوا أَنفُسَكُمْ
"অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা কোরো না।"[১]
'অর্থাৎ তোমরা নফসের পবিত্রতার বর্ণনা দিয়ো না। এই আয়াতের উদ্দেশ্য আর সূরা শামস-এর নবম আয়াত (তথা : قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়।'[২])-এর উদ্দেশ্য এক নয়। কেননা কে সত্যিকারের আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে, তা কেবল আল্লাহই বলতে পারেন। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى | “তিনি ভালো জানেন কে সংযমী।”'[৩]
'যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ইসলামপূর্ব নাম ছিল বাররাহ। তাঁকে বলা হয়েছিল, "নিজেকে নিজেই পবিত্র দাবি করছ?” অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাম রাখেন যাইনাব। আর আল্লাহ তাআলার বাণী-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنفُسَهُم بَلِ اللَّهُ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ "আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র বলে থাকে, অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করেন!”'[৪]
'এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো—ওই সকল লোকের অবস্থা বর্ণনা করা, যারা নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানুষের কাছে সেটা বলে বেড়ায়। যেমন নাকি সত্যায়নকারী সাক্ষীদেরকে ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সত্যায়ন করে।'
'পঞ্চম প্রতিষেধক-ন্যায়পরায়ণতা: পরিমিতিবোধ, মধ্যপন্থা ও ন্যায়পরায়ণতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, যেমন জুলুমের কারণে হয় নষ্ট ও ভ্রষ্ট। এ কারণে সকল গুনাহই বান্দার নিজের ওপর জুলুম ও অন্যায় হিসেবে বিবেচিত। আর জুলুম ও অন্যায় হলো ন্যায়ের উল্টো। তো, গুনাহের পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের সঙ্গে ন্যায় নয় বরং অন্যায় আচরণ করে থাকে। উপরন্তু অন্তরের পরিশুদ্ধি ঘটে ন্যায় ও ইনসাফের মাধ্যমে; অন্যায় ও অবিচারে তাতে অনিষ্টতা ও কদর্যতা ছড়ায়। যখন মানুষ নিজের ওপর জুলুম করে, তখন সে নিজেই একসাথে জালিম ও মাজলুম তথা অত্যাচারী ও অত্যাচারিত হয়। অনুরূপভাবে, কেউ ইনসাফ করলে-তা নিজের প্রতি সুবিচার বলা যায়। আসলে আমল যেহেতু তার থেকেই ঘটছে, তাই এর ফলাফলও তার দিকেই বর্তাবে-সহজ হিসেব। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ
"সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার ওপর বর্তায় যা সে করে।" [১]
'ষষ্ঠ প্রতিষেধক-আমল : ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ-সবধরনের আমলেরই দুটি প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। একটি বাইরে, আরেকটি ভেতরে, তথা অন্তরে। শুধু তাই নয়, বাইরের আগেই বরং আভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আর নফস পরিশুদ্ধ হয় আদল ও ইনসাফের মাধ্যমে এবং খারাপ ও বিনষ্ট হয় জুলুমের কারণে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا
“যে সৎকর্ম করে, সে নিজের উপকারের জন্যই করে, আর যে অসৎকর্ম করে, তা তার ওপরই বর্তাবে।”[২]
إِنْ أَحْسَنتُمْ أَحْسَنتُمْ لِأَنفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا
"তোমরা যদি ভালো কিছু কর, তবে নিজেদের জন্যই ভালো করবে; আর যদি মন্দ কিছু কর, তবে তাও নিজেদের জন্যই।”” [৩]
'পূর্ববর্তী মনীষীদের কেউ কেউ বলেছেন- “সৎকাজসমূহ অন্তরে আলো ছড়ায়, দেহের শক্তি বাড়ায়, চেহারা উজ্জ্বল করে, রিজিকে প্রশস্ততা আনে, সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা জাগায়; আর বদকাজ অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে, চেহারায় কলঙ্ক লেপে, শরীরকে নিস্তেজ করে, রিজিকে সংকীর্ণতা আনে এবং মানুষের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে।” আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ | "প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।”[১]
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ | “প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।”[২]
وَذَكِّرْ بِهِ أَن تُبْسَلَ نَفْسٌ بِمَا كَسَبَتْ لَيْسَ لَهَا مِن دُونِ اللَّهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ وَإِن تَعْدِلْ كُلَّ عَدْلٍ لَّا يُؤْخَذْ مِنْهَا أُولَئِكَ الَّذِينَ أُبْسِلُوا بِمَا كَسَبُوا "তাদেরকে কুরআন দ্বারা উপদেশ দিন, যাতে কেউ নিজ কর্মের কারণে এমনভাবে গ্রেফতার না হয়ে যায় যে, আল্লাহ ব্যতীত তার কোনো সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী আর থাকে না; এমনকি যদি তারা বিনিময় হিসেবে জগতের সবকিছু প্রদান করে, তবু তাদের কাছ থেকে তা গৃহীত হবে না। এরাই ওই সকল লোক যারা নিজেদের কৃতকর্মের কারণে ধরা পড়ে গেছে।”[৩]
'تبسل শব্দের অর্থ হলো বন্ধককৃত, আবদ্ধ বা কারারুদ্ধ। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো-মানবদেহ যখন রোগমুক্ত হয়, তখন সে তার স্বাভাবিক রুচিবোধ ফিরে পায়। অসুস্থ হলে আবার এই রুচিবোধের অনুপস্থিতি দেখা দেয়। তো, একজন মানুষের অবস্থা যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, সে তার সাধ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ ভালো অবস্থানে যেতে চাইবে এটাই তো কাম্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ | "তোমরা চাইলেও স্ত্রীদের মধ্যে সমতাবিধান করতে সক্ষম হবে না।”[৪]
وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"ন্যায্যভাবে ওজন ও মাপ পূর্ণ করো। তবে হ্যাঁ, আমি কাউকে তার সাধ্যের অতীত কিছু চাপিয়ে দিই না।”[১]
‘আল্লাহ তাআলা রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন এবং কুরআন নাজিল করেছেন, যেন তাঁরা মানুষের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। আর সর্বশ্রেষ্ঠ ইনসাফ হলো, এক আল্লাহর ইবাদত করা যার কোনো শরিক নেই; এর পরবর্তী ইনসাফ হলো, মানুষের হক আদায়েরে ক্ষেত্রে নিষ্ঠার আচরণ করা; সর্বশেষ নিজের প্রতি জুলুম না করা।’
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে আমি বললাম, 'মুহতারাম! আপনার কথা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ইনসাফ, পরিমিতিবোধ ও ন্যায়পরায়ণতা হলো অন্তরের সুস্থতা ও নিরাপত্তার উপকরণ। কেননা জুলুম ও অন্যায় হলো আত্মিক ব্যাধির বাহন।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। জুলুম ও অবিচার অন্তরের অন্যতম প্রধান রোগ। আর ইনসাফ হলো অন্তরস্থ যাবতীয় রোগের আরোগ্যসাধনের প্রতিষেধক।'
'ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি কিছু মানুষকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, "যদি তুমি নিজে সঠিক পথে থাক, তবে অন্যকে ভয় পাবে কেন?” বলার উদ্দেশ্য হলো—মাখলুককে ভয় করাও শিরক ও অন্যান্য গুনাহের মতোই একটি আত্মিক ব্যাধি। সুতরাং এটি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে।'

টিকাঃ
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ১০৩
[২] সূরা নুর, আয়াত-ক্রম: ২১
[১] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ২৮
[২] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩০
[৩] সূরা আ'লা, আয়াত-ক্রম: ১৪-১৫
[৪] সূরা শামস, আয়াত-ক্রম: ৯-১০
[৫] সূরা আবাসা, আয়াত: ৩
[১] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ১৮-১৯
[২] আত্মশুদ্ধি
[৩] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ৬-৭
[১] সূরা নাজম, আয়াত-ক্রম: ৩২
[২] সূরা শামস, আয়াত-ক্রম: ৯
[৩] সূরা নাজম, আয়াত-ক্রম: ৩২
[৪] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৪৯
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৮৬
[২] সূরা ফুসসিলাت, আয়াত-ক্রম: ৪৬
[৩] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৭
[১] সূরা তুর, আয়াত-ক্রম: ২১
[২] সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[৩] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৭০
[৪] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ১২৯
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১৫২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00