📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 মনোব্যাধি যেমন ক্ষতিকর শিফাও তেমনি কল্যাণকর

📄 মনোব্যাধি যেমন ক্ষতিকর শিফাও তেমনি কল্যাণকর


এবার আমি জানতে চাইলাম, 'মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি ও অস্বস্তির মধ্যে কোনটি বেশি গুরুতর?'
শাইখ বললেন, 'মানসিক তথা আত্মিক স্বস্তি ও অস্বস্তি শারীরিক স্বস্তি ও অস্বস্তির তুলনায় বেশি গুরুতর। তবে দৈহিক অসুস্থতা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার কারণে মনেও যে অস্বস্তি অনুভূত হয়, সেটি একটু ব্যতিক্রম। তাই চৈত্তিক সুস্থতা-অসুস্থতা দৈহিক সুস্থতা-অসুস্থতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশয় ও সন্দেহ কখনো কখনো অন্তরস্থ রোগের আলামত হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে আলোচনা গত হয়েছে। আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "ফলে যার অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ সে প্রলুব্ধ হয়।”[১]
'এ-কারণেই আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু জাফর আল-খারায়িতি একটি কিতাব রচনা করেছেন; যার নাম দিয়েছেন 'কিতাবু ইতিলালিল কুলুব বিল-আহওয়া' [খ]। মূলকথা হলো-মুনাফিকদের হৃদয় দুটি কারণে রোগাক্রান্ত। যথা: আকিদা বা বিশ্বাসগত ভ্রষ্টতা এবং ইরাদা বা ইচ্ছাসংক্রান্ত বিভ্রান্তি।
'আবার দেখো, অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত ব্যক্তির মনেও একরকম রোগের সংক্রমণ ঘটে। যাকে বলা যায়-জালিমের জুলুম থেকে নিঃসৃত মাজলুমের মনোবেদনা। আমরা দেখি মাজলুমের মনঃকষ্ট কেবল পাওনা বুঝে পেলেই দূর হয়। অন্তরের কষ্ট ও অস্বস্তি দূরীকরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ ، وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ “মুমিনদের অন্তরসমূহ প্রশমিত করবেন। এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করবেন।”[৩]
'মনের বেদনা দূর হলে অন্তরের ক্ষোভ চলে যায়। আবার মনঃকষ্ট দূর হলে এবং প্রাপ্য বুঝে পেলে মাজলুমের মনে প্রশান্তি ফিরে আসে। উল্লিখিত আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। দেখো, কারও দৃষ্টিশক্তি কিংবা শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলা মানবদেহে মারাত্মক অসম্পূর্ণতা ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, এ অবস্থায় সে অগণিত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়, সম্মুখীন হয় অসংখ্য সমস্যার। অনুরূপভাবে কারও অন্তরচক্ষু যদি অন্ধ হয়, হৃদয়ের কান বধির হয়; ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও কল্যাণ-অকল্যাণ নিরূপণে অন্তর অসমর্থ হয়, তাহলে এসব সমস্যাও তার অন্তরস্থ ব্যাধি। সন্দেহ নেই এইসব ব্যাধি ওই ব্যক্তিকে একসময় কুপোকাত করে ফেলবে এবং এর প্রকোপে সে মানসিকভাবেও যন্ত্রণায় ভুগবে।'
'আবার দেখো, কারও মনে যখন কোনো বদ অভ্যাস স্থান পায়-যেমন : মাত্রাতিরিক্ত খাবার খাওয়া কিংবা অখাদ্য-কুখাদ্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা, ইত্যাদি-এমতাবস্থায় এই বদ অভ্যাস একসময় তার রোগে পরিণত হয় এবং তাকে ফেলে উভয় সংকটে। অর্থাৎ, খাওয়ার পর যে যন্ত্রণায় সে ভোগে, সেটি তার আহারপূর্ব অবস্থার তুলনায় বেগতিক হয়; খাবার বেশি খেলেও অস্থির লাগে, আবার কম খেলেও পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলে।'
'আরও একটি উদাহরণ দেখো। কেউ যদি এমন কারও প্রতি প্রেমাসক্ত হয়, যে তার কোনো কাজেই আসবে না, যদিও এই প্রেমের কারণ হয় প্রেমাস্পদের রূপ-সৌন্দর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা ধন-সম্পত্তি, এমতাবস্থায় যদি কোনোভাবে প্রেমিক তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, তাহলে সে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মতো অন্তর্দাহে জ্বলে। আর যদি কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত মানুষ আয়ত্তে এসেই যায়, তাহলে সমস্যা কতগুণ বৃদ্ধি পায়, তা বলাই বাহুল্য।'
'আবার, কোনো অসুস্থ ব্যক্তি যদি উপকারী ও দরকারি খাবার-পানীয় অপছন্দবশত পরিহার করে চলে, তাহলে তার রোগ নিরাময় তো দূরের কথা, বরং বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এই দুর্দশা অব্যাহত থাকলে এক পর্যায়ে তার প্রাণনাশও ঘটতে পারে। আবার হতে পারে ওইসব প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য পথ্য ও প্রতিষেধক সে এড়িয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে সমস্যা কম থাকলেও পরে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, যদি না আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন।'
'তো, আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি হিংসুকের অবজ্ঞা ঠিক সুস্থদের পানাহার করতে দেখে অসুস্থ কারও খারাপ লাগার মতোই। এমনকি তাদের এই খাবার-দাবার তো সে একরকম সহ্যই করতে পারে না। এদিকে হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি তার দায়-দায়িত্ব এমনভাবে এড়িয়ে চলে, যেমন রোগক্লিষ্ট কেউ উপকারী ও দরকারি পানাহার থেকে নিজেকে দূরে রাখে।'
আমি বললাম, 'শাইখ! বিষয়টি তো জনৈক কবির এই কবিতারই অনুলিপি—
(ভাবার্থ) "তারা আমাকে ওষুধের নামে 'অসুখ'ই খাইয়েছে; শুশ্রূষার নামে কুপথ্য দিলে রোগ কি আর নিরাময় হয়!" শাইখ, আমার কাছে মনে হয়, পরিমিতিবোধ নিঃসন্দেহ অনেক বড় নিয়ামত।'
শাইখ বললেন, 'সত্য বলেছ। তোমার সঙ্গে আমি আরও একটু যোগ করি- দেখো, আত্মিক সুস্থতা ও মধ্যমপন্থা বর্জিত যে আসক্তি ও অবজ্ঞা মানুষের মনে জন্ম নেয়, তা ঠিক দৈহিক সুস্থতা ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিরুদ্ধ আসক্তি ও অনাসক্তির মতো। অন্তরের চোখ ও হৃদয়ের কান যদি বাস্তবতা উপলব্ধি করতে অসমর্থ হয়, ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দৈহিক অন্ধত্ব ও বধিরতার অনুরূপ, যা কি-না মানুষকে শরীরী বস্তু-দর্শনের সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়; দূরীভূত করে দেয় ক্ষতিকর কিংবা কল্যাণকর জিনিসের পার্থক্য নিরূপণ ক্ষমতা।'
'একজন অন্ধ যদি তার চোখে আলো ফিরে পায়, তাহলে কতইনা খুশি হবে, তার জন্য এটা কত বড় পাওয়া হবে, ঠিক তেমনিভাবে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যাওয়া তার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। শুধু তাই নয়, অন্তরের চোখে দেখে কোনো কিছুর স্বরূপ উদঘাটন করা, আর চর্মচোখে তাকিয়ে থাকার মধ্যে যে কী বিশাল তফাৎ বিদ্যমান, তা কেবল আল্লাহ তাআলাই পরিমাপ করতে পারবেন।'
'আমরা এখানে কেবল উভয় প্রকার অসুস্থতার মধ্যে মিল ও অমিলগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি। কেননা আত্মিক চিকিৎসা তো দৈহিক চিকিৎসার মতোই। সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সমীপে চিঠিতে লিখেন-“শুনেছি আপনি চিকিৎসা-পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। সতর্ক থাকবেন, কোনো প্রাণনাশের ঘটনা যেন না ঘটে। আর হ্যাঁ, আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন বান্দার অন্তরস্থ রোগব্যাধি নিরাময়ের জন্য।" আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
| “কুরআনে আমি যা নাজিল করি, তা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের | জন্য রহমত। আর জালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।”১।
*একই কুরআন মুমিনদের জন্য শিফা অথচ কাফিরদের জন্য ব্যাধি! এর মূল কারণ হলো—বিশ্বাস ও অবিশ্বাস। সাধারণত ওষুধের ওপর বিশ্বাস রাখলে তা কাজে দেয়, অবিশ্বাস থাকলে হয়তো তা কোনো কাজেই আসে না। কুরআন কাফিরদের জন্য উপকারী না হলেও মুমিনরা তা থেকে উপকৃত হয়, কারণ তারা পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে অন্তরস্থ ব্যাধি নিরাময়ে এই ওষুধ প্রয়োগ করে।'

টিকাঃ
[১] সূরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৩২
[২] অর্থ: প্রবৃত্তির কারণে অন্তর রোগাক্রান্ত
[৩] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ১৪,১৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-জম: ৮১

এবার আমি জানতে চাইলাম, 'মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি ও অস্বস্তির মধ্যে কোনটি বেশি গুরুতর?'
শাইখ বললেন, 'মানসিক তথা আত্মিক স্বস্তি ও অস্বস্তি শারীরিক স্বস্তি ও অস্বস্তির তুলনায় বেশি গুরুতর। তবে দৈহিক অসুস্থতা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার কারণে মনেও যে অস্বস্তি অনুভূত হয়, সেটি একটু ব্যতিক্রম। তাই চৈত্তিক সুস্থতা-অসুস্থতা দৈহিক সুস্থতা-অসুস্থতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশয় ও সন্দেহ কখনো কখনো অন্তরস্থ রোগের আলামত হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে আলোচনা গত হয়েছে। আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "ফলে যার অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ সে প্রলুব্ধ হয়।”[১]
'এ-কারণেই আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু জাফর আল-খারায়িতি একটি কিতাব রচনা করেছেন; যার নাম দিয়েছেন 'কিতাবু ইতিলালিল কুলুব বিল-আহওয়া' [২]। মূলকথা হলো-মুনাফিকদের হৃদয় দুটি কারণে রোগাক্রান্ত। যথা: আকিদা বা বিশ্বাসগত ভ্রষ্টতা এবং ইরাদা বা ইচ্ছাসংক্রান্ত বিভ্রান্তি।
'আবার দেখো, অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত ব্যক্তির মনেও একরকম রোগের সংক্রমণ ঘটে। যাকে বলা যায়-জালিমের জুলুম থেকে নিঃসৃত মাজলুমের মনোবেদনা। আমরা দেখি মাজলুমের মনঃকষ্ট কেবল পাওনা বুঝে পেলেই দূর হয়। অন্তরের কষ্ট ও অস্বস্তি দূরীকরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ ، وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ “মুমিনদের অন্তরসমূহ প্রশমিত করবেন। এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করবেন।”[৩]
'মনের বেদনা দূর হলে অন্তরের ক্ষোভ চলে যায়। আবার মনঃকষ্ট দূর হলে এবং প্রাপ্য বুঝে পেলে মাজলুমের মনে প্রশান্তি ফিরে আসে। উল্লিখিত আয়াতে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। দেখো, কারও দৃষ্টিশক্তি কিংবা শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলা মানবদেহে মারাত্মক অসম্পূর্ণতা ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, এ অবস্থায় সে অগণিত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়, সম্মুখীন হয় অসংখ্য সমস্যার। অনুরূপভাবে কারও অন্তরচক্ষু যদি অন্ধ হয়, হৃদয়ের কান বধির হয়; ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও কল্যাণ-অকল্যাণ নিরূপণে অন্তর অসমর্থ হয়, তাহলে এসব সমস্যাও তার অন্তরস্থ ব্যাধি। সন্দেহ নেই এইসব ব্যাধি ওই ব্যক্তিকে একসময় কুপোকাত করে ফেলবে এবং এর প্রকোপে সে মানসিকভাবেও যন্ত্রণায় ভুগবে।'
'আবার দেখো, কারও মনে যখন কোনো বদ অভ্যাস স্থান পায়-যেমন : মাত্রাতিরিক্ত খাবার খাওয়া কিংবা অখাদ্য-কুখাদ্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা, ইত্যাদি-এমতাবস্থায় এই বদ অভ্যাস একসময় তার রোগে পরিণত হয় এবং তাকে ফেলে উভয় সংকটে। অর্থাৎ, খাওয়ার পর যে যন্ত্রণায় সে ভোগে, সেটি তার আহারপূর্ব অবস্থার তুলনায় বেগতিক হয়; খাবার বেশি খেলেও অস্থির লাগে, আবার কম খেলেও পেটে ক্ষুধার আগুন জ্বলে।'
'আরও একটি উদাহরণ দেখো। কেউ যদি এমন কারও প্রতি প্রেমাসক্ত হয়, যে তার কোনো কাজেই আসবে না, যদিও এই প্রেমের কারণ হয় প্রেমাস্পদের রূপ-সৌন্দর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা ধন-সম্পত্তি, এমতাবস্থায় যদি কোনোভাবে প্রেমিক তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, তাহলে সে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মতো অন্তর্দাহে জ্বলে। আর যদি কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত মানুষ আয়ত্তে এসেই যায়, তাহলে সমস্যা কতগুণ বৃদ্ধি পায়, তা বলাই বাহুল্য।'
'আবার, কোনো অসুস্থ ব্যক্তি যদি উপকারী ও দরকারি খাবার-পানীয় অপছন্দবশত পরিহার করে চলে, তাহলে তার রোগ নিরাময় তো দূরের কথা, বরং বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এই দুর্দশা অব্যাহত থাকলে এক পর্যায়ে তার প্রাণনাশও ঘটতে পারে। আবার হতে পারে ওইসব প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য পথ্য ও প্রতিষেধক সে এড়িয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে সমস্যা কম থাকলেও পরে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, যদি না আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন।'
'তো, আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি হিংসুকের অবজ্ঞা ঠিক সুস্থদের পানাহার করতে দেখে অসুস্থ কারও খারাপ লাগার মতোই। এমনকি তাদের এই খাবার-দাবার তো সে একরকম সহ্যই করতে পারে না। এদিকে হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি তার দায়-দায়িত্ব এমনভাবে এড়িয়ে চলে, যেমন রোগক্লিষ্ট কেউ উপকারী ও দরকারি পানাহার থেকে নিজেকে দূরে রাখে।'
আমি বললাম, 'শাইখ! বিষয়টি তো জনৈক কবির এই কবিতারই অনুলিপি—
(ভাবার্থ) "তারা আমাকে ওষুধের নামে 'অসুখ'ই খাইয়েছে; শুশ্রূষার নামে কুপথ্য দিলে রোগ কি আর নিরাময় হয়!" শাইখ, আমার কাছে মনে হয়, পরিমিতিবোধ নিঃসন্দেহ অনেক বড় নিয়ামত।'
শাইখ বললেন, 'সত্য বলেছ। তোমার সঙ্গে আমি আরও একটু যোগ করি- দেখো, আত্মিক সুস্থতা ও মধ্যমপন্থা বর্জিত যে আসক্তি ও অবজ্ঞা মানুষের মনে জন্ম নেয়, তা ঠিক দৈহিক সুস্থতা ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বিরুদ্ধ আসক্তি ও অনাসক্তির মতো। অন্তরের চোখ ও হৃদয়ের কান যদি বাস্তবতা উপলব্ধি করতে অসমর্থ হয়, ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দৈহিক অন্ধত্ব ও বধিরতার অনুরূপ, যা কি-না মানুষকে শরীরী বস্তু-দর্শনের সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়; দূরীভূত করে দেয় ক্ষতিকর কিংবা কল্যাণকর জিনিসের পার্থক্য নিরূপণ ক্ষমতা।'
'একজন অন্ধ যদি তার চোখে আলো ফিরে পায়, তাহলে কতইনা খুশি হবে, তার জন্য এটা কত বড় পাওয়া হবে, ঠিক তেমনিভাবে অন্তর্দৃষ্টি খুলে যাওয়া তার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। শুধু তাই নয়, অন্তরের চোখে দেখে কোনো কিছুর স্বরূপ উদঘাটন করা, আর চর্মচোখে তাকিয়ে থাকার মধ্যে যে কী বিশাল তফাৎ বিদ্যমান, তা কেবল আল্লাহ তাআলাই পরিমাপ করতে পারবেন।'
'আমরা এখানে কেবল উভয় প্রকার অসুস্থতার মধ্যে মিল ও অমিলগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি। কেননা আত্মিক চিকিৎসা তো দৈহিক চিকিৎসার মতোই। সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সমীপে চিঠিতে লিখেন-“শুনেছি আপনি চিকিৎসা-পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। সতর্ক থাকবেন, কোনো প্রাণনাশের ঘটনা যেন না ঘটে। আর হ্যাঁ, আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন বান্দার অন্তরস্থ রোগব্যাধি নিরাময়ের জন্য।" আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
| “কুরআনে আমি যা নাজিল করি, তা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত। আর জালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।”[১]।
*একই কুরআন মুমিনদের জন্য শিফা অথচ কাফিরদের জন্য ব্যাধি! এর মূল কারণ হলো—বিশ্বাস ও অবিশ্বাস। সাধারণত ওষুধের ওপর বিশ্বাস রাখলে তা কাজে দেয়, অবিশ্বাস থাকলে হয়তো তা কোনো কাজেই আসে না। কুরআন কাফিরদের জন্য উপকারী না হলেও মুমিনরা তা থেকে উপকৃত হয়, কারণ তারা পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে অন্তরস্থ ব্যাধি নিরাময়ে এই ওষুধ প্রয়োগ করে।'

টিকাঃ
[১] সূরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৩২
[২] অর্থ: প্রবৃত্তির কারণে অন্তর রোগাক্রান্ত
[৩] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ১৪,১৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৮২

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 প্রবৃত্তি হলো মনোব্যাধির আঁতুড়ঘর

📄 প্রবৃত্তি হলো মনোব্যাধির আঁতুড়ঘর


'বিষয়টি যদি এমনই হয়ে থাকবে, তাহলে মানসিক ও শারীরিক ব্যাধির মূল হেতু কী?' জানতে চাইলাম আমি।
শাইখ বললেন, 'মানুষের প্রাকৃতিক কামনা-বাসনা বা ঘৃণা-অবজ্ঞা যখন পরিমিতিবোধের সীমা অতিক্রম করে, তখন তার মধ্যে দৈহিক অসুস্থতা দেখা দেয়। এটি হতে পারে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কোনোকিছুর প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকে, অথবা হতে পারে উপকারী কোনো কিছুর প্রতি কামনা-বাসনা থেকে। এ কারণে সে এমন কিছু অপছন্দ করতে থাকে যা তার জন্য উপকারী এবং পছন্দ করতে শুরু করে ক্ষতিকর সবকিছু। আর এর সবই হয়ে থাকে ইন্দ্রিয়ানূভূতি ও সঞ্চালনা-শক্তির দুর্বলতার কারণে।
'অনুরূপভাবে পরিমিতিবোধ-বর্জিত প্রেম-ভালোবাসা বা ঘৃণা-অবজ্ঞা মানুষের মধ্যে চিন্তাগত ব্যাধি সৃষ্টি করে। যাকে বলে অন্তর্লিপ্সা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ
“আল্লাহর হিদায়াতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে!”।২।
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ
"বরং যারা জালিম, তারা অজ্ঞতাবশত তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে।"১
'চিকিৎসকের পরামর্শ বা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কিছু করলে মানুষের দেহের স্বাভাবিক অবস্থাও এভাবে বিঘ্নিত হয়। অবশ্য মানসিক সক্ষমতা ও অক্ষমতা থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ কারণে সে আর উপকারী পথ্য-প্রতিষেধক ঠিকমতো চিনতে পারে না।'
'অনেক নির্বোধ রোগী আছে, যারা অসুস্থাবস্থায়ও যাচ্ছেতাই খেতে চায়, ওষুধপত্র একটু মুখরোচক না-হলে বা অরুচিকর হলে আর খেতে চায় না। অথচ একটু কষ্ট করে ওষুধটা খেলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভবিষ্যতের জন্য তা উপকারী। কিন্তু এটুকু না করলে পরবর্তী সময়ে তাকে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, এমনকি প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে। বনি আদমের অবস্থা ঠিক অনুরূপ—এরা মূর্খতাবশত নিজেদের ওপর জুলুম করে, চিত্তাকর্ষক যা দেখে তাই পেতে চায়, চাই তা ক্ষতিকরও হোক। আবার যা অপ্রীতিকর মনে হয়, তাই এড়িয়ে যায়, যদিও তাতেই কল্যাণ নিহিত। এই স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে একসময় মানুষকে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়—দুনিয়াতে কিংবা আখেরাতে। আর আখেরাতের আজাব তো বড়ই ভয়ংকর।'

টিকাঃ
[২] সূরা কাসাস, আয়াত-ক্রম: ৫০
[১] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ২৯

'বিষয়টি যদি এমনই হয়ে থাকবে, তাহলে মানসিক ও শারীরিক ব্যাধির মূল হেতু কী?' জানতে চাইলাম আমি।
শাইখ বললেন, 'মানুষের প্রাকৃতিক কামনা-বাসনা বা ঘৃণা-অবজ্ঞা যখন পরিমিতিবোধের সীমা অতিক্রম করে, তখন তার মধ্যে দৈহিক অসুস্থতা দেখা দেয়। এটি হতে পারে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কোনোকিছুর প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষা থেকে, অথবা হতে পারে উপকারী কোনো কিছুর প্রতি কামনা-বাসনা থেকে। এ কারণে সে এমন কিছু অপছন্দ করতে থাকে যা তার জন্য উপকারী এবং পছন্দ করতে শুরু করে ক্ষতিকর সবকিছু। আর এর সবই হয়ে থাকে ইন্দ্রিয়ানূভূতি ও সঞ্চালনা-শক্তির দুর্বলতার কারণে।
'অনুরূপভাবে পরিমিতিবোধ-বর্জিত প্রেম-ভালোবাসা বা ঘৃণা-অবজ্ঞা মানুষের মধ্যে চিন্তাগত ব্যাধি সৃষ্টি করে। যাকে বলে অন্তর্লিপ্সা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ
“আল্লাহর হিদায়াতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে!”।[২]।
'আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ
"বরং যারা জালিম, তারা অজ্ঞতাবশত তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে।"[১]
'চিকিৎসকের পরামর্শ বা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কিছু করলে মানুষের দেহের স্বাভাবিক অবস্থাও এভাবে বিঘ্নিত হয়। অবশ্য মানসিক সক্ষমতা ও অক্ষমতা থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ কারণে সে আর উপকারী পথ্য-প্রতিষেধক ঠিকমতো চিনতে পারে না।'
'অনেক নির্বোধ রোগী আছে, যারা অসুস্থাবস্থায়ও যাচ্ছেতাই খেতে চায়, ওষুধপত্র একটু মুখরোচক না-হলে বা অরুচিকর হলে আর খেতে চায় না। অথচ একটু কষ্ট করে ওষুধটা খেলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভবিষ্যতের জন্য তা উপকারী। কিন্তু এটুকু না করলে পরবর্তী সময়ে তাকে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, এমনকি প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে। বনি আদমের অবস্থা ঠিক অনুরূপ—এরা মূর্খতাবশত নিজেদের ওপর জুলুম করে, চিত্তাকর্ষক যা দেখে তাই পেতে চায়, চাই তা ক্ষতিকরও হোক। আবার যা অপ্রীতিকর মনে হয়, তাই এড়িয়ে যায়, যদিও তাতেই কল্যাণ নিহিত। এই স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে একসময় মানুষকে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়—দুনিয়াতে কিংবা আখেরাতে। আর আখেরাতের আজাব তো বড়ই ভয়ংকর।'

টিকাঃ
[২] সূরা কাসাস, আয়াত-ক্রম: ৫০
[১] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ২৯

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 তাকওয়াই মনোব্যাধির সর্বোত্তম প্রতিষেধক

📄 তাকওয়াই মনোব্যাধির সর্বোত্তম প্রতিষেধক


জানতে চেয়ে বললাম, ‘শাইখ, আপনার আলোচনা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবছি, হৃদয়স্থ যে-সকল ব্যাধির কথা আমরা জানলাম, এতে কেউ আক্রান্ত হলে কী উপায় হবে তার? কীভাবে সে চিকিৎসা নেবে, সেবা-শুশ্রূষা গ্রহণ করবে?’
শাইখ বললেন, ‘তোমরা যদি একশব্দে এর সমাধান চাও, তাহলে তার জবাব হবে “তাকওয়া”। হ্যাঁ, তাকওয়া বা পরহেজগারিতাই এ-সকল রোগের সর্বোত্তম প্রতিষেধক। তাকওয়া বলতে উদ্দেশ্য হলো—উপকারী কর্মের মাধ্যমে ক্ষতিকর সবকিছু থেকে আত্মরক্ষা করা। অর্থাৎ একই সাথে ভালো জিনিস গ্রহণ করতে হবে এবং মন্দ জিনিস পরিহার করতে হবে। অপরন্তু যে অনিষ্ট থেকে বাঁচতে চায়, তার জন্য উৎকৃষ্ট কিছু গ্রহণ করা অপরিহার্য। কখনো কখনো মানুষ ভালো কিছু গ্রহণ করার পাশাপাশি খারাপটাও চেখে দেখে। এমন হলে সেটাকে আর ‘হাবলো তাকওয়া’ বলা যাবে না। আবার ভালো-মন্দ উভয়টা একত্রে পরিহার কর'ও সম্ভব না। কেননা মানুষ যখন দীর্ঘ সময় খাবারশূন্য থাকে, তখন ক্ষুধার তাড়নায় অখাদ্য-কুখাদ্য যা-ই সামনে পড়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে, যা হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এমনকি হতে পারে প্রাণনাশক। এমনটি করা যাবে না। এজন্যই আখেরাতের উত্তম প্রতিফল ও প্রকৃষ্ট প্রতিদান কেবল তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য। কেননা তারা নিজেদেরকে যাবতীয় কদর্য ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেছে। তাদের শেষ পরিণতি হলো আত্মসমর্পণ, মর্যাদা ও সম্মান। যদিও আত্মরক্ষা ও আত্মশুদ্ধির পথে চলতে গিয়ে প্রথম দিকে তাদেরকে নানারকম দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সৎকাজ ও নেকআমলের ওপর অটল অবিচল থাকতে গিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ
"তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। কিন্তু তোমাদের কাছে যা অপছন্দের, হতে পারে তা-ই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার কোনোকিছু হয়তো তোমাদের পছন্দের, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।" [১]
'অসৎকাজ ও বদআমল থেকে বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
"পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।" [২]
'আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন—
وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُونُ لَكُمْ
"আর তোমরা কামনা করছিলে এমন জিনিস যাতে কোনো রকম কণ্টক নেই, তা-ই তোমাদের ভাগে আসুক।"১।
'আসলে কি, যে ব্যক্তি আত্মরক্ষার পথ এড়িয়ে চলবে, তার জন্য নিকৃষ্ট পরিণতি অপেক্ষা করছে। আর যে মন্দ বিষয়াবলি পরিহার করার পাশাপাশি ভালো কিছু গ্রহণ করেছে, সে ওই লোকের তুলনায় উত্তম, যে কেবল মন্দ ত্যাগ করলেও ভালো কিছু এখনো গ্রহণ করেনি। কেননা অখাদ্য ত্যাগ করতে বলায় যদি খাদ্য গ্রহণই কেউ ছেড়ে দেয়, তাহলে তো অসুস্থতা নিশ্চিত। হুবহু দশা তারও, যে কুপথ ছেড়েছে তো ঠিক, কিন্তু সুপথ এখনো ধরেনি।'
আমি বললাম, 'শাইখ, আলোচনা থেকে যা বুঝলাম—আমার মনে হয় অনেকের বুঝই এমন—ভালো-মন্দ উভয়টা একত্রে পরিহার করা সমপর্যায়ের। বিষয়টি কি এমনই?'
শাইখ বললেন, 'না, বিষয়টি এমন নয়। আমি যা বোঝাতে চাইছি, আমি নিজেও যা বিশ্বাস করি এবং যা আমার কাছে একটি শক্তিশালী মূলনীতি, তা হলো—ভালো কিছু গ্রহণ করা মন্দ কিছু পরিহার করার তুলনায় উত্তম। যেমন খাবার খাওয়া অনাহারে থাকার চেয়ে উত্তম। এখানে প্রথমটি অপরিহার্য বলে মুখ্য আর দ্বিতীয়টি পারিপার্শ্বিক হবার কারণে গৌণ। সুস্থতাকালে রোগসৃষ্টিকারী উপকরণ এড়িয়ে চলা এবং রোগাক্রান্ত হলে রোগমুক্তির তদবির করা যেমন আবশ্যক, ঠিক তেমনি অন্তরস্থ ব্যাধির ক্ষেত্রে প্রথমত রোগ থেকে মুক্ত থাকতে হবে, উপরন্তু রোগাক্রান্ত হয়েই গেলে সুস্থ হওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।'
'লক্ষণীয় বিষয় হলো—সুস্থতা রক্ষিত হয় আরোগ্যের মাধ্যমে আর রোগ দূরীভূত হয় প্রতিষেধক প্রয়োগে। তাই ইলম ও ঈমান-পরিবর্ধক বিষয়াবলি মনে স্থান দিলে অন্তর সুস্থ থাকবে। যেমন : আল্লাহর স্মরণ, আখেরাতের ধ্যান ও অনুধাবন এবং শরিয়ত-নির্ধারিত কর্তব্য পালন। আবার এগুলো অন্তরের রোগব্যাধির জন্যও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। যেমন: বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনার মাধ্যমে সংশয়-সন্দেহ দূর হয়, হকের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে বাতিলের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয় এবং এই ঘৃণার দরুণ বাতিলের প্রতি মহব্বত দূর হয়。
'ইয়াহইয়া ইবনু আম্মার বলেছেন-“ইলম বা জ্ঞান পাঁচ প্রকার। প্রথম প্রকার হলো দ্বীনের প্রাণশক্তি স্বরূপ; যা কি না তাওহিদ তথা একত্ববাদের ইলম। দ্বিতীয় প্রকার হলো দ্বীনের খাদ্য স্বরূপ; যা কি না কুরআন ও হাদিস সংক্রান্ত ইলম। তৃতীয় প্রকার হলো দ্বীনের ওষুধ স্বরূপ; তা হলো সমসাময়িক সমস্যার সমাধান সংক্রান্ত ইলম বা ফতোয়ার ইলম। চতুর্থ প্রকার হলো দ্বীনের ব্যাধি স্বরূপ। যেমন: বিদআতিদের কার্যকলাপ। পঞ্চম প্রকার হলো দ্বীন ধ্বংসের কারণ। আর তা হলো জাদুবিদ্যা বা জাদু-সংক্রান্ত ইলম।”
'তো, যে কথাটি বললাম-সুস্থতা রক্ষিত হয় আরোগ্যের মাধ্যমে আর রোগ দূরীভূত হয় প্রতিষেধক প্রয়োগে। এটি শরীরের প্রাকৃতিক রোগের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি অন্তরের আত্মা, ধর্ম ও শরিয়ত সংক্রান্ত রোগের বেলায়ও সত্য। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ ، كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتَجُ الْبَهِيمَةَ ، هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ . ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ . رضى الله عنه - {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا } الآيَةَ.
“প্রত্যেক নবজাতক আপন ফিতরাতের (প্রকৃতির) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয় (পরে সেগুলোর নাক-কান কাটা হয়)। তোমরা কি এসবকে (জন্মগতভাবে) কানকাটা দেখেছ?” পরে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তিলাওয়াত করেন- ) فطرة الله الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا( “আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ করো, যে ফিতরাতের ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” [১]
'আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন-
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُونَ . وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ . ضَرَبَ لَكُم مَّثَلًا مِّنْ أَنفُسِكُمْ هَل لَّكُم مِّن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن شُرَكَاءَ فِي مَا رَزَقْنَاكُمْ فَأَنتُمْ فِيهِ سَوَاءٌ تَخَافُونَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ أَنفُسَكُمْ : كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ . بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ فَمَن يَهْدِي مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ . فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
“নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সব তাঁরই। সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে এনেছেন, এরপর তিনিই সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য খুবই সহজ। আকাশ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন—তোমাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীরা কি তাতে তোমাদের সমান সমান অংশীদার? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর, যেরূপ ভয় নিজেদের লোককে কর? এমনিভাবে আমি সমঝদার সম্প্রদায়ের জন্য সকল নিদর্শন সবিস্তার বর্ণনা করি। বরং যারা জালিম, তারা অজ্ঞতাবশত তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। অতএব, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কে বোঝাবে! তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই। আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটাই আল্লাহর ফিতরাত (প্রকৃতি), যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।”[১]
'উল্লিখিত হাদিস ও আয়াত থেকে প্রতিভাত হয়-আল্লাহ বান্দাকে তাঁর দিকে অভিমুখী হওয়ার প্রাকৃতিক গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর তা হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা-যার কোনো শরিক নেই।'
'এটাই হলো অন্তরের পরিমিত স্বাভাবিক ও সঠিক পদক্ষেপ। এর ব্যতিক্রম মহাঅন্যায়। কেউ তা করলে সে অজ্ঞাতসারেই প্রবৃত্তির অনুসারী বলে গণ্য হবে। এই ফিতরাত তথা স্বভাব ও প্রকৃতির জন্য এমন উপাদান অপরিহার্য যা তার নিজস্ব ইলম ও আমলকে পরিবর্ধন করবে। এজন্য সমগ্র দ্বীন-ইসলাম পরিপূর্ণ ফিতরাত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ শরিয়তের সজ্জায় সুসজ্জিত। আর এটিই হলো আল্লাহর দস্তরখান। যেমন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ كُلَّ آدِبٍ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى مَأْدُبَتُهُ ، وَإِنَّ مَأْدُبَةَ اللَّهِ هِيَ الْقُرْآنُ "প্রত্যেক মেজবান চায় তার ভোজসভায় মানুষ এসে মেহমানদারি গ্রহণ করুক; আর আল্লাহর মেহমানদারি হলো কুরআন।" [১]
'উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ তাআলার বৃষ্টি বর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। কুরআন ও হাদিসেও এই উপমা এসেছে। যা হোক, যারা স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা অন্তরকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, মনের ভেতর বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ঘটায়। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআন অবতীর্ণ করেছেন অন্তরের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শিফাস্বরূপ।'

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২১৬
[২] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৪০,৪১
[১] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ৭
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৮৫ ও ১৩৫৮; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৫৮
[১] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ২৫-৩০
[১] ফাযায়েলে কুরআন, ইমাম দারেমি (২৩২৪)। হাদিসের রাবীরা বিশ্বস্ত হলেও সনদে সামান্য বিচ্ছিন্নতা আছে। এই বর্ণনার সাথে ইমাম দারেমির বর্ণনার শব্দগত পার্থক্য আছে।

জানতে চেয়ে বললাম, ‘শাইখ, আপনার আলোচনা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবছি, হৃদয়স্থ যে-সকল ব্যাধির কথা আমরা জানলাম, এতে কেউ আক্রান্ত হলে কী উপায় হবে তার? কীভাবে সে চিকিৎসা নেবে, সেবা-শুশ্রূষা গ্রহণ করবে?’
শাইখ বললেন, ‘তোমরা যদি একশব্দে এর সমাধান চাও, তাহলে তার জবাব হবে “তাকওয়া”। হ্যাঁ, তাকওয়া বা পরহেজগারিতাই এ-সকল রোগের সর্বোত্তম প্রতিষেধক। তাকওয়া বলতে উদ্দেশ্য হলো—উপকারী কর্মের মাধ্যমে ক্ষতিকর সবকিছু থেকে আত্মরক্ষা করা। অর্থাৎ একই সাথে ভালো জিনিস গ্রহণ করতে হবে এবং মন্দ জিনিস পরিহার করতে হবে। অপরন্তু যে অনিষ্ট থেকে বাঁচতে চায়, তার জন্য উৎকৃষ্ট কিছু গ্রহণ করা অপরিহার্য। কখনো কখনো মানুষ ভালো কিছু গ্রহণ করার পাশাপাশি খারাপটাও চেখে দেখে। এমন হলে সেটাকে আর ‘হাবলো তাকওয়া’ বলা যাবে না। আবার ভালো-মন্দ উভয়টা একত্রে পরিহার কর'ও সম্ভব না। কেননা মানুষ যখন দীর্ঘ সময় খাবারশূন্য থাকে, তখন ক্ষুধার তাড়নায় অখাদ্য-কুখাদ্য যা-ই সামনে পড়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে, যা হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এমনকি হতে পারে প্রাণনাশক। এমনটি করা যাবে না। এজন্যই আখেরাতের উত্তম প্রতিফল ও প্রকৃষ্ট প্রতিদান কেবল তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য। কেননা তারা নিজেদেরকে যাবতীয় কদর্য ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেছে। তাদের শেষ পরিণতি হলো আত্মসমর্পণ, মর্যাদা ও সম্মান। যদিও আত্মরক্ষা ও আত্মশুদ্ধির পথে চলতে গিয়ে প্রথম দিকে তাদেরকে নানারকম দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সৎকাজ ও নেকআমলের ওপর অটল অবিচল থাকতে গিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ
"তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। কিন্তু তোমাদের কাছে যা অপছন্দের, হতে পারে তা-ই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার কোনোকিছু হয়তো তোমাদের পছন্দের, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।" [১]
'অসৎকাজ ও বদআমল থেকে বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
"পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।" [২]
'আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন—
وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُونُ لَكُمْ
"আর তোমরা কামনা করছিলে এমন জিনিস যাতে কোনো রকম কণ্টক নেই, তা-ই তোমাদের ভাগে আসুক।"[১]।
'আসলে কি, যে ব্যক্তি আত্মরক্ষার পথ এড়িয়ে চলবে, তার জন্য নিকৃষ্ট পরিণতি অপেক্ষা করছে। আর যে মন্দ বিষয়াবলি পরিহার করার পাশাপাশি ভালো কিছু গ্রহণ করেছে, সে ওই লোকের তুলনায় উত্তম, যে কেবল মন্দ ত্যাগ করলেও ভালো কিছু এখনো গ্রহণ করেনি। কেননা অখাদ্য ত্যাগ করতে বলায় যদি খাদ্য গ্রহণই কেউ ছেড়ে দেয়, তাহলে তো অসুস্থতা নিশ্চিত। হুবহু দশা তারও, যে কুপথ ছেড়েছে তো ঠিক, কিন্তু সুপথ এখনো ধরেনি।'
আমি বললাম, 'শাইখ, আলোচনা থেকে যা বুঝলাম—আমার মনে হয় অনেকের বুঝই এমন—ভালো-মন্দ উভয়টা একত্রে পরিহার করা সমপর্যায়ের। বিষয়টি কি এমনই?'
শাইখ বললেন, 'না, বিষয়টি এমন নয়। আমি যা বোঝাতে চাইছি, আমি নিজেও যা বিশ্বাস করি এবং যা আমার কাছে একটি শক্তিশালী মূলনীতি, তা হলো—ভালো কিছু গ্রহণ করা মন্দ কিছু পরিহার করার তুলনায় উত্তম। যেমন খাবার খাওয়া অনাহারে থাকার চেয়ে উত্তম। এখানে প্রথমটি অপরিহার্য বলে মুখ্য আর দ্বিতীয়টি পারিপার্শ্বিক হবার কারণে গৌণ। সুস্থতাকালে রোগসৃষ্টিকারী উপকরণ এড়িয়ে চলা এবং রোগাক্রান্ত হলে রোগমুক্তির তদবির করা যেমন আবশ্যক, ঠিক তেমনি অন্তরস্থ ব্যাধির ক্ষেত্রে প্রথমত রোগ থেকে মুক্ত থাকতে হবে, উপরন্তু রোগাক্রান্ত হয়েই গেলে সুস্থ হওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।'
'লক্ষণীয় বিষয় হলো—সুস্থতা রক্ষিত হয় আরোগ্যের মাধ্যমে আর রোগ দূরীভূত হয় প্রতিষেধক প্রয়োগে। তাই ইলম ও ঈমান-পরিবর্ধক বিষয়াবলি মনে স্থান দিলে অন্তর সুস্থ থাকবে। যেমন : আল্লাহর স্মরণ, আখেরাতের ধ্যান ও অনুধাবন এবং শরিয়ত-নির্ধারিত কর্তব্য পালন। আবার এগুলো অন্তরের রোগব্যাধির জন্যও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। যেমন: বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনার মাধ্যমে সংশয়-সন্দেহ দূর হয়, হকের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে বাতিলের প্রতি ঘৃণা তৈরি হয় এবং এই ঘৃণার দরুণ বাতিলের প্রতি মহব্বত দূর হয়।
'ইয়াহইয়া ইবনু আম্মার বলেছেন-“ইলম বা জ্ঞান পাঁচ প্রকার। প্রথম প্রকার হলো দ্বীনের প্রাণশক্তি স্বরূপ; যা কি না তাওহিদ তথা একত্ববাদের ইলম। দ্বিতীয় প্রকার হলো দ্বীনের খাদ্য স্বরূপ; যা কি না কুরআন ও হাদিস সংক্রান্ত ইলম। তৃতীয় প্রকার হলো দ্বীনের ওষুধ স্বরূপ; তা হলো সমসাময়িক সমস্যার সমাধান সংক্রান্ত ইলম বা ফতোয়ার ইলম। চতুর্থ প্রকার হলো দ্বীনের ব্যাধি স্বরূপ। যেমন: বিদআতিদের কার্যকলাপ। পঞ্চম প্রকার হলো দ্বীন ধ্বংসের কারণ। আর তা হলো জাদুবিদ্যা বা জাদু-সংক্রান্ত ইলম।”
'তো, যে কথাটি বললাম-সুস্থতা রক্ষিত হয় আরোগ্যের মাধ্যমে আর রোগ দূরীভূত হয় প্রতিষেধক প্রয়োগে। এটি শরীরের প্রাকৃতিক রোগের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি অন্তরের আত্মা, ধর্ম ও শরিয়ত সংক্রান্ত রোগের বেলায়ও সত্য। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ ، كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتَجُ الْبَهِيمَةَ ، هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ . ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ . رضى الله عنه - {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا } الآيَةَ.
“প্রত্যেক নবজাতক আপন ফিতরাতের (প্রকৃতির) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয় (পরে সেগুলোর নাক-কান কাটা হয়)। তোমরা কি এসবকে (জন্মগতভাবে) কানকাটা দেখেছ?” পরে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তিলাওয়াত করেন- ) فطرة الله الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا( “আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ করো, যে ফিতরাতের ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” [১]
'আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন-
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُونَ . وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ . ضَرَبَ لَكُم مَّثَلًا مِّنْ أَنفُسِكُمْ هَل لَّكُم مِّن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن شُرَكَاءَ فِي مَا رَزَقْنَاكُمْ فَأَنتُمْ فِيهِ سَوَاءٌ تَخَافُونَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ أَنفُسَكُمْ : كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ . بَلِ اتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَهْوَاءَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ فَمَن يَهْدِي مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَا لَهُم مِّن نَّاصِرِينَ . فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
“নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সব তাঁরই। সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে এনেছেন, এরপর তিনিই সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য খুবই সহজ। আকাশ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে একটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন—তোমাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীরা কি তাতে তোমাদের সমান সমান অংশীদার? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর, যেরূপ ভয় নিজেদের লোককে কর? এমনিভাবে আমি সমঝদার সম্প্রদায়ের জন্য সকল নিদর্শন সবিস্তার বর্ণনা করি। বরং যারা জালিম, তারা অজ্ঞতাবশত তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। অতএব, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কে বোঝাবে! তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই। আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটাই আল্লাহর ফিতরাত (প্রকৃতি), যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।”[১]
'উল্লিখিত হাদিস ও আয়াত থেকে প্রতিভাত হয়-আল্লাহ বান্দাকে তাঁর দিকে অভিমুখী হওয়ার প্রাকৃতিক গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আর তা হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা-যার কোনো শরিক নেই।'
'এটাই হলো অন্তরের পরিমিত স্বাভাবিক ও সঠিক পদক্ষেপ। এর ব্যতিক্রম মহাঅন্যায়। কেউ তা করলে সে অজ্ঞাতসারেই প্রবৃত্তির অনুসারী বলে গণ্য হবে। এই ফিতরাত তথা স্বভাব ও প্রকৃতির জন্য এমন উপাদান অপরিহার্য যা তার নিজস্ব ইলম ও আমলকে পরিবর্ধন করবে। এজন্য সমগ্র দ্বীন-ইসলাম পরিপূর্ণ ফিতরাত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ শরিয়তের সজ্জায় সুসজ্জিত। আর এটিই হলো আল্লাহর দস্তরখান। যেমন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ كُلَّ آدِبٍ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى مَأْدُبَتُهُ ، وَإِنَّ مَأْدُبَةَ اللَّهِ هِيَ الْقُرْآنُ "প্রত্যেক মেজবান চায় তার ভোজসভায় মানুষ এসে মেহমানদারি গ্রহণ করুক; আর আল্লাহর মেহমানদারি হলো কুরআন।" [১]
'উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ তাআলার বৃষ্টি বর্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। কুরআন ও হাদিসেও এই উপমা এসেছে। যা হোক, যারা স্বভাব-প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা অন্তরকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, মনের ভেতর বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ঘটায়। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআন অবতীর্ণ করেছেন অন্তরের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শিফাস্বরূপ।'

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২১৬
[২] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৪০,৪১
[১] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ৭
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৮৫ ও ১৩৫৮; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৫৮
[১] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ২৫-৩০
[১] ফাযায়েলে কুরআন, ইমাম দারেমি (২৩২৪)। হাদিসের রাবীরা বিশ্বস্ত হলেও সনদে সামান্য বিচ্ছিন্নতা আছে। এই বর্ণনার সাথে ইমাম দারেমির বর্ণনার শব্দগত পার্থক্য আছে।

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও থাকে শিফা

📄 দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও থাকে শিফা


আমি মনে মনে বললাম, 'শাইখ ফিতরাত সংক্রান্ত হাদিসের যে ব্যাখ্যা করলেন, এতে সূক্ষ্ম একটি আপত্তি রয়ে গেছে। বিষয়টি আসলে ভাবনারও বটে। এরই মধ্যে শাইখ আপত্তি উঠতে পারে এমন একটি বিষয়ে আলোচনা তুললেন। বিষয়টি হলো-আল্লাহ-প্রদত্ত ফিতরাত তথা স্বভাব-প্রকৃতির ওপর অবিচল থাকার পরও মুমিনরা কেন বিপদ-আপদে আক্রান্ত হয়?
শাইখ কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, 'মুমিনরা যে-সকল বিপদ-আপদ দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হয় এর একটি ভালো দিক হলো, এর মাধ্যমে যাবতীয় পঙ্কিলতা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে বান্দা জান্নাতের জন্য প্রস্তুত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنُ مِنْ وَصَبٍ وَلَا نَصَبٍ وَلَا هَمْ وَلَا حُزْنٍ وَلَا غَمِّ وَلَا أَذًى حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا خَطَايَاهُ
"মুমিন যে দুঃখ-দুর্দশা, চিন্তা-ভাবনা, কষ্ট-যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়, এমনকি তার পায়ে যদি একটি কাঁটাও ফুটে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।"[১]
'এর সত্যায়ন পাওয়া যায় কুরআন খুললে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
مَن يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ
| “যে-কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে।”[২]
'এখন কেউ যদি এতসব রোগব্যাধি থেকে দুনিয়াতে পরিশুদ্ধ না হয়, বরং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তাকে আখেরাতে রোগমুক্ত হতে হবে। তাই আল্লাহ তাকে শুদ্ধির নিমিত্তে শাস্তি দেবেন। যেমন কেউ যদি একসঙ্গে একাধিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, উপরন্তু রোগ উপশমের জন্য কোনো ঔষধ সেবন না করে, অনন্তর আরও রোগ জমতে থাকে, তাহলে তার মৃত্যু দ্রুত অনিবার্য। আসারে বর্ণিত হয়েছে-
إِذا قَالُوا الْمَرِيضِ اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ يَقُوْلُ اللهُ كَيْفَ أَرْحَمُهُ مِنْ شَيْءٍ بِهِ أَرْحَمُهُ
"রুগ্ন ব্যক্তির জন্য যখন দুআ হিসেবে অন্যরা বলে, 'হে আল্লাহ আপনি তার প্রতি রহম করুন!' তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি যেভাবে তার প্রতি রহম করেছি, তা থেকে আবার কীভাবে রহম করব?”
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الْمَرَضُ حِطَّةٌ يَحُطُّ الْخَطَايَا عَنْ صَاحِبِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ الْيَابِسَةُ وَرَقَهَا "অসুস্থতা হলো অসুস্থ ব্যক্তির পাপমোচন করে, যেমন মৃত গাছ থেকে পাতাসমূহ ঝরে পড়ে।" [১]
'বিভিন্ন শারীরিক রোগব্যাধি- যেমন প্লেগ, ডায়রিয়া, মানসিক, ভারসাম্যহীনতা, ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মুত্যুবরণ করলে সে শহিদি মর্যাদা লাভ করবে। অনুরূপভাবে কেউ পানিতে ডুবে কিংবা আগুনে পুড়ে অথবা ধ্বংসস্তুপের নিচে পড়ে মারা গেলেও শহিদ বলে গণ্য হবে।'
'তো, শারীরিক ব্যাধির মতো আত্মিক যে সকল ব্যাধি রয়েছে তাতে আক্রান্ত হয়ে যদি কেউ আল্লাহকে ভয় করে ও ধৈর্যধারণ করে এমতাবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে শহিদি মর্যাদা পাবে, ঠিক যেমন একজন ভীতসন্ত্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে রণাঙ্গনে ধৈর্য ধরে আমৃত্যু জিহাদ করে শহিদ হয়ে থাকে।'
'এর কারণ হলো-কার্পণ্য ও ভীরুতা আত্মিক ব্যাধি। কেউ এইসব ব্যাধিকে পাত্তা দিলে মনে একরকম যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়, আবার না দিলেও যাতনা পোহাতে হয়। ঠিক যেমন শারীরিক রোগের বেলায় হয়ে থাকে। এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত কথিত প্রেম-ভালোবাসা-সে আলোচনা যদিও গত হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, কেউ যদি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে, তথাপি নিজেকে পবিত্র রাখতে চেষ্টা করে, বিষয়টি গোপন রাখে, ধৈর্যধারণ করে এবং এমতাবস্থায় মারাও যায়, তাহলে সে শহিদ বলে গণ্য হবে। এর কারণ হিসেবে এ-ও বলা হয়েছিল, এসব প্রেম-ভালোবাসা হলো অন্তরের ব্যাধি, যা মানুষকে ক্ষতির দিকে টেনে নেয়। ঠিক যেমন অসুস্থ ব্যক্তিকে রোগব্যাধি ক্ষতির মুখোমুখি করে। তো, কেউ যদি প্রেমাসক্ত হয় এবং সেই আসক্তিকে মনে স্থান দেয়, তাহলে দুনিয়া-আখেরাতে তাকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, এই আশঙ্কা আছে। আর যদি সে এটাকে পাত্তা না দেয়, গোপন রাখে, নিজেকে হেফাজতে রাখে, তবুও তাকে কষ্ট পেতে হয়; কিন্তু এই কষ্টাবস্থায় মারা গেলেও শহিদি মৃত্যু হবার আশা করা যায়। এখানে মূলত যে বিষয়টি ঘটে তা হলো, এসব প্রেমাসক্তি তাকে জাহান্নামে নেওয়ার ব্যবস্থা করে, আর সে মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেকে তা থেকে হেফাজত করে। ঠিক যেমন ভীরুতা মানুষকে জান্নাত থেকে বাধা দেয়, কিন্তু সে তা পরোয়া না করে নিজেকে জিহাদের ময়দানে নিয়ে যায় এবং শহিদ হয়ে নিজেকে জান্নাতের উপযুক্ত করে।'
'তো, এই সকল রোগে আক্রান্ত হয়েও যদি কেউ নিজের ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে সে ওই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবে, যাদের সম্পর্কে নবীজি বলেছেন-
لَا يَقْضِي اللهُ لِلْمُؤْمِنِ قَضَاءً إِلَّا كَانَ خَيْرًا لَّهُ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ فَشَكَرَ كَانَ خَيْرًا لَّهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ فَصَبَرَ كَانَ خَيْرًا لَّهُ
“মুমিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যে ফয়সালাই করুন না কেন, নিঃসন্দেহে তা কল্যাণকর। যদি সে কখনো সুসময় অতিক্রম করে এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আবার যদি কখনো বিপদগ্রস্ত হয় এবং তাতে ধৈর্যধারণ করে, তবে সেটাও তার জন্য কল্যাণকরই হয়।”[১]
'সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবি ﷺ ও তাঁর সকল সাহাবীর ওপর।'
শাইখের মজলিস আজকের মতো এখানেই শেষ। কিন্তু মজলিস শেষ হলেও সকলের মনে একই কামনা—আল্লাহ তাআলা যেন আবার আমাদেরকে শাইখের মজলিসে সমবেত হওয়ার তাওফিক দেন এবং তাঁর থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দেন।

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫৬৪১, ৫৬৪২; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৫৭৩।
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ১২৩
[১] আল-মুজামুল কাবির, তাবরানি, হাদিস-ক্রম: ১০০২; সহিহ-আলবানি। হাদিসটির বিভিন্ন শাওয়াহেদ আছে।
[১] জামিউল উসুল, হাদিস-ক্রম: ৭০১২; শব্দগত তারতম্য আছে।

আমি মনে মনে বললাম, 'শাইখ ফিতরাত সংক্রান্ত হাদিসের যে ব্যাখ্যা করলেন, এতে সূক্ষ্ম একটি আপত্তি রয়ে গেছে। বিষয়টি আসলে ভাবনারও বটে। এরই মধ্যে শাইখ আপত্তি উঠতে পারে এমন একটি বিষয়ে আলোচনা তুললেন। বিষয়টি হলো-আল্লাহ-প্রদত্ত ফিতরাত তথা স্বভাব-প্রকৃতির ওপর অবিচল থাকার পরও মুমিনরা কেন বিপদ-আপদে আক্রান্ত হয়?
শাইখ কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, 'মুমিনরা যে-সকল বিপদ-আপদ দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হয় এর একটি ভালো দিক হলো, এর মাধ্যমে যাবতীয় পঙ্কিলতা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে বান্দা জান্নাতের জন্য প্রস্তুত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنُ مِنْ وَصَبٍ وَلَا نَصَبٍ وَلَا هَمْ وَلَا حُزْنٍ وَلَا غَمِّ وَلَا أَذًى حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا خَطَايَاهُ
"মুমিন যে দুঃখ-দুর্দশা, চিন্তা-ভাবনা, কষ্ট-যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়, এমনকি তার পায়ে যদি একটি কাঁটাও ফুটে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।"[১]
'এর সত্যায়ন পাওয়া যায় কুরআন খুললে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
مَن يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ
| “যে-কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে।”[২]
'এখন কেউ যদি এতসব রোগব্যাধি থেকে দুনিয়াতে পরিশুদ্ধ না হয়, বরং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তাকে আখেরাতে রোগমুক্ত হতে হবে। তাই আল্লাহ তাকে শুদ্ধির নিমিত্তে শাস্তি দেবেন। যেমন কেউ যদি একসঙ্গে একাধিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, উপরন্তু রোগ উপশমের জন্য কোনো ঔষধ সেবন না করে, অনন্তর আরও রোগ জমতে থাকে, তাহলে তার মৃত্যু দ্রুত অনিবার্য। আসারে বর্ণিত হয়েছে-
إِذا قَالُوا الْمَرِيضِ اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ يَقُوْلُ اللهُ كَيْفَ أَرْحَمُهُ مِنْ شَيْءٍ بِهِ أَرْحَمُهُ
"রুগ্ন ব্যক্তির জন্য যখন দুআ হিসেবে অন্যরা বলে, 'হে আল্লাহ আপনি তার প্রতি রহম করুন!' তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি যেভাবে তার প্রতি রহম করেছি, তা থেকে আবার কীভাবে রহম করব?”
'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الْمَرَضُ حِطَّةٌ يَحُطُّ الْخَطَايَا عَنْ صَاحِبِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ الْيَابِسَةُ وَرَقَهَا "অসুস্থতা হলো অসুস্থ ব্যক্তির পাপমোচন করে, যেমন মৃত গাছ থেকে পাতাসমূহ ঝরে পড়ে।" [১]
'বিভিন্ন শারীরিক রোগব্যাধি- যেমন প্লেগ, ডায়রিয়া, মানসিক, ভারসাম্যহীনতা, ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মুত্যুবরণ করলে সে শহিদি মর্যাদা লাভ করবে। অনুরূপভাবে কেউ পানিতে ডুবে কিংবা আগুনে পুড়ে অথবা ধ্বংসস্তুপের নিচে পড়ে মারা গেলেও শহিদ বলে গণ্য হবে।'
'তো, শারীরিক ব্যাধির মতো আত্মিক যে সকল ব্যাধি রয়েছে তাতে আক্রান্ত হয়ে যদি কেউ আল্লাহকে ভয় করে ও ধৈর্যধারণ করে এমতাবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে শহিদি মর্যাদা পাবে, ঠিক যেমন একজন ভীতসন্ত্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে রণাঙ্গনে ধৈর্য ধরে আমৃত্যু জিহাদ করে শহিদ হয়ে থাকে।'
'এর কারণ হলো-কার্পণ্য ও ভীরুতা আত্মিক ব্যাধি। কেউ এইসব ব্যাধিকে পাত্তা দিলে মনে একরকম যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়, আবার না দিলেও যাতনা পোহাতে হয়। ঠিক যেমন শারীরিক রোগের বেলায় হয়ে থাকে। এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত কথিত প্রেম-ভালোবাসা-সে আলোচনা যদিও গত হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, কেউ যদি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে, তথাপি নিজেকে পবিত্র রাখতে চেষ্টা করে, বিষয়টি গোপন রাখে, ধৈর্যধারণ করে এবং এমতাবস্থায় মারাও যায়, তাহলে সে শহিদ বলে গণ্য হবে। এর কারণ হিসেবে এ-ও বলা হয়েছিল, এসব প্রেম-ভালোবাসা হলো অন্তরের ব্যাধি, যা মানুষকে ক্ষতির দিকে টেনে নেয়। ঠিক যেমন অসুস্থ ব্যক্তিকে রোগব্যাধি ক্ষতির মুখোমুখি করে। তো, কেউ যদি প্রেমাসক্ত হয় এবং সেই আসক্তিকে মনে স্থান দেয়, তাহলে দুনিয়া-আখেরাতে তাকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, এই আশঙ্কা আছে। আর যদি সে এটাকে পাত্তা না দেয়, গোপন রাখে, নিজেকে হেফাজতে রাখে, তবুও তাকে কষ্ট পেতে হয়; কিন্তু এই কষ্টাবস্থায় মারা গেলেও শহিদি মৃত্যু হবার আশা করা যায়। এখানে মূলত যে বিষয়টি ঘটে তা হলো, এসব প্রেমাসক্তি তাকে জাহান্নামে নেওয়ার ব্যবস্থা করে, আর সে মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেকে তা থেকে হেফাজত করে। ঠিক যেমন ভীরুতা মানুষকে জান্নাত থেকে বাধা দেয়, কিন্তু সে তা পরোয়া না করে নিজেকে জিহাদের ময়দানে নিয়ে যায় এবং শহিদ হয়ে নিজেকে জান্নাতের উপযুক্ত করে।'
'তো, এই সকল রোগে আক্রান্ত হয়েও যদি কেউ নিজের ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে সে ওই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবে, যাদের সম্পর্কে নবীজি বলেছেন-
لَا يَقْضِي اللهُ لِلْمُؤْمِنِ قَضَاءً إِلَّا كَانَ خَيْرًا لَّهُ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ فَشَكَرَ كَانَ خَيْرًا لَّهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ فَصَبَرَ كَانَ خَيْرًا لَّهُ
“মুমিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যে ফয়সালাই করুন না কেন, নিঃসন্দেহে তা কল্যাণকর। যদি সে কখনো সুসময় অতিক্রম করে এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে, তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আবার যদি কখনো বিপদগ্রস্ত হয় এবং তাতে ধৈর্যধারণ করে, তবে সেটাও তার জন্য কল্যাণকরই হয়।”[১]
'সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয়নবি ﷺ ও তাঁর সকল সাহাবীর ওপর।'

টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫৬৪১, ৫৬৪২; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৫৭৩।
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ১২৩
[১] আল-মুজামুল কাবির, তাবরানি, হাদিস-ক্রম: ১০০২; সহিহ-আলবানি। হাদিসটির বিভিন্ন শাওয়াহেদ আছে。
[১] জামিউল উসুল, হাদিস-ক্রম: ৭০১২; শব্দগত তারতম্য আছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00