📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 আল্লাহর গোলামির মধ্যেই শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা নিহিত

📄 আল্লাহর গোলামির মধ্যেই শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা নিহিত


'যখন রবের দয়া ও করুণার প্রতি বান্দার প্রত্যাশা দৃঢ় থেকে সুদৃঢ় হয়, যখন বান্দার মনে এই প্রত্যয় স্থিতি লাভ করে যে, আল্লাহই তার দুঃখ-দুর্দশা দূর করবেন, তিনিই যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করবেন, তখন রবের প্রতি বান্দার দাসত্ব ও আনুগত্যের স্তর অনেক ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়, বহুগুণে বৃদ্ধি পায় সৃষ্টিকুল থেকে তার অমুখাপেক্ষিতা ও নির্লিপ্ততা। কিন্তু কারও আশা-ভরসা মাখলুক কেন্দ্রিক হলে, মনে গাইরুল্লাহর প্রতি বশ্যতা ও বাধ্যতা সৃষ্টি হবে। অবশ্য কোনোভাবে এসব থেকে বিমুখ থাকতে পারলে অন্তরের স্বচ্ছলতা এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে, তখন আর নিজেকে কারও কাছে ছোট মনে হবে না। জ্ঞানীরা বলেন-“কারও সমকক্ষ হতে চাইলে তার থেকে অমুখাপেক্ষী হও; কারও কাছে বড় হতে চাইলে, তার প্রতি অনুগ্রহ করো; আর কারও অধীন হতে চাইলে, তার দিকে হাত বাড়াও।”
'মূল কথা হলো—বান্দার ভরসাস্থল আল্লাহ হলে তার দাসত্ব ও আনুগত্যের স্তর সমুন্নত হয়। আর গাইরুল্লাহর কাছে নতজানু হলে খোদাভক্তি ও বন্দেগি থেকে সে বহুদূরে সরে যায়। বিশেষত যার জীবনের লক্ষ্য খালেক নয়, বরং মাখলুক, তার কথা তো বলাই বাহুল্য। এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে যার ভরসাস্থল হলো তার প্রভাব-প্রতিপত্তি, সহায়-সম্পত্তি, সৈন্য-অনুসারী, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব; যে নির্ভরশীল তার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, রাজ্য-রাজত্ব, যোগ্যতা-সক্ষমতা, নেতা-সমর্থকসহ আরও অনেকের ওপর, যাদের কেউ হয়তো মৃত্যুবরণ করেছে, আর কেউ হয়তো করবে। অথচ সে আস্থা রাখতে পারত চিরঞ্জীব সত্তার ওপর। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে—
وَ تَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوْتُ وَ سَبِّحْ بِحَمْدِهِ ، وَ كَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا
'আপনি সেই চিরঞ্জীব সত্তার ওপর ভরসা করুন, যিনি অমর এবং তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করুন। বান্দার পাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।”” [১]
আমি মনে মনে বলছিলাম, সুবহানাল্লাহ! শাইখ তো এ যুগের অধিকাংশ মানুষের সার্বিক অবস্থা একেবারে হুবহু বলে দিলেন! নিঃসন্দেহে শাইখ যে কথাগুলো বলে গেলেন, সেসব কেবল কোনো বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ফকীহর পক্ষেই বলা সম্ভব। এবং এমন কারো পক্ষেই সম্ভব, যিনি অন্তরের রোগব্যাধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। পাঠক! আসুন আমরা শাইখের কথা শুনতে থাকি। শুধু শুনলেই হবে না, বরং সম্ভব হলে সোনার হরফে লিখে খাঁটি সোনার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চেষ্টা করি।
শাইখ বলছিলেন, 'কারও মনে যদি মাখলুকের প্রতি এই প্রত্যয় ও প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, তারা তাকে বিপদে সাহায্য করবে, প্রয়োজনে রিজিকের ব্যবস্থা করবে এবং সর্বদা দেখভাল করবে, তাহলে নিজের অজান্তেই সে তাদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং আশানুপাতে তার অন্তরে তাদের প্রতি বশ্যতা ও বাধ্যতা জন্ম নেয়। যদিও বাহ্যত তাকে মনে হবে নির্দেশক কিংবা পরিচালক, বস্তুত তার হৃদয়জুড়ে কেবলই অন্যের তোষামোদ। কিন্তু বুদ্ধিমান তো শুধু চর্মচক্ষু দিয়ে দেখে না, দেখে অন্তর্চক্ষু দিয়েও। তাই তার কাছে বাস্তবতা ধরা পড়ে, যদিও তা থাকে হাজারও আবরণে ঢাকা।'
'দেখো! কারও মন যদি কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যদি এটি তার জন্য বৈধও হয়, তবুও এই 'আসক্তিটা' ভালো নয়; বরং ক্ষতিকর। এই আসক্তির কারণে সে ওই নারীর হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হবে, যা বলবে তাই শুনবে, চোখের ইশারায় উঠবে, বসবে। বাহ্যত যদিও সে তার কর্তা, যেহেতু সে স্বামী, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে তার কারাগারে বন্দী, বা টাকায় কেনা গোলামের মতো।
'আর যদি স্বামীর মন স্ত্রীকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়, যদি সে তার প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়, তার কোনো বিকল্প সে ভাবতেই না পারে, তখন এই স্ত্রী তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষমতাধর মনিব ও অত্যাচারী আমিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সে কোনোভাবেই তার ওই বলয় থেকে বের হতে পারে না। এমনকি এর থেকেও ভয়ংকর পরিস্থিতি হতে পারে। কেননা মানসিক গোলামি শারীরিক গোলামির চেয়েও ভয়ংকর; আত্মিক দাসত্ব দৈহিক দাসত্বের চেয়েও নিকৃষ্ট। এর কারণ হলো কেউ যদি শারীরিকভাবে কারও গোলামে পরিণত হয়, অথচ মন তার দাসত্ব মেনে না নেয়, তবে দাসত্ব সত্ত্বেও তার মনে স্বস্তি ও শান্তি থাকবে; তার দিকে সে তেমন ভ্রুক্ষেপই করবে না। এমনকি সে ওই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা-কৌশল অব্যাহত রাখবে। এজন্য মানুষের অন্তর, যা কিনা প্রকৃত মালিক—সেই অন্তরই যদি গাইরুল্লাহর দাসে পরিণত হয়, তবে সেটাই হবে চূড়ান্ত দাসত্ব ও বন্দিত্ব; কেননা অন্তর এই দাসত্ব গ্রহণ করে নিয়েছে।'
'অন্তরের দাসত্ব ও বন্দিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে পাপ ও পুণ্যের হিসেবও হয়ে থাকে। কেননা কোনো মুসলিম যদি কোনো কাফিরের হাতে বন্দী হয়, অথবা পাপাচারী যদি তাকে অন্যায়ভাবে গোলাম বানায়, প্রত্যক্ষভাবে এটি খারাপ দেখালেও পরোক্ষভাবে এতে ক্ষতির কিছু নেই, যদি সে তার সাধ্যমতো আবশ্যকীয় আমলগুলো করতে থাকে। আর যদি কেউ সঙ্গত কারণে গোলামে পরিণত হয় এবং এরপর সে আল্লাহ ও তার মনিবের হক আদায় করে, তবে সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। যদি কাউকে কুফরি-কালামের ওপর বাধ্য করা হয়, এদিকে তার মন-মস্তিষ্কে ঈমান ও বিশ্বাস থাকে ভরপুর, তবে এতে সমস্যার কিছু নেই। অন্যদিকে কারও মন যদি গাইরুল্লাহর দাসে পরিণত হয়, তবে সেটি নিতান্তই ক্ষতির, বাহ্যত সে যত বড় রাজা-বাদশাই হোক না কেন।'
সুতীক্ষ্ণ শব্দের ঝংকার ও অনুপম বাক্যের মালা গেঁথে শাইখ তাঁর প্রাঞ্জল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কথার মিষ্টতায় কখন যে হারিয়ে গেছি, নিজেই জানি না। চারপাশের নিস্তব্ধতায় মনে হলো, আমি বুঝি একাই এই মজলিসে। সত্যতা যাচাই করতে ডানে-বাঁয়ে তাকালাম, দেখি, আমি একা না, সবার অবস্থাই এমন। যেন সবার মাথায় পাখি বসে আছে। হবেই বা না কেন; শাইখের এই বক্তব্য যদি পৃথিবীবাসী শুনত, তবে সকলেই সকল সমস্যার সমাধান পেয়ে যেত।
শাইখ বলছিলেন, 'প্রকৃত স্বাধীনতা হলো মনের স্বাধীনতা। এমনিভাবে প্রকৃত পরাধীনতাও হলো মনের পরাধীনতা। যেমন মনের ধনাঢ্যতাই আসল ধনাঢ্যতা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
"সম্পদের আধিক্য নয়, বরং অন্তরে ধনাঢ্যতাই আসল ধনাঢ্যতা।"[১]
'আমি কসম করে বলতে পারি—এই যে ক্ষয়ক্ষতির কথা আমি বললাম, এসব তো কেবল বৈধ কিছুর প্রতি আসক্তির ফলেই ঘটে, আর যদি কেউ অবৈধ কিছুর প্রতি আসক্ত হয়, যেমন কোনো পরনারী কিংবা না-বালেগ বালক, তাহলে সে দুনিয়াতেই এমন এমন শাস্তির সম্মুখীন হবে, যা থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাওয়া সম্ভব হবে না। আর যারা এই ধরনের ফিতনায় পতিত হয়, তারা একদিকে যেমন শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, অপরদিকে তাদের সওয়াবের ঝুলিও থাকে শূন্য। কেননা কোনো প্রেমিক যখন প্রেমাস্পদের রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি আসক্ত হয়, তার মন তখন সে-দিকেই ঝুঁকে থাকে। শুধু প্রেম বা আসক্তিই নয়, বরং সে তার দাসত্ব ও বশ্যতা বরণ করে নেয়। এতে করে তার থেকে এত পরিমাণ মন্দ কাজ ঘটতে থাকে, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গুণে শেষ করতে পারবে না। হ্যাঁ, হতে পারে সে কোনোভাবে নোংরামি ও অশ্লীলতা বেঁচে থাকল, কিন্তু দীর্ঘদিন (অবৈধ) প্রেমাস্পদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা অশ্লীলতার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কেউ যদি কোনো গুনাহ করার পর তাওবা করে, তাহলে তার হৃদয় থেকে ওই গুনাহের প্রতিক্রিয়া দূর হয়ে যায়। কিন্তু এমন লোকদের অবস্থা হলো নেশাগ্রস্ত ও মানসিক ভারসাম্যহীন লোকদের মতো। কবি বলেন—
"প্রবৃত্তির নেশা ও মদের নেশা তো একই, নেশাগ্রস্ত কারও হুঁশ ফিরে কি কখনোই?”
'কবি আরও বলেন—
“তারা বলে : প্রেমে পড়ে পাগল হয়ে গেছ তো তুমি! আমি বলি : প্রেমাসক্তি তো পাগলামির চেয়েও বেশি। প্রেমে পাগল যে, যুগযুগান্তরে পাগলামি কাটে না তার, সাধারণ পাগলামি কেটে যাবে হয়তো আজ, নয়তো কাল।”
একটানা দীর্ঘ আলোচনার পর শাইখ থামলেন। আমরা বুঝতে পারলাম, তিনি আজকের মতো এখানেই শেষ করতে চাচ্ছেন। তবুও আমি বলে ফেললাম—‘মুহতারাম শাইখ! শেষোক্ত বিষয়টিতে যদি আরেকটু বিস্তারিত আলোকপাত করতেন, তবে হয়তো আমার মতো অনেকেই উপকৃত হতো। এ বিষয়ে আসলে আমরা সকলেই খুব কম জানি; কিন্তু বুঝি, জানাটা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন।'
শাইখ বললেন, 'আল্লাহ সহায় হলে এ বিষয়ে তোমাদের নিয়ে আগামী মজলিসে সবিস্তর আলোচনা করব। সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবীজির প্রতি।'

টিকাঃ
[১] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৪৪৬; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৫১; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৭৩১৬; বুখারি ও মুসলিমে إِنَّمَا এর স্থলে وَلَكِنَّ রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00