📄 মানুষ স্বীয় প্রবৃত্তির পূজারী
'মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের নিরূপক হলো তার ঈমানের স্বরূপ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের শ্রেণী দুটি—খাস ও আম, তথা বিশেষ ও সাধারণ। মুমিনদের এই বিভাজনকে কেন্দ্র করে বান্দার ওপর রবের রবুবিয়্যাত তথা প্রভুর প্রভুত্বও বিভাজিত। অর্থাৎ আল্লাহর বিশেষ বান্দারা আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাআলার নেকনজর লাভ করে, আর অন্যরা থাকে উদাসীন। এজন্য উম্মতের মধ্যে সূক্ষ্মতিসূক্ষ্মরূপে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে, যা আমরা আঁচও করতে পারি না। বুখারি ও মুসলিম শরিফে নবীজি থেকে বর্ণিত হয়েছে—
تَعِسَ عَبْدُ الدِّيْنَارِ وعَبْدُ الدِّرْهَم وعَبْدُ الْقَطِيْفَةِ وَ عَبْدُ الْخَمِيْصَةِ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيْكَ فَلَا انْتَقَشَ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ ، وَإِنْ مُنِعَ سَخِطَ
"লাঞ্ছিত হোক দিনার-পূজারি, দিরহাম-পূজারি এবং রেশমি শাল- পূজারি; লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক; তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে কেউ তা তুলে দেবে না। জিহাদের ময়দানে সে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয়, আর না-পেলে হয় ক্ষুব্ধ।"[১]
'আমরা দেখতে পাচ্ছি-যারা ধন-সম্পদ ও পোষাক-পরিচ্ছদের পেছনে পড়ে থাকে তাদেরকে নবীজি ﷺ দিনার, দিরহাম ও রেশমি শালের পূজারি বা দাস আখ্যায়িত করেছেন। তাদের সম্পর্কে হাদিসে বদ দুআ ও দুঃসংবাদ এসেছে। হাদিসের বাণী-تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ অর্থাৎ, “সে লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক; তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে কেউ তা তুলে দেবে না।”- থেকে তা-ই প্রতিভাত হয়। উক্ত হাদিসে ব্যবহৃত اَلنَّفْسُ শব্দের অর্থ পা থেকে কাঁটা তোলা। আর اَلْمِنْقَاسُ বলতে বোঝায় কাঁটা বের করার শলাকা।'
'এখানে এমন ব্যক্তির অবস্থা চিত্রায়িত হয়েছে, যার জন্য বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি পাওয়া সুকঠিন এবং কোনো পরীক্ষায় সফল হওয়া অত্যন্ত জটিল। কেননা তার সম্পর্কে (নবীজির) পবিত্র জবানে উচ্চারিত হয়েছে-"লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক!” যেহেতু তার উদ্দেশে এমন তিরস্কার এসেছে, সুতরাং সে লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হবে, নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। তবে এতসব তিরস্কার ও ভর্ৎসনার উদ্দীপক কেবল তার সম্পদলিপ্সা। কেননা “সে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় আর না-পেলে ক্ষুব্ধ হয়।” সম্পদই যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ مِنْهُمْ مَّنْ يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقْتِ فَإِنْ أَعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَ إِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ
"তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা সদকা বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। এর থেকে কিছু পেলে তারা সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে হয় বিক্ষুব্ধ।"[১]
'বক্ষ্যমাণ আয়াত থেকে প্রতিভাত হয় যে, নিজেদের খুশি ও অখুশিই তাদের কাছে মুখ্য ছিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি ছিল গৌণ। কিন্তু এই দৈন্যদশা শুধু তাদের একারই না, বরং তাদের দলভুক্ত ব্যক্তি সেও, যে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, রূপ-সৌন্দর্য আর মনোবাসনার পেছনে পড়ে থাকে লালায়িত কুকুরের মতো। তার এসব কামনা-বাসনা চরিতার্থ হলে আনন্দিত হয় আর না-হলে হয় ক্রোধান্বিত। এ জন্য তাকে বলা হয়—প্রবৃত্তির পূজারি বা নফসের গোলাম। গোলাম এজন্য যে, তার মধ্যে মানসিক বশ্যতা ও চৈত্তিক দাসত্ব প্রবলভাবে বিদ্যমান। আর প্রকৃত দাসত্ব ও গোলামি তো—দিলের দাসত্ব ও মনের গোলামি। কেননা মন দাসত্বের জিঞ্জিরায় আবদ্ধ হলে দেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাসে পরিণত হয়। কবি বলেন—
الْعَبْدُ حُرُّ مَا قَنَعَ + وَ الْحُرُّ عَبْدٌ مَا طَمِعَ অল্পে তুষ্ট হলে মানুষ থাকে স্বাধীন নয়তো লোভের কাছে হয় পরাধীন।
'কবি আরও বলেন—
أَطَعْتُ مَطَامِعِي ، فَاسْتَبْعَدَتْنِي + وَ لَوْ أَنِّي قَنَعْتُ لَكُنْتُ حُرًا মনোবাসনা পূরণ করতে চেয়েছিলাম, তাই সে আমায় করে নিয়েছে গোলাম। তবে যদি আমি অল্পে তুষ্ট থাকতাম, স্বাধীনতা আমার কভু নাহি হারাতাম।
'জ্ঞানীজনেরা বলেন— “উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের গলায় বেড়ি ও পায়ে শেকলের মতো। গলা থেকে বেড়ি সরানো গেলে পা থেকে শেকলও খুলে যায়।' উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— "আশা-আসক্তি দরিদ্রতা-উদ্দীপক, নিরাশা-নির্বেদ ধনবত্তা বিবর্ধক, আর নির্লিপ্ততা মানুষকে করে স্বনির্ভর।”
'এই বিষয়গুলো আসলে মানুষের অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেননা আমরা দেখি-কেউ কোনো বিষয়ে মোহমুক্ত হলে আর সেদিকে ছোটে না, তা পাবার আশাও রাখে না, এমনকি মনে আর সেটার প্রয়োজনও বোধ করে না। সেটা যার আয়ত্বাধীন, তাকেও আর আহামরি কিছু মনে হয় না। অপরদিকে কোনো কিছু পেতে মানুষ উদগ্রীব হলে মন সেদিকেই নিবিষ্ট হয়। তা কারও মালিকানাধীন হলে তার কাছে সে অবনতও হয়। বস্তুত মানুষের মন ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা, বাড়ি-গাড়ি ও নারীর প্রতি আসক্তির আঁতুড়ঘর। অথচ নবীজি ﷺ-এর বক্তব্য, কুরআনের ভাষায়-
فَابْتَغُوْا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَ اعْبُدُوهُ وَ اشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ
"সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছে রিজিক প্রার্থনা করো, তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো; তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।”[১]
'বান্দা রিজিকের মুখাপেক্ষী; রিজিক ছাড়া তার চলবেই না। তাই রিজিকের তাগিদে আল্লাহমুখী হলে তা হবে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বান্দার দাসত্ব ও আনুগত্যজ্ঞাপক। আর যদি সে মাখলুকের দিকে হাত বাড়ায়, তাহলে তো সৃষ্টির প্রতি তাবেদারি ও গোলামিই প্রকাশ পেল।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৮৮৭; ইবনে হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ৩২১৮। হাদিসটিতে শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[১] সূরা আনকাবুত, আয়াত-ক্রম: ১৭
📄 একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ
'শাইখ কি এ দিকে ইঙ্গিত করতে চাচ্ছেন যে, প্রয়োজনেও কারও কাছে চাওয়া যাবে না?'-আমি জিজ্ঞেস করলাম।
শাইখ বললেন, 'না, তা-না; আমি বরং বলতে চাচ্ছি-মৌলিকভাবে ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ এবং প্রয়োজনসাপেক্ষে বৈধ। কেননা ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে একাধিক হাদিসগ্রন্থে অনেকগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম হাদিস : لَا تَزَالُ الْمَسْأَلَهُ بِأَحَدِكُمْ حَتَّى يَأْتِيَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَيْسَ فِي وَجْهِهِ مُزْعَةٌ لَحْمٍ "কেয়ামত পর্যন্ত কিছু মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করতেই থাকবে; এমনকি তাদের চেহারায় সামান্য মাংসও থাকবে না।" [১]
দ্বিতীয় হাদিস : مَنْ سَأَلَ النَّاسَ وَ لَهُ مَا يُغْنِيْهِ جَاءَتْ مَسْأَلَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خُدُوشًا أَوْ خُمُوْشًا أَوْ كُدُوْحًا فِي وَجْهِهِ "পর্যাপ্ত সম্পদ থাকতেও যে মানুষের কাছে ভিক্ষা করবে, কেয়ামতের দিন তার মুখমণ্ডলে জখম, নখের আঁচড় ও ক্ষতের চিহ্ন থাকবে।”[২]
তৃতীয় হাদিস : لَا تَحِلُّ الْمَسْأَلَةَ إِلَّا لِذِي غُرْمٍ مُفْظِعٍ أَوْ دَمْعٍ مُوْجِعٍ أَوْ فَقْرٍ مُدْقِعِ "ভিক্ষা করা শুধু তার জন্যই বৈধ, যে মারাত্মক ঋণগ্রস্ত, দুঃখ-দুর্দশায় পতিত অথবা অভাবে জর্জরিত।” [৩]
চতুর্থ হাদিস : لأَنْ يَأْخُذَ أَحَدُكُمْ حَبْلَهُ فَيَذْهَبَ فَيَحْتَطِبَ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ ، أَعْطُوهُ أَوْ مَنَعَوْهُ "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে আনে, সে আমার কাছে ওই লোকের চেয়ে উত্তম, যে অন্যের কাছে হাত পাতে, অনন্তর কিছু পায় বা না-পায়।”[১]
পঞ্চম হাদিস :
مَا أَتَاكَ مِنْ هَذَا الْمَالِ وَأَنْتَ غَيْرُ سَائِلٍ وَلَا مُشْرِف فَخُذْهُ وَمَا لَا فَلَا تُتْبِعُهُ نَفْسَكَ
"কোনো প্রকার আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ব্যতীত যে সম্পদ তোমার হস্তগত হয়, তা গ্রহণ করতে সমস্যা নেই। আর যদি এমনটি না-হয়, তবে তা থেকে নির্লিপ্ত হও।”[২]
'কিছু পাওয়ার জন্য মুখে বলা বা অন্তরে কামনা করা—উভয়টি নবীজি অপছন্দ করেছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে—
وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ ، وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ ، وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
“যে চাওয়া থেকে বিরত থাকে, তাকে আল্লাহ অমুখাপেক্ষী করেন; যে সন্তুষ্ট থাকে, তাকে আল্লাহ সম্পদশালী করেন; যে ধৈর্য ধরে, তার সহনশীলতা আল্লাহ বৃদ্ধি করেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম নিয়ামত আর কী হতে পারে!”[৩]
'নবীজি তাঁর বিশিষ্ট সাহাবীদেরকে অসিয়ত করেছিলেন কারও কাছে কিছু না চাইতে। এ প্রসঙ্গে মুসনাদে এসেছে—
إِنَّ أَبَا بَكْرٍ كَانَ يَسْقُطُ السُّوْطَ مِنْ يَدِهِ فَلَا يَقُوْلُ لِأَحَدٍ نَاوِلْنِي إِيَّاهُ ، وَ يَقُوْلُ إِنَّ خَلِيْلِي أَمَرَنِي أَلَّا أَسْأَلَ النَّاسَ شَيْئًا
“আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র হাত থেকে লাঠি পড়ে যাচ্ছিল, তবু তিনি কাউকে তা হাতে তুলে দিতে বলেননি। তিনি বলতেন—'আমার বন্ধু আমাকে কারও কাছে কিছু চাইতে নিষেধ করেছেন।”[১]
'সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে আউফ ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَايَعَهُ فِي طَائِفَةٍ وَ أَسَرَّ إِلَيْهِمْ كَلِمَةً خَفِيَّةً: أَلَّا تَسْأَلُوا النَّاسَ شَيْئًا فَكَانَ بَعْضُهُمْ أُولئِكَ النَّفَرُ يَسْقُطُ السَّوْطَ مِنْ أَيْدِيهِمْ فَلَا يَقُوْلُ لِأَحَدٍ نَاوِلْنِي إِيَّاهُ
“নবীজি কতক সাহাবীকে বাইআত প্রদান করে তাঁদেরকে একটি গোপন কথা বলেন। তা হলো- 'তোমরা কারও কাছে কিছু চাইবে না।' এ কারণে তাঁরা হাত থেকে লাঠি পড়ে গেলেও কাউকে তুলে দিতে বলতেন না।”[২]
'উল্লিখিত হাদিসসমূহ থেকে এ বিষয়টি প্রতিভাত হয় যে, বান্দার উচিত সর্বদা স্রষ্টার কাছে চাওয়া; বিনা প্রয়োজনে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ وَ إِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ
"সুতরাং যখন অবসর পান তখন ইবাদতে পরিশ্রান্ত হোন এবং আপনার রবের দিকে মনোনিবেশ করুন।”[৩]
'নবীজি ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন-
إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ
"যদি কিছু চাইতেই হয় তবে আল্লাহর কাছে চাও, যদি সাহায্য প্রার্থনা করতে হয় তবে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা কোরো।”[৪]
শাইখ কথা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, মাঝ দিয়ে আমি বলে ফেললাম, 'এখানে হাদিস ও কুরআনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?'
শাইখ বললেন, 'আরবি ভাষার ব্যাকরণ অনুসারে 'যরফ' [১] বোঝায় এমন শব্দ বাক্যের শুরুতে উল্লেখিত হলে তা নির্দিষ্টতা ও বিশিষ্টতা বোঝায়। এ হিসেবে এখানে যেন বান্দাকে বলা হচ্ছে-"কারও কাছে রিজিক চাইবে না, যদি চাইতেই হয়, তবে আল্লাহর কাছে চাও।” এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ اسْتَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ “আর তোমরা আল্লাহর কাছেই তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর।” [২]
'বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের জন্য জীবিকা উপার্জন যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকাও আবশ্যক। উভয় ক্ষেত্রেই বান্দার জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করার অবকাশ রয়েছে। কোনো প্রয়োজনে যেমন বান্দা আল্লাহর কাছে চাইতে পারবে, তেমনি সমস্যায় পতিত হলে তাঁর কাছে ফরিয়াদও জানাতে পারবে। যেমন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন-কুরআনের ভাষায়-
أَشْكُوا بَنِي وَ حُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَ أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ "আমি তো আমার মনোবেদনা ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।” [৩]
'এরই প্রেক্ষিতে কুরআনে কারিমে বিভিন্ন স্থানে الْهَجْرُ الْجَمِيلُ তথা উৎকৃষ্ট ত্যাগ, الصَّفْحَ الْجَمِيلُ তথা সুন্দর মার্জনা ও الصَّبْرُ الْجَمِيلُ তথা উত্তম ধৈর্যের উল্লেখ রয়েছে।'
আমি বললাম, 'শাইখ! আমরা জানি কুরআনের এই শব্দগুলো প্রায় সমার্থবোধক; এসবের মধ্যে কি তেমন কোনো পার্থক্য আছে?'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, কেউ কেউ পার্থক্যের কথা বলেছেন। যেমন: উৎকৃষ্ট ত্যাগ হলো-মনে যাতনাহীন ত্যাগ; সুন্দর মার্জনা হলো-অপরাধীকে নিন্দা না-করে ক্ষমা; আর উত্তম ধৈর্য হলো-সৃষ্টিকুলের কাছে অভিযোগহীন সহ্য।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৪০; মুসলিম (حَتَّى يَأْتِيَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) এর স্থলে (حَتَّى يَلْقَى) আল্লাহ আছে।
[২] ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ১৮৪০; সহিহ-শুয়াইব আরনাউত।
[৩] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ১৬৪১; ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ২১৯৮; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস- ক্রম: ১২১৩৪; এটি মূলত আনাস ইবনু মালেকের সূত্রে বর্ণিত হাদিসের একটি অংশ। হাদিসের সনদ যঈফ তবে বিভিন্ন শাওয়াহেদের ভিত্তিতে হাদিসের এই অংশটুকু হাসান পর্যায়ের-শুয়াইব আরনাউত। অন্যান্য বর্ণনায় (دمغ) এর স্থলে (دمع) এসেছে।
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭০; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৪৭৩; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৪৫; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[৩] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৫৩; আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ১৬৪৪।
[১] মুসনাদ, ৭/১৮২
[২] মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৪৩; শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[৩] সূরা আশ-শারহ, আয়াত-ক্রম: ৭-৮
[৪] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২৫১৬
[১] স্থান, কাল বা পাত্র
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৩২
[৩] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৮৬
📄 আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা উত্তম ধৈর্যের পরিপন্থী নয়
আমি বললাম, 'শাইখ! আল্লাহর কাছে অভিযোগ করলে ধৈর্য তার উত্তমরূপ হারাবে—এমনটি কি ভাবার সুযোগ আছে?'
শাইখ ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'না, আল্লাহর কাছে অনুযোগ করা উত্তম ধৈর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু না। কেননা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বলেছিলেন— فَصَبْرٌ جَمِيلٌ অর্থাৎ "সুতরাং আমার কর্তব্য হলো উত্তমরূপে ধৈর্যধারণ।" [১] আবার তিনিই বলেছিলেন— إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِّي وَ حُزْنِي إِلَى الله অর্থাৎ "আমি তো আমার মনোবেদনা ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি।” [২] যেহেতু কুরআন একই সঙ্গে তাঁর ফরিয়াদ ও উত্তম ধৈর্যের স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই আমরা বলতেই পারি—অভিযোগ বান্দার কাছে করা না-হলে, ধৈর্য তার শোভা হারাবে না।'
'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু ফজরের নামাজে সাধারণত সূরা ইউনুস, সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল তিলাওয়াত করতেন। উল্লিখিত আয়াত পাঠকালে কখনো কখনো তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেন। তাঁর ক্রন্দনধ্বনি একদম পেছনের কাতার পর্যন্ত পৌঁছে যেত। হাদিসে এসেছে মূসা আলাইহিস সালাম দুআ করেছিলেন—
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ ، وَإِلَيْكَ الْمُشْتَكَى ، وَأَنْتَ الْمُسْتَعَانُ ، وَبِكَ الْمُస్ْتَغَاثُ ، وَعَلَيْكَ التَّكْلَانُ ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
"হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনার, আপনার সমীপেই আমার সকল ফরিয়াদ, আপনি আমার সাহায্যকর্তা, আপনি আমার মদদদাতা, আপনি আমার আশাভরসা; আপনি ছাড়া আমার কোনো সামর্থ্য নেই, নেই কোনো সক্ষমতা।"
'তায়েফের তৎকালীন অধিবাসীরা নবীজির সঙ্গে কী আচরণ করেছিল তা আমাদের সকলেরই জানা। সে সময় নবীজি যে দুআ করেছিলেন, তা হলো-
اللهم إليك أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي ، وقلة حيلتي ، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ ، أنت رب المستضعفين ، وأنت ربي . اللهم إلى من تكلني ؟ إلى بعيد يتجهمني ، أم إلى عدوّ ملكته أمري. إن لم يَكُن بِكَ غضب عليَّ فلا أبالي ، غير أنَّ عافيتك هي أوسع لي ، أعوذ بنور وجهك الذي أشرقت له الظلمات ، وصلح عليهِ أمرُ الدُّنيا والآخرة ، أن ينزل بي سخطك ، أو يحل علي غضبُكَ. لَكَ العُتْبى حتّى ترضى ، فلا حول ولا قوَّةَ إِلَّا بِكَ
“হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি আমার দুর্বলতা প্রকাশ করছি, দুরবস্থা স্বীকার করছি এবং তাদের দুর্ব্যবহারে অনুযোগ জানাচ্ছি; আপনি দুর্বলদের রব, আপনিই তো আমার রব; হে আল্লাহ! আপনি আমার দায়িত্ব আর কার ওপর ন্যস্ত করবেন? কতদিন আর তারা আমার ওপর আক্রমণ করে যাবে! কিংবা শত্রুদের হাতে আর কতদিন আমার বিষয় ছেড়ে দেবেন! আমার ওপর যদি আপনার ক্রোধ না থেকে থাকে তবে আমি কোনোকিছুর পরোয়া করি না। তবে যদি আপনি আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তাহলে তা আমার জন্য সহজ। আমি আপনার সত্তার নূরের ওসিলায় পানাহ চাইছি, যে নূরে দূরীভূত হয় সকল আঁধার, সমাধা হয় দুনিয়া ও আখেরাতের সকল বিষয়-আশয়; তবে হ্যাঁ, আমার প্রতি যেন আপনার অসন্তুষ্টি কিংবা ক্রোধ না হয়; আপনার সন্তুষ্টিই আমার সন্তুষ্টি। কেননা আপনি ছাড়া আমার আর কোনো ভরসা নেই, নেই কোনো শক্তি ও সক্ষমতা।"[১]
'এজন্যই ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল অসুস্থ থাকাকালে যখন বলা হয়েছিল— তাউস রহিমাহুল্লাহ তো রোগীর ক্রন্দন-রোদন অপছন্দ করেছেন, তিনি বলেন এটি অধৈর্য-জ্ঞাপক।' এ কথা শুনে ইমাম আহমাদ মৃত্যু পর্যন্ত আর কখনো একটু উহ-আহ শব্দও করেননি।'
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ১৮
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৮৬
[১] আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবরানি, হাদিস-ক্রম: ১৮১; হাদিসটিতে সনদগত দুর্বলতা আছে।
📄 আল্লাহর গোলামির মধ্যেই শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা নিহিত
'যখন রবের দয়া ও করুণার প্রতি বান্দার প্রত্যাশা দৃঢ় থেকে সুদৃঢ় হয়, যখন বান্দার মনে এই প্রত্যয় স্থিতি লাভ করে যে, আল্লাহই তার দুঃখ-দুর্দশা দূর করবেন, তিনিই যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করবেন, তখন রবের প্রতি বান্দার দাসত্ব ও আনুগত্যের স্তর অনেক ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়, বহুগুণে বৃদ্ধি পায় সৃষ্টিকুল থেকে তার অমুখাপেক্ষিতা ও নির্লিপ্ততা। কিন্তু কারও আশা-ভরসা মাখলুক কেন্দ্রিক হলে, মনে গাইরুল্লাহর প্রতি বশ্যতা ও বাধ্যতা সৃষ্টি হবে। অবশ্য কোনোভাবে এসব থেকে বিমুখ থাকতে পারলে অন্তরের স্বচ্ছলতা এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে, তখন আর নিজেকে কারও কাছে ছোট মনে হবে না। জ্ঞানীরা বলেন-“কারও সমকক্ষ হতে চাইলে তার থেকে অমুখাপেক্ষী হও; কারও কাছে বড় হতে চাইলে, তার প্রতি অনুগ্রহ করো; আর কারও অধীন হতে চাইলে, তার দিকে হাত বাড়াও।”
'মূল কথা হলো—বান্দার ভরসাস্থল আল্লাহ হলে তার দাসত্ব ও আনুগত্যের স্তর সমুন্নত হয়। আর গাইরুল্লাহর কাছে নতজানু হলে খোদাভক্তি ও বন্দেগি থেকে সে বহুদূরে সরে যায়। বিশেষত যার জীবনের লক্ষ্য খালেক নয়, বরং মাখলুক, তার কথা তো বলাই বাহুল্য। এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে যার ভরসাস্থল হলো তার প্রভাব-প্রতিপত্তি, সহায়-সম্পত্তি, সৈন্য-অনুসারী, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব; যে নির্ভরশীল তার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব, রাজ্য-রাজত্ব, যোগ্যতা-সক্ষমতা, নেতা-সমর্থকসহ আরও অনেকের ওপর, যাদের কেউ হয়তো মৃত্যুবরণ করেছে, আর কেউ হয়তো করবে। অথচ সে আস্থা রাখতে পারত চিরঞ্জীব সত্তার ওপর। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে—
وَ تَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوْتُ وَ سَبِّحْ بِحَمْدِهِ ، وَ كَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا
'আপনি সেই চিরঞ্জীব সত্তার ওপর ভরসা করুন, যিনি অমর এবং তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করুন। বান্দার পাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।”” [১]
আমি মনে মনে বলছিলাম, সুবহানাল্লাহ! শাইখ তো এ যুগের অধিকাংশ মানুষের সার্বিক অবস্থা একেবারে হুবহু বলে দিলেন! নিঃসন্দেহে শাইখ যে কথাগুলো বলে গেলেন, সেসব কেবল কোনো বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ফকীহর পক্ষেই বলা সম্ভব। এবং এমন কারো পক্ষেই সম্ভব, যিনি অন্তরের রোগব্যাধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। পাঠক! আসুন আমরা শাইখের কথা শুনতে থাকি। শুধু শুনলেই হবে না, বরং সম্ভব হলে সোনার হরফে লিখে খাঁটি সোনার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চেষ্টা করি।
শাইখ বলছিলেন, 'কারও মনে যদি মাখলুকের প্রতি এই প্রত্যয় ও প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, তারা তাকে বিপদে সাহায্য করবে, প্রয়োজনে রিজিকের ব্যবস্থা করবে এবং সর্বদা দেখভাল করবে, তাহলে নিজের অজান্তেই সে তাদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং আশানুপাতে তার অন্তরে তাদের প্রতি বশ্যতা ও বাধ্যতা জন্ম নেয়। যদিও বাহ্যত তাকে মনে হবে নির্দেশক কিংবা পরিচালক, বস্তুত তার হৃদয়জুড়ে কেবলই অন্যের তোষামোদ। কিন্তু বুদ্ধিমান তো শুধু চর্মচক্ষু দিয়ে দেখে না, দেখে অন্তর্চক্ষু দিয়েও। তাই তার কাছে বাস্তবতা ধরা পড়ে, যদিও তা থাকে হাজারও আবরণে ঢাকা।'
'দেখো! কারও মন যদি কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যদি এটি তার জন্য বৈধও হয়, তবুও এই 'আসক্তিটা' ভালো নয়; বরং ক্ষতিকর। এই আসক্তির কারণে সে ওই নারীর হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হবে, যা বলবে তাই শুনবে, চোখের ইশারায় উঠবে, বসবে। বাহ্যত যদিও সে তার কর্তা, যেহেতু সে স্বামী, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে তার কারাগারে বন্দী, বা টাকায় কেনা গোলামের মতো।
'আর যদি স্বামীর মন স্ত্রীকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়, যদি সে তার প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়, তার কোনো বিকল্প সে ভাবতেই না পারে, তখন এই স্ত্রী তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষমতাধর মনিব ও অত্যাচারী আমিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সে কোনোভাবেই তার ওই বলয় থেকে বের হতে পারে না। এমনকি এর থেকেও ভয়ংকর পরিস্থিতি হতে পারে। কেননা মানসিক গোলামি শারীরিক গোলামির চেয়েও ভয়ংকর; আত্মিক দাসত্ব দৈহিক দাসত্বের চেয়েও নিকৃষ্ট। এর কারণ হলো কেউ যদি শারীরিকভাবে কারও গোলামে পরিণত হয়, অথচ মন তার দাসত্ব মেনে না নেয়, তবে দাসত্ব সত্ত্বেও তার মনে স্বস্তি ও শান্তি থাকবে; তার দিকে সে তেমন ভ্রুক্ষেপই করবে না। এমনকি সে ওই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা-কৌশল অব্যাহত রাখবে। এজন্য মানুষের অন্তর, যা কিনা প্রকৃত মালিক—সেই অন্তরই যদি গাইরুল্লাহর দাসে পরিণত হয়, তবে সেটাই হবে চূড়ান্ত দাসত্ব ও বন্দিত্ব; কেননা অন্তর এই দাসত্ব গ্রহণ করে নিয়েছে।'
'অন্তরের দাসত্ব ও বন্দিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে পাপ ও পুণ্যের হিসেবও হয়ে থাকে। কেননা কোনো মুসলিম যদি কোনো কাফিরের হাতে বন্দী হয়, অথবা পাপাচারী যদি তাকে অন্যায়ভাবে গোলাম বানায়, প্রত্যক্ষভাবে এটি খারাপ দেখালেও পরোক্ষভাবে এতে ক্ষতির কিছু নেই, যদি সে তার সাধ্যমতো আবশ্যকীয় আমলগুলো করতে থাকে। আর যদি কেউ সঙ্গত কারণে গোলামে পরিণত হয় এবং এরপর সে আল্লাহ ও তার মনিবের হক আদায় করে, তবে সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। যদি কাউকে কুফরি-কালামের ওপর বাধ্য করা হয়, এদিকে তার মন-মস্তিষ্কে ঈমান ও বিশ্বাস থাকে ভরপুর, তবে এতে সমস্যার কিছু নেই। অন্যদিকে কারও মন যদি গাইরুল্লাহর দাসে পরিণত হয়, তবে সেটি নিতান্তই ক্ষতির, বাহ্যত সে যত বড় রাজা-বাদশাই হোক না কেন।'
সুতীক্ষ্ণ শব্দের ঝংকার ও অনুপম বাক্যের মালা গেঁথে শাইখ তাঁর প্রাঞ্জল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর কথার মিষ্টতায় কখন যে হারিয়ে গেছি, নিজেই জানি না। চারপাশের নিস্তব্ধতায় মনে হলো, আমি বুঝি একাই এই মজলিসে। সত্যতা যাচাই করতে ডানে-বাঁয়ে তাকালাম, দেখি, আমি একা না, সবার অবস্থাই এমন। যেন সবার মাথায় পাখি বসে আছে। হবেই বা না কেন; শাইখের এই বক্তব্য যদি পৃথিবীবাসী শুনত, তবে সকলেই সকল সমস্যার সমাধান পেয়ে যেত।
শাইখ বলছিলেন, 'প্রকৃত স্বাধীনতা হলো মনের স্বাধীনতা। এমনিভাবে প্রকৃত পরাধীনতাও হলো মনের পরাধীনতা। যেমন মনের ধনাঢ্যতাই আসল ধনাঢ্যতা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
"সম্পদের আধিক্য নয়, বরং অন্তরে ধনাঢ্যতাই আসল ধনাঢ্যতা।"[১]
'আমি কসম করে বলতে পারি—এই যে ক্ষয়ক্ষতির কথা আমি বললাম, এসব তো কেবল বৈধ কিছুর প্রতি আসক্তির ফলেই ঘটে, আর যদি কেউ অবৈধ কিছুর প্রতি আসক্ত হয়, যেমন কোনো পরনারী কিংবা না-বালেগ বালক, তাহলে সে দুনিয়াতেই এমন এমন শাস্তির সম্মুখীন হবে, যা থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাওয়া সম্ভব হবে না। আর যারা এই ধরনের ফিতনায় পতিত হয়, তারা একদিকে যেমন শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, অপরদিকে তাদের সওয়াবের ঝুলিও থাকে শূন্য। কেননা কোনো প্রেমিক যখন প্রেমাস্পদের রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি আসক্ত হয়, তার মন তখন সে-দিকেই ঝুঁকে থাকে। শুধু প্রেম বা আসক্তিই নয়, বরং সে তার দাসত্ব ও বশ্যতা বরণ করে নেয়। এতে করে তার থেকে এত পরিমাণ মন্দ কাজ ঘটতে থাকে, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গুণে শেষ করতে পারবে না। হ্যাঁ, হতে পারে সে কোনোভাবে নোংরামি ও অশ্লীলতা বেঁচে থাকল, কিন্তু দীর্ঘদিন (অবৈধ) প্রেমাস্পদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা অশ্লীলতার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কেউ যদি কোনো গুনাহ করার পর তাওবা করে, তাহলে তার হৃদয় থেকে ওই গুনাহের প্রতিক্রিয়া দূর হয়ে যায়। কিন্তু এমন লোকদের অবস্থা হলো নেশাগ্রস্ত ও মানসিক ভারসাম্যহীন লোকদের মতো। কবি বলেন—
"প্রবৃত্তির নেশা ও মদের নেশা তো একই, নেশাগ্রস্ত কারও হুঁশ ফিরে কি কখনোই?”
'কবি আরও বলেন—
“তারা বলে : প্রেমে পড়ে পাগল হয়ে গেছ তো তুমি! আমি বলি : প্রেমাসক্তি তো পাগলামির চেয়েও বেশি। প্রেমে পাগল যে, যুগযুগান্তরে পাগলামি কাটে না তার, সাধারণ পাগলামি কেটে যাবে হয়তো আজ, নয়তো কাল।”
একটানা দীর্ঘ আলোচনার পর শাইখ থামলেন। আমরা বুঝতে পারলাম, তিনি আজকের মতো এখানেই শেষ করতে চাচ্ছেন। তবুও আমি বলে ফেললাম—‘মুহতারাম শাইখ! শেষোক্ত বিষয়টিতে যদি আরেকটু বিস্তারিত আলোকপাত করতেন, তবে হয়তো আমার মতো অনেকেই উপকৃত হতো। এ বিষয়ে আসলে আমরা সকলেই খুব কম জানি; কিন্তু বুঝি, জানাটা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন।'
শাইখ বললেন, 'আল্লাহ সহায় হলে এ বিষয়ে তোমাদের নিয়ে আগামী মজলিসে সবিস্তর আলোচনা করব। সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবীজির প্রতি।'
টিকাঃ
[১] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৪৪৬; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১০৫১; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ৭৩১৬; বুখারি ও মুসলিমে إِنَّمَا এর স্থলে وَلَكِنَّ রয়েছে।