📄 পদাধিকারীদের পরশ্রীকাতরতা
'যাদের প্রতি হিংসা করা হয় তারা কি পরস্পর হিংসাশ্রয়ী হয়?'- জিজ্ঞেস করলাম।
শাইখ বললেন, 'পদমর্যাদা কিংবা ধনসম্পদে একাধিক ব্যক্তি সমপর্যায়ে থাকাকালে তাদের একজন যদি আগে বাড়ে কিংবা পেছনে পড়ে, তবে তাদের মধ্যেও হিংসার উদ্রেক হয়। এক্ষেত্রে একজনের অগ্রগামিতাই হয় আরেকজনের অন্তর্দাহের কারণ। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর ভাইদের হিংসার ঘটনা, আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্রের মধ্যে একজনের প্রতি অপরজনের হিংসার ঘটনা। দ্বিতীয় ঘটনায় বিদ্বেষের কারণ ছিল—তাদের একজনের কুরবানি আল্লাহ কবুল করেছিলেন এবং অন্যজনেরটা করেননি। তখন ঈমান ও তাকওয়ার বিবেচনায় আল্লাহর তরফ থেকে একজন মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ায় আরেকজন পরশ্রীকাতর হয়ে পড়েছিল। ঠিক একই কারণেই আজীবন ইহুদিরা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। কিন্তু হিংসুটে ভাই হিংসার মধ্যেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং ঈর্ষানল নেভাতে গিয়ে ভাইয়ের প্রাণও কেড়ে নিয়েছিল। এজন্য বলা হয়ে থাকে—সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানি ঘটে তিনটি গুনাহের মাধ্যমে—লোভ, দাম্ভিকতা ও পরশ্রীকাতরতা। লোভ প্রকাশ পেয়েছিল আদম আলাইহিস সালাম থেকে, দম্ভ ইবলিস শয়তান থেকে আর পরশ্রীকাতরতা আদমপুত্র কাবিল থেকে; যে কারণে সে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে ফেলেছিল। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
ثَلَاثُ لَا يَنْجُو مِنْهُنَّ أَحَدٌ : الْحَسَدُ ، وَ الظَّنُّ ، وَ الطَّيَرَةُ. وَ سَأُحَدِّثُكُمْ بِمَا يَخْرُجُ مِنْ ذَلِكَ : إِذَا حَسَدْتَ فَلَا تَبْغَضَ ، وَإِذَا ظَنَنْتَ فَلَا تُحَقِّقَ ، وَ إِذَا تَطَيَّرْتَ فَامْضِ
“তিনটি জিনিসি থেকে কেউ রেহাই পায় না-হিংসা, অনুমান ও কুধারণা। তবে আমি তোমাদেরকে এসব থেকে বাঁচার উপায় বলে দিচ্ছি; কারও প্রতি মনে হিংসা এলে তাকে অবজ্ঞা করবে না, অনুমেয় কিছু যাচাই করতে যাবে না এবং কুধারণাকে কখনো প্রশ্রয় দেবে না।”১।
'হাদিসটি ইবনু আবিদ দুনইয়া তাঁর সনদে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া একাধিক হাদিসগ্রন্থে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ
“পূর্ববর্তী উম্মাতদের ব্যাধি তোমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। তা হলো-হিংসাবৃত্তি ও বিদ্বেষ। এই রোগ হলো মুণ্ডনকারী। আমি চুল মুণ্ডনের কথা বলছি না। বরং এসব তো তোমাদের দ্বীনকেই নিঃশেষ করে দেবে।”২
'নবীজি হিংসাবৃত্তিকে রোগ বলেছেন, যেমন বলেছেন কার্পণ্যকেও। হাদিসে এসেছে-
أَيُّ دَاءٍ أَدْوَأُ مِنَ البُخْلِ | 'কৃপণতার চেয়ে বড় রোগ আর কী হতে পারে?'।
উল্লিখিত হাদিস থেকে আমরা জ্ঞাত হলাম-এগুলোও রোগ, অন্তরের রোগ।'
'অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلاقِ وَالْأَهْوَاءِ وَالْأَدْوَاءِ
"(নবীজি বলেন, হে আল্লাহ) আমি আপনার কাছে মন্দ চরিত্র, প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা ও রোগব্যাধি থেকে পানাহ চাই।" [১]
'উল্লিখিত হাদিসে الأذواء শব্দটি الْأَهْوَاء و الأخلاق শব্দের পরে ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্দেশ্য এদিকে ইঙ্গিত করা যে—মানুষের মৌলিক চরিত্র কখনো স্বভাব-প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ | “(হে নবী!) নিঃসন্দেহে আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।” [২]
'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, ইবনু উয়াইনাহ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বলেন— خُلُقٍ عَظِيمٌ তথা সুমহান চরিত্র-এর উদ্দেশ্য হলো— دِينٌ عَظِيمٌ তথা সুমহান ধর্ম। ইবনু আব্বাসের সূত্রে অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে— عَلَى دِيْنِ الْإِسْلَامِ তথা ইসলাম ধর্মের ওপর। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, "তাঁর (নবীজির) চরিত্র ছিল কুরআনেরই বাস্তবরূপ।” হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন নিঃসৃত শিষ্টাচারই হলো সুমহান চরিত্র।'
আজকের মজলিস এখানেই সমাপ্ত। শাইখের পরবর্তী মজলিসে সাক্ষাতের আশা রাখছি। সে মজলিসে আমরা অন্তরের রোগব্যাধি প্রসঙ্গে আরও আলোচনা শুনব ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[১] তাখরিজু إহইয়াই উলুমিদ্দিন, যাইনুদ্দিন ইরাকি, হাদিস-ক্রম: ৩/২৩১। তাখরিজু মিনহাজিল কাসিদীন, শুয়াইব আরনাউত, হাদিস-ক্রম: ১৮৬; উভয়ের মতেই হাদিসটি যঈফ।
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২৫১০; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১৪৩০। এটি মূলত হাদিসের একটি অংশ। শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদিসটি হাসান লিগায়রিহি।
[৩] আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস-ক্রম:-২৯৬।
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৫৯১। হাদিসটি ইমাম তাবারনি, ইমাম হাকেম, ইমাম ইবনু হিব্বানও বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযি الْأَدْوَاءُ শব্দের বদলে الْأَعْمَالُ শব্দে বর্ণনা করেছেন।
[২] সূরা আল-কলাম, আয়াত-ক্রম: ৪