📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 ঐচ্ছিক ও আবশ্যিক সহনশীলতা

📄 ঐচ্ছিক ও আবশ্যিক সহনশীলতা


'এই যে প্রেমাসক্তি—প্রেমাস্পদের মন পাওয়া ছিল যেখানে কাম্য, সেখানে এই সম্পর্কের ভালো-মন্দ নির্ভর করছিল তাঁর সম্মতির ওপর। ওদিকে তাঁর প্রতি ভাইদের ঘৃণা ও অবজ্ঞার ফলশ্রুতিতে তিনি কুয়োয় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। অতঃপর হয়েছিলেন গোলামে পরিণত—এর সবই ছিল 'ইচ্ছাবহির্ভূত'। তো, এই ভাইয়েরাই তাঁকে স্বাধীনতার উন্মুক্ত পরিসর থেকে বের করে এনে নিতান্তই 'অনিচ্ছায়' দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল। এরপর 'ইচ্ছাকৃতভাবেই' তিনি উল্লিখিত কারণে কারাজীবন গ্রহণ করেছিলেন। তখন কারাবদ্ধতাই ছিল তাঁর জন্য 'মন্দের ভালো'। এক্ষেত্রে তিনি যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা ছিল 'ঐচ্ছিক ধৈর্য'। নিঃসন্দেহে তাতে ছিল তাকওয়া ও খোদাভীতির সংমিশ্রণ। অপরদিকে ভাইদের অন্যায়-অবিচারে তাঁর থেকে যে সহনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা ছিল এর উল্টো। অর্থাৎ, সেটা ছিল—'আবশ্যিক বা অনৈচ্ছিক ধৈর্য'। কারণ ওই সব জুলুম-অত্যাচার সাধারণ বিপদ-আপদের মতো। এরকম পরিস্থিতিতে সকলকে নিরুপায় হয়েই ধৈর্য ধরতে হয়; তাছাড়া এমতাবস্থায় মনে মনে সান্ত্বনা গ্রহণ ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। ধৈর্যের দ্বিতীয় প্রকার, তথা 'ঐচ্ছিক ধৈর্য' হলো সর্বোত্তম ধৈর্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—
ইন্নাহু মান ইয়াত্তাকি ওয়া ইয়াসবির ফাইন্নাল্লাহা লা ইউদিউ আজরাল মুহসিনিন।
"নিশ্চয় যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধরে, (সে প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে) কারণ আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।"[১]
'ঈমান আনার কারণে কোনো মুমিনকে যদি কষ্ট দেওয়া হয়, ইসলাম পরিত্যাগ করে কুফরি করতে বলা হয়, অথবা বলা হয় পাপ ও পঙ্কিলতায় লিপ্ত হতে; অবাধ্যতা করলে তার ওপর নেমে আসে আরও জুলুম, আরও অত্যাচার। তাকে কারাবরণ করতে হয় কিংবা দেশান্তরিত হতে হয়, তবুও সে দ্বীনের ওপর অটল-অবিচল থাকতে সবধরনের কষ্ট-ক্লেশ মাথা পেতে নেয়, তবে অবশ্যই সে পরহেজগার ও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল মুহাজির সাহাবীদের বেলায়-তাঁরা একবুক কষ্ট নিয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছিলেন, সয়েছিলেন অকথ্য নির্যাতন আর নিপীড়ন, তবুও নবীজি ﷺ-এর আনীত দ্বীন থেকে সরে দাঁড়াননি, বরং আমৃত্যু অবিচল ছিলেন দ্বীন ইসলামের ওপর。
'স্বয়ং নবীজি ﷺ কতভাবে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়েছেন, তারও ইয়ত্তা নেই। তবে তিনি এসব নিপীড়নের ওপর ধৈর্যধারণ করেছেন স্বেচ্ছায়। কেননা তাঁকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল-ইচ্ছাকৃতভাবে যে কাজ তিনি করে যাচ্ছেন, তা থেকে যেন বিরত থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেননি বরং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন মক্কার ঘরে ঘরে। এজন্য বলা যায়-নবীজি ﷺ-এর ধৈর্য ছিল ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ধৈর্যের তুলনায় বৃহত্তর।'
'এটা ঠিক কীভাবে?'- জানতে চাইলাম আমি।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'দেখো, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাছে অশ্লীলতা কামনা করা হয়েছিল, অমান্য করায় তাঁকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। আর এদিকে নবীজি ﷺ ও তাঁর সাহাবীদেরকে বলা হয়েছিল কুফরি করতে। অবাধ্যতার সাজা ছিল-জীবন বিসর্জন; সাথে অন্যান্য শাস্তি তো আছেই। তাছাড়া তাঁর কারাবরণ অপেক্ষাকৃত ছিল সহজ। কেননা মুশরিকরা নবীজি ﷺ ও হাশেমিদেরকে দীর্ঘদিন গিরিখাদে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। নবীজির চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করলে তো তাদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। আগে তারা সাহাবিদের হিজরত করতে একরকম বাধ্য করত। কিন্তু যখন জানতে পারল আনসারি সাহাবীরা নবীজি -এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেছেন তখন হিজরতের পথেও তারা বাধা হয়ে দাঁড়াল। এরপর আর প্রকাশ্যে কেউ মক্কা ছাড়তে পারেননি। যদিও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর মতো কিছু সাহসী সাহাবী মুশরিকদের এসব হুমকি-ধমকি থোড়াই কেয়ার করে মাথা উঁচু করে সদর্পে মদিনার পথে যাত্রা করেছিলেন।'
'আসলে কাফিররা প্রথম দিকে সাহাবীদেরকে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করত। কিন্তু যখন দেখল এতে বরং মুসলমানেরা ভিনদেশে গিয়ে নিরাপদে নিজেদের ধর্মকর্ম করবার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, তখন কতক সাহাবীকে হিজরত করতে তারা বাধা দিল, তাঁদেরকে আটকে রাখল, সংযুক্ত করল নির্যাতনের নতুন মাত্রা। এহেন পরিস্থিতিতে মুমিনগণ যে নির্যাতন-নিষ্পেষণ সহ্য করেছেন, বিপদে আপদে আক্রান্ত হয়েছেন, এর কারণ ছিল শুধু স্বেচ্ছায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়া। এসময় তাঁরা যে-সকল বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা আসমানি বিপদের মতো ছিল না, যেমন ছিল ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কারাবরণ এবং তাঁদের পিতা-পুত্রের মধ্যকার বিচ্ছেদ। তো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন হলে স্বেচ্ছায় ধৈর্যধারণ করাই হলো সর্বোত্তম ধৈর্য। এমন ধৈর্যশীলরা অধিক মর্যাদার অধিকারী হবেন। যদিও বালা-মুসিবতে সন্তুষ্টচিত্তে সহনশীল বিপদগ্রস্তমাত্রই পাপমুক্ত হন, সওয়াবের অধিকারীও হন। তবে আল্লাহর আনুগত্যই যাদের কষ্টের একমাত্র কারণ, তারা স্বয়ং মুসিবতের ওপর সওয়াব লাভ করবেন; বিপদের বিনিময়ে তাদের আমলনামায় যুক্ত হয় পুণ্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন-
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَأُ وَ لَا نَصَبٌ وَ لَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ لَا يَطَئُوْنَ مَوْطِئًا يَغِيْظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُوْنَ مِنْ عَدَةٍ نَّيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
"তা একারণে যে-আল্লাহর পথে যে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধার কষ্ট দেখা দেয় অথবা তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফেরদের মনে ক্রোধের সঞ্চার করে কিংবা শত্রুদের বিরুদ্ধে তারা বিজয় লাভ করে—এর প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লেখা হয় নেক আমল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ | সৎকর্মশীলদের কোনো কর্ম বৃtha যেতে দেন না।”[১]
'অর্থাৎ যে-সকল বিপদে মানুষের কোনো হাত থাকে না—যেমন অসুখ-বিসুখ, স্বজন হারানো, কোনো কিছু খোয়ানো—এসব ক্ষেত্রে কেবল ধৈর্যের প্রতিদানই পাওয়া যাবে। স্বয়ং বিপদ কিংবা পারিপার্শ্বিক কারণে কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না। আর যাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন ও আনুগত্য স্বীকার করতে গিয়ে নির্যাতন-নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন, নানামুখী সমস্যায় পড়েছেন—আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন, কারাবন্দী কিংবা দেশান্তরিত হয়েছেন, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, হারিয়েছেন পরিবার-পরিজন, পদ ও সম্পদ, সহ্য করে নিয়েছেন ক্রোধ ও কটূক্তি—তাঁরা নিঃসন্দেহে নবিদের পথে রয়েছেন এবং তাঁদের অনুসারীরা প্রথম যুগের মুহাজিরতুল্য। এঁরা সকল কষ্টের বিনিময়ে প্রতিদানপ্রাপ্ত হবেন, তাঁদের ত্যাগসমূহ নেক আমল বলে গণ্য হবে। যেমন- একজন মুজাহিদ জিহাদের ময়দানে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যন্ত্রণা ও কাফেরীয় ক্রোধ সহ্যের কারণে সওয়াব লাভ করেন। যদিও এসব কাজ সরাসরি বান্দা কর্তৃক সম্পাদিত আমলের মধ্যে পড়ে না, তবে এসবের অনুঘটক তার ইচ্ছাধীন কিছু আমল। এজন্য সেগুলোকে বলা হয় স্বয়ংক্রিয় নেকি।
'কিন্তু এসব আমলের মৌলিক সম্পাদনকারী কে? এসব কি হেতু সৃষ্টিকারী কর্তৃক সম্পাদিত, নাকি আল্লাহ কর্তৃক, নাকি এর কোনো কর্তাই নেই—এ বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো—এগুলো হেতু সৃষ্টিকারী ও অন্যান্য হেতুর সাথে সম্পৃক্ত বলে গণ্য হবে। এজন্যই এর বিনিময়ে নেক আমল লেখা হয়।

টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৯০
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ১২০

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 পরহিংসার প্রতিষেধক

📄 পরহিংসার প্রতিষেধক


'আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো—সকলের কাছে যেন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়—মানব-মন যেসব রোগে আক্রান্ত হয়, হিংসাবৃত্তি তার অন্যতম। খুব কম মানুষই এই মহামারি থেকে বাঁচতে পারে। তাই তো লোকমুখে প্রচলিত— خَلَا جَسَدٌ مِنْ حَسَدٍ অর্থাৎ "হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত নয় কোনো মানুষ।” হিংসা সার্বজনীন ব্যাধি হলেও মন্দ লোকেরাই কেবল আচরণ ও উচ্চারণে তা প্রকাশ করে; ভালো মানুষেরা তা মনেই চেপে রাখে। বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহকে বলা হয়েছিল, "মুমিন কি হিংসুটে হতে পারে?” জবাবে তিনি বলেছিলেন, "ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কথা ভুলে গেছ? তাছাড়া তোমার মনে বুঝি এর উদ্রেক ঘটে না? হ্যাঁ, এটাকে যদি নিজ-মনে চেপে রাখতে পার, কখনো আচরণ-উচ্চারণে প্রকাশ না কর, তবে ক্ষতির কিছু নেই।"
আমি বললাম, 'মুহতারাম, আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে—কোনো মুসলিমের মনে হিংসা যদি এসেই যায়, তবে তার করণীয় কী?'
শাইখ বললেন, 'কেউ যখন বুঝতে পারবে, তার মনে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ কাজ করছে, তখন তার সঙ্গে যাবতীয় আচার-ব্যবহারে আরও বেশি ধৈর্যের পরিচয় দেবে, তার ব্যাপারে আল্লাহকে আরও বেশি ভয় করবে। কিছুদিন এই অনুশীলন করতে পারলে একসময় আপনা-আপনিই মনে হিংসাত্মক মানসিকতার ওপর ঘৃণা তৈরি হবে।'
'অনেক মানুষ আছে এমন, যারা কোনোভাবে দায়গ্রস্ত হওয়ায় যার প্রতি তাদের হিংসা তার ওপর কখনো জুলুম করে না, আবার তার প্রতি কেউ জুলুম করলে জালিমের পাশেও দাঁড়ায় না। কিন্তু তাদের যা করণীয় ছিল, তাও তারা ঠিকমতো করে না। যেমন : তাদের সামনে কেউ ওই ব্যক্তির অযথা নিন্দা করলে প্রতিবাদ করে না, তার সম্পর্কে ভালোকথা বলে না; এমনকি কাউকে তার প্রশংসা করতে দেখলেও বোবা বনে যায়। এসকল লোকেরা অপরের হক আদায়ের ক্ষেত্রে দায়গ্রস্ত, সীমালঙ্ঘনকারীদের মতো। তাই তাদের প্রতিফল হবে ওই লোকদের মতো, যারা অন্যের হক নষ্ট করে, বিভিন্নভাবে মানুষের সঙ্গে বে-ইনসাফি করে, বিপদে-আপদে জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমকে সাহায্য করা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, ঠিক যেমন সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে হিংসার শিকার ব্যক্তির বিপদে।'
'মোটকথা, আচরণ-উচ্চারণে বিদ্বেষ প্রকাশ করে কেউ সীমালঙ্ঘন করলে শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আর যে আল্লাহকে ভয় করবে, সহনশীলতার পরিচয় দেবে, সে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত তো হবেই না, বরং আল্লাহ তাকে পরহেজগারিতার কারণে উপকৃত করবেন। যেমনটা ঘটেছিল যাইনাব বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ক্ষেত্রে। কেননা নবিপত্নীদের মধ্যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা'র মধ্যে একরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এমনিতেই দেখা যায় নারীকুল যথেষ্ট ঈর্ষাপরায়ণ; সঙ্গে যদি থাকে পরস্পর সতীনের সম্পর্ক, তবে তো কথাই নেই। কারণ স্বামীর ওপর স্ত্রীর যে অধিকার তাতে নারীরা কারও অংশীদারত্ব মেনে নিতে পারেন না কোনোভাবেই। কীভাবেই বা পারবেন! এতে যে নিজের ভাগে কম পড়ে যায়।'

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 পদাধিকারীদের পরশ্রীকাতরতা

📄 পদাধিকারীদের পরশ্রীকাতরতা


'যাদের প্রতি হিংসা করা হয় তারা কি পরস্পর হিংসাশ্রয়ী হয়?'- জিজ্ঞেস করলাম।
শাইখ বললেন, 'পদমর্যাদা কিংবা ধনসম্পদে একাধিক ব্যক্তি সমপর্যায়ে থাকাকালে তাদের একজন যদি আগে বাড়ে কিংবা পেছনে পড়ে, তবে তাদের মধ্যেও হিংসার উদ্রেক হয়। এক্ষেত্রে একজনের অগ্রগামিতাই হয় আরেকজনের অন্তর্দাহের কারণ। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায় ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর ভাইদের হিংসার ঘটনা, আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্রের মধ্যে একজনের প্রতি অপরজনের হিংসার ঘটনা। দ্বিতীয় ঘটনায় বিদ্বেষের কারণ ছিল—তাদের একজনের কুরবানি আল্লাহ কবুল করেছিলেন এবং অন্যজনেরটা করেননি। তখন ঈমান ও তাকওয়ার বিবেচনায় আল্লাহর তরফ থেকে একজন মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ায় আরেকজন পরশ্রীকাতর হয়ে পড়েছিল। ঠিক একই কারণেই আজীবন ইহুদিরা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। কিন্তু হিংসুটে ভাই হিংসার মধ্যেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং ঈর্ষানল নেভাতে গিয়ে ভাইয়ের প্রাণও কেড়ে নিয়েছিল। এজন্য বলা হয়ে থাকে—সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানি ঘটে তিনটি গুনাহের মাধ্যমে—লোভ, দাম্ভিকতা ও পরশ্রীকাতরতা। লোভ প্রকাশ পেয়েছিল আদম আলাইহিস সালাম থেকে, দম্ভ ইবলিস শয়তান থেকে আর পরশ্রীকাতরতা আদমপুত্র কাবিল থেকে; যে কারণে সে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে ফেলেছিল। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
ثَلَاثُ لَا يَنْجُو مِنْهُنَّ أَحَدٌ : الْحَسَدُ ، وَ الظَّنُّ ، وَ الطَّيَرَةُ. وَ سَأُحَدِّثُكُمْ بِمَا يَخْرُجُ مِنْ ذَلِكَ : إِذَا حَسَدْتَ فَلَا تَبْغَضَ ، وَإِذَا ظَنَنْتَ فَلَا تُحَقِّقَ ، وَ إِذَا تَطَيَّرْتَ فَامْضِ
“তিনটি জিনিসি থেকে কেউ রেহাই পায় না-হিংসা, অনুমান ও কুধারণা। তবে আমি তোমাদেরকে এসব থেকে বাঁচার উপায় বলে দিচ্ছি; কারও প্রতি মনে হিংসা এলে তাকে অবজ্ঞা করবে না, অনুমেয় কিছু যাচাই করতে যাবে না এবং কুধারণাকে কখনো প্রশ্রয় দেবে না।”১।
'হাদিসটি ইবনু আবিদ দুনইয়া তাঁর সনদে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া একাধিক হাদিসগ্রন্থে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ
“পূর্ববর্তী উম্মাতদের ব্যাধি তোমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। তা হলো-হিংসাবৃত্তি ও বিদ্বেষ। এই রোগ হলো মুণ্ডনকারী। আমি চুল মুণ্ডনের কথা বলছি না। বরং এসব তো তোমাদের দ্বীনকেই নিঃশেষ করে দেবে।”২
'নবীজি হিংসাবৃত্তিকে রোগ বলেছেন, যেমন বলেছেন কার্পণ্যকেও। হাদিসে এসেছে-
أَيُّ دَاءٍ أَدْوَأُ مِنَ البُخْلِ | 'কৃপণতার চেয়ে বড় রোগ আর কী হতে পারে?'।
উল্লিখিত হাদিস থেকে আমরা জ্ঞাত হলাম-এগুলোও রোগ, অন্তরের রোগ।'
'অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلاقِ وَالْأَهْوَاءِ وَالْأَدْوَاءِ
"(নবীজি বলেন, হে আল্লাহ) আমি আপনার কাছে মন্দ চরিত্র, প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা ও রোগব্যাধি থেকে পানাহ চাই।" [১]
'উল্লিখিত হাদিসে الأذواء শব্দটি الْأَهْوَاء و الأخلاق শব্দের পরে ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্দেশ্য এদিকে ইঙ্গিত করা যে—মানুষের মৌলিক চরিত্র কখনো স্বভাব-প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ | “(হে নবী!) নিঃসন্দেহে আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।” [২]
'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, ইবনু উয়াইনাহ, আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) বলেন— خُلُقٍ عَظِيمٌ তথা সুমহান চরিত্র-এর উদ্দেশ্য হলো— دِينٌ عَظِيمٌ তথা সুমহান ধর্ম। ইবনু আব্বাসের সূত্রে অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে— عَلَى دِيْنِ الْإِسْلَامِ তথা ইসলাম ধর্মের ওপর। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, "তাঁর (নবীজির) চরিত্র ছিল কুরআনেরই বাস্তবরূপ।” হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআন নিঃসৃত শিষ্টাচারই হলো সুমহান চরিত্র।'
আজকের মজলিস এখানেই সমাপ্ত। শাইখের পরবর্তী মজলিসে সাক্ষাতের আশা রাখছি। সে মজলিসে আমরা অন্তরের রোগব্যাধি প্রসঙ্গে আরও আলোচনা শুনব ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
[১] তাখরিজু إহইয়াই উলুমিদ্দিন, যাইনুদ্দিন ইরাকি, হাদিস-ক্রম: ৩/২৩১। তাখরিজু মিনহাজিল কাসিদীন, শুয়াইব আরনাউত, হাদিস-ক্রম: ১৮৬; উভয়ের মতেই হাদিসটি যঈফ।
[২] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ২৫১০; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ১৪৩০। এটি মূলত হাদিসের একটি অংশ। শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদিসটি হাসান লিগায়রিহি।
[৩] আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস-ক্রম:-২৯৬।
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৫৯১। হাদিসটি ইমাম তাবারনি, ইমাম হাকেম, ইমাম ইবনু হিব্বানও বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযি الْأَدْوَاءُ শব্দের বদলে الْأَعْمَالُ শব্দে বর্ণনা করেছেন।
[২] সূরা আল-কলাম, আয়াত-ক্রম: ৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00