📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা মানুষের মর্যাদা বুলন্দ করে

📄 সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা মানুষের মর্যাদা বুলন্দ করে


আমি বললাম, 'শাইখ! আমরা কি এ বিষয়টিকে একটি মূলনীতির অধীনে বিবেচনা করতে পারি? যেমন-কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষা ব্যাতিরেকে যে কল্যাণকর কাজের আকাঙ্ক্ষা রাখবে সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যার মধ্যে প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষা রয়েছে।'
শাইখ ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই এমনটা ধরে নিতে পার। আমি বরং তোমাদের সঙ্গে আরও কিছু কথা যোগ করছি, যা বিষয়টিকে আরও মজবুত করবে। দেখো, সাহাবীদের মধ্যে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর মতো আরও অনেক সাহাবী ছিলেন, যাঁরা এ ধরনের চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত ছিলেন। তাঁরা ওই সকল সাহাবীর তুলনায় অধিক মর্যাদাবান ছিলেন, যাঁরা এরকম প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষার মনোভাব রাখতেন, যদিও এটি নিতান্তই একটি বৈধ বিষয়। এজন্যই তো আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু أمين هذه الأمة তথা "এই উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি” খেতাব পেয়েছিলেন। কেননা যদি কাউকে কোনো জিনিস হেফাজতের জন্য বিশ্বস্ত মনে করা হয়, আর তার ওই জিনিসের প্রতি কোনো আগ্রহ না থাকে, তবে সে আমানত রক্ষার ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক উপযুক্ত বলে গণ্য হবে, যার কিনা ওই জিনিসের প্রতি আগ্রহ আছে। এ জন্যই (যুবতীর সঙ্গে) নারী, শিশু ও হিজড়াদের ওপর বিশ্বাস করা যায়। ছোটখাটো দায়িত্বের বেলায় বিশ্বাস করা যায় এমন ব্যক্তিকে, যার বড় দায়িত্বের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। সম্পদের বেলায় বিশ্বাস করা যায় এমন ব্যক্তিকে, যার ব্যাপারে জানা যায়, তার ওই সম্পদ গ্রহণের কোনো ইচ্ছে নেই। যে মনে মনে বিশ্বাসঘাতকতা লালন করে, তাকে বিশ্বাস করা আর ছাগল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেকড়েকে বিশ্বাস করা সমান কথা। তাই, কারও মনে কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ থাকলে, সে ওই বিষয়ে আমানত রক্ষা করতে অক্ষম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
'আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, তিনি বলেন-
كنا يوما جلوسا مع رسول الله ﷺ فقال : يطلع عليكم من هذا الفج رجل من أهل الجنة ، فطلع رجل من الأنصار تنطف لحيته من ماء وضوئه قد علق نعليه يده بشماله فسلم ، فلما كان من الغد ، قال النبي ﷺ مثل ذلك فطلع ذلك الرجل مثل حاله الأولى ، فلما أن كان في اليوم الثالث ، قال النبي ﷺ مثل مقالته فطلع ذلك الرجل على مثل حالته الأولى ، فلما قام النبي ﷺ تبعه عبد الله بن عمرو بن العاص ، فقال: إني لا حيث أبي فأقسمت عليه أني لا أدخل عليه ثلاثا فإن رأيت أن تؤويني إليك حتى تمضي الثلاثة أيامٍ فعلت فقال: نعم ، قال أنس: فكان عبد الله يحدث أنه كان معه ثلاث ليال فلم يره يقومُ من الليل شيئًا ، غير أنه إذا تعار ، أو قال: انقلب على فراشه ، ذكر الله ، عزَّ وجلَّ ، وكبر حتى يقوم ، لصلاة الفجر ، قال عبد الله بن عمرو: غير أني لم أسمعه يقول إلا خيرًا ، فلما مضت الثلاث الليالي كدتُ أن أحتقر عمله ، قلت : يا عبد الله ، لم يكن بيني وبين والدي غضب ، ولا هجرة ولكني سمعت رسول الله ﷺ يقول لك ثلاث مرات يطلع عليكم الآن رجل من أهل الجنة ، فطلعت أنت الثلاث مرات فأردت أن أوي إليك لأنظر عملك فأقتدي بك ، فلم أرك تعمل كبيرةً فما الذي بلغ بك ما قال رسول الله ﷺ ؟ قال : ما هو إلا ما رأيت فلما وليتُ دَعاني ، فقال: ما هو إلا ما رأيت غير أني لا أجد في نفسي على مسلم غشا ، ولا أحسد أحدًا على خير أعطاه الله تعالى إياه ، قال عبد الله : قلتُ : هي التي بلغت بك وهي التي لا تطيق
“আমরা একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় তিনি বললেন, 'তোমাদের সামনে এই গিরিপথ দিয়ে একজন জান্নাতি মানুষের আগমন ঘটবে।' তিনি বলেন, তখন একজন আনসারি সাহাবী উপস্থিত হলেন, যাঁর দাড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওজুর পানি ঝরছিল এবং জুতোজোড়া ছিল তাঁর বাঁ হাতে; অতঃপর তিনি এসে সালাম দিলেন। পরের দিন নবীজি একই কথা বললেন। সেদিনও ওই সাহাবী এই অবস্থায় উপস্থিত হলেন। তৃতীয় দিনও নবীজি একই কথা বললেন এবং সেই সাহাবী একই অবস্থায় উপস্থিত হলেন। এরপর নবীজি উঠে গেলে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিছু নিলেন। তিনি তাঁকে বললেন, 'আমার বাবা আমার ওপর রেগে আছেন। আমি কসম করেছি যে, তিনদিন পর্যন্ত ঘরে ফিরব না। যদি আপনি আমাকে তিনটা দিন আপনার কাছে থাকতে অনুমতি দিতেন, তবে আমি থেকে যেতাম।' তিনি রাজি হলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, তিনি তিনরাত সেখানে ছিলেন। এরমধ্যে কোনোদিন তিনি তাঁকে রাত-জেগে ইবাদত করতে দেখেননি।
তবে তিনি যখন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেছেন, তখন মুখে আল্লাহর জিকির ছিল, এভাবে থাকতে থাকতে ফজরের সময় হলে উঠে পড়েছেন।
আবদুল্লাহ বলেন, “তবে আমি তাঁকে সবসময় ভালো কথা বলতে শুনেছি। এভাবে যখন তিনদিন কেটে গেল এবং আমার কাছে তাঁর আমল খুবই সাদাসিধে মনে হলো, তখন আমি তাঁকে বললাম, 'হে আল্লাহর বান্দা! আমার ও আমার বাবার মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি, কিন্তু আমি তিনবার নবীজি-কে বলতে শুনেছি—তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতি মানুষ উপস্থিত হবে। (আর সেই মানুষটি ছিলেন আপনি।) এজন্য আমি ইচ্ছে করেছিলাম আপনার কাছে থাকতে, যেন আপনার আমল দেখতে পারি। এজন্য আপনার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না। তাহলে কী সে কারণ, যা আপনাকে নবীজির উক্ত বক্তব্যের উপযোগী করে দিয়েছে?' তিনি বললেন, 'তা আর তেমন কিছু না, বরং আপনি যা দেখেছেন ওটুকই। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে এই যে, আমি আমার মনে কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছে রাখি না এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের ব্যাপারে কাউকে হিংসা করি না।' আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে এই হলো সেই আমল, যার মাধ্যমে আপনি এতদূর পৌঁছে গেছেন, আর আমরা সেটি করতে পারছি না!'" [১]
'আব্দুল্লাহ ইবনু আমর যে বললেন- “এই হলো সেই আমল, যার মাধ্যমে আপনি এতদূর পৌঁছে গেছেন, আর আমরা সেটি করতে পারছি না।” এতে এ-দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি সর্বপ্রকার হিংসা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। এজন্যই আল্লাহ তাআলা আনসারদের প্রশংসা করে বলেন-
وَ لَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أَوْتُوْا وَ يُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَ لَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
“মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, সেজন্য তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে।”[২]
'অর্থাৎ, ওই সম্পদের ব্যাপারে যা তাদের মুহাজির ভাইদের দেওয়া হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন, তারা তাদের মনে কোনো 'হাজত' অর্থাৎ হিংসা বা ক্রোধ অনুভব করেন না ওই সম্পদের ব্যাপারে যা মুহাজিরদের দেওয়া হয়েছে।'
'কেউ কেউ বলেছেন, সম্পদ দ্বারা এখানে জিহাদলব্ধ সম্পদ উদ্দেশ্য। আবার কেউ বলেছেন, সাধারণ দান কিংবা হাদিয়া-তোহফা উদ্দেশ্য। তো, মুহাজিরদেরকে যে সম্পদ কিংবা মর্যাদা দেওয়া হতো, সে ব্যাপারে আনসারগণ কোনো প্রয়োজনই বোধ করতেন না। আর হিংসা তো এভাবেই হয়。
'আউস ও খাযরাজ সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। তাদের একপক্ষ যখন এমন কিছু করত, যার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে মর্যাদা লাভ করা যায়, তখন অপরপক্ষও চেষ্টা করত তেমন কিছু করতে। এটি এমন প্রতিযোগিতা, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ فِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ
|"এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।"
আমি বললাম, 'মুহতারাম, আপনার কথা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, কতক হিংসা মন্দ নয়। তাহলে হিংসা মাত্রই মন্দ কেন বলা হয়?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এ বিষয়ে আল্লাহ চাইলে আগামী মজলিসে বিস্তারিত আলোচনা করব।'

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৬৬।
[২] সুরা হাশর, আয়াত-৯
[১] সূরা মুতাফফিফিন, আয়াত-ক্রম: ২৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00