📄 হিংসার স্বরূপ ও প্রকার
'হিংসা হলো মানব-মনে সৃষ্ট এক বিশেষ যন্ত্রণা, যার কারণ হতে পারে জ্ঞানীর জ্ঞান-প্রজ্ঞা বা ধনীর সুখ-সাচ্ছন্দ্য। এজন্য মহৎ কারও জন্য হিংসা করা শোভা পায় না। কেননা তিনি তো সর্বাবস্থায়ই ভালো থাকেন, তুষ্ট থাকেন।'
'হিংসার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেকে বলেছেন—হিংসা হলো, কারও নিয়ামত বিলুপ্তির আকাঙ্ক্ষা করা, যদিও অনুরূপ নিয়ামত হিংসুকের অর্জিত হোক বা না-হোক। পক্ষান্তরে ঈর্ষা হলো এর উল্টো। অর্থাৎ, ঈর্ষা হলো—কারও সমপরিমাণ নিয়ামতের আকাঙ্ক্ষা করা, এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির নিয়ামত বিনষ্টের কোনো কামনা তার থাকে না। বাস্তবতা হলো—হিংসার মধ্যে ঘৃণা ও অবজ্ঞা বিদ্যমান থাকে। মৌলিকভাবেই হিংসুক অন্যের সুখ সাচ্ছন্দ্য সহ্য করতে পারে না।'
'হিংসা প্রধানত দুই প্রকার। প্রথম প্রকার: কোনো কারণ ছাড়াই অন্যের ভালো দেখতে না-পারা। এটা হলো নিকৃষ্ট পর্যায়ের হিংসা। এ-ক্ষেত্রে সে অন্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অপছন্দ করে, অন্যের সুখে নিজে কষ্ট পায়, যন্ত্রণায় ভোগে। এক পর্যায়ে এই স্বভাব তার অন্তরের রোগে পরিণত হয়ে যায়। তখন সে কাউকে সুখ-বঞ্চিত দেখলে আনন্দিত হয়। যদিও এর সাথে তার বিন্দুমাত্র লাভ-ক্ষতির সম্পর্ক নেই।'
আমি বললাম, 'কারও নিয়ামত দূরীভূত হতে দেখে যে হিংসুকের ভালো লাগে, এটাও তো তার লাভের মধ্যে ফেলা যায়।'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিকই বলেছ। কিন্তু হতে পারে হিংসার শিকার ওই ব্যক্তি আরও বড় নিয়ামত প্রাপ্ত হলো। তখন কিন্তু সেই হিংসুকের জ্বালা আরও বেড়ে যাবে।'
'দ্বিতীয় প্রকার: নিজের ওপর কারও শ্রেষ্ঠত্ব সহ্য করতে না পারা। অর্থাৎ, কেউ তার থেকে আগে বেড়ে যাবে, এটা সে সইতে পারবে না। বরং সে সবসময় অন্যের সমপর্যায়ে কিংবা অগ্রে থাকতে চাইবে। এটিও একধরনের হিংসা। যেটাকে অনেকে 'গিবত্বা' বা ঈর্ষা বলেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে 'হাসাদ' বা 'হিংসা'ই বলেছেন। হাদিসটি কয়েকজন প্রসিদ্ধ সাহাবী বর্ণনা করেছেন। যদিও তাঁদের বর্ণনাগুলোর মধ্যে শব্দগত সামান্য তারতম্য রয়েছে。
প্রথম হাদিস : আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لا حَسَدَ إِلا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً فَسُلِّطَ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ الْحِكْمَةَ ، فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
“দুই ব্যক্তির ওপর হিংসা করা বৈধ; এক. সে ব্যক্তি-যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং বৈধ পন্থায় অকাতরে সে তা ব্যয় করে; দুই. এমন ব্যক্তি-যাকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং সে তা প্রয়োগ করে ফয়সালা করে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়।” [১]
দ্বিতীয় হাদিস : আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَقُومُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً فَهُوَ يُنْفِقُهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ
“দুটি ব্যাপার ছাড়া হিংসা করা যায় না। এমন লোক যাকে আল্লাহ কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন এবং সে তদনুযায়ী রাত-দিন আমল করে। আরেকজন সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অর্থ-সম্পদ দান করেছেন এবং রাত-দিন সে তা (আল্লাহর পথে) খরচ করে।” [২]
তৃতীয় হাদিস : আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ عَلَّمَهُ اللهُ الْقُرْآنَ فَهُوَ يَتْلُوْهُ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ فَسَمِعَهُ جَارٌ لَهُ فَقَالَ لَيْتَنِي أُوتِيْتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلَانٌ فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالًا فَهُوَ يُهْلِكُهُ فِي الْحَقِّ فَقَالَ رَجُلٌ لَيْتَنِي أُوتِيْتُ مِثْلَ مَا أُوتِيَ فُلَانٌ فَعَمِلْتُ مِثْلَ مَا يَعْمَلُ
“দুই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও সাথে হিংসা করা যায় না। এক ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং সে তা দিন- রাত তেলাওয়াত করে। আর তা শুনে তার প্রতিবেশীরা বলে, হায়! আমাদেরকেও যদি তার মতো এমন জ্ঞান দেওয়া হতো, তাহলে আমিও তার মতো আমল করতাম। আর একজন এমন লোক, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে সম্পদ হকের পথে খরচ করে। এমনটা দেখে অন্য কেউ বলে হায়! আমাকেও যদি অমুক ব্যক্তির মতো সম্পদ দেওয়া হতো, আমিও তার মতো ব্যয় করতাম।" [১]
'উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে প্রতিভাত হয়, হিংসার দুটি ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিয়েছেন। কেউ কেউ এটাকে ঈর্ষা বলে থাকেন। ঈর্ষা হলো- অন্যের অনুরূপ নিয়ামত কামনা করা, সাথে নিজের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব অপছন্দ করা।'
আমি বললাম, 'যেহেতু এখানে একজনের আকাঙ্ক্ষা কেবলই অপরজনের সমপরিমাণ নিয়ামত লাভ করা, তাহলে এটাকে হিংসা বললে কি আপত্তি করা যায় না?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, করা যায়। কেউ কেউ তো প্রশ্নও তুলেছেন- “সে তো কেবল নিজের জন্য নিয়ামত কামনা করেছে, তাহলে এটাকে হিংসা কেন বলা হলো!” এর জবাবে বলা হয়-তার এই কামনার সূচনা হয়েছে অন্যের নিয়ামত দেখে। মূলত নিজের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব তার ভালো লাগেনি। অন্যের এই নিয়ামত ও শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি না থাকলে, সে নিজের জন্যও হয়তো এটি কামনা করত না। যেহেতু সূচনাটা হলো—নিজের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব অপছন্দ করার কারণে, তাই এটিও একরকম হাসাদ বা হিংসা। কেননা এর শেষটা ভালো দেখালেও, শুরুটা মন্দই ছিল। হ্যাঁ, কেউ যদি অন্যের অবস্থার কোনো বিবেচনা না রেখে নিজের জন্য নিয়ামত কামনা করে, তবে এতে হিংসার কিছু থাকবে না। দ্বিতীয় প্রকারটিকে মানুষ হিংসা মনে করে না, তাই এতেই বেশি লিপ্ত হয়।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৩
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭৫৮
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৫০২৬
📄 সৎ কাজে প্রতিযোগিতা হিংসা নয়
আমি বললাম, 'তাহলে তো সৎ ও কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা হিংসার অন্তর্ভুক্ত হবে না, তাই না?'
শাইখ বললেন, 'মানুষ যখন অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজে কিছু অর্জন করতে চেষ্টা করে, তখন সেটা হয় মুনাফাসাহ বা 'সৎ কাজে প্রতিযোগিতা'। এতে মন্দের কিছু নেই। পছন্দের কোনো এক বিষয় যদি একাধিক ব্যক্তি অর্জন করতে চায়, এবং প্রত্যেকেই শুধু নিজের দিকটা চিন্তা করে, তবে সমস্যার কিছু নেই। আর উপরে যে বিষয়ে আলোচনা হলো, সেটা হচ্ছে নিজের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব অপছন্দ করা, যেমনটি সাধারণ যে কোনো প্রতিযোগিতায় দেখা যায়—একজন অপরজনের বিজয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হয়। প্রতিযোগিতা মৌলিকভাবে মন্দ নয়। বরং কল্যাণের প্রতিযোগিতা উত্তমও। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ . عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ . تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ . يُسْقَوْنَ مِنْ رَّحِيقٍ مَّخْتُوْمٍ . خِتْمُهُ مِسْكٌ ، وَ فِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ
| “নিশ্চয় সৎলোকেরা থাকবে পরম আরামে; সিংহাসনে বসে তারা (এদিক-সেদিক) অবলোকন করবে। আপনি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবেন। তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। যার মোহর হবে কস্তুরী। এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের | প্রতিযোগিতা করা উচিত।”
'কুরআনে প্রতিযোগীদেরকে (পরকালের) নিয়ামতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে আদেশ করা হয়েছে, পার্থিব ও ক্ষণস্থায়ী কোনো কিছুর জন্য নয়। হাদিসের সঙ্গেও এই বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল দুই ব্যক্তির ওপর হিংসার অনুমতি দিয়েছেন। প্রথমত এমন ব্যক্তি, যাকে ইলম দেওয়া হয়েছে, সে তা অনুযায়ী আমল করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয়ত এমন লোক, যাকে সম্পদ দেওয়া হয়েছে এবং সে তা (আল্লাহর রাহে) খরচ করে। অপরদিকে এর বিপরীত অবস্থা হলো—ইলম দেওয়া হয়েছে কিন্তু সে তা অনুযায়ী আমল করে না এবং অন্যকে শিক্ষাও দেয় না কিংবা সম্পদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু সে তা (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করে না। এমতাবস্থায় এদের হিংসা করার কোনো সুযোগ নেই। এসব কাজ কল্যাণকর নয়, তাই এমন কিছুর আকাঙ্ক্ষাও করা যাবে না। বরং এসব তার আজাবের কারণ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রাখে।'
'কাউকে যদি বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হয়, এবং সে ইলম ও ইনসাফের সঙ্গে তা পালন করে, সকল আমানত যথাযথ স্থানে পৌঁছে দেয়, জনগণের মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী ফয়সালা করে, তবে নিঃসন্দেহে তা অনেক বড় মর্যাদার ব্যাপার। কিন্তু এভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিনতর জিহাদের সমতুল্য। সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদই করছে।'
আমি বললাম, 'শাইখ, নবীজি হিংসার ক্ষেত্রে শুধু দুটি আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। জিহাদ, হজ, সালাত, সওমসহ কত আমল আছে, সেগুলো উল্লেখ করেননি কেন?'
শাইখ বললেন, 'নবীজি ওইগুলো উল্লেখ করেননি এজন্য যে, মানুষের নফস এমন কাউকে হিংসা করে না, যে কষ্টে আছে; যদিও আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার চেয়ে জিহাদ বেশি উত্তম। অপরদিকে দাতা কিংবা শিক্ষকের সাধারণত কোনো শত্রু থাকে না। যদি এমন হয়ে থাকে যে, তাদেরও শত্রু আছে এবং তাদেরকেও শত্রুদের সঙ্গে জিহাদ করতে হয়, তবে আবার তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে। এজন্য নবীজি নামাজি, রোজাদার কিংবা হাজিদের কথা উল্লেখ করেননি। কেননা সালাত, হজ কিংবা সওমের মতো আমলে বাহ্যত কেউ উপকৃত হয় না; যেমন হয়ে থাকে কোনো শিক্ষক কিংবা দাতার ক্ষেত্রে। দেখা যায় জ্ঞান বিতরণের জন্য সম্মান করা হয় শিক্ষককে, আর দান-সদকার জন্য দাতাকে।'
টিকাঃ
[১] সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত-ক্রম: ২২-২৬
📄 হিংসার নানা কারণ
আমি বললাম, 'শাইখ, মানুষ হয়তো পদমর্যাদা ও ধনসম্পদের জন্যই অন্যকে বেশি হিংসা করে, তাই না?'
শাইখ বললেন, 'হ্যাঁ, নিজের চেয়ে অপরের কর্তৃত্ব কিংবা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব থেকেই মূলত হিংসার উৎপত্তি ঘটে। এমনকি এটা হতে পারে খাবার-দাবার কিংবা বিবাহ-শাদির বিবেচনায়ও। এ ছাড়া সাধারণত কোনো "আমেল” অন্যকে হিংসা করে না। তবে ওপরের ওই দুই প্রকার ব্যতিক্রম। কেননা ওই দুই ক্ষেত্রে মানুষকে প্রচুর হিংসা করতে দেখা যায়। এজন্য আলিমদের অনুসারীদের মধ্যেই এমন অনেক আছে, যারা (ঈর্ষার নামে) তাকে হিংসা করে। এমনটা অন্যদের বেলায় ঘটে না। আবার যারা বিশিষ্ট দানশীল, তাদের বেলায়ও এমনটি ঘটতে পারে।'
'ইলম মানুষের অন্তরের খাদ্য হিসেবে কাজ করে, আর সম্পদ কাজ করে দেহের খাবার হিসেবে। দেহ ও মনের কাজে আসে—এমন সবকিছুর প্রতিই মানুষ মুখাপেক্ষী। এজন্য আল্লাহ দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন। একটি উদাহরণে তিনি বলেন—
ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا عَبْدًا مَّمْلُوْكًا لَّا يَقْدِرُ عَلَى شَيْءٍ وَ مَنْ رَّزَقْنَهُ مِنَّا رِزْقًا حَسَنًا فَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ سِرًّا وَ جَهْرًا هَلْ يَسْتَوْنَ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ . وَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا رَّجُلَيْنِ أَحَدُهُمَا أَبْكَمُ لَا يَقْدِرُ عَلَى شَيْءٍ وَ هُوَ كَلٌّ عَلَى مَوْلَهُ أَيْنَمَا يُوَقِّهْهُ لَآيَأْتِ بِخَيْرٍ ، هَلْ يَسْتَوِي هُوَ وَ مَنْ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَ هُوَ عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, একদিকে কারও মালিকানাধীন গোলাম, যে কোনো কিছুর ওপর ক্ষমতা রাখে না এবং এমন একজন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে উৎকৃষ্ট রিজিক দিয়েছি। সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; উভয়ে কি সমান হতে পারে? সকল প্রশংসা আল্লাহর, কিন্তু অধিকাংশই এসব বিষয় জানে না। আল্লাহ আরেকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন— দুজন লোক, তাদের একজন বোবা, কোনো কাজ করতে পারে না; বরং সে তার মালিকের জন্য একটা বোঝা। মনিব তাকে যেদিকেই পাঠায়, ভালো কিছু সে করে আসে না। সে কি সমান হবে ঐ ব্যক্তির, যে অন্যকে ইনসাফের আদেশ দেয় এবং নিজেও সরল পথে অবিচল থাকে।" [১]
'উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা দুটি উপমা পেশ করেছেন। একটি তাঁর আপন সত্তার সঙ্গে এবং অপরটি তিনি ছাড়া অন্য যেসকল উপাস্যের উপাসনা করা হয়, সে-সবের সঙ্গে। কেননা মূর্তি না পারে কোনো দরকারি কাজ করতে, না পারে কোনো উপকারী কথা বলতে।'
'যদি দুজন লোককে চিন্তা করা হয়, যাদের একজন হচ্ছে গোলাম, যার কিছুই করার ক্ষমতা নেই; অপরজন স্বাধীন এবং তাকে আল্লাহ উত্তম রিযিক দান করেছেন এবং সে তা থেকে গোপনে প্রকাশ্যে দান করে; এমতাবস্থায় এই অক্ষম গোলাম ও গোপনে-প্রকাশ্যে দানশীল ব্যক্তি কি সমপর্যায়ের হবে? আর আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা তো এমন সত্ত্বা যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে সক্ষম; তিনি তো সর্বদা বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেই যাচ্ছেন। তাহলে কীভাবে তাঁর সঙ্গে এমন অক্ষম গোলামের সাদৃশ্য দেওয়া যেতে পারে, যে সাহায্য ছাড়া কিছুই করতে সক্ষম না! তো, এ হলো ওই ব্যক্তির উদাহরণ, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন, আর সে সবসময় তা থেকে খরচ করে।'
'দ্বিতীয় উদাহরণ: যদি এমন দুজন ব্যক্তির কথা চিন্তা করা হয়, যাদের একজন বোবা ও বধির, যে কিছুই বুঝে না, বলতেও পারে না, করতেও পারে না, বরং সে নিজেই তার মালিকের ওপর একটা বোঝা। সে মালিকের কোনো কাজেই আসে না, কোনোভাবেই মালিক তার দ্বারা উপকৃত হতে পারে না, বরং তার মালিকানা যার হাতে ন্যস্ত হয়েছে, সে তার ওপরই ঝামেলা তৈরি করে আছে; অপর ব্যক্তির আছে ইলম ও ইনসাফ। সে ইনসাফের আদেশ দেয়, তদনুযায়ী আমলও করে এবং সে আছে সরল সঠিক পথে। এই দ্বিতীয় ব্যক্তি হলো ওই ব্যক্তির মতো, যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, যে নিজে তদনুযায়ী আমল করে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়।'
'আল্লাহ তাআলা নিজেকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন এজন্য যে, তিনি ইলম ও ইনসাফের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিকারী, তিনি ইনসাফের আদেশদাতা এবং তিনিই সরল-সঠিক পথের রূপরেখা নির্ধারণকারী। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَ الْمَلَئِكَةُ وَأُولُوا الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” [১]
হুদ আলাইহিস সালামের ভাষ্যে কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ رَبِّي وَ رَبِّكُمْ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ أَخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
"আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি যিনি আমার এবং তোমাদের রব। পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই যা তাঁর পূণ আয়ত্তাধীন নয়। নিঃসন্দেহে আমার পালনকর্তা সরল পথে।” [২]
'সাহাবীরা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কারণ, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন আলিম ও মুআল্লিম (শিক্ষক), তাঁর ভাই ছিলেন বিশিষ্ট দানশীল। এজন্য লোকেরা তাঁদের সম্মান করত। মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন যে, লোকেরা ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে হজের মাসআলা জিজ্ঞেস করে, তখন তিনি বললেন, "নিঃসন্দেহে এটি অনেক বড় মর্যাদার বিষয়।”
'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সঙ্গে দানের প্রতিযোগিতা করেছিলেন। যেমনটি হাদিসের কিতাবে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন-
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمًا أَنْ نَتَصَدَّقَ فَوَافَقَ ذَلِكَ مَالاً عِنْدِي فَقُلْتُ الْيَوْمَ أَسْبِقُ أَبَا بَكْرٍ إِنْ سَبَقْتُهُ يَوْمًا فَجِئْتُ بِنِصْفِ مَالِي فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَا أَبْقَيْتَ لِأَهْلِكَ . قُلْتُ مِثْلَهُ قَالَ وَأَتَى أَبُو بَكْرٍ - رضى الله عنه - بِكُلِّ مَا عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا أَبْقَيْتَ لأَهْلِكَ . قَالَ أَبْقَيْتُ لَهُمُ اللَّهَ وَرَسُولَهُ . قُلْتُ لَا أَسَابِقُكَ إِلَى شَيْءٍ أَبَدًا
“একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে সাদাকাহ করতে নির্দেশ দিলেন। ঘটনাক্রমে সেদিন আমার কাছে মালও ছিল। আমি (মনে মনে) বললাম, আজ আমি আবু বকর থেকে অগ্রগামী হব, কোনোদিন দানের ব্যাপারে তাঁর অগ্রগামী হতে পারিনি। কাজেই আমি আমার অর্ধেক মাল নিয়ে উপস্থিত হলাম। রাসূলুল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'পরিবারের জন্য কী অবশিষ্ট রেখে এসেছ?' আমি বললাম, 'যা এনেছি তার সমপরিমাণ।' উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এদিকে আবু বকর নিজের সমস্ত মাল নিয়ে উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'পরিবারের জন্য কী অবশিষ্ট রেখে এসেছ?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ আর তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।' তখন আমি বললাম, 'কখনো কোনো বিষয়েই আপনাকে আমি পেছনে ফেলতে পারব না।" [১]
'উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যেটি করলেন, তা হলো সৎ কাজে প্রতিযোগিতা, যা বৈধ ঈর্ষার অন্তর্ভুক্ত।'
আমি বললাম, 'এই বিষয়টি যদি বৈধ প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে, তাহলে এখানে উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কোনো ব্যাপার আছে কি?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এখানে সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু'র অবস্থা বেশি উত্তম। কেননা তিনি সবধরনের প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত। তিনি অন্যের অবস্থা বিবেচনায় নেননি। যেমন মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আমরা মেরাজের হাদিসে জেনেছি, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈর্ষা বোধ করেন, এমনকি নবীজি যখন তাঁকে অতিক্রম করেন, তখন তিনি কেঁদেই ফেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, "আপনি কাঁদছেন কেন?" তিনি বললেন, “আমি কাঁদছি, কারণ আমার পর এমন কাউকে নবুওয়াত দান করা হয়েছে, যাঁর উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে বেশি জান্নাতি হবে।”
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৭৫-৭৬
[১] সূরা আলি ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৮
[২] সূরা হুদ, আয়াত-ক্র:
[১] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ১৬৭৮; শুয়াইব আরনাউত হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
📄 সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা মানুষের মর্যাদা বুলন্দ করে
আমি বললাম, 'শাইখ! আমরা কি এ বিষয়টিকে একটি মূলনীতির অধীনে বিবেচনা করতে পারি? যেমন-কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষা ব্যাতিরেকে যে কল্যাণকর কাজের আকাঙ্ক্ষা রাখবে সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যার মধ্যে প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষা রয়েছে।'
শাইখ ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই এমনটা ধরে নিতে পার। আমি বরং তোমাদের সঙ্গে আরও কিছু কথা যোগ করছি, যা বিষয়টিকে আরও মজবুত করবে। দেখো, সাহাবীদের মধ্যে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর মতো আরও অনেক সাহাবী ছিলেন, যাঁরা এ ধরনের চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত ছিলেন। তাঁরা ওই সকল সাহাবীর তুলনায় অধিক মর্যাদাবান ছিলেন, যাঁরা এরকম প্রতিযোগিতা কিংবা ঈর্ষার মনোভাব রাখতেন, যদিও এটি নিতান্তই একটি বৈধ বিষয়। এজন্যই তো আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু أمين هذه الأمة তথা "এই উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি” খেতাব পেয়েছিলেন। কেননা যদি কাউকে কোনো জিনিস হেফাজতের জন্য বিশ্বস্ত মনে করা হয়, আর তার ওই জিনিসের প্রতি কোনো আগ্রহ না থাকে, তবে সে আমানত রক্ষার ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক উপযুক্ত বলে গণ্য হবে, যার কিনা ওই জিনিসের প্রতি আগ্রহ আছে। এ জন্যই (যুবতীর সঙ্গে) নারী, শিশু ও হিজড়াদের ওপর বিশ্বাস করা যায়। ছোটখাটো দায়িত্বের বেলায় বিশ্বাস করা যায় এমন ব্যক্তিকে, যার বড় দায়িত্বের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। সম্পদের বেলায় বিশ্বাস করা যায় এমন ব্যক্তিকে, যার ব্যাপারে জানা যায়, তার ওই সম্পদ গ্রহণের কোনো ইচ্ছে নেই। যে মনে মনে বিশ্বাসঘাতকতা লালন করে, তাকে বিশ্বাস করা আর ছাগল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেকড়েকে বিশ্বাস করা সমান কথা। তাই, কারও মনে কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ থাকলে, সে ওই বিষয়ে আমানত রক্ষা করতে অক্ষম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
'আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, তিনি বলেন-
كنا يوما جلوسا مع رسول الله ﷺ فقال : يطلع عليكم من هذا الفج رجل من أهل الجنة ، فطلع رجل من الأنصار تنطف لحيته من ماء وضوئه قد علق نعليه يده بشماله فسلم ، فلما كان من الغد ، قال النبي ﷺ مثل ذلك فطلع ذلك الرجل مثل حاله الأولى ، فلما أن كان في اليوم الثالث ، قال النبي ﷺ مثل مقالته فطلع ذلك الرجل على مثل حالته الأولى ، فلما قام النبي ﷺ تبعه عبد الله بن عمرو بن العاص ، فقال: إني لا حيث أبي فأقسمت عليه أني لا أدخل عليه ثلاثا فإن رأيت أن تؤويني إليك حتى تمضي الثلاثة أيامٍ فعلت فقال: نعم ، قال أنس: فكان عبد الله يحدث أنه كان معه ثلاث ليال فلم يره يقومُ من الليل شيئًا ، غير أنه إذا تعار ، أو قال: انقلب على فراشه ، ذكر الله ، عزَّ وجلَّ ، وكبر حتى يقوم ، لصلاة الفجر ، قال عبد الله بن عمرو: غير أني لم أسمعه يقول إلا خيرًا ، فلما مضت الثلاث الليالي كدتُ أن أحتقر عمله ، قلت : يا عبد الله ، لم يكن بيني وبين والدي غضب ، ولا هجرة ولكني سمعت رسول الله ﷺ يقول لك ثلاث مرات يطلع عليكم الآن رجل من أهل الجنة ، فطلعت أنت الثلاث مرات فأردت أن أوي إليك لأنظر عملك فأقتدي بك ، فلم أرك تعمل كبيرةً فما الذي بلغ بك ما قال رسول الله ﷺ ؟ قال : ما هو إلا ما رأيت فلما وليتُ دَعاني ، فقال: ما هو إلا ما رأيت غير أني لا أجد في نفسي على مسلم غشا ، ولا أحسد أحدًا على خير أعطاه الله تعالى إياه ، قال عبد الله : قلتُ : هي التي بلغت بك وهي التي لا تطيق
“আমরা একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় তিনি বললেন, 'তোমাদের সামনে এই গিরিপথ দিয়ে একজন জান্নাতি মানুষের আগমন ঘটবে।' তিনি বলেন, তখন একজন আনসারি সাহাবী উপস্থিত হলেন, যাঁর দাড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওজুর পানি ঝরছিল এবং জুতোজোড়া ছিল তাঁর বাঁ হাতে; অতঃপর তিনি এসে সালাম দিলেন। পরের দিন নবীজি একই কথা বললেন। সেদিনও ওই সাহাবী এই অবস্থায় উপস্থিত হলেন। তৃতীয় দিনও নবীজি একই কথা বললেন এবং সেই সাহাবী একই অবস্থায় উপস্থিত হলেন। এরপর নবীজি উঠে গেলে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিছু নিলেন। তিনি তাঁকে বললেন, 'আমার বাবা আমার ওপর রেগে আছেন। আমি কসম করেছি যে, তিনদিন পর্যন্ত ঘরে ফিরব না। যদি আপনি আমাকে তিনটা দিন আপনার কাছে থাকতে অনুমতি দিতেন, তবে আমি থেকে যেতাম।' তিনি রাজি হলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, তিনি তিনরাত সেখানে ছিলেন। এরমধ্যে কোনোদিন তিনি তাঁকে রাত-জেগে ইবাদত করতে দেখেননি।
তবে তিনি যখন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেছেন, তখন মুখে আল্লাহর জিকির ছিল, এভাবে থাকতে থাকতে ফজরের সময় হলে উঠে পড়েছেন।
আবদুল্লাহ বলেন, “তবে আমি তাঁকে সবসময় ভালো কথা বলতে শুনেছি। এভাবে যখন তিনদিন কেটে গেল এবং আমার কাছে তাঁর আমল খুবই সাদাসিধে মনে হলো, তখন আমি তাঁকে বললাম, 'হে আল্লাহর বান্দা! আমার ও আমার বাবার মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি, কিন্তু আমি তিনবার নবীজি-কে বলতে শুনেছি—তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতি মানুষ উপস্থিত হবে। (আর সেই মানুষটি ছিলেন আপনি।) এজন্য আমি ইচ্ছে করেছিলাম আপনার কাছে থাকতে, যেন আপনার আমল দেখতে পারি। এজন্য আপনার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো খুব বেশি আমল করতে দেখলাম না। তাহলে কী সে কারণ, যা আপনাকে নবীজির উক্ত বক্তব্যের উপযোগী করে দিয়েছে?' তিনি বললেন, 'তা আর তেমন কিছু না, বরং আপনি যা দেখেছেন ওটুকই। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে এই যে, আমি আমার মনে কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছে রাখি না এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের ব্যাপারে কাউকে হিংসা করি না।' আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে এই হলো সেই আমল, যার মাধ্যমে আপনি এতদূর পৌঁছে গেছেন, আর আমরা সেটি করতে পারছি না!'" [১]
'আব্দুল্লাহ ইবনু আমর যে বললেন- “এই হলো সেই আমল, যার মাধ্যমে আপনি এতদূর পৌঁছে গেছেন, আর আমরা সেটি করতে পারছি না।” এতে এ-দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি সর্বপ্রকার হিংসা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। এজন্যই আল্লাহ তাআলা আনসারদের প্রশংসা করে বলেন-
وَ لَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أَوْتُوْا وَ يُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَ لَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
“মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, সেজন্য তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে।”[২]
'অর্থাৎ, ওই সম্পদের ব্যাপারে যা তাদের মুহাজির ভাইদের দেওয়া হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন, তারা তাদের মনে কোনো 'হাজত' অর্থাৎ হিংসা বা ক্রোধ অনুভব করেন না ওই সম্পদের ব্যাপারে যা মুহাজিরদের দেওয়া হয়েছে।'
'কেউ কেউ বলেছেন, সম্পদ দ্বারা এখানে জিহাদলব্ধ সম্পদ উদ্দেশ্য। আবার কেউ বলেছেন, সাধারণ দান কিংবা হাদিয়া-তোহফা উদ্দেশ্য। তো, মুহাজিরদেরকে যে সম্পদ কিংবা মর্যাদা দেওয়া হতো, সে ব্যাপারে আনসারগণ কোনো প্রয়োজনই বোধ করতেন না। আর হিংসা তো এভাবেই হয়。
'আউস ও খাযরাজ সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। তাদের একপক্ষ যখন এমন কিছু করত, যার মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে মর্যাদা লাভ করা যায়, তখন অপরপক্ষও চেষ্টা করত তেমন কিছু করতে। এটি এমন প্রতিযোগিতা, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ فِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ
|"এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।"
আমি বললাম, 'মুহতারাম, আপনার কথা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, কতক হিংসা মন্দ নয়। তাহলে হিংসা মাত্রই মন্দ কেন বলা হয়?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এ বিষয়ে আল্লাহ চাইলে আগামী মজলিসে বিস্তারিত আলোচনা করব।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৬৬।
[২] সুরা হাশর, আয়াত-৯
[১] সূরা মুতাফফিফিন, আয়াত-ক্রম: ২৬