📄 স্বভাব-প্রকৃতি ও অন্তরের ব্যাধি
আমি বললাম, 'আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্তরের রোগের শাখাপ্রশাখা অনেক। হিংসা, বিদ্বেষ, কৃপণতা, প্রেমাসক্তি-আরও কত কী! আমরা এবার অন্তরের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে চাই, যে প্রকৃতিতে আল্লাহ অন্তর সৃষ্টি করেছেন।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'যথার্থ জিজ্ঞাসা। এ বিষয়ে আমি আরও কিছু আলোচনা করছি, আশা করি এতে যাবতীয় সংশয় ও অন্তর সম্পর্কিত অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শুরু করছি।'
'দেখো, অন্তর সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহকে ভালোবাসার উদ্দেশে। আল্লাহর ভালোবাসাই হলো অন্তরের আসল স্বভাব-প্রকৃতি, যার ওপর বান্দাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত আছে, এ সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ ، فَأَبَوَاهُ يُهَوَدَانِهِ أَوْ يُنَصِرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ ، كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتَجُ الْبَهِيمَةَ ، هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ . ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ . رضى الله عنه - {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا } الآيَةَ.
"প্রত্যেক নবজাতক আপন ফিতরাতের (প্রকৃতি) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদি, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। (পরে সেগুলোর নাক-কান কাটা হয়) তোমরা কি এসবকে (জন্মগতভাবে) কানকাটা দেখেছ? পরে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তিলাওয়াত করেন - ) فطرة الله الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا( অর্থ : আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ করো, যে ফিতরাতের ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" [১]
'আল্লাহ তাআলা বান্দাদেরকে তাঁর মহব্বত ও ইবাদতের গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেভাবেই তাদের স্বভাব-প্রকৃতি গঠন করেছেন। যদি অন্তরের মধ্যে কোনো রকম অনিষ্ট প্রবেশ না-করে, তবে সে একসময় আল্লাহর পরিচয় পেয়েই যায়। হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা তৈরি হয়। কিন্তু যদি বান্দা অন্তরের রোগে আক্রান্ত হয়-যেমন: মা-বাবা কর্তৃক ইহুদি কিংবা খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হলো-তবে আল্লাহ তাকে যে স্বভাব-প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছিলেন, তা আর বাকি থাকে না। অবশ্য এটিও হয়ে থাকে তাকদির অনুসারে। যেমন: উটের আকৃতি নাক-কান কেটে দেওয়ার মাধ্যমে বিকৃত হয়। তবে কেউ কেউ আবার আল্লাহর দেওয়া স্বভাব-প্রকৃতির দিকে ফিরে আসতে পারে, যদি সে নিজে চেষ্টা করে এবং আল্লাহও তার জন্য সহজ করে দেন।'
'নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরিত হয়েছিলেন কেবল সেই স্বভাবগত প্রকৃতিকে সুদৃঢ় ও সুসম্পন্ন করতে, পাল্টে দিতে কিংবা পরিবর্তন করতে নয়। কারও অন্তরে যদি আল্লাহর ভালোবাসা থেকে থাকে, তার দ্বীন আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে রাখে, তবে সে কখনো মাখলুককে ভালোবাসে না; প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়া তো অনেক দূরের কথা। আর যখনই কেউ কারও প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে, তার দিল থেকে আল্লাহর ভালোবাসা অনুপস্থিত হতে থাকে। আল্লাহর নবি ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহপ্রেমী, তাঁর দ্বীন ছিল আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ, এজন্য তিনি এধরনের ফিতনায় পড়েননি। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَ الْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ "এমনিভাবে তার থেকে আমি যাবতীয় মন্দ ও অশ্লীল বিষয় সরিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।” [২]
'মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী ও স্ত্রীর পরিবার ছিল মুশরিক। এজন্যই সে এই ধরনের প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। বস্তুত এ ধরনের প্রেমে যে আসক্ত হবে, নিঃসন্দেহে তার তাওহিদ ও ঈমানে অপূর্ণতা রয়েছে। অপরদিকে যে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁকে ভয় করে, তার মধ্যে অন্তত দুটি এমন শক্তি বিদ্যমান থাকবে, যা তাকে এ ধরনের আসক্তি থেকে হেফাজত করবে।'
'এক. আল্লাহমুখী হওয়া ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। কারণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হলো পৃথিবীর অন্য সবকিছুর প্রতি আসক্তির চেয়ে আনন্দের। তো, যার মধ্যে আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে, তার মনে অন্য কিছুর প্রতি আকর্ষণ হতেই পারে না।'
'দুই. আল্লাহর ভয় ও ভীতি। কেননা আল্লাহর ভয় বান্দার অন্তরকে এসব থেকে দূরে রাখে।
'কেউ যখন কোনো কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে—এটা হতে পারে প্রেম, ভালোবাসা কিংবা অন্য কোনো কারণে—একই সঙ্গে যদি আরও কিছুর প্রতি তার আসক্তি থাকে এবং বিষয় দুটির মধ্যে বৈপরীত্য পাওয়া যায়, তবে সাধারণ পন্থা হলো—একটি তার কাছে প্রাধান্য পাবে এবং অপরটি থেকে সে সরে দাঁড়াবে। কেননা হতে পারে উভয় ভালোবাসা বহাল রাখতে গিয়ে যে ক্ষতি হবে, তা সে মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং যদি বান্দার কাছে আল্লাহর ভালোবাসা প্রাধান্য পায় এবং আল্লাহর প্রতি যথাযথ ভয় থাকে, তবে তার মধ্যে এ ধরনের প্রেম-ভালোবাসা বা আসক্তি স্থান পাবে না। অবশ্য যদি তার মধ্যে উদাসীনতা কাজ করে, এবং শরিয়তের বিধান অমান্য করায় আল্লাহর প্রীতি ও ভীতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সে হয়তো ওই ধরনের আসক্তিতেই নিমজ্জিত থেকে যাবে। কারণ আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান দৃঢ় হয়, অবাধ্যতায় দুর্বল হয়। এজন্য বান্দা যখনই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভীতি থেকে কোনো নেক কাজ করে, তার এই ভালোবাসা ও ভীতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। একইসঙ্গে এটি তার অন্তর থেকে অন্য সবকিছুর প্রীতি ও ভীতি দূর করে দেয়।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৮৫ ও ১৩৫৮; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৫৮
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪
📄 কিছু উপকারী প্রতিষেধক ও কার্যকর ওষুধ
আমি বললাম, 'মুহতারাম! দেহের রোগব্যাধির যে প্রক্রিয়ার কথা আমরা জানলাম, তা কি মনের রোগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, বিষয়টি শারীরিক অসুস্থতার মতোই। কেননা সুস্থতা রক্ষিত হয় রোগমুক্তির মাধ্যমে। আবার রোগ দূর হয় রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ঠিক এভাবে অন্তরের সুস্থতা রক্ষিত হয় ঈমানের মাধ্যমে। উপকারী জ্ঞান ও কল্যাণকর শিক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমে ঈমান অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয় বৃদ্ধি করে। এগুলোই হলো অন্তরের খাদ্য। (এতে সে শক্তি সঞ্চয় করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।) এ প্রসঙ্গে ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখযোগ্য, তা হলো-
إِنَّ كُلَّ آدِبٍ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى مَأْدُبَتُهُ ، وَإِنَّ مَأْدُبَةِ اللَّهِ هِيَ الْقُرْآنُ
"প্রত্যেক মেজবান চায় তার তার ভোজসভায় মানুষ আসুক, মেহমানদারি গ্রহণ করুক। আর আল্লাহর মেহমানদারি হলো কুরআন।" [১]
'কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য বিশেষ মেহমানদারি। তাই একজন মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো-আল্লাহর কাছে দুআ করা, বিশেষ করে শেষরাতে, আজান ও ইকামতের সময়, সিজদায় এবং প্রত্যেক নামাজের পরে। এর সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা। কেননা যে আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুখে রাখেন। এর সঙ্গে আবশ্যক হলো-দিনে-রাতে এবং ঘুমের সময় মাসনূন দুআসমূহ পাঠ করা, কোনো বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করা; কেননা এতে অন্তর দৃঢ় থেকে সুদৃঢ় হবে, ঈমান মজবুত হবে। এর সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ খুব সুন্দর ভাবে আদায় করতে আগ্রহী হওয়া; কারণ নামাজই হলো দ্বীনের ভিত্তি। বেশি বেশি "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করা; কেননা এর মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যা দূর হবে এবং কঠিন ও জটিল কাজ খুব সহজ ও সরলভাবে সমাধা হবে। দুআ থেকে কখনো নিরাশ হতে নেই। কেননা বান্দা তাড়াহুড়ো না করলে একসময় তার দুআ কবুল করা হয়। এদিকে সে বলে ফেলে আমি বারবার দুআ করেছি কিন্তু আল্লাহ তা কবول করেননি। এটাও মনে রাখা উচিত যে, সাহায্য আসে ধৈর্যের পরে, সফলতা আসে কষ্টের পরে, আর সহজতা আসে কাঠিন্যের পরে। ধৈর্যের পরীক্ষা না দিয়ে কেউ ভালো কিছু অর্জন করতে পারে না; যেখানে নবিরাই পারেননি সেখানে অন্যদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা তাঁরই, যিনি আমাদেরকে ইসলাম এবং সুন্নাহর অনুসারী করেছেন। প্রশংসা আদায় করছি তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল নিয়ামতের ওপর, তাঁর শান অনুযায়ী। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের পথপ্রদর্শক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথি-সঙ্গী এবং পত্নীগণের ওপর; আরও সালাম বর্ষিত হোক শেষ দিবস পর্যন্ত যারা একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাঁর অনুসরণ করে যাবে, তাদের ওপর।'
'আগামী মজলিসে সাক্ষাত হবে ইনশাআল্লাহ! সেই আশা রেখে আপনাদেরকে আল্লাহর হাওলায় ছেড়ে দিচ্ছি, নিশ্চয় আল্লাহ ওয়াদাপূরণকারী।'
টিকাঃ
[১] ফাযায়েলে কুরআন, ইমাম দারেমি (২৩২৪)। হাদিসের রাবীরা বিশ্বস্ত হলেও সনদে সামান্য বিচ্ছিন্নতা আছে। এই বর্ণনার সাথে ইমাম দারেমির বর্ণনার শব্দগত পার্থক্য আছে।