📄 কামনা ও আসক্তি : করণীয় ও বর্জনীয়
আমি বললাম, 'এতক্ষণ আমরা কৃপণতা ও হিংসা সম্পর্কে জানলাম। প্রবৃত্তির কামনা ও প্রেমাসক্তি সম্পর্কেও কিছু জানতে চাই, জানতে চাই এ দুটোর স্বরূপ এবং এসব সমস্যায় পড়লে একজন মুসলিমের করণীয় সম্পর্কে।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ! এটি খুবই সূক্ষ্ম বিষয়। এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে সতর্কতা আবশ্যক। আমি আল্লাহ তাআলার তাওফিক ও সাহায্য কামনা করছি, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শুরু করছি- প্রবৃত্তির প্ররোচনা ও প্রেম-ভালোবাসা এমন রোগ, যা নফসের খুবই প্রিয়, যদিও এসব তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এমন কিছু অপছন্দ করতে শুরু করে, যা তার জন্য উপকারী।'
এরপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। এই সুযোগে আমি বললাম, 'অন্তরের এসব ব্যাধি কি শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে?'
শাইখ বললেন, 'অবশ্যই! যদি অন্তরের ব্যাধি মারাত্মক আকার ধারণ করে, তাহলে তা মানুষের শরীরেও রোগ সৃষ্টি করে। এটি হতে পারে মানসিকভাবে। যেমন বিষাদগ্রস্ত হওয়া। আবার হতে পারে শারীরিকভাবে। যেমন দুর্বলতা অনুভব করা, উদ্যমহীনতা অনুভব করা ইত্যাদি। আমাদের উদ্দেশ্য অবশ্য অন্তরের রোগ; যা নফসের জন্য ক্ষতিকর আসক্তির উৎস। যেমন: শারীরিকভাবে অসুস্থ কোনো ব্যক্তির কাছে এমন জিনিসিই ভালো লাগে, যা তার জন্য উপকারী তো নয়ই, বরং ক্ষতিকর। যদি তাকে পছন্দের সেই খাবার না দেওয়া হয়, তাহলে সে মনঃক্ষুণ্ণ হয়। আবার সেই খাবার দেওয়া হলেও তার রোগ বৃদ্ধি পায়; কখনো-বা আবার মারাত্মক আকার ধারণ করে। একইভাবে প্রেমিক যখন তার প্রেমাস্পদের সংস্পর্শে যায়, তাকে দেখে, স্পর্শ করে-তার জন্য তা ক্ষতির কারণ হয়। এমনকি প্রেমাস্পদকে নিয়ে চিন্তাভাবনা বা কল্পনা করাও প্রেমিকের জন্য ক্ষতিকর; যদিও সে এতেই আনন্দ লাভ করে। যদি তাকে তার প্রেমাস্পদ থেকে দূরে রাখা হয়, সে মনঃক্ষুণ্ণ হয়, ব্যথিত হয়। আবার প্রেমাস্পদের কাছে যেতে দিলে তার রোগ বৃদ্ধি পায়। এবং পরবর্তী সময়ে এটি তার যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দেয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ اللَّهَ لَيَحْمِي عَبْدَهُ الْمُؤْمِنَ مِنَ الدُّنْيَا ، كَمَا يَحْمِي أَحَدُكُمْ مَرِيضَهُ الطَّعَامَ وَالشَّرَابَ
"আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাকে দুনিয়া থেকে এমনভাবে হেফাজত করেন, যেভাবে তোমরা রুগ্ন ব্যক্তিকে (ক্ষতিকর) পানাহার থেকে বিরত রাখো।”[1]
'আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মুসা আলাইহিস সালাম-এর একান্ত আলাপনে বর্ণিত হয়েছে-আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার প্রিয় বান্দাদের দুনিয়ার আরাম- আয়েশ থেকে এমনভাবে বিরত রাখি, যেমন একজন দায়িত্বশীল রাখাল তার উটকে আশঙ্কাজনক চারণভূমি থেকে দূরে রাখে। আমি তাদেরকে দুনিয়ার সুখ-শান্তি থেকে এমনভাবে দূরে রাখি, যেভাবে রাখাল তার উটকে ঝুঁকিপূর্ণ আস্তাবল থেকে হেফাজত করে। আর এটি কেবল অনুগত বান্দাদের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাদের জন্য নির্ধারিত অংশ নিরাপদে নিশ্চিন্তে তারা পেয়েই যায়। পাশাপাশি দুনিয়া ও প্রবৃত্তির ছোবল থেকে রেহাই পায়। [২]
'তাই বলব, অসুস্থতা দূর হওয়ার মাধ্যমেই কেবল রোগী সুস্থ হতে পারে বরং বলা যায় এর একমাত্র উপায় হলো অন্তর থেকে এমন মন্দাসক্তি দূর করা।'
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৩৬২২; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদিসটি সহিহ। হাদিসটিতে শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
[২] আয-যুহদ, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল
📄 প্রেমাসক্তির ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায়
'প্রেমাসক্তি কি মানুষের ইচ্ছাধীন কিছু? নাকি স্রেফ কল্পনা?'-জানতে চাইলাম আমি।
শাইখ বললেন, 'প্রেমাসক্তির ব্যাখ্যায় মানুষ দুইভাগে বিভক্ত। এক পক্ষের বক্তব্য হলো-এটি ইরাদা বা ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত। এটিই প্রসিদ্ধ মত। দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য হলো-এটি কল্পনার আওতাধীন বিষয়। তবে এটি কেবলই অহেতুক কল্পনা। এজন্যই তো প্রেমিক তার প্রেমাস্পদ সম্পর্কে এতসব কল্পনা করে বসে থাকে, যার সবই বাহুল্য। যারা এই মতের প্রবক্তা, তারা বলে থাকেন-আল্লাহর সঙ্গে ইশক তথা আসক্তি শব্দটি যায় না। কেননা তিনি কারও প্রতি আসক্ত হন না। বরং তিনি এসব থেকে পবিত্র। এ ছাড়া কেউ যদি আল্লাহর সম্পর্কে যাচ্ছেতাই কল্পনা করে, তবে তার প্রশংসা তো দূরের কথা বরং নিন্দা করা হয়।
'আর প্রথম মতের প্রবক্তাদের কেউ কেউ বলে থাকেন—আল্লাহর সঙ্গেও ইশক শব্দের প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই শব্দটি হলো পরিপূর্ণ ভালোবাসা-প্রকাশক। আর আল্লাহকে যেমন ভালোবাসা যায়, তেমন তিনি নিজেও ভালোবাসেন। আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়েদ থেকে বর্ণিত এক আসারে আছে, তিনি বলেন—“আমার বান্দা আমার কাছে আসে, আমাকে ভালোবাসে এবং আমিও তাকে ভালোবাসি।” এটি মূলত কতক সূফির বক্তব্য। প্রকৃতপক্ষে জমহুর তথা অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এই শব্দ আল্লাহর ‘শানে’ ব্যবহার করার পক্ষে নন। কেননা ইশক হলো বাড়াবাড়িরকমের ভালোবাসা। যাকে বলে মাত্রাতিরিক্ত। আর আল্লাহর ভালোবাসায় কোনো সীমারেখা নেই। তাই এমন কোনো সীমা নির্ধারণই ঠিক না, যা অতিক্রমের প্রসঙ্গ আসতে পারে। এই মতের প্রবক্তারা আরও বলেন—ইশক তথা আসক্তিমাত্রই অপছন্দনীয়। সৃষ্টিকর্তা কিংবা সৃষ্টি-কারও ক্ষেত্রেই এটি শোভা পায় না। কেননা আসক্তি হলো এমন ভালোবাসা, যা মাত্রাতিরিক্ত, সীমালঙ্ঘিত। এ ছাড়া ইশক শব্দটি সাধারণ একজন নারী কিংবা না-বালেগ বাচ্চার প্রতি পুরুষের আকর্ষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ কিংবা পদমর্যাদার প্রতি টান বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহৃত হয় না। নবী-রাসূলদের প্রতি ভালোবাসা বোঝাতেও এমন প্রয়োগ চোখে পড়ে না। তাছাড়া এটির সঙ্গে আরও অনেক হারাম কাজের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন: কোনো নারী বা বালকের প্রতি আসক্ত হয়ে তাকে দেখা, স্পর্শ করা, ইত্যাদি।
'স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা কখনো কখনো তাকে ইনসাফ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যেমন স্ত্রীর প্রেমে অন্ধ হয়ে সে এমন কাজ করে, যা করা বৈধ নয়, আবার এমন কাজ থেকে বিরত থাকে, যা করা আবশ্যক। প্রায়ই দেখা যায়—নতুন স্ত্রীর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে সে তার পূর্বের স্ত্রীর সন্তানের ওপর জুলুম করছে; নতুনজনকে খুশি করতে এমন সব কাজ করে যাচ্ছে, যা তার দ্বীন-দুনিয়া উভয়টির জন্যই ক্ষতিকর। যেমন: তাকে এত পরিমাণ উত্তরাধিকার সম্পদের মালিক করে দিচ্ছে, যেটুকুর প্রাপক সে না; অথবা তার পরিবারকে এই পরিমাণ সম্পদ ও ক্ষমতা দিচ্ছে, যা কিনা শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে; অথবা তার জন্য খরচ করতে গিয়ে অপচয়, অপব্যয় করছে; কিংবা তাকে এমন সব হারাম কাজের সুযোগ দিচ্ছে, যা তার উভয় জাহানের জন্যই ক্ষতিকর। এ-সব তো সে করছে এমন নারীর জন্য, যার সঙ্গে তার সহবাস বৈধ, অথচ এগুলো সবই হারাম। তাহলে এবার বলো, কতটা খারাপ হতে পারে, যদি অচেনা নারী বা বালকের জন্য গুনাহে লিপ্ত হয়, যেখানে ভালোর ছিটেফোঁটাও নেই, বরং এত পরিমাণ অনিষ্ট রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ গুণে শেষ করতে পারবে না। এটা হলো এমন এক রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বীন-দুনিয়া উভয়টি ধ্বংস করে দেয়। আবার কখনো কখনো বিবেক-বুদ্ধির সঙ্গে শরীরও খারাপ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
"তবে তোমরা পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে রয়েছে ব্যাধি।" [১]
'তো, যার অন্তরে এই ধরনের কামনা-বাসনা ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত বস্তু অনুকূলে এলে সে আরও বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে। তার আসক্তি, ইচ্ছা ও কামনাকে শক্তিশালী করে। এবং এর মাধ্যমে তার রোগ আরও বৃদ্ধি পায়। তবে এর বিপরীতটি ঘটে যদি তার মনে আশার বদলে 'নিরাশা' দেখা দেয়।'
'নিরাশা কি তখন এমন কারও জন্য ওষুধ হিসেবে কাজ করবে?'-আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, নিরাশা আকাঙ্ক্ষাকে দূর করে। এর কারণে ইচ্ছাটা দুর্বল হতে থাকে, ভালোবাসাটাও শিথিল হয়ে যায়। কেননা সাধারণত মানুষ নিরাশা নিয়ে কোনোকিছুর পেছনে ছুটে না। তাছাড়া অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকলে ইচ্ছাটা একসময় এমনিতেই মরে যায়। কেবল মনের নড়বড়ে কিছু অনুভূতি থাকে। এমতাবস্থায় যদি সে আবার প্রেমাস্পদকে দেখার কিংবা কথা বলার সুযোগ পায়, তাহলে পরিস্থিতি ফের পাল্টে যেতে পারে।'
'কেউ যদি এ ধরনের ফিতনায় পড়ে আল্লাহকে ভয় করে এবং সব ধরনের কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, তবে আল্লাহ তাকে অবশ্যই এর প্রতিদান দেবেন।'
"مَنْ عَشِقَ فَعَفٌ وَكَتَمَ وَصَبَرَ ثُمَّ مَاتَ كَانَ شَهِيدًا - কেউ যদি প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ার পর নিজেকে হেফাজতের চেষ্টা করে, বিষয়টি গোপন রাখে, মনের কষ্ট বুকে চেপে ধৈর্যধারণ করে এবং এমতাবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।"১] হাদিসটি আবু ইয়াহইয়া আল-কাত্তাতের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন মুজাহিদ রহ.-এর সূত্রে থেকে, তিনি ইবনু আব্বাসের সূত্রে। এই বর্ণনাটিতে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। তাই এটি দলিলযোগ্য নয়। তবে শরিয়তের দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে যে বিষয়টি অনস্বীকার্য, তা এই যে-কেউ যদি পরনারীর প্রতি আসক্ত হওয়ার পর নিজের চোখ, মুখ ও হাতকে পংকিলত যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, বিষয়টি গোপন রাখে এবং এ সম্পর্কে অন্যায় কথা না বলে, কারও কাছে কোনো অভিযোগ না করে, তার প্রতি কোনো আগ্রহ প্রকাশ না করে, কিংবা তার এই প্রেমাস্পদকে পেতেও চেষ্টা না করে, সর্বোপরি আল্লাহর আনুগত্য ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে ধৈর্যধারণ করে, ধৈর্যধারণ করে নিজের বুকে জমে থাকা কষ্টের ওপর, যেভাবে ধৈর্যধারণ করা হয় অন্য সকল বিপদ-আপদের ওপর, তাহলে নিঃসন্দেহে সে ওই ব্যক্তির মতো বলে গণ্য হবে, যে আল্লাহকে ভয় করে এবং ধৈর্যধারণ করো। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন-
مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
"যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, (তারা সৎকর্মশীল) নিঃসন্দেহে আল্লাহ এমন সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।”২
'ঠিক একইভাবে ওই সকল ব্যক্তিও প্রতিদানপ্রাপ্ত হবে, যারা হিংসা-বিদ্বেষসহ অন্তরের নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহকে ভয় করবে এবং ধৈর্যধারণ করবে।' আমি বললাম, 'শাইখ! আমাদের হৃদয় যদি এমন কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন, সে ক্ষেত্রে আমরা কী করব? এবং কীভাবে নিজের মনকে মানিয়ে নেব?'
শাইখ বললেন, 'আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে এমন কিছুর প্রতি কেউ আসক্ত হলে তার ওপর আবশ্যক হলো, নিজের মধ্যে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করা, যেন সে এই আয়াতের আওতাভুক্ত হতে পারে-
وَ أَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى ، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
"আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত।"[১]
'নফস যখন কোনো কিছুর প্রতি আসক্ত হয়, তখন সে সাধ্যানুযায়ী সকল উপায়ে তা চরিতার্থ করতে চেষ্টা করে। এমন অনেক কৌশলও সে খুঁজে বের করে, যা ধরে তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে। আর যদি কারও ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা ন্যায়সঙ্গত না হয়, তাহলে সে গুনাহগার হবে। গুনাহগার হওয়ার আরও কিছু কারণ হলো-কাউকে হিংসাবশত ঘৃণা করা, তার সাথে সম্পর্ক রাখে এমন লোকদেরও কষ্ট দেওয়া। যেমন: তাদেরকে কোনো ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, কিংবা অযথা শত্রুতা পোষণ করা, অথবা নিতান্তই নফসের প্ররোচনায় পড়ে কোনো হারাম কাজ করা; বা আল্লাহ তাআলা-নির্দেশিত কোনো কাজই করা, তবে সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে নফসের চাহিদা পূরণার্থে করা।'
'নফসের মধ্যে এমন আরও অসংখ্য ব্যাধি রয়েছে। যেমন: মানুষ অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ঘৃণা করে, এরপর এর পেছনে পড়ে আরও অনেক কিছু ঘৃণা করতে থাকে; এক্ষেত্রে সে কোনো যুক্তি খোঁজে না, বরং নফসের ধোঁকায় পড়েই এমন করতে থাকে। আবার কোনো জিনিস হয়তো তার ভালো লাগলে প্রাসঙ্গিক আরও অনেক কিছু পছন্দ করতে থাকে, এক্ষেত্রেও সে বিবেক কাজে লাগায় না, বরং নিজের ইচ্ছা আর কামনার বশবর্তী হয়েই এমন করতে থাকে। যেমন জনৈক কবি বলেছেন-
أُحِبُّ لِحُتِهَا السُّوْدَانَ حَتَّى + أُحِبَّ لِحُتِهَا سُوْدَ الْكِلَابِ
"তার প্রেমে পড়ে আমি কালো সবকিছু ভালোবাসি। প্রেমে তার ভালোবাসি কুকুরের কালো রঙ এমনকি।”
'লোকটির প্রেমাস্পদ হয়তো কালো ছিল। তাই সে পৃথিবীতে কালো বলতে যা কিছু আছে, সবকিছুর প্রেমে পড়ে গেছে। এমনকি কালো কুকুরও বাদ পড়েনি। এই সবই মানুষের অন্তরের রোগ-চিন্তা-ভাবনা ও খেয়াল-কল্পনার অসুখ। আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, যেন তিনি আমাদেরকে সকল রোগ থেকে সুস্থ রাখেন। এবং তাঁর কাছেই প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা ও বদচরিত্রের 'অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই।'
টিকাঃ
[১] সূরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৩২
[১] মুহাদ্দিসগণ এই হাদিস যঈফ হওয়ার ব্যাপারে একমত—শুয়াইব আরনাউত; ৪/২৫৩ তাখরিজু যাদিল মাআদ।
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৯০
[১] সূরা নাযিআত, আয়াত-ক্রম: ৪০-৪১
📄 স্বভাব-প্রকৃতি ও অন্তরের ব্যাধি
আমি বললাম, 'আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্তরের রোগের শাখাপ্রশাখা অনেক। হিংসা, বিদ্বেষ, কৃপণতা, প্রেমাসক্তি-আরও কত কী! আমরা এবার অন্তরের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে চাই, যে প্রকৃতিতে আল্লাহ অন্তর সৃষ্টি করেছেন।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'যথার্থ জিজ্ঞাসা। এ বিষয়ে আমি আরও কিছু আলোচনা করছি, আশা করি এতে যাবতীয় সংশয় ও অন্তর সম্পর্কিত অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শুরু করছি।'
'দেখো, অন্তর সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহকে ভালোবাসার উদ্দেশে। আল্লাহর ভালোবাসাই হলো অন্তরের আসল স্বভাব-প্রকৃতি, যার ওপর বান্দাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত আছে, এ সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ ، فَأَبَوَاهُ يُهَوَدَانِهِ أَوْ يُنَصِرَانِهِ أَوْ يُمَحِّسَانِهِ ، كَمَثَلِ الْبَهِيمَةِ تُنْتَجُ الْبَهِيمَةَ ، هَلْ تَرَى فِيهَا جَدْعَاءَ . ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ . رضى الله عنه - {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا } الآيَةَ.
"প্রত্যেক নবজাতক আপন ফিতরাতের (প্রকৃতি) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদি, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। (পরে সেগুলোর নাক-কান কাটা হয়) তোমরা কি এসবকে (জন্মগতভাবে) কানকাটা দেখেছ? পরে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তিলাওয়াত করেন - ) فطرة الله الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا( অর্থ : আল্লাহর দেওয়া ফিতরাতের অনুসরণ করো, যে ফিতরাতের ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" [১]
'আল্লাহ তাআলা বান্দাদেরকে তাঁর মহব্বত ও ইবাদতের গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেভাবেই তাদের স্বভাব-প্রকৃতি গঠন করেছেন। যদি অন্তরের মধ্যে কোনো রকম অনিষ্ট প্রবেশ না-করে, তবে সে একসময় আল্লাহর পরিচয় পেয়েই যায়। হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা তৈরি হয়। কিন্তু যদি বান্দা অন্তরের রোগে আক্রান্ত হয়-যেমন: মা-বাবা কর্তৃক ইহুদি কিংবা খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হলো-তবে আল্লাহ তাকে যে স্বভাব-প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছিলেন, তা আর বাকি থাকে না। অবশ্য এটিও হয়ে থাকে তাকদির অনুসারে। যেমন: উটের আকৃতি নাক-কান কেটে দেওয়ার মাধ্যমে বিকৃত হয়। তবে কেউ কেউ আবার আল্লাহর দেওয়া স্বভাব-প্রকৃতির দিকে ফিরে আসতে পারে, যদি সে নিজে চেষ্টা করে এবং আল্লাহও তার জন্য সহজ করে দেন।'
'নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) প্রেরিত হয়েছিলেন কেবল সেই স্বভাবগত প্রকৃতিকে সুদৃঢ় ও সুসম্পন্ন করতে, পাল্টে দিতে কিংবা পরিবর্তন করতে নয়। কারও অন্তরে যদি আল্লাহর ভালোবাসা থেকে থাকে, তার দ্বীন আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে রাখে, তবে সে কখনো মাখলুককে ভালোবাসে না; প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়া তো অনেক দূরের কথা। আর যখনই কেউ কারও প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে, তার দিল থেকে আল্লাহর ভালোবাসা অনুপস্থিত হতে থাকে। আল্লাহর নবি ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহপ্রেমী, তাঁর দ্বীন ছিল আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ, এজন্য তিনি এধরনের ফিতনায় পড়েননি। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَ الْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ "এমনিভাবে তার থেকে আমি যাবতীয় মন্দ ও অশ্লীল বিষয় সরিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।” [২]
'মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী ও স্ত্রীর পরিবার ছিল মুশরিক। এজন্যই সে এই ধরনের প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। বস্তুত এ ধরনের প্রেমে যে আসক্ত হবে, নিঃসন্দেহে তার তাওহিদ ও ঈমানে অপূর্ণতা রয়েছে। অপরদিকে যে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁকে ভয় করে, তার মধ্যে অন্তত দুটি এমন শক্তি বিদ্যমান থাকবে, যা তাকে এ ধরনের আসক্তি থেকে হেফাজত করবে।'
'এক. আল্লাহমুখী হওয়া ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। কারণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হলো পৃথিবীর অন্য সবকিছুর প্রতি আসক্তির চেয়ে আনন্দের। তো, যার মধ্যে আল্লাহর ভালোবাসা থাকবে, তার মনে অন্য কিছুর প্রতি আকর্ষণ হতেই পারে না।'
'দুই. আল্লাহর ভয় ও ভীতি। কেননা আল্লাহর ভয় বান্দার অন্তরকে এসব থেকে দূরে রাখে।
'কেউ যখন কোনো কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে—এটা হতে পারে প্রেম, ভালোবাসা কিংবা অন্য কোনো কারণে—একই সঙ্গে যদি আরও কিছুর প্রতি তার আসক্তি থাকে এবং বিষয় দুটির মধ্যে বৈপরীত্য পাওয়া যায়, তবে সাধারণ পন্থা হলো—একটি তার কাছে প্রাধান্য পাবে এবং অপরটি থেকে সে সরে দাঁড়াবে। কেননা হতে পারে উভয় ভালোবাসা বহাল রাখতে গিয়ে যে ক্ষতি হবে, তা সে মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং যদি বান্দার কাছে আল্লাহর ভালোবাসা প্রাধান্য পায় এবং আল্লাহর প্রতি যথাযথ ভয় থাকে, তবে তার মধ্যে এ ধরনের প্রেম-ভালোবাসা বা আসক্তি স্থান পাবে না। অবশ্য যদি তার মধ্যে উদাসীনতা কাজ করে, এবং শরিয়তের বিধান অমান্য করায় আল্লাহর প্রীতি ও ভীতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সে হয়তো ওই ধরনের আসক্তিতেই নিমজ্জিত থেকে যাবে। কারণ আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান দৃঢ় হয়, অবাধ্যতায় দুর্বল হয়। এজন্য বান্দা যখনই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভীতি থেকে কোনো নেক কাজ করে, তার এই ভালোবাসা ও ভীতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। একইসঙ্গে এটি তার অন্তর থেকে অন্য সবকিছুর প্রীতি ও ভীতি দূর করে দেয়।'
টিকাঃ
[১] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ১৩৮৫ ও ১৩৫৮; মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৬৫৮
[২] সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪
📄 কিছু উপকারী প্রতিষেধক ও কার্যকর ওষুধ
আমি বললাম, 'মুহতারাম! দেহের রোগব্যাধির যে প্রক্রিয়ার কথা আমরা জানলাম, তা কি মনের রোগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'হ্যাঁ, বিষয়টি শারীরিক অসুস্থতার মতোই। কেননা সুস্থতা রক্ষিত হয় রোগমুক্তির মাধ্যমে। আবার রোগ দূর হয় রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। ঠিক এভাবে অন্তরের সুস্থতা রক্ষিত হয় ঈমানের মাধ্যমে। উপকারী জ্ঞান ও কল্যাণকর শিক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমে ঈমান অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয় বৃদ্ধি করে। এগুলোই হলো অন্তরের খাদ্য। (এতে সে শক্তি সঞ্চয় করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।) এ প্রসঙ্গে ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখযোগ্য, তা হলো-
إِنَّ كُلَّ آدِبٍ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى مَأْدُبَتُهُ ، وَإِنَّ مَأْدُبَةِ اللَّهِ هِيَ الْقُرْآنُ
"প্রত্যেক মেজবান চায় তার তার ভোজসভায় মানুষ আসুক, মেহমানদারি গ্রহণ করুক। আর আল্লাহর মেহমানদারি হলো কুরআন।" [১]
'কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য বিশেষ মেহমানদারি। তাই একজন মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো-আল্লাহর কাছে দুআ করা, বিশেষ করে শেষরাতে, আজান ও ইকামতের সময়, সিজদায় এবং প্রত্যেক নামাজের পরে। এর সঙ্গে বেশি বেশি ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা। কেননা যে আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুখে রাখেন। এর সঙ্গে আবশ্যক হলো-দিনে-রাতে এবং ঘুমের সময় মাসনূন দুআসমূহ পাঠ করা, কোনো বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করা; কেননা এতে অন্তর দৃঢ় থেকে সুদৃঢ় হবে, ঈমান মজবুত হবে। এর সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ খুব সুন্দর ভাবে আদায় করতে আগ্রহী হওয়া; কারণ নামাজই হলো দ্বীনের ভিত্তি। বেশি বেশি "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পাঠ করা; কেননা এর মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যা দূর হবে এবং কঠিন ও জটিল কাজ খুব সহজ ও সরলভাবে সমাধা হবে। দুআ থেকে কখনো নিরাশ হতে নেই। কেননা বান্দা তাড়াহুড়ো না করলে একসময় তার দুআ কবুল করা হয়। এদিকে সে বলে ফেলে আমি বারবার দুআ করেছি কিন্তু আল্লাহ তা কবول করেননি। এটাও মনে রাখা উচিত যে, সাহায্য আসে ধৈর্যের পরে, সফলতা আসে কষ্টের পরে, আর সহজতা আসে কাঠিন্যের পরে। ধৈর্যের পরীক্ষা না দিয়ে কেউ ভালো কিছু অর্জন করতে পারে না; যেখানে নবিরাই পারেননি সেখানে অন্যদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা তাঁরই, যিনি আমাদেরকে ইসলাম এবং সুন্নাহর অনুসারী করেছেন। প্রশংসা আদায় করছি তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল নিয়ামতের ওপর, তাঁর শান অনুযায়ী। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের পথপ্রদর্শক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথি-সঙ্গী এবং পত্নীগণের ওপর; আরও সালাম বর্ষিত হোক শেষ দিবস পর্যন্ত যারা একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাঁর অনুসরণ করে যাবে, তাদের ওপর।'
'আগামী মজলিসে সাক্ষাত হবে ইনশাআল্লাহ! সেই আশা রেখে আপনাদেরকে আল্লাহর হাওলায় ছেড়ে দিচ্ছি, নিশ্চয় আল্লাহ ওয়াদাপূরণকারী।'
টিকাঃ
[১] ফাযায়েলে কুরআন, ইমাম দারেমি (২৩২৪)। হাদিসের রাবীরা বিশ্বস্ত হলেও সনদে সামান্য বিচ্ছিন্নতা আছে। এই বর্ণনার সাথে ইমাম দারেমির বর্ণনার শব্দগত পার্থক্য আছে।