📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 দুনিয়ার মহব্বতে ডুবে অন্তর পথভ্রষ্ট হয়

📄 দুনিয়ার মহব্বতে ডুবে অন্তর পথভ্রষ্ট হয়


এরপর শাইখ তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী কথার মধ্যে সামান্য বিরতি দিলেন। এভাবে তিনি আসলে সুযোগ দেন-কারও মনে খটকা থাকলে যেন তা দূর করা সম্ভব হয়। সুযোগটা আমি কাজে লাগাই, বলি, 'হে আমাদের ইমাম! আমরা আপনার কথা থেকে অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ ও প্রিয়-অপ্রিয়'র দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমরা এ-ও জানতে পারলাম যে-এগুলো জয়ী হলে অন্তর পরাস্ত ও বিধ্বস্ত হয়। যদি বিষয়টি এমনই হয়ে থাকে তাহলে অন্তরের এই দুরবস্থা বর্ণনার ক্ষেত্রে 'الْغَمْرَة [১] শব্দটিই কি কেবল প্রযোজ্য? আপনি নিশ্চয় জেনে থাকবেন- 'الْغَمْرة' শব্দটি কুরআনে চার স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'প্রশ্নটি খুবই চমৎকার হয়েছে। হ্যাঁ, প্রিয় ছাত্ররা আমার! নিশ্চয় মানুষ যা পছন্দ করে কিংবা ভয় করে-তা যা-ই হোক না কেন-অন্তরকে নিমজ্জিত করে ফেলে এবং তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
بَلْ قُلُوبُهُمْ فِي غَمْرَةٍ مِنْ هَذَا وَ لَهُمْ أَعْمَالُ مِنْ دُونِ ذَلِكَ هُمْ لَهَا عَمِلُوْنَ
"বরং তাদের অন্তর এ বিষয়ে অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন, এ ছাড়া তাদের আরও আমল রয়েছে, যা তারা করছে।” [২]
'তো, যা থেকে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে, কলব ঠিক তাতেই নিমজ্জিত হয়। এরপর এই অসতর্কতা তাকে আল্লাহর যিকির, পরকালের নিয়ামত ও আযাবের স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَذَرْهُمْ فِي غَمْرَتِهِمْ حَتَّى حِينٍ "অতএব তাদেরকে কিছু কালের জন্যে নিজেদের অজ্ঞতায় নিমজ্জিত থাকতে দিন।"।১।
'অর্থাৎ তাদের অন্তর নিমজ্জিত থাকুক ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততিসহ আরও পছন্দের যা কিছু আছে তাতে; যদিও কল্যাণ ও নেক আমলের দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে এসব তাদের জন্য অনেক বড় বাধা। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
قُتِلَ الْخَرَّصُوْنَ ، الَّذِينَ هُمْ فِي غَمْرَةٍ سَاهُونَ | “অনুমানকারীরা ধ্বংস হোক, যারা কিনা উদাসীন, ভ্রান্ত।”।২।
'তো, তারা দুনিয়ার ভালোবাসায় নিমজ্জিত, আখেরাতের সবকিছু তাদের থেকে আচ্ছাদিত। তাই পরকাল ও পরকালের সবকিছুর ব্যাপারে তারা চরম উদাসীন।' আমি মনে মনে ভাবছিলাম-শাইখ যে তিনটি আয়াত উল্লেখ করেছেন, তাতে 'الْغَمْرَة' শব্দটি আছে এবং সবখানে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরও একটি আয়াতে শব্দটি আছে, কিন্তু অর্থগত বৈপরীত্যের কারণে হয়তো শাইখ সেই আয়াত উল্লেখ করেননি। আয়াতটি হলো-
وَ لَوْ تَرَى إِذِ الظَّلِمُوْنَ فِي غَمَرْتِ الْمَوْتِ | 'যদি আপনি দেখেন যখন জালিমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে।[৩]
ভাবনা ফেলে শাইখের কথায় মন দিলাম। তিনি বললেন, 'তাদের গাফলতির বিষয়টি কুরআনের একটি আয়াতের সাথে সাদৃশ্য রাখে। আয়াতটি এই-
وَ لَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَ اتَّبَعَ هَوْنَهُ وَ كَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا "যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, এবং যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে গেছে, | আপনি তার আনুগত্য করবেন না।”১
'সুতরাং বলা যায়, الغمرة তথা উদাসীনতাও প্রবৃত্তি-অনুসরণের মধ্যে পড়ে। আবার الشهو তথা ভুলে যাওয়া হচ্ছে এক ধরনের উদাসীনতা। এজন্য কেউ কেউ বলেছে- اَلسَّهْوُ হলো-কোনো কিছু সম্পর্কে উদাসীন বা বেখবর হওয়া। আর সকল অনিষ্টের কেন্দ্র হলো-গাফলত তথা উদাসীনতা এবং শাহওয়াত তথা প্রবৃত্তির প্ররোচনা।
'কারণ আল্লাহ ও আখেরাত সম্পর্কে উদাসীনতা কল্যাণের দ্বার বন্ধ করে দেয়, যা কিনা যিকির এবং সতর্কতার মধ্যে নিহিত।'
'এদিকে, প্রবৃত্তির প্ররোচনা অকল্যাণ, বিস্মরণ ও আশঙ্কার দরজা খুলে দেয়। এতে অন্তর একরকম খেয়ালখুশির জিন্দেগিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। এরপর ধাপে ধাপে সে আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন হয়, গাইরুল্লাহর অনুসরণ করতে শুরু করে, আল্লাহর যিকির ভুলে যায়। এমনকি গাইরুল্লাহর মধ্যে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, যাকে বলে যারপরনাই বেপরোয়া। এদিকে মনের মধ্যে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয়ে যায় সীমাহীন। যেমনটি বুখারি-সহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীজি থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি বলেন-
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وعَبْدُ الدَّرْهَم وعَبْدُ الْقَطِيفَةِ وَ عَبْدُ الْخَمِيصَةِ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ ، وَإِنْ مُنِعَ سَخِطَ
"লাঞ্ছিত হোক দিনার-পূজারি, দিরহাম-পূজারি এবং রেশমি শাল- পূজারি। লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। কাঁটা বিঁধলে কেউ তা তুলে দেবে না। (জিহাদের ময়দানে) কিছু পেলে সে সন্তুষ্ট হয়, আর না পেলে অসন্তুষ্ট হয়।”২
'নবীজি মানুষকে ওইসবের গোলাম আখ্যায়িত করেছেন, যা পেলে মানুষ আনন্দিত হয় এবং যা হারালে দুঃখিত হয়। এমনকি যেসবের গোলামি মানুষ করে বলে এই হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন রেশমি শাল-যদিও মানুষ তা পরিধান করে, বস্তুত সে যেন উল্টো ওই শালের খাদেম। কতক সালাফ যেমনটি বলেছেন, "এমন পোষাক পরিধান করো, যা তোমার খাদেম হয়; এমন পোষাক পরো না, তোমাকে যে পোষাকের খেদমত করতে হয়।” প্রথমটির উদাহরণ হলো-এমন চাদর, যার ওপর প্রয়োজনে বসাও যায়। আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো-মখমলের এমন শাল, যা গায়ে জড়িয়ে রাখতে হয়। (এমনকি নষ্ট হওয়ার ভয়ে একরকম পেরেশানি পোহাতে হয়।) এ তো গেল সামান্য বস্তুর প্রতি মহব্বতের কথা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সতর্ক করেছেন, তা তো আরও মারাত্মক। তিনি সোজা গোলাম বা পূজারিই বলে দিয়েছেন। আর তারা যদি এসবের গোলাম বা পূজারি হয়, তবে ওইসব তো তাদের প্রভু-তুল্য। যা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত এবং পরস্পর অংশীদারত্ব নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত।
'এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তাদের দেওয়া হলে খুশি হয়”, “তাদের না দিলে বেজার হয়”। তো, যা হাসিল করতে পেরে মানুষ আনন্দিত হয় এবং গচ্ছা গেলে ব্যথিত হয়, মানুষ তো বলতে গেলে ওই জিনিসেরই গোলাম। যদিও আরও নিম্নস্তরের গোলাম বলা হয় তাকে, যে উভয়টি পেলেই খুশি হয় এবং উভয়টি হারালে দুঃখ পায়। অপরদিকে মা'বুদে হক তথা যথাযোগ্য উপাস্য তো তিনি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুমিন বান্দা যখন তাঁর ইবাদত করে, তাঁকে ভালোবাসে, তখন তার অন্তরে ঈমান, তাওহিদ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, যিকির ও ইবাদতের স্পৃহা অর্জিত হয়। এবং সে এতেই আনন্দিত হয়। আর ইবাদত থেকে বঞ্চিত করা হলে সে ক্রোধান্বিত হয়।'

টিকাঃ
[১] নোট : الغمرة অর্থ 'অজ্ঞতা, ভ্রষ্টতা, ভীষণতা, ভয়াবহতা, প্রচণ্ডতা
[২] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্র
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্রম: ৫৪
[২] সূরা জাসিয়া, আয়াত-ক্রম: ১০-১১
[৩] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম:
[১] সূরা কাহফ, আয়াত-ক্রম: ২৮
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৮৮৭; ইবনু হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ৩২১৮। হাদিসটিতে শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 আল্লাহর গোলামি : স্বরূপ ও প্রকৃতি

📄 আল্লাহর গোলামি : স্বরূপ ও প্রকৃতি


'এ বিষয়টি নিশ্চিত যে, কারও কাছে যখন কিছু ভালো লাগে, তখন সে মনে মনে ওই জিনিসের কল্পনা করতে থাকে এবং সাধ্যানুযায়ী সেটি পেতেও চায়। বিখ্যাত সুফি জুনাইদ বাগদাদি বলেন, “বান্দা কেবল তখনই খাঁটি বান্দা হতে পারে, যখন সে গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর আসক্তি ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে।” তাঁর এই বক্তব্য উল্লিখিত হাদিসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর একনিষ্ঠ গোলাম হতে পারে না, তার দ্বীন-ধর্ম আল্লাহর জন্য খাঁটি হতে পারে না, যতক্ষণ-না সে গাইরুল্লাহর গোলামি থেকে বের হতে পারে। শুধু তাই নয়, বরং যদি তার মধ্যে গাইরুল্লাহর দাসত্ব ও ইবাদতের সামান্য হিসসাও বিদ্যমান থাকে, তবে সে একনিষ্ঠ বান্দা হতে পারল না। গাইরুল্লাহ যদি বান্দার হাসি-खुশি কিংবা আনন্দ- বেদনার উপলক্ষ হয়, তবে এ থেকে অনুমিত হয় যে, সে যেন গাইরুল্লাহরই দাস; তার অন্তরে গাইরুল্লাহর প্রতি মহব্বতের অনুপাতে তার অংশীদারত্বও আছে; বাড়িয়ে বললে ইবাদতও।
'বিখ্যাত আবিদ ও মুহাদ্দিস ফুযাইল ইবনে ইয়ায বলেন, “আল্লাহর কসম, ওই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতে সক্ষম হয়নি, যার কাছে কোনো মাখলুক প্রতিপালকের মর্যাদা পায়।” যায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল বলেন-
"এক প্রভূ বিশ্বাস করো, নাকি অসংখ্য?
এক দ্বীন মানো, তবে দাসত্ব কেন বিক্ষিপ্ত!"
'ইমাম তিরমিযি ও তাবারানি আসমা বিনতু উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা'র সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَخَيَّلَ وَاخْتَالَ وَنَسِيَ الْكَبِيرَ الْمُتَعَالِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَجَبَّرَ وَاعْتَدَى وَنَسِيَ الْجَبَّارَ الأَعْلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ سَهَا وَلَهَا وَنَسِيَ الْمَقَابِرَ وَالْبِلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ بَغَى وَ اعْتَدَى وَنَسِيَ الْمُبْتَدَا وَالْمُنْتَهَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدُّنْيَا بِالدِّينِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدِّينَ بِالشُّبُهَاتِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ رَغَبٌ يُذِلُّهُ وَيُزِيلُهُ عَنْ الْحَقِّ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ طَمَعٌ يَقُودُهُ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ هَوَى يُضِلُّهُ
"সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে নিজেকে বড় মনে করে এবং অহংকার করে আর আল্লাহকে ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে জালিম হয়ে জুলুম করে এবং পরাক্রমশালী আল্লাহকে ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে সত্যবিমুখ হয়ে অনর্থক কাজে লিপ্ত হয় এবং গোরস্তান ও মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে বিদ্রোহী হয়ে অবাধ্যতা করে এবং তার শুরু ও শেষ ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়া হাসিলের পথ অবলম্বন করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে সন্দেহজনক বিষয়ের ওপর আমল করে দ্বীনের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যাকে প্রবৃত্তির চাহিদা লাঞ্ছিত করে এবং সত্য থেকে বিচ্যুত করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে লালসার গোলাম হয়ে যায়, লালসা তাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যাকে তার প্রবৃত্তি ভুল পথে পরিচালিত করে।" [১]
'ইমাম তিরমিযি এ হাদিসটিকে গরিব বলেছেন। যদিও উল্লিখিত অন্যান্য সহিহ হাদিস, এই হাদিসটির সমর্থন করায় এটিও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। (আল্লাহই সর্বজ্ঞানী)।
'এটি ছাড়া আরও অসংখ্য হাদিস ও আসার রয়েছে, যেগুলো অর্থগত দিক থেকে এই হাদিসের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। কুরআনের আয়াতও আছে। যেমন : আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ، وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
"আর কিছু লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।”[২]

টিকাঃ
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম ২৪৪৮; মুহাদ্দিসগণের মতে হাদিসের সনদ যঈফ।
[২] সুরা বাকারা, আয়াত-১৬৫

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে ধ্বংস করে

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে ধ্বংস করে


এই বিষয়ে শাইখের আলোচনা শেষ হলে তিনি তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক আরও কিছু বিষয় যুক্ত করলেন। যে বিষয়গুলো চিন্তা-ভাবনার নিরিখে, বিশিষ্টজন তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এ পর্যায়ে শাইখ আমাদের এমন এক প্রাণবন্ত আলোচনার দিকে নিয়ে গেলেন, যা আমাদের অন্তরে স্পন্দন সৃষ্টি করল।
শাইখ বললেন, 'এতক্ষণ তোমাদেরকে আমি যে কথাগুলো বললাম, এই কথাগুলো হুবহু প্রযোজ্য হবে এমন সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যারা কিনা জোর করে হলেও ক্ষমতায় যেতে চায়। সম্মানজনক কথা বললে তারা খুব খুশি হয়, যদিও তা মিথ্যা হয়। আবার একটু অপমানজনক কথা বললে খুব রেগে যায়, যদিও তা সত্য হয়। কিন্তু একজন মুমিন বান্দা সবসময়ই সত্যের ওপর সন্তুষ্ট থাকে, সেটা তার পক্ষে যাক কিংবা বিপক্ষে। এবং মিথ্যায় সে ক্ষুব্ধ হয়, সেটাও তার পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে। কেননা সে জানে—আল্লাহ সত্য, সততা ও ইনসাফ পছন্দ করেন, মিথ্যা, অন্যায় ও অবিচার অপছন্দ করেন।
'একজন মুমিনকে যখন বলা হয়—সত্য, সততা ও ইনসাফ তো আল্লাহর পছন্দের, তখন সেও তা নিজের পছন্দের করে নেয়। যদিও সেসব তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। কেননা সে তো তার নিজস্ব ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকে নবীজির আনীত শরিয়তের সামনে কুরবান করে দিয়েছে। একইভাবে যখন তাকে বলা হয়—মিথ্যা, অন্যায় ও অবিচার তো আল্লাহর অপছন্দের, তখন সেও তা ঘৃণা করতে শুরু করে, যদিও কোনো কারণে সেটা তার মনঃপূত হয়।
'ঠিক একই কথা প্রযোজ্য হবে এমন ব্যক্তির বেলায়, 'যে অসদুপায় অবলম্বন করে হলেও সম্পদশালী হতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ مِنْهُمْ مِّنْ يَّلْمِرُكَ فِي الصَّدَقْتِ فَإِنْ أَعْطُوْا مِنْهَا رَضُوا وَ إِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ
"তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সাদাকাহ বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। তারা তা থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় আর না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়।"[১]
'এরাই ওই সকল লোক, যাদের সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—تَعِسَ عَبْدُ الدِّيْنَارِ - ধ্বংস হোক দিনার-পূজারি।
‘এ তো গেল সম্পদ উপার্জনে মোহগ্রস্ত ব্যক্তির কথা, তাহলে এবার চিন্তা করে দেখো, ওই ব্যক্তির অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক হতে পারে, যার অন্তরের ওপর প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে, যাকে ধরাশায়ী করে রেখেছে এমনসব লোভনীয় বস্তু যা আল্লাহর মহব্বত ও ইবাদত থেকে বিমুখ করে দেয়। যেহেতু তার অন্তর নানারকম অনিষ্ট ও মাখলুকের মহব্বতে নিমজ্জিত, তাই আপন রবের ইবাদত, প্রীতি ও ভীতি থেকে সে দূরে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কেননা প্রত্যেক প্রেমিক তার প্রেমাষ্পদকে নিজের দিকে টানে এবং অন্যের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এভাবেই সকল অনিষ্ট মানুষকে আল্লাহর উপাসনা ও সান্নিধ্য থেকে সরিয়ে দূরে বরং বহুদূরে নিক্ষেপ করে।’
‘এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাঁদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের বলেন— الْفَقْرَ تَخَافُوْنَ ؟ لَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الْفَقْرَ . وَ إِنَّمَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا ، حَتَّى إِنَّ قَلْبَ أَحَدِكُمْ إِذَا زَاغَ لَا يُزِيغُهُ إِلَّا هِيَ
“তোমরা কি দারিদ্র্যের ভয় করছ? আমি তো বরং তোমাদের ওপর দুনিয়াদারি ভয় করছি। এমনকি তোমাদের কারও অন্তর যদি ভ্রষ্ট হয়, তবে তা কেবল দুনিয়ার কারণেই হবে।” [১]
‘আরও একটি বিষয় খেয়াল করা যাক—মানুষ বন্ধুকে ভালোবাসে, শত্রুর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে; ভালোবাসার মানুষকে কাছে টানে, শত্রুকে দূরে রাখে। তার এই ভালোবাসা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তবে এটিই তার সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক ছিন্নকারী হতে পারে। একইভাবে, শত্রুর সঙ্গে মন্দ আচরণ— তথা ঘৃণা করা, কষ্ট দেওয়া বা প্রতিশোধ নেওয়া—কখন যে মানুষকে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে উদাসীন করে দেয়, তা সে টেরও পায় না। শুধু তাই নয়, উদ্দেশ্যহীনভাবে ভালোবাসে এমন বন্ধুরা যদি কারও সঙ্গে সদাচার করে, তাহলে বন্ধুদের এই সদাচার তার মনেও একরকম ভালোবাসার জন্ম দেয়; সেটা যদি খুব দৃঢ় নাও হয়ে থাকে তবুও এটি একটু একটু করে তাকে তাদের সমপর্যায়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তাঁর ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।'

টিকাঃ
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[১] ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৩৯৮২; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। ইবনু মাজাহ ও মুসনাদু আহমাদের বর্ণনার সাথে এই বর্ণনার অর্থগত মিল থাকলেও শব্দগত তারতম্য, আছে।

📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 প্রবৃত্তির ফিতনায় অন্তরের চিকিৎসা

📄 প্রবৃত্তির ফিতনায় অন্তরের চিকিৎসা


আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কারও অন্তর যদি কামনা-বাসনা, পদমর্যাদা, ধনসম্পদ বা ভীতিকর কিছুর ফিতনায় পড়ে যায়, তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'বান্দা যতক্ষণ-না তার দ্বীনকে আল্লাহর জন্য খাঁটি করবে, ততক্ষণ সে এই ধরনের ফিতনা থেকে রেহাই পাবে না। সুতরাং বান্দার ভালোবাসা হতে হবে এক আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সে-জন্য। তার ঘৃণাও হতে হবে আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহ যা ঘৃণা করেন, সে-জন্য। বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও একই কথা। যদি এমনটি না হয়, তাহলে মাখলুকের প্রতি তার মহব্বত এবং তার প্রতি মাখলুকের ভালোবাসা— উভয়টি একটি অপরটির দিকে আকর্ষণ করবে। এ ক্ষেত্রে হয়তো প্রথমটির আকর্ষণ শক্তিশালী হবে, অথবা দ্বিতীয়টির। যদি সে নিজে শক্তিশালী হয় এবং নিজ প্রবৃত্তিকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে কোনো প্রিয় বস্তু তাকে আকর্ষণ করতে পারবে না। কেননা সে নিজেই নিজ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণকারী এবং এর প্ররোচনা থেকে হেফাজতকারী। আর এই আত্মিক শক্তির উৎস হলো— আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা, যা তাকে যাবতীয় প্রিয় জিনিসের আকর্ষণ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে পারবে।
'এবার আসি কারও প্রতি অন্যের ভালোবাসা প্রসঙ্গে। কাউকে যদি অন্যরা ভালোবাসে, তাহলে এই ভালোবাসার শক্তি তাকে আকর্ষিত করতে পারে। এমতাবস্থায় যদি তার মধ্যে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা-নিঃসৃত শক্তি সঞ্চিত থাকে, যা দিয়ে সে নিজেকে হেফাজত করতে পারে, তবে তো ভালো কথা। অন্যথায় তারা তাকে নিজেদের দলে নিয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর প্রতি তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রীর ভালোবাসার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। আমরা জানি, ইউসুফ আলাইহিস সালাম ওই নারীর ফাঁদে পা দেননি। কেননা তাঁর ঈমানি শক্তি, আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা ও ইখলাস বাদশাহর স্ত্রীর রূপ-সৌন্দর্য এবং যুবক ইউসুফের প্রতি তার আসক্তির তুলনায় অনেক অনেক বেশি প্রবল ছিল। এই অবস্থা তখন হতে পারে, যখন কেউ তার রূপ-সৌন্দর্যের প্রেমে পড়বে; বস্তুত এখানে প্ররোচনা তৈরির আরও অনেক উপলক্ষ রয়েছে, যা উভয় পক্ষের চেয়ে শক্তিশালী। তাছাড়া, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা তো স্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা নবী হিসেবে তিনি নিষ্পাপ, যার হেফাজতকারী স্বয়ং আল্লাহ। তা না-হলে দেখা যায়, মানুষের প্রেম-ভালোবাসা সাধারণত দ্বিপাক্ষিক হয় এবং তাদের মধ্যে মন্দ কিছু ঘটেই যায়। এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ | “দুজন নারী-পুরুষ একান্তে মিলিত হলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।”[১]
শাইখ ইবনু তাইমিয়া এই সমাজেরই একজন। তাই তিনি আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাছাড়া তিনি বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও ধীসম্পন্ন। তাঁর জীবনযাপন কুরআন ও সুন্নাহর সাজে সজ্জিত। সমাজের ভেতর-বাহির সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান রাখায় শাইখ বিভিন্ন প্রসঙ্গে আরও প্রাঞ্জল আলোচনা পেশ করলেন। আমরাও অভিভূত হয়ে শুনতে থাকলাম।
শাইখ বলছিলেন- 'একজন মানুষকে কখনো কখনো তার জ্ঞান, দ্বীন, সদাচার বা অন্য কোনো কারণে ভালোবাসা হয়। এসব ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা থাকে আরও ভায়াবহ। হ্যাঁ, যদি তার মধ্যে ঈমানি শক্তি, পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি এবং তাওহিদি চেতনা বিদ্যমান থাকে, তবে ভিন্ন কথা। কেননা জ্ঞান-বুদ্ধি, যশ-খ্যাতি, রূপ-সৌন্দর্য সবার জন্যই ফিতনা। আসলে কি, বন্ধুরা সাধারণত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির ফিকিরে থাকে। যদি কোনো কারণে সেটা না হয়, তবে ভালোবাসায় ভাটা পড়ে; সূচনা হয় ঘৃণার। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো সম্পর্কের ইতি টেনে প্রাণের বন্ধু হয়ে যায় জানের দুশমন। তো, মানুষকে তার বন্ধুরা সাধারণত বিভিন্ন উদ্দেশ্যে শুধু ব্যবহারই করতে চায়; এমনকি কখনো কখনো শুধু বন্ধুত্ব তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না, তারা পেতে চায় দাসত্ব। এদিকে শত্রুরা সবসময় কষ্ট দিতে চায়, ক্ষতি করতে চায়। আর বন্ধুরা চায় উপকৃত হতে। তাদের এই উপকার যদি তার নিজের বা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকরও হয়, তবুও এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আসলে খুব কম বন্ধুই কৃতজ্ঞ হয়ে থাকে।
'তো, মৌলিকভাবে কী বন্ধু, কী শত্রু—কেউই উপকার করতে চায় না, চায় না ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে। বরং সবাই চায় নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ যদি আল্লাহর প্রকৃত আবেদ তথা দাস না হয়, আল্লাহর ওপর ভরসা না রাখে, তাঁকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে এবং সকল বন্ধুত্ব ও শত্রুতা আল্লাহর ওয়াস্তে না হয়, তবে উভয় পক্ষই নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা হতে পারে নিজেদের দোজাহানের বরবাদির কারণ।
'এটি বনি আদমের খুবই স্বাভাবিক চরিত্র। তাদের মধ্যে যখনই কোথাও ঝগড়া-বিবাদ সংঘটিত হয়, তখন কিছু মানুষ যায়েদ (কাল্পনিক চরিত্র)-এর পক্ষ নেয়। আবার আরও কিছু মানুষ আমর (কাল্পনিক চরিত্র)-এর বিরুদ্ধে যায়। আর কিছু মানুষ নেয় আরেক পক্ষ। পক্ষ বিভিন্ন হলেও সবার উদ্দেশ্য থাকে অভিন্ন—নিজের স্বার্থ হাসিল করা। তো, যায়েদের পক্ষ যারা নিয়েছিল, তাদের প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে গেলে তারাই আবার আমরের দলে যোগ দেয়। একই ঘটনা ঘটে আমরের সঙ্গে। আর এটাই মানুষের চিরায়ত অভ্যাস।
'একই পরিস্থিতি হতে পারে quando কোনো নেতাকে কেন্দ্র করে দুটি পক্ষ তৈরি হয়। এমতাবস্থায় যারা তাকে সমর্থন করে, সে সাধারণত ওই দিকে ঝুঁকে। কিন্তু সমর্থকদের এই সমর্থন যদি আল্লাহর ওয়াস্তে নাহয়, তবে তারা নেতার জন্য প্রতিপক্ষের চেয়েও ক্ষতিকর হতে পারে। কেননা প্রতিপক্ষ হয়তো বিভিন্ন উপায়ে তার দুনিয়াবি ক্ষতি করতে চাইবে। যেমন: তাকে হত্যা করা, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা পদচ্যুত করা ইত্যাদি। এই সবগুলোই পার্থিব বিষয়। এসবের কারণে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, যদি নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে।
নিরাপদ রাখার উপায় হলো—নিজেকে এমন অবস্থায় রাখা, যা দুনিয়াদারদের অবস্থার ঠিক উল্টো। দুনিয়াদাররা দুনিয়ার জন্য দ্বীন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। ধর্মীয় ক্ষতিকে তারা কিছু মনেই করে না। তো, বান্দা যদি দ্বীনকে গুরুত্ব দেয়, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না, কেননা দ্বীন হলো বান্দা ও রবের মধ্যে এমন এক সেতুবন্ধন, যার ওপর কারও কোনো ধরনের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা নেই।
'অপরদিকে যারা নিজেদের বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করার জন্য নেতাকে সমর্থন জানিয়েছিল, নিজেদের সেই স্বার্থ পূরণ করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এতে যদি নেতার দ্বীনের বড় কোনো ক্ষতিও হয়ে যায়, তবুও তারা পিছপা হবে না। যদি তারা ইচ্ছা পূরণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে মুহূর্তেই তাদের সমর্থন শত্রুতায় রূপ নেয়। এমতাবস্থায় সে দুটি কারণে কষ্টে নিপতিত হতে পারে, এক. তাদের অনুপস্থিতি, দুই. তাদের শত্রুতা।
'এদের শত্রুতা আরও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা রাখে। কারণ বন্ধুত্বের সুযোগে তার দুর্বল সব দিক সম্পর্কে তারা অবগত হতে পেরেছে, জানতে পেরেছে এমন কিছু, যা শত্রুরা হয়তো জানে না। ফলে এবার নতুন ও পুরাতন শত্রুরা মিলে খুব সহজেই তার সর্বনাশ ডেকে আনতে পারবে।'
'যদি তার পক্ষে ওই সমর্থকদের সঙ্গ ত্যাগ করা সম্ভব না হয়, তবে তাদের মন রক্ষা করে চলতে হবে, তাদের যাবতীয় ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও তাকে ধর্মীয়ভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। সে যদি শর্তসাপেক্ষে তাদের সকল পার্থিব চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়, তবে সে-ও হয়তো তার কাঙ্ক্ষিত পদ পেয়ে যাবে। তবে এজন্য তাকেও তাদের অন্যায় অবিচার ও জুলুমের পরিপূর্ণ অংশীদার হতে হবে। এবং তারাও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকে ব্যবহার করতে থাকবে। যদি এতে সে পার্থিব ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তবুও তারা সরে আসবে না। ধর্মীয় ক্ষতি তো বিবেচনায়ই নেবে না। বস্তুত মানুষ যেমন জালেম, তেমনি জাহেলও; নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না।'
'তাদের এইসব দুরভিসন্ধি যদি প্রকাশ পেয়ে যায়, তখন যদি সে তাদের সঙ্গে যথাসম্ভব সদাচার করে, তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহকে সামনে রেখে তাদের প্রয়োজন পূরণ করে, তাদেরকে সাহায্য করা একমাত্র আল্লাহর জন্যই হয় এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখে, তবে হয়তো তার কোনো ক্ষতি হবে না; আর নয়তো তারা তার দ্বীন-দুনিয়া উভয়টাই ধ্বংস করে দেবে। যেমনটি প্রায়ই দুনিয়াদার ক্ষমতালোভীদের বেলায় ঘটে থাকে। কারণ ক্ষমতা ও পদমর্যাদা লাভ করার জন্য তাকে অন্যায়-অবিচার করতে বলা হয়, এর প্রয়োজনও তাকে বোঝানো হয়; যদি তা না করে, তার দিকে শত্রুতার তির নিক্ষেপ করা হয়। যেমনটি অধিকাংশ সময় ঘটে থাকে।
'হুবহু একই ঘটনা ঘটতে পারে, যদি কেউ কাউকে তার বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে ভালোবাসে। কেননা সে যদিও তার খিদমত করবে, তাকে সম্মান করবে, পারতপক্ষে সবই করবে তার জন্য, কিন্তু বিনিময়ে এমন 'হারাম' বা নিষিদ্ধ কিছু দাবি করবে, যা তার দ্বীনের জন্য ধ্বংসাত্মক। যেমন: বিদআতের দিকে আহ্বানকারী কোনো বিদআতির ভক্ত যদি কেউ হয়ে যায়, তাহলে সে তাকে একসময় জেনে-বুঝে বাতিলের সাহায্য করতে বাধ্য করে। অন্যথায় তার প্রতি শত্রুতা করতে শুরু করে। এ কারণেই বিজ্ঞ কাফের ও জ্ঞানী বিদআতিরা জানে যে তারা মিথ্যার ওপর আছে, তবুও সেই মিথ্যার পথেই চলে। এমনকি অনুসারীদের ধরে রাখতে তারা সত্যানুসারীদের বিরোধিতাও করে।'
'কেউ যখন গাইরুল্লাহকে ভালোবাসে, বন্ধু বানায়, সঙ্গে সঙ্গে সে আল্লাহর আশিক ও প্রেমিকদেরও অপছন্দ করতে শুরু করে। আর যখন গাইরুল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা হয়, তখন তার বন্ধুপক্ষের ক্ষতি শত্রুপক্ষের ক্ষতি থেকেও ভয়ংকর হতে পারে। কেননা শত্রুদের সর্বোচ্চ ক্ষতি এটাই হবে যে, তারা তার এই পার্থিব বন্ধুর মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, দূরত্ব তৈরি করবে। আর বন্ধু ও তার মধ্যকার এই দূরত্ব তার জন্য বলতে গেলে রহমত। আর অন্য বন্ধুরা চাইবে এই রহমত দূর করতে, এ থেকে বঞ্চিত করতে। তাহলে তোমরাই বলো, এটা কোন ধরনের বন্ধুত্ব?'
'তারা আরও চাইবে-যেন এই বন্ধুত্ব বাকি থাকে এবং তারা নিজেদের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করতে পারে। আর এই উভয়টিই তার জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَ رَأَوُا الْعَذَابَ وَ تَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ
"অনুসৃতরা যখন অনুসারীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে এবং যখন আজাব প্রত্যক্ষ করবে আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক।" [১]
'এ সম্পর্কে ফুযাইল ইবনে ইয়ায বর্ণনা করেন লাইছ রহিমাহুল্লাহর সূত্রে, তিনি মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহর সূত্রে, যে, এখানে الْأَسْبَابُ তথা সম্পর্ক দ্বারা উদ্দেশ্য ওই সকল ভালোবাসা, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য ছিল না। এবং ওই সকল সম্পর্ক, যার ভিত্তি ছিল কেবলই দুনিয়া। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُوا مِنَّا كَذَلِكَ يُرِيهِمُ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ حَسَرَتٍ عَلَيْهِمْ ۖ وَمَا هُمْ بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ
"আর অনুসারীরা বলবে, কতই-না ভালো হতো, যদি আমাদেরকে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ দেওয়া হতো! তাহলে আমরাও তাদের প্রতি তেমনি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম, যেমন তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে আমাদের প্রতি। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দেখাবেন তাদের কৃতকর্ম তাদেরকে অনুতপ্ত করার জন্য। আর তারা কস্মিনকালেও জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।" [১]
'তাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে ওই সকল আমলের কারণে যা তারা দুনিয়াতে একে অন্যের জন্য করত এবং তাতে বিন্দুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির ইচ্ছে থাকত না। এর অন্তর্ভুক্ত হবে—বিশেষ ব্যক্তির সান্নিধ্য ও বন্ধুত্ব, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। মোটকথা—কল্যাণ শুধুই এক আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে, তার সঙ্গে শিরক করা থেকে বিরত থাকার মধ্যে। বস্তুত তিনি ছাড়া আর কোনো উপায়-অবলম্বন নেই, নেই কোনো সহায়-সম্বলও।'
কথা বলতে বলতে শাইখ এবার সকলের দিকে দৃষ্টি দিলেন। আমরা সকলেই হা করে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। পাঠক, বলুন তো! কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বাস্তবতা-নির্ভর এমন তেজোদ্দীপ্ত আলোচনা শুনে এভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় না হয়ে উপায় আছে?
এরপর ইমাম ইবনু তাইমিয়া বলেন, 'যা-কিছু আমরা শুনলাম, এ-থেকে আল্লাহ আমাদের উপকৃত করুন। সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবী -এর ওপর। আগামী মজলিসে সাক্ষাত হবে, এই আশা নিয়ে মহান আল্লাহর হাতে তোমাদেরকে সোপর্দ করছি, যাঁর ওয়াদা কখনো অপূরণীয় থাকে না।'

টিকাঃ
[১] তিরমিযি, হাদিস-কুম-১১৭১। ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৬
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00