📄 অন্তর যেন কামনার খাঁচায় বন্দী
'যারা প্রবৃত্তির চাহিদা, তথা রূপ-সৌন্দর্য, পান-আহার, পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির পেছনে পড়ে থাকে, এসব তাদের ওপর একটু একটু করে প্রভাব বিস্তার করে। এভাবে ক্ষমতার বিস্তার করতে করতে একসময় তাদেরকে বশীভূত করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং কামনা ও লালসার বেড়াজালে বন্দী করে ফেলে। এমতাবস্থায় নিজের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সব চলে যায় প্রবৃত্তির কব্জায়। এবার প্রবৃত্তি তাদেরকে যেভাবে চলতে বলে, চোখ বুজে সেভাবেই চলতে থাকে। এজন্যই সালাফের কেউ কেউ বলেছেন- “কোনো সুশ্রী বালকের পাশে যদি কোনো হিংস্র প্রাণী এবং ধার্মিক যুবক থাকে, তবে আমি ওই বালকের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে হিংস্র প্রাণী অপেক্ষা যুবকের ওপর বেশি আশঙ্কা করি। আর বালকের জায়গায় যদি কোনো সুন্দরী রমণী থাকে, তবে তো কথাই নেই।”
'এই আশঙ্কা এজন্যই যে, আল্লাহর কোনো বান্দা, যার অন্তর মোটামুটি পরিশুদ্ধ এবং কিছুটা আধ্যাত্মিক সাধনাও সে করেছে, তবে এখনো আল্লাহর ভালোবাসা ও ইবাদতের সামনে নিজেকে পরিপূর্ণরূপে সঁপে দেয়নি, আল্লাহর ভয় এখনো তার মধ্যে স্থিতি লাভ করেনি; এমতাবস্থায় প্রবৃত্তি যদি কোনোভাবে তাকে কোনো লোভনীয় বস্তুর পেছনে ফেলতে পারে, তাহলে তার ওপর এতটাই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, ঠিক যেমন কোনো হিংস্র প্রাণী শিকারের ওপর থাবা বসায়। হিংস্র প্রাণীটি বলপূর্বক শিকারের ওপর আক্রমণ করে, আর অসহায় প্রাণীটি কোনোভাবেই থাবা থেকে ছুটতে পারে না। অনুরূপভাবে মানুষের অন্তর যখন প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার পেছনে পড়ে যায়, প্রবৃত্তি তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, আর এই অবস্থা থেকে সে কোনোভাবেই বের হতে পারে না। এভাবে সে প্রবৃত্তির কাছে হেরে যায়, হারিয়ে যায় কামনার অতল গহ্বরে। ঠিক যেমন শিকারকৃত প্রাণীটি মিশে যায় হিংস্র প্রাণীর পাকস্থলীতে। এসব কিছু এজন্যই ঘটে যে, কামনা-বাসনা চরিতার্থ করাই নফসের উদ্দেশ্য, আর সেটি করার জন্য প্রবৃত্তি থাকে অত্যন্ত উদগ্রীব, যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন।'
'মানুষের মনে যা কিছু প্রভাব বিস্তার করে, সবকিছুর কাছেই সে পরাস্ত হয়। হোক সেটা আকাঙ্ক্ষার কিংবা আশঙ্কার। আকাঙ্ক্ষার তালিকায় রয়েছে-ধন-সম্পদ, যশ-খ্যাতি, রূপ-সৌন্দর্য ইত্যাদি। একইভাবে ভীতসন্ত্রস্ত কারও মন- মস্তিষ্ক ভয়ের মধ্যে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়, যেমন কেউ পানিতে পড়ে ডুবে যাচ্ছে। কারণ, অন্তরকে বেষ্টন করে আছে যে শরীর, তাতে কোনো আঘাত পড়লে সে প্রভাব অন্তরেও পড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক। এভাবে অন্তরের ওপর প্রভাব বিস্তার করে যাবতীয় আশঙ্কা, আকাঙ্ক্ষা, পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়াবলি। আকাঙ্ক্ষা ও পছন্দের সবকিছু সে পেতে চায়, আবার আশঙ্কা ও অপছন্দের সবকিছু দূরে ঠেলে দেয়। আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক প্রিয় জিনিসের সঙ্গে, আর আশঙ্কার সম্পর্ক অপ্রিয় জিনিসের সাথে। তবে আল্লাহ ছাড়া কেউ ভালো কিছু দিতে পারে না, তিনি ছাড়া কেউ অনিষ্টও দূর করতে পারে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَ إِنْ يَّمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلَا كاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَ إِنْ يُّرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ، يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ، وَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোনো কষ্ট আরোপ করতে চান, তাহলে কেউ নেই তা দূর করার তিনি ছাড়া। পক্ষান্তরে যদি তিনি কল্যাণ দান করেন, তবে তার অনুগ্রহকে রহিত করার মতোও কেউ নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন; বস্তুত তিনিই ক্ষমাশীল দয়ালু।" [১]
وَ مَا بِكُمْ مِّنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ
“তোমাদের কাছে যেসকল নিয়ামত আছে, তা আল্লাহরই পক্ষ থেকে। অতঃপর তোমরা যখন দুঃখে-কষ্টে নিপতিত হও তখন তাঁরই নিকট ফরিয়াদ জানাও।” [২]
'বান্দা যখন আশা পূরণ এবং আশঙ্কা দূরীকরণের দুআ করে, তখন আল্লাহ ওই বান্দাকে তাঁর প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, তাঁর মারেফাত, তাওহিদ এবং তাঁকে পাবার আকাঙ্ক্ষা দান করেন; বান্দার অন্তরের প্রাণশক্তি বাড়িয়ে দেন, ঈমানের আলোয় করেন আলোকিত—এই সব কখনো কখনো বান্দার কাঙ্ক্ষিত বস্তুর চেয়ে অনেক বেশি উপকারী হতে পারে। এ-তো গেল পার্থিব কোনোকিছু কামনার কথা। বান্দা যদি এমন কিছু প্রার্থনা করে-যা তার যিকির, শোকর, ইবাদত, ইত্যাদি বিষয়াবলির ক্ষেত্রে সহযোগী হবে, তবে কাঙ্ক্ষিত বিষয়টির তুলনায় আকাঙ্ক্ষাই তার জন্য বেশি উপকারী। আকাঙ্ক্ষাটি হচ্ছে-দুআ। আর কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো হচ্ছে-আল্লাহর যিকির, শোকর এবং সর্বোত্তম পন্থায় তাঁর ইবাদত। আর দুআকে বলা হয়েছে সকল ইবাদতের প্রাণ।'
টিকাঃ
[১] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ১০৭
[২] সূরা নাহল, আয়াত: ৫৩
📄 দুনিয়ার মহব্বতে ডুবে অন্তর পথভ্রষ্ট হয়
এরপর শাইখ তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী কথার মধ্যে সামান্য বিরতি দিলেন। এভাবে তিনি আসলে সুযোগ দেন-কারও মনে খটকা থাকলে যেন তা দূর করা সম্ভব হয়। সুযোগটা আমি কাজে লাগাই, বলি, 'হে আমাদের ইমাম! আমরা আপনার কথা থেকে অন্তরের পছন্দ-অপছন্দ ও প্রিয়-অপ্রিয়'র দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমরা এ-ও জানতে পারলাম যে-এগুলো জয়ী হলে অন্তর পরাস্ত ও বিধ্বস্ত হয়। যদি বিষয়টি এমনই হয়ে থাকে তাহলে অন্তরের এই দুরবস্থা বর্ণনার ক্ষেত্রে 'الْغَمْرَة [১] শব্দটিই কি কেবল প্রযোজ্য? আপনি নিশ্চয় জেনে থাকবেন- 'الْغَمْرة' শব্দটি কুরআনে চার স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে।'
ইমাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'প্রশ্নটি খুবই চমৎকার হয়েছে। হ্যাঁ, প্রিয় ছাত্ররা আমার! নিশ্চয় মানুষ যা পছন্দ করে কিংবা ভয় করে-তা যা-ই হোক না কেন-অন্তরকে নিমজ্জিত করে ফেলে এবং তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
بَلْ قُلُوبُهُمْ فِي غَمْرَةٍ مِنْ هَذَا وَ لَهُمْ أَعْمَالُ مِنْ دُونِ ذَلِكَ هُمْ لَهَا عَمِلُوْنَ
"বরং তাদের অন্তর এ বিষয়ে অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন, এ ছাড়া তাদের আরও আমল রয়েছে, যা তারা করছে।” [২]
'তো, যা থেকে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে, কলব ঠিক তাতেই নিমজ্জিত হয়। এরপর এই অসতর্কতা তাকে আল্লাহর যিকির, পরকালের নিয়ামত ও আযাবের স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَذَرْهُمْ فِي غَمْرَتِهِمْ حَتَّى حِينٍ "অতএব তাদেরকে কিছু কালের জন্যে নিজেদের অজ্ঞতায় নিমজ্জিত থাকতে দিন।"।১।
'অর্থাৎ তাদের অন্তর নিমজ্জিত থাকুক ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততিসহ আরও পছন্দের যা কিছু আছে তাতে; যদিও কল্যাণ ও নেক আমলের দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে এসব তাদের জন্য অনেক বড় বাধা। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
قُتِلَ الْخَرَّصُوْنَ ، الَّذِينَ هُمْ فِي غَمْرَةٍ سَاهُونَ | “অনুমানকারীরা ধ্বংস হোক, যারা কিনা উদাসীন, ভ্রান্ত।”।২।
'তো, তারা দুনিয়ার ভালোবাসায় নিমজ্জিত, আখেরাতের সবকিছু তাদের থেকে আচ্ছাদিত। তাই পরকাল ও পরকালের সবকিছুর ব্যাপারে তারা চরম উদাসীন।' আমি মনে মনে ভাবছিলাম-শাইখ যে তিনটি আয়াত উল্লেখ করেছেন, তাতে 'الْغَمْرَة' শব্দটি আছে এবং সবখানে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আরও একটি আয়াতে শব্দটি আছে, কিন্তু অর্থগত বৈপরীত্যের কারণে হয়তো শাইখ সেই আয়াত উল্লেখ করেননি। আয়াতটি হলো-
وَ لَوْ تَرَى إِذِ الظَّلِمُوْنَ فِي غَمَرْتِ الْمَوْتِ | 'যদি আপনি দেখেন যখন জালিমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে।[৩]
ভাবনা ফেলে শাইখের কথায় মন দিলাম। তিনি বললেন, 'তাদের গাফলতির বিষয়টি কুরআনের একটি আয়াতের সাথে সাদৃশ্য রাখে। আয়াতটি এই-
وَ لَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَ اتَّبَعَ هَوْنَهُ وَ كَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا "যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, এবং যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে গেছে, | আপনি তার আনুগত্য করবেন না।”১
'সুতরাং বলা যায়, الغمرة তথা উদাসীনতাও প্রবৃত্তি-অনুসরণের মধ্যে পড়ে। আবার الشهو তথা ভুলে যাওয়া হচ্ছে এক ধরনের উদাসীনতা। এজন্য কেউ কেউ বলেছে- اَلسَّهْوُ হলো-কোনো কিছু সম্পর্কে উদাসীন বা বেখবর হওয়া। আর সকল অনিষ্টের কেন্দ্র হলো-গাফলত তথা উদাসীনতা এবং শাহওয়াত তথা প্রবৃত্তির প্ররোচনা।
'কারণ আল্লাহ ও আখেরাত সম্পর্কে উদাসীনতা কল্যাণের দ্বার বন্ধ করে দেয়, যা কিনা যিকির এবং সতর্কতার মধ্যে নিহিত।'
'এদিকে, প্রবৃত্তির প্ররোচনা অকল্যাণ, বিস্মরণ ও আশঙ্কার দরজা খুলে দেয়। এতে অন্তর একরকম খেয়ালখুশির জিন্দেগিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। এরপর ধাপে ধাপে সে আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন হয়, গাইরুল্লাহর অনুসরণ করতে শুরু করে, আল্লাহর যিকির ভুলে যায়। এমনকি গাইরুল্লাহর মধ্যে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, যাকে বলে যারপরনাই বেপরোয়া। এদিকে মনের মধ্যে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয়ে যায় সীমাহীন। যেমনটি বুখারি-সহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নবীজি থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি বলেন-
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وعَبْدُ الدَّرْهَم وعَبْدُ الْقَطِيفَةِ وَ عَبْدُ الْخَمِيصَةِ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ ، وَإِنْ مُنِعَ سَخِطَ
"লাঞ্ছিত হোক দিনার-পূজারি, দিরহাম-পূজারি এবং রেশমি শাল- পূজারি। লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। কাঁটা বিঁধলে কেউ তা তুলে দেবে না। (জিহাদের ময়দানে) কিছু পেলে সে সন্তুষ্ট হয়, আর না পেলে অসন্তুষ্ট হয়।”২
'নবীজি মানুষকে ওইসবের গোলাম আখ্যায়িত করেছেন, যা পেলে মানুষ আনন্দিত হয় এবং যা হারালে দুঃখিত হয়। এমনকি যেসবের গোলামি মানুষ করে বলে এই হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন রেশমি শাল-যদিও মানুষ তা পরিধান করে, বস্তুত সে যেন উল্টো ওই শালের খাদেম। কতক সালাফ যেমনটি বলেছেন, "এমন পোষাক পরিধান করো, যা তোমার খাদেম হয়; এমন পোষাক পরো না, তোমাকে যে পোষাকের খেদমত করতে হয়।” প্রথমটির উদাহরণ হলো-এমন চাদর, যার ওপর প্রয়োজনে বসাও যায়। আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো-মখমলের এমন শাল, যা গায়ে জড়িয়ে রাখতে হয়। (এমনকি নষ্ট হওয়ার ভয়ে একরকম পেরেশানি পোহাতে হয়।) এ তো গেল সামান্য বস্তুর প্রতি মহব্বতের কথা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সতর্ক করেছেন, তা তো আরও মারাত্মক। তিনি সোজা গোলাম বা পূজারিই বলে দিয়েছেন। আর তারা যদি এসবের গোলাম বা পূজারি হয়, তবে ওইসব তো তাদের প্রভু-তুল্য। যা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত এবং পরস্পর অংশীদারত্ব নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত।
'এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তাদের দেওয়া হলে খুশি হয়”, “তাদের না দিলে বেজার হয়”। তো, যা হাসিল করতে পেরে মানুষ আনন্দিত হয় এবং গচ্ছা গেলে ব্যথিত হয়, মানুষ তো বলতে গেলে ওই জিনিসেরই গোলাম। যদিও আরও নিম্নস্তরের গোলাম বলা হয় তাকে, যে উভয়টি পেলেই খুশি হয় এবং উভয়টি হারালে দুঃখ পায়। অপরদিকে মা'বুদে হক তথা যথাযোগ্য উপাস্য তো তিনি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুমিন বান্দা যখন তাঁর ইবাদত করে, তাঁকে ভালোবাসে, তখন তার অন্তরে ঈমান, তাওহিদ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, যিকির ও ইবাদতের স্পৃহা অর্জিত হয়। এবং সে এতেই আনন্দিত হয়। আর ইবাদত থেকে বঞ্চিত করা হলে সে ক্রোধান্বিত হয়।'
টিকাঃ
[১] নোট : الغمرة অর্থ 'অজ্ঞতা, ভ্রষ্টতা, ভীষণতা, ভয়াবহতা, প্রচণ্ডতা
[২] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্র
[১] সূরা মুমিনুন, আয়াত-ক্রম: ৫৪
[২] সূরা জাসিয়া, আয়াত-ক্রম: ১০-১১
[৩] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম:
[১] সূরা কাহফ, আয়াত-ক্রম: ২৮
[২] বুখারি, হাদিস-ক্রম: ২৮৮৭; ইবনু হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ৩২১৮। হাদিসটিতে শব্দগত সামান্য তারতম্য আছে।
📄 আল্লাহর গোলামি : স্বরূপ ও প্রকৃতি
'এ বিষয়টি নিশ্চিত যে, কারও কাছে যখন কিছু ভালো লাগে, তখন সে মনে মনে ওই জিনিসের কল্পনা করতে থাকে এবং সাধ্যানুযায়ী সেটি পেতেও চায়। বিখ্যাত সুফি জুনাইদ বাগদাদি বলেন, “বান্দা কেবল তখনই খাঁটি বান্দা হতে পারে, যখন সে গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর আসক্তি ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে।” তাঁর এই বক্তব্য উল্লিখিত হাদিসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর একনিষ্ঠ গোলাম হতে পারে না, তার দ্বীন-ধর্ম আল্লাহর জন্য খাঁটি হতে পারে না, যতক্ষণ-না সে গাইরুল্লাহর গোলামি থেকে বের হতে পারে। শুধু তাই নয়, বরং যদি তার মধ্যে গাইরুল্লাহর দাসত্ব ও ইবাদতের সামান্য হিসসাও বিদ্যমান থাকে, তবে সে একনিষ্ঠ বান্দা হতে পারল না। গাইরুল্লাহ যদি বান্দার হাসি-खुশি কিংবা আনন্দ- বেদনার উপলক্ষ হয়, তবে এ থেকে অনুমিত হয় যে, সে যেন গাইরুল্লাহরই দাস; তার অন্তরে গাইরুল্লাহর প্রতি মহব্বতের অনুপাতে তার অংশীদারত্বও আছে; বাড়িয়ে বললে ইবাদতও।
'বিখ্যাত আবিদ ও মুহাদ্দিস ফুযাইল ইবনে ইয়ায বলেন, “আল্লাহর কসম, ওই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতে সক্ষম হয়নি, যার কাছে কোনো মাখলুক প্রতিপালকের মর্যাদা পায়।” যায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল বলেন-
"এক প্রভূ বিশ্বাস করো, নাকি অসংখ্য?
এক দ্বীন মানো, তবে দাসত্ব কেন বিক্ষিপ্ত!"
'ইমাম তিরমিযি ও তাবারানি আসমা বিনতু উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা'র সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَخَيَّلَ وَاخْتَالَ وَنَسِيَ الْكَبِيرَ الْمُتَعَالِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ تَجَبَّرَ وَاعْتَدَى وَنَسِيَ الْجَبَّارَ الأَعْلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ سَهَا وَلَهَا وَنَسِيَ الْمَقَابِرَ وَالْبِلَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ بَغَى وَ اعْتَدَى وَنَسِيَ الْمُبْتَدَا وَالْمُنْتَهَى بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدُّنْيَا بِالدِّينِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ يَخْتِلُ الدِّينَ بِالشُّبُهَاتِ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ رَغَبٌ يُذِلُّهُ وَيُزِيلُهُ عَنْ الْحَقِّ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ طَمَعٌ يَقُودُهُ بِئْسَ الْعَبْدُ عَبْدٌ هَوَى يُضِلُّهُ
"সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে নিজেকে বড় মনে করে এবং অহংকার করে আর আল্লাহকে ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে জালিম হয়ে জুলুম করে এবং পরাক্রমশালী আল্লাহকে ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে সত্যবিমুখ হয়ে অনর্থক কাজে লিপ্ত হয় এবং গোরস্তান ও মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ, যে বিদ্রোহী হয়ে অবাধ্যতা করে এবং তার শুরু ও শেষ ভুলে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়া হাসিলের পথ অবলম্বন করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে সন্দেহজনক বিষয়ের ওপর আমল করে দ্বীনের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যাকে প্রবৃত্তির চাহিদা লাঞ্ছিত করে এবং সত্য থেকে বিচ্যুত করে। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যে লালসার গোলাম হয়ে যায়, লালসা তাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই ব্যক্তি কতই-না খারাপ যাকে তার প্রবৃত্তি ভুল পথে পরিচালিত করে।" [১]
'ইমাম তিরমিযি এ হাদিসটিকে গরিব বলেছেন। যদিও উল্লিখিত অন্যান্য সহিহ হাদিস, এই হাদিসটির সমর্থন করায় এটিও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। (আল্লাহই সর্বজ্ঞানী)।
'এটি ছাড়া আরও অসংখ্য হাদিস ও আসার রয়েছে, যেগুলো অর্থগত দিক থেকে এই হাদিসের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। কুরআনের আয়াতও আছে। যেমন : আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ، وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
"আর কিছু লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।”[২]
টিকাঃ
[১] তিরমিযি, হাদিস-ক্রম ২৪৪৮; মুহাদ্দিসগণের মতে হাদিসের সনদ যঈফ।
[২] সুরা বাকারা, আয়াত-১৬৫
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে ধ্বংস করে
এই বিষয়ে শাইখের আলোচনা শেষ হলে তিনি তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক আরও কিছু বিষয় যুক্ত করলেন। যে বিষয়গুলো চিন্তা-ভাবনার নিরিখে, বিশিষ্টজন তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এ পর্যায়ে শাইখ আমাদের এমন এক প্রাণবন্ত আলোচনার দিকে নিয়ে গেলেন, যা আমাদের অন্তরে স্পন্দন সৃষ্টি করল।
শাইখ বললেন, 'এতক্ষণ তোমাদেরকে আমি যে কথাগুলো বললাম, এই কথাগুলো হুবহু প্রযোজ্য হবে এমন সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যারা কিনা জোর করে হলেও ক্ষমতায় যেতে চায়। সম্মানজনক কথা বললে তারা খুব খুশি হয়, যদিও তা মিথ্যা হয়। আবার একটু অপমানজনক কথা বললে খুব রেগে যায়, যদিও তা সত্য হয়। কিন্তু একজন মুমিন বান্দা সবসময়ই সত্যের ওপর সন্তুষ্ট থাকে, সেটা তার পক্ষে যাক কিংবা বিপক্ষে। এবং মিথ্যায় সে ক্ষুব্ধ হয়, সেটাও তার পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে। কেননা সে জানে—আল্লাহ সত্য, সততা ও ইনসাফ পছন্দ করেন, মিথ্যা, অন্যায় ও অবিচার অপছন্দ করেন।
'একজন মুমিনকে যখন বলা হয়—সত্য, সততা ও ইনসাফ তো আল্লাহর পছন্দের, তখন সেও তা নিজের পছন্দের করে নেয়। যদিও সেসব তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। কেননা সে তো তার নিজস্ব ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকে নবীজির আনীত শরিয়তের সামনে কুরবান করে দিয়েছে। একইভাবে যখন তাকে বলা হয়—মিথ্যা, অন্যায় ও অবিচার তো আল্লাহর অপছন্দের, তখন সেও তা ঘৃণা করতে শুরু করে, যদিও কোনো কারণে সেটা তার মনঃপূত হয়।
'ঠিক একই কথা প্রযোজ্য হবে এমন ব্যক্তির বেলায়, 'যে অসদুপায় অবলম্বন করে হলেও সম্পদশালী হতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ مِنْهُمْ مِّنْ يَّلْمِرُكَ فِي الصَّدَقْتِ فَإِنْ أَعْطُوْا مِنْهَا رَضُوا وَ إِنْ لَّمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ
"তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সাদাকাহ বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। তারা তা থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় আর না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়।"[১]
'এরাই ওই সকল লোক, যাদের সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—تَعِسَ عَبْدُ الدِّيْنَارِ - ধ্বংস হোক দিনার-পূজারি।
‘এ তো গেল সম্পদ উপার্জনে মোহগ্রস্ত ব্যক্তির কথা, তাহলে এবার চিন্তা করে দেখো, ওই ব্যক্তির অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক হতে পারে, যার অন্তরের ওপর প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে, যাকে ধরাশায়ী করে রেখেছে এমনসব লোভনীয় বস্তু যা আল্লাহর মহব্বত ও ইবাদত থেকে বিমুখ করে দেয়। যেহেতু তার অন্তর নানারকম অনিষ্ট ও মাখলুকের মহব্বতে নিমজ্জিত, তাই আপন রবের ইবাদত, প্রীতি ও ভীতি থেকে সে দূরে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কেননা প্রত্যেক প্রেমিক তার প্রেমাষ্পদকে নিজের দিকে টানে এবং অন্যের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এভাবেই সকল অনিষ্ট মানুষকে আল্লাহর উপাসনা ও সান্নিধ্য থেকে সরিয়ে দূরে বরং বহুদূরে নিক্ষেপ করে।’
‘এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তাঁদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন—নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের বলেন— الْفَقْرَ تَخَافُوْنَ ؟ لَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الْفَقْرَ . وَ إِنَّمَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا ، حَتَّى إِنَّ قَلْبَ أَحَدِكُمْ إِذَا زَاغَ لَا يُزِيغُهُ إِلَّا هِيَ
“তোমরা কি দারিদ্র্যের ভয় করছ? আমি তো বরং তোমাদের ওপর দুনিয়াদারি ভয় করছি। এমনকি তোমাদের কারও অন্তর যদি ভ্রষ্ট হয়, তবে তা কেবল দুনিয়ার কারণেই হবে।” [১]
‘আরও একটি বিষয় খেয়াল করা যাক—মানুষ বন্ধুকে ভালোবাসে, শত্রুর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে; ভালোবাসার মানুষকে কাছে টানে, শত্রুকে দূরে রাখে। তার এই ভালোবাসা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তবে এটিই তার সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক ছিন্নকারী হতে পারে। একইভাবে, শত্রুর সঙ্গে মন্দ আচরণ— তথা ঘৃণা করা, কষ্ট দেওয়া বা প্রতিশোধ নেওয়া—কখন যে মানুষকে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে উদাসীন করে দেয়, তা সে টেরও পায় না। শুধু তাই নয়, উদ্দেশ্যহীনভাবে ভালোবাসে এমন বন্ধুরা যদি কারও সঙ্গে সদাচার করে, তাহলে বন্ধুদের এই সদাচার তার মনেও একরকম ভালোবাসার জন্ম দেয়; সেটা যদি খুব দৃঢ় নাও হয়ে থাকে তবুও এটি একটু একটু করে তাকে তাদের সমপর্যায়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তাঁর ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।'
টিকাঃ
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম: ৫৮
[১] ইবনু মাজাহ, হাদিস-ক্রম: ৫; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৩৯৮২; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। ইবনু মাজাহ ও মুসনাদু আহমাদের বর্ণনার সাথে এই বর্ণনার অর্থগত মিল থাকলেও শব্দগত তারতম্য, আছে।