📘 রূহের চিকিৎসা > 📄 অন্তর ও শরীরের রোগের মধ্যে পার্থক্য

📄 অন্তর ও শরীরের রোগের মধ্যে পার্থক্য


আমি বললাম, 'শাইখ যদি আমাদের জন্য আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরতেন, তাহলে হয়তো অন্তর ও শরীরের রোগের পার্থক্যটা আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হতো। শাইখ হয়তো খেয়াল করে থাকবেন-অসুস্থতার দরুণ শরীর একসময় প্রাণ হারায়, কিন্তু অন্তরের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না।'
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এটি নিঃসন্দেহে যথাযোগ্য জিজ্ঞাসা। আমি চেষ্টা করব এমন আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে, যাতে সকলের সংশয় কেটে যায়।
'আমরা জানি-মৃত্যু হচ্ছে রোগের পরবর্তী ধাপ। অর্থাৎ, প্রথমে মানুষ অসুস্থ হয়, তারপর হয়তো মারা যায়। এ হিসেবে চরম মূর্খ ও অজ্ঞ একজন মানুষের হৃদয় হচ্ছে মৃত; আর এক বা একাধিক বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তির হৃদয় ঠিক মৃত না, তবে অসুস্থ। দেহের মতো মানুষের মনেরও জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্য আছে। শুধু তাই নয়, বরং দেহের জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্যের তুলনায় মনের জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্যের বিষয়টি বৃহত্তর, বিস্তৃত। এজন্য ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরে যখন কামনা-বাসনা ও লোভ-লালসা স্থান পায়, তখন রোগ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। অপরদিকে সে যখন জ্ঞানী-গুণীদের সংস্পর্শে আসে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ শোনে, তখন অন্তর রোগমুক্ত হয়, অগ্রসর হয় কল্যাণের দিকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ “এ কারণে যে, শয়তান যা প্রক্ষেপণ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করে দেন তাদের জন্যে, যাদের অন্তরে রোগ আছে।”[১]
‘বক্ষ্যমাণ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহ এমন লোকদের ব্যাপারে ফিতনার কথা বলছেন, যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। আর শয়তান মূলত ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরেই সন্দেহের বীজ বপন করতে সক্ষম হয়। এদিকে ঈমান থেকে দূরে সরার কারণে তাদের হৃদয় শুষ্ক ও পাষণ্ড হয়ে থাকে। রোগাক্রান্ত হওয়ায় এইসকল লোকদের অন্তর থাকে দুর্বল। তাই শয়তান তাদের হৃদয়ে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেওয়ার সুযোগ পায় এবং তা তাদের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে মুমিনদের উপহাস করতে করতে ঈমান আনার ব্যাপারেও তাদের মনে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়। তাই ঈমান আনা তাদের জন্য হয়ে যায় নিদারুণ পরীক্ষা। এ-সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
لَئِن لَّمْ يَنتَهِ المُنْفِقُونَ وَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَ الْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينِةِ “মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা এবং মদিনায় গুজব রটনাকারীরা যদি বিরত না হয়।”[২]
وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ “এবং যাতে যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা বলে যে...”[৩]
‘উল্লিখিত আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হলো—এখানে যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত বলা হয়েছে, তাদের হৃদয় কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের অন্তরের মতো একেবারে মৃত না। আবার মুমিনদের অন্তরের মতো সুস্থও না। বরং সন্দেহ ও কামনার রোগে তাদের হৃদয় রোগাক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।" [১]
'এখানে ব্যাধি অর্থ প্রবৃত্তির লালসা। কেননা রোগব্যাধিমুক্ত কারও সম্মুখ দিয়ে কোনো নারী হেঁটে গেলে সে হয়তো তার দিকে তাকাবেই না। অপরদিকে লালসাগ্রস্ত মানুষ লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। এবং সে তার আত্মার দুর্বলতা ও হৃদয়ের রোগের স্তর অনুপাতে মন্দ কর্মের দিকে ধাবিত হবে। তাই নারীরা যখন কোমল কন্ঠে ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলে, তখন অসুস্থ হৃদয়ের মানুষেরা কুচিন্তায় নিমজ্জিত হয়।'
এতটুকু বলে শাইখ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বিষয়টি কি স্পষ্ট হলো? তোমাদের আপত্তি কি কাটল?'
আমি বললাম, 'জি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।'
শাইখ বললেন, 'আজকের মতো এখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করছি। এ মজলিসে আমরা আত্মার ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করলাম। ইনশাআল্লাহ, আগামী মজলিসে এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।'

টিকাঃ
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ৫৩
[২] সুরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৬০
[৩] সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত-ক্রম: ৩১
[১] সূরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00