📄 অন্তরের ব্যাধি : আলামত ও প্রতিকার
আমি বললাম, ‘শ্রদ্ধেয় শাইখ! এ ক্ষেত্রে আমার কোনো দ্বিমত নেই যে, শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার আলামত হচ্ছে—শরীরে যন্ত্রণা অনুভব করা অথবা দেহাভ্যন্তরে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, যেমনটি আপনার থেকেও জানলাম। কিন্তু দৈহিক ও আত্মিক ব্যাধির মধ্যে সাদৃশ্যবিধান ঠিক কীভাবে সঙ্গত?’
শাইখ ইবনু তাইমিয়া বললেন, ‘প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ! দেহের মতো মনেরও কিছু রোগ আছে। রোগের কারণে মানুষের অন্তরে সমস্যা সৃষ্টি হয়। যাতে তার চিন্তাশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
‘খুলে বলি—বিভিন্ন রকম সংশয় ও সন্দেহের দ্বারা মানুষের চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়। এর প্রভাবে কখনো সে সত্য অনুধাবনে অসমর্থ হয়, কখনো-বা মিথ্যাকে সত্য মনে করে। পরবর্তী সময়ে নষ্ট হয় তার ইচ্ছাশক্তিও। তখন উপকারী কিছু তার আর ভালো লাগে না, মন ঝুঁকতে থাকে সকল মন্দ জিনিসের দিকে।
‘আগেই বলেছি দেহের মতো মনেরও কিছু রোগ আছে। এবার চলো, বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। বিভিন্ন তাফসিরগ্রন্থে مَرَضٌ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে عُلةٌ শব্দ দিয়ে, আবার কখনো-বা করা হয়েছে رَيْبٌ শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ, যে শব্দ দিয়ে দেহের রোগ বোঝানো হয়, ঠিক একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে মনের ব্যাধি বোঝাতে। যেমন: মুজাহিদ ও কাতাদাহ রাহিমাহুমাল্লাহ কুরআনের আয়াত- فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ এর তাফসিরে مَرَضٌ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন شَكٌّ শব্দ দিয়ে। আবার কখনো কখনো مَرَضٌ শব্দের ব্যাখ্যা করেছেন- شَهْوَةٌ إِلَى الزنى বা ব্যভিচারের প্রতি আসক্তি দিয়ে। যেমনটি দেখা যায় কুরআনের আয়াত فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ-এ مَرَضٌ শব্দের ব্যাখ্যায়। সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম-দেহের মতো মনেরও রোগ আছে। কুরআনের ভাষায় যাকে বলা হয়েছে সন্দেহ, সংশয় বা পরনারীর প্রতি আসক্তি।[১]
'আরও একটি বিষয় খেয়াল করা যাক। আমরা প্রায়ই দেখতে পাই-অসুস্থ মানুষ যে কারণে কষ্ট পায়, সুস্থ কেউ হয়তো তাতে কষ্ট পায় না। এজন্য দেখা যায়-সামান্য শীত, গরম কিংবা ছোটোখাটো কাজে অসুস্থ মানুষটি কষ্ট পাচ্ছে, ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সুস্থ কারও জন্য এসব কিছুই না। অসুস্থ লোকটির এই অক্ষমতার কারণ হলো-অসুস্থতার দরুণ সৃষ্ট দুর্বলতা। রোগব্যাধি মূলত শারীরিক শক্তি হ্রাস করে মানুষকে দুর্বল করে দেয়। এই অবস্থায় সে একজন সুস্থ ও শক্তিশালী মানুষের মতো সবকিছু করতে সক্ষম থাকে না।
'একজন মানুষকে সুস্থ থাকতে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে হয়। রোগব্যাধির সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার একজন রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে নতুন কোনো রোগ প্রবেশ করলে অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। তবে কোনো প্রতিষেধক দেয়া গেলে অসুখ কমে যায়।
'সহজ কথায়-যে কারণে মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, সেই কারণ বৃদ্ধি পেলে তার রোগ ও দুর্বলতা বাড়তে থাকে, কমতে থাকে শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা। এভাবে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে ঘটতে এক পর্যায়ে হয়তো সে মারাই যায়। এমতাবস্থায় যদি সে এমন কোনো পথ্য বা প্রতিষেধক গ্রহণ করে যা তার অসুস্থতা দূর করতে সক্ষম, তাহলে সে সুস্থ হতে থাকে এবং ফিরে পেতে থাকে হারানো শক্তি ও সামর্থ্য। ঠিক একই ঘটনা ঘটে মনের রোগের ক্ষেত্রেও।'
আবার আরজ করলাম, 'মুহতারাম, আপনার কথা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, অন্তরের ব্যাধি মূলত সন্দেহ, সংশয় কিংবা প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা থেকেই জন্ম নেয়। কিন্তু অন্তরের ব্যাধি এবং দৈহিক রোগের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। তা হলো-দৈহিক রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ শরীরে ব্যথা অনুভব করে, অপরদিকে অন্তরের ব্যাধির কোনো ব্যথা নেই। আমার ধারণা উভয়ের মধ্যে এটি একটি মৌলিক ব্যবধান।'
শাইখ ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'না, বিষয়টি তেমন নয়। বরং অন্তরের ব্যাধির কারণেও ব্যথা অনুভব হয়। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি, কুরআনুল কারিম থেকে প্রমাণও পেশ করছি। দেখো, ক্রোধ বা রাগ এক ধরনের অনুভূতি। আমরা এটিকে কলবের একটি সমস্যা বা ব্যাধি হিসেবে ধরে নিতে পারি। শত্রুপক্ষ তোমাকে পরাস্ত করলে তুমি ক্রুদ্ধ হও। এবং এই পরিস্থিতি তোমার হৃদয়ে একরকম কষ্টও তৈরি করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَيَشْفِ صُdُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ ، وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ
“তিনি মুমিনদের অন্তরসমূহকে প্রশান্ত করবেন। তাদের অন্তরের ক্রোধ দূর করবেন।”।১।
'বক্ষ্যমাণ আয়াতে আমরা দেখতে পাচ্ছি-মন থেকে ক্রোধ দূরীকরণকেই কুরআনে শিফা বা সুস্থতা বলা হয়েছে। আরবরা বলে থাকে- فُلَانٌ شَفَى غَيْظُهُ অর্থাৎ, অমুকের রাগ প্রশমিত হয়েছে। আমরা আরও দেখতে পাই-নিহতের আত্মীয়রা হত্যার বিচার পেলে খুশি হয়, এতে তারা আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে, তাদের ক্রোধ প্রশমিত হয়। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।
'এই যে মনের অশান্তি দূর হওয়া এবং প্রশান্তি লাভ করা-এটাই হলো ক্রোধ, দুশ্চিন্তা কিংবা মনের যাতনার মতো রোগ থেকে সুস্থতা। এই সবগুলো সমস্যার কারণেই মানুষ মনের মধ্যে ব্যথা অনুভব করে, যন্ত্রণায় ভোগে। এমনিভাবে শক্ (সন্দেহ) ও জহলٌ (অজ্ঞতা)-এর রোগও মানুষকে ব্যথিত করে। দেখো, নবীজি ইরশাদ করেন-
هلا سألوا إذْ لَمْ يَعْلَمُوا فَإِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيَ السُّؤال "কোনো বিষয়ে যখন তাদের অবগতি না থাকে, তখন জিজ্ঞেস করে নেয় না কেন? অজ্ঞতা থেকে আরোগ্য লাভের উপায়ই তো জিজ্ঞাসা।"।১।
'এভাবে একজন সন্দিহান ও সংশয়গ্রস্ত মানুষ মানসিক কষ্টে ভোগে, যতক্ষণ-না সে তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে পারে। যেমন: বিজ্ঞজনের জবাবে আশ্বস্ত হয়ে প্রশ্নকারী বলে, "তিনি আমাকে সন্তোষজনক জবাব দিয়েছেন।"'
টিকাঃ
[১] নোট : مرض شك ريب অর্থ যথাক্রমে 'ব্যাধি', 'সন্দেহ' ও 'সংশয়'।
[১] সূরা তাওবা, আয়াত-ক্রম : ১৪-১৫
[১] আবু দাউদ, হাদিস-ক্রম: ৩৩৬; এটি মূলত হাদিসের একটি অংশ। হযরত জাবিরের সূত্রে বর্ণিত সনদে হাদিসটি যঈফ। আবু দাউদে একই অর্থে কাছাকাছি শব্দে ইবনে আব্বাসের সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত আছে। শুয়াইব আরনাউত ইবনু আব্বাসের সনদকে হাসান বলেছেন। হযরত জাবিরের বর্ণনায় هلا এর স্থলে ألا এসেছে।
📄 অন্তর ও শরীরের রোগের মধ্যে পার্থক্য
আমি বললাম, 'শাইখ যদি আমাদের জন্য আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরতেন, তাহলে হয়তো অন্তর ও শরীরের রোগের পার্থক্যটা আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হতো। শাইখ হয়তো খেয়াল করে থাকবেন-অসুস্থতার দরুণ শরীর একসময় প্রাণ হারায়, কিন্তু অন্তরের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না।'
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বললেন, 'এটি নিঃসন্দেহে যথাযোগ্য জিজ্ঞাসা। আমি চেষ্টা করব এমন আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে, যাতে সকলের সংশয় কেটে যায়।
'আমরা জানি-মৃত্যু হচ্ছে রোগের পরবর্তী ধাপ। অর্থাৎ, প্রথমে মানুষ অসুস্থ হয়, তারপর হয়তো মারা যায়। এ হিসেবে চরম মূর্খ ও অজ্ঞ একজন মানুষের হৃদয় হচ্ছে মৃত; আর এক বা একাধিক বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তির হৃদয় ঠিক মৃত না, তবে অসুস্থ। দেহের মতো মানুষের মনেরও জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্য আছে। শুধু তাই নয়, বরং দেহের জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্যের তুলনায় মনের জীবন, মরণ, রোগ ও আরোগ্যের বিষয়টি বৃহত্তর, বিস্তৃত। এজন্য ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরে যখন কামনা-বাসনা ও লোভ-লালসা স্থান পায়, তখন রোগ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। অপরদিকে সে যখন জ্ঞানী-গুণীদের সংস্পর্শে আসে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ শোনে, তখন অন্তর রোগমুক্ত হয়, অগ্রসর হয় কল্যাণের দিকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لِيَجْعَلَ مَا يُلْقِي الشَّيْطَنُ فِتْنَةً لِلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ “এ কারণে যে, শয়তান যা প্রক্ষেপণ করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করে দেন তাদের জন্যে, যাদের অন্তরে রোগ আছে।”[১]
‘বক্ষ্যমাণ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহ এমন লোকদের ব্যাপারে ফিতনার কথা বলছেন, যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। আর শয়তান মূলত ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরেই সন্দেহের বীজ বপন করতে সক্ষম হয়। এদিকে ঈমান থেকে দূরে সরার কারণে তাদের হৃদয় শুষ্ক ও পাষণ্ড হয়ে থাকে। রোগাক্রান্ত হওয়ায় এইসকল লোকদের অন্তর থাকে দুর্বল। তাই শয়তান তাদের হৃদয়ে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেওয়ার সুযোগ পায় এবং তা তাদের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে মুমিনদের উপহাস করতে করতে ঈমান আনার ব্যাপারেও তাদের মনে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়। তাই ঈমান আনা তাদের জন্য হয়ে যায় নিদারুণ পরীক্ষা। এ-সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
لَئِن لَّمْ يَنتَهِ المُنْفِقُونَ وَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ وَ الْمُرْجِفُونَ فِي الْمَدِينِةِ “মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা এবং মদিনায় গুজব রটনাকারীরা যদি বিরত না হয়।”[২]
وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ “এবং যাতে যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা বলে যে...”[৩]
‘উল্লিখিত আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হলো—এখানে যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত বলা হয়েছে, তাদের হৃদয় কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের অন্তরের মতো একেবারে মৃত না। আবার মুমিনদের অন্তরের মতো সুস্থও না। বরং সন্দেহ ও কামনার রোগে তাদের হৃদয় রোগাক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে।" [১]
'এখানে ব্যাধি অর্থ প্রবৃত্তির লালসা। কেননা রোগব্যাধিমুক্ত কারও সম্মুখ দিয়ে কোনো নারী হেঁটে গেলে সে হয়তো তার দিকে তাকাবেই না। অপরদিকে লালসাগ্রস্ত মানুষ লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। এবং সে তার আত্মার দুর্বলতা ও হৃদয়ের রোগের স্তর অনুপাতে মন্দ কর্মের দিকে ধাবিত হবে। তাই নারীরা যখন কোমল কন্ঠে ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলে, তখন অসুস্থ হৃদয়ের মানুষেরা কুচিন্তায় নিমজ্জিত হয়।'
এতটুকু বলে শাইখ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বিষয়টি কি স্পষ্ট হলো? তোমাদের আপত্তি কি কাটল?'
আমি বললাম, 'জি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।'
শাইখ বললেন, 'আজকের মতো এখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করছি। এ মজলিসে আমরা আত্মার ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করলাম। ইনশাআল্লাহ, আগামী মজলিসে এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।'
টিকাঃ
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ৫৩
[২] সুরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৬০
[৩] সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত-ক্রম: ৩১
[১] সূরা আহযাব, আয়াত-ক্রম: ৩২